• ১০ নভেম্বর ২০১৯ ১৫:০০:০৭
  • ১০ নভেম্বর ২০১৯ ১৫:০০:০৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

বিশ্বাস এবং অনুমান আর ভেঙে ফেলা বাবরি মসজিদ

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


‘বিশ্বাস’কে বিশ্বাস করে রায় হয়ে গেছে বাবরি মসজিদ বিষয়ে। রায়ে বলা হয়েছে, মাটির নিচে অন্য স্থাপনা ছিলো। সুতরাং কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা যেহেতু বিশ্বাস করে ওখানে রাম মন্দির ভেঙে বাবরি মসজিদ করা হয়েছে তাই সহি। অতএব মসজিদ অন্যত্র যাক।

আদালতের রায় নিয়ে কোনো কথা বলা যায় না, অন্তত দক্ষিণ এশিয়ায় নয়। তবে ‘বিশ্বাস’ নিয়ে কথা বলা যায়। আফ্রিকার মানুষ বিশ্বাস করে কালো জাদুতে। ভুডু, ব্ল্যাক ম্যাজিক, পিশাচ বিদ্যা, ব্ল্যাক আর্ট নানা নামে অভিহিত এই জাদু আফ্রিকা থেকে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে।

এমনকি খোদ অ্যামেরিকা-বৃটেনের মত দেশেও চর্চা চলে কালো জাদুর। অনেকেই বিশ্বাস করে এই ভৌতিক বিদ্যায়। কালো জাদুর চর্চা করতে গিয়ে সেখানে মানুষ হত্যার মত ঘটনা ঘটে, ঘটে ধর্ষণের মতন ঘটনা। যারা কালো জাদুর চর্চা করে তারা বিশ্বাস করে খুন ধর্ষণের মতন ঘটনায় মঙ্গল নিহিত রয়েছে। এমন কোনো খুনের ঘটনার বিচারে কি তবে ‘বিশ্বাস’ জয়ী হবে? বিচারক কি বলবেন, যেহেতু মানুষ বিশ্বাস করে সুতরাং এসব খুন-ধর্ষণ সংঘটিত হয়েছে মঙ্গলের নিমিত্তে’, অতএব এতে কোন অপরাধ নেই। এক্ষেত্রে যারা খুন-ধর্ষণের শিকার তাদের পরিবারকে কিছু অর্থ সাহায্য দেয়া হোক ক্ষতিপূরণ হিসাবে! তবে?

বিজ্ঞান কি স্বীকার করে ব্ল্যাক ম্যাজিককে? করে না। কিন্তু তারপরেও কিছু মানুষ ব্ল্যাক ম্যাজিকে বিশ্বাস করে। মিথ নির্ভর যে সব ধর্ম রয়েছে, সেই মিথকে কি বিজ্ঞান বিশ্বাস করে? করে না। তাহলে মিথের উপর নির্ভর করে কি কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া যায়? প্রশ্নটা এখানেই। মানুষের মনে কষ্ট দেয়ার বিষয়টাকে আমলে নেয়া যায়। মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ কিংবা মসজিদ ভেঙে মন্দির, এমন ঘটনায় বিশাল জনগোষ্ঠী মানসিকভাবে আহত হয়েছে, এমন কারণে সিদ্ধান্ত হওয়া সঙ্গত। কোনো ‘বিশ্বাস’ নির্ভর সিদ্ধান্ত সঙ্গত কিনা তা ভাবনার বিষয়।

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতার অনেক নিদর্শন এখনো পাওয়া যায়। গ্রিকদের তৎকালীন ধর্ম বিশ্বাসের সাথে এখনকার কি কোনো মিল রয়েছে? তাদের ধর্ম এবং বিশ্বাসের কি পরিবর্তনে ঘটেনি? ঘটেছে। এখন যদি কেউ দাবি করেন, এখানে জিউসের মন্দির ছিলো তার উপর গির্জা বানানো হয়েছে অতএব এই গির্জাকে সরিয়ে নেয়া হোক। এমন দাবির প্রেক্ষিতে কেউ কি তার বিশ্বাসকে আমলে নিবেন, নাকি সময়টাকে এবং কালের পরিবর্তনকে আমলে নেবেন? কোনটা বাস্তব সঙ্গত? নিঃসন্দেহে সময়ের পরিবর্তিত রূপটাই গ্রহণযোগ্য।

এখানে বিশ্বাস কিংবা আগের স্থাপনা খুব একটা অর্থবহন করে না। আর যদি তাই করতো, তাহলে বিশ্বে নতুন সভ্যতা গড়ে উঠতো না। এক সভ্যতার ধ্বংসস্তুপের উপরই নতুন সভ্যতার পত্তন হয়, এটাই কালের নিয়ম। 
ইসলামের আগে অনেক ধর্ম ছিলো, এখনো রয়েছে। কোথাও হয়তো অন্য ধর্মের মানুষ ইসলামে আকৃষ্ট হয়েছে, সেখানে স্থাপিত হয়েছে মসজিদ। হয়তো সেটা অন্য কোনো ধর্মের উপসনালয় ছিলো, কিন্তু কালের পরিক্রমায় তা রূপ নিয়েছে মসজিদে। সুতরাং সিদ্ধান্তের সময় কালের পরিক্রমাই বড় ‘ফ্যাক্টর’ হিসাবে বিবেচিত হওয়া উচিত, ‘বিশ্বাস’ বা অনুমান নয়।

পৃথিবীতে সভ্যতার পর সভ্যতা এসেছে চলে গিয়েছে। মায়ান’রা গিয়েছে, গ্রিক, রোমান এমন অনেক সভ্যতা গিয়েছে। মানুষ নতুন সভ্যতার সাথে পরিচিত হয়েছে। এখন যদি কেউ বলে আফ্রোদিতি রাতে স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেছে, ‘এইখানে আমার মন্দির ছিলো, তা ভেঙে গির্জা বানানো হয়েছে, আমার মন্দির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।’ এমন স্বপ্নজনিত বিশ্বাস এবং আব্দার কতটা যুক্তি ও ন্যায় সঙ্গত? এমন অনেকেই যদি দাবি করেন, এখানে মন্দির ছিলো এবং তা যদি সত্যিও হয়, তারপরেও সেখানে কালের পরিক্রমায় প্রতিষ্ঠিত গির্জা সরানোর সিদ্ধান্ত কি যুক্তি ও ন্যায়ের পক্ষে যাবে? প্রশ্নটা খুব সহজ বা সাধারণ নয়, ভেবে দেখার যথেষ্ট জায়গা রয়েছে। 

পুনশ্চ : আধুনিক বিশ্বে, বিজ্ঞান মনস্কতার দাবি যেখানে করা হয়, সেখানে ‘মিথ’ এর গ্রহণযোগ্যতা যখন প্রতিবাদহীন হয়, তখন সে আধুনিকতা সবচেয়ে বড় পশ্চাতপদতার নাম। ভারতের এক সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বিষয়টিকে আইনি দিক থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। এরমধ্যে তিনি বলেছেন, ‘যদি তিন’শ বছর আগের বিচার করা হয়, তাহলে অনেক মন্দির মসজিদ ভাঙা পড়বে’। এ কথাটি কোনভাবেই ফেলে দেয়ার নয়।

বাবরি মসজিদ যারা ভেঙে ফেলেছেন, তারা করেছেন আবেগের বশে। আবেগ ধর্ম সম্প্রদায়ের একটি অবলম্বন। কিন্তু বিচারের অবলম্বন যুক্তি ও বিবেক। সুতরাং যারা মসজিদ, মন্দির বা প্যাগাডো ভাঙেন যে বিবেচনায় তার সাথে বিচারিক বিবেচনার বড় পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্য ঘুচে যাবার মতন অবস্থা সৃষ্টি হলে তারচেয়ে বড় ‘ডিজাস্টার’ আর কিছু হতে পারে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাকন রেজা বাবরি মসজিদ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0220 seconds.