• ০৩ নভেম্বর ২০১৯ ২০:২৫:৩৮
  • ০৩ নভেম্বর ২০১৯ ২০:২৫:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

আপনার সন্তান আছে?

ছবি : সংগৃহীত


বিলেকাসা :


সন্তান হচ্ছে সৃষ্টি জগতের সবচে বড় এবং সুন্দর পুরষ্কার। আর পিতামাতার এবং সৃষ্টি জগতের একমাত্র দায়িত্বই হল সন্তানের যত্ন নেয়া, ওদেরকে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তোলা! এর জন্য দরকার শিক্ষা! দায়িত্ববোধের মাধ্যমে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে সুস্থ্যভাবে টিকে থাকায় উদ্বুদ্ধ করার নামই হল শিক্ষা! শিক্ষা একটি ব্যক্তিদায় নয়, শিক্ষা একটি সামাজিক দায়। একক ভাবে মানুষকে শিক্ষিত করে তোলা যায় না।

জন্মের পর মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো থেকেই সন্তানের শিক্ষা শুরু হয়ে গেছে এবং সন্তান শিখতে শুরু করেছে। এর জন্য মা এবং সন্তান দুজনেই ওতপ্রোত ভাবে জড়িত; সন্তানের ভেতরে আছে টিকে থাকার বাসনা, মায়ের মাঝে আছে সন্তানকে টিকিয়ে রাখার সর্বান্তকরণ ইচ্ছা! প্রকৃতিগত ভাবেই মা এবং সন্তান যার যার এই নিজস্ব গুণের অধিকারী!

সন্তান তিন চার বছর পর্যন্ত ভালোই শিখেছে। এর পরের ধাপ শিক্ষার জন্য শিক্ষার জন্য স্কুল বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দরকার। এবার শুরু হয়ে গেল পিতামাতার সামাজিক অন্ধত্ব! বেশীরভাগ পিতামাতারই চিন্তা হল একটি ভালো স্কুলে সন্তানকে ভর্তি করতে হবে। ভালো মানে কি? সামাজিক প্রেক্ষাপটে আমার চোখে যা ধরা পড়ে তা হল, ভালো স্কুল মানে যেখানে বেশী ছাত্রছাত্রীই পরীক্ষায় ভালো করে। আমি পরীক্ষায় ভালো করার বিরুদ্ধে না, টিকে থাকতে হলে আমাদেরকে ভালো করতেই হবে। তবে আমি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার বিরুদ্ধে, ঘোর বিরুদ্ধে। সবকিছুতেই ভালো করতে হবে এবং ভালো করার চেষ্টা করতে হবে! খেলাধুলা, বাড়ির কাজ, অন্যদের সাহায্যে এগিয়ে যাওয়া, ...সব কিছুতেই ভালো করতে হবে; একটি পরিপূর্ণ জীবনের পূর্বশর্ত এগুলো।

কিন্তু শুরুতেই আপনি সামাজিক সন্ত্রাসের শিকার। আপনার ছেলে মেয়েকে ভালো প্রফেশনে যেতে হবে। এর জন্য ভালো রেজাল্ট দরকার। ভালো রেজাল্টের জন্য ভালো স্কুলে দরকার ... এটা কি খারাপ, একে কেন সন্ত্রাস বলা হচ্ছে? কারণ এই করতে গিয়েই আপনি নিজের অবস্থান ভালো করে খেয়াল করতে পারবেন না।

একটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে নিজের অবস্থান ভালো করে বুঝা যায় না। ভালো প্রফেশনে সন্তানকে যেতে হবে বলে, অন্য প্রফেশনের লোকদের প্রতি আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কিন্তু একেবারেই নাজুক। খেয়াল করে দেখেন রিক্সাওয়ালা, মুদি দোকানদার, কাজের বুয়া, ... এদের প্রতি আপনার দৃষ্টি ভঙ্গি কেমন! অথচ ওরা সবাই আমাদের কাজে লাগছে; আপনাকে এগিয়ে দেয়ার জন্য, আপনার সন্তানকে এগিয়ে দেয়ার জন্য। এবং আপনি স্বাভাবিক ভাবে কিছুতেই চাইতে পারছেন না, আপনার সন্তান ওদের মত কেউ হোক। আপনি আপনার ছোট সন্তানকে ওদের সঙ্গে মিশতে পর্যন্ত দিতে চান না।

সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। স্কুলে ভর্তি করার পরই দেখা যাচ্ছে লেখাপড়ার নামে সন্তানের উপর ভীষণ চাপ, এর কারণ পিতামাতার অন্ধত্ব, সামাজিক, এবং শিক্ষা সন্ত্রাস। এই সন্ত্রাসের মাঝে আপনার সঙ্গে বিশেষ ভূমিকা রাখে “শিক্ষক” বলে আমরা যাদেরকে জানি! স্কুলে ভর্তি করার মানেই যেন শুধু লেখাপড়া। সন্তানের পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা জ্ঞান ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, এতে আমরা খুবই উদাসীন। ঘরটা পরিষ্কার থাকলেই হল, বাড়ির বাইরে যাই থাক না কেন, সামনের রাস্তায় বা ড্রেনে যত ময়লা বা গন্ধই থাকুক না কেন, যেন ঘরে ঢুকে পড়লেই শেষ। কিন্তু এই গন্ধ আপনার এবং আপনার সন্তানের ফুসফুসে ঢুকছে। এর জন্য ফল সবাইকে ভোগ করতে হচ্ছে, এবং সামনে আরো ভয়াবহ ভাবে ফল ভোগ করতে হবে। সন্তানকে বাড়ির কাজ শেখাতে হয়, যা আমরা সাধারণত করি না, আমরা লেগে আছি ওর লেখাপড়ায়; আমাদের আপাত ধারণা হচ্ছে, বাড়ির সব কাজ করবে বুয়া।

শিক্ষা সন্ত্রাস শুরু হয়ে গেছে, “শিক্ষক” এবং আপনি দুজনেই এখন মূর্তিমান আতংক। স্কুলে খুব ভালো করার জন্য বাড়িতে রাখা হচ্ছে প্রাইভেট টিউটর, এবং দেখা যাচ্ছে নিজের স্কুলের শিক্ষককেই রাখতে হচ্ছে, না হলে ছাত্র খারাপ করবে, পরীক্ষার খাতায় শিক্ষক নম্বর কম দিবেন, ছাত্রের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করবে; এটি একটি ভয়ানক সন্ত্রাস। সন্তানের উপর মানসিক চাপ যেন না পড়ে, সেজন্যেই আপনি “শিক্ষক” নামক সন্ত্রাসীর শিকার হয়ে গেলেন। এর উপর আছে আপনার নিজস্ব অন্ধত্ব, সন্তানকে ভালো করতেই হবে।

আপনি এতটাই অন্ধ যে ছোট্ট বাচ্চার পিঠে এক গাদা বই চাপিয়ে পাঠিয়ে দিলেন ভালো স্কুলে। লেখাপড়ায় ওকে ভালো করতেই হবে। পিইসিই এল তো অন্ধত্বের সঙ্গে যোগ হল আপনার মাতলামি। এই পরীক্ষায় গোল্ডেন এ-প্লাস পেতে হবে। এটাই হল অনেক বড় একটি শিক্ষা সন্ত্রাস – এই পিইসিই পরীক্ষার গোল্ডেন এ-প্লাস কোথায় কাজে লাগবে? আপনি মাতাল হয়ে ছুটলেন কোচিং এর দোকানে। স্কুলেরও নিজস্ব কোচিং আছে; আপনার অন্ধত্বের সঙ্গে মাতলামির সুযোগে পুরো “স্কুল”ই হয়ে উঠেছে সন্ত্রাসী চক্রের আখড়া! স্কুলে কোচিং করা কি বাধ্যতামূলক হয়ে গেছে?

আপনি এতটাই অন্ধ আর মাতাল, আপনি খেয়াল করতে পারছেন না, আপনার সন্তান কি ধরণের রাস্তায় চলাচল করছে, কতটা ভাঙা, কতটা নোংরা, দিনে কতটা যানজট পড়ে ... এখানে আপনার অভিব্যক্তি হল, এগুলো ভেবে আমি কিরব! অবশ্যই করার আছে, ভাবলেই দেখবেন আমাদের সবারই কিছু না কিছু করার আছে। একটি ক্লাসের ছাত্রদের সব বাবা মা মিলে ঠিক করুন, সন্তানদের সেই স্কুলের কোচিং-এ দিবেন না। নিজের অন্ধত্ব এবং মাতলামি থেকে বের হয়ে এলেই বুঝবেন, সন্ত্রাসীরা যত সঙ্ঘবদ্ধই হোক না কেন, ওরা মানসিক ভাবে খুবই দুর্বল হয়ে থাকে। এর সঙ্গে ছেলে মেয়েকে যোগ করুন ঘরের কিছু কাজে, একটু পরিষ্কার পরিছন্নতা শেখাতে, সন্তানকে কিছু কাজ করতে দিন। বাসার কাজের লোকের সঙ্গেও মিশতে দিন, ওদের সঙ্গে কাজ করতে দিন; এতে করে ওরা বুঝতে শিখবে ওরাও মানুষ, ওদের প্রতিও ওর দায়িত্ব আছে। আপনার বাড়ির কাজের লোকদের জামা কাপড় যেন সব সময় পরিষ্কার থাকে। এটা আপনার সন্তানকেও শিখান। ওদের সঙ্গে বসে মাঝে মাঝে গল্পের বই পড়ুন, ওদের সঙ্গে ওদের উপযোগী সিনেমা দেখুন, ... ওদের জীবনের অংশ হয়ে উঠুন; এটা এক স্বর্গীয় অনুভূতি, ওরা আপনার জীবনের সবচে বড় এবং সুন্দর পুরষ্কার। ওদেরকে শেখাতে গিয়ে নিজেকেও গড়ে তুলুন, ওদের উপযোগী করে; এতে ওদের চিন্তাও যেমন বুঝতে পারবেন, নিজেকেও গড়ে তুলতে পারবেন নতুন পূর্ণতা দিয়ে; যা আপানার সন্তানের জীবনে একটি স্বাভাবিক গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে।

জেএসসি আরেকটি বড় শিক্ষা সন্ত্রাস; পিইসিই এবং জেএসসি চালু করার ফলে বাবা মার অন্ধত্বের কারণে কোচিং ব্যবসা হয়ে উঠেছে ভীষণ রমরমা! আগে কোচিং ব্যবসা ছিল এসএসসির আগে আগে, এখন শুরু হয়ে গেছে ক্লাস থ্রি বা তারও আগে থেকে।

আপনার অন্ধত্বের কারণে এর মধ্যেই ছেলে মেয়ের জীবনে যোগ হয়েছে স্মার্ট ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ...। আপনাকে যদি বলি, কেন সন্তানের হাতে এগুলো দিয়েছেন। আপনার ঝটপট উত্তর, সবাই দেয়, ওরাও চাইল, না দিয়ে কি করব! ভালো উত্তর। এখন কথা হল, এগুলোও কি ভালো না? জীবনের জন্যে বিজ্ঞানের এই অবদান কি খারাপ? একেবারেই না। ইন্টারনেটের সুবিধা সহ একটি স্মার্ট ফোন হল ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীদের আবিষ্কৃত সমস্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার! আপনি চাইলেই যে কোন কিছু সম্পর্কে ভালো একটি ধারণা পেতে পারেন। কিন্তু এর জন্যে আপনাকে গভীর মন দিয়ে পড়তে হবে। সুবিধা হল, এখন আর আগের মত লাইব্রেরীতে দৌড়াতে হবে না। প্রশ্ন হল, আপনার সন্তান কি এই কারণেই স্মার্ট ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ... ব্যাবহার করে? এর বাইরেও এই আধুনিক যন্ত্রগুলোতে অনেক সুবিধা আছে, লেখাপড়া থেকে সামাজিক যোগাযোগ সহ অনেক কিছুই করা যায়।

এখন একটু খেয়াল করে দেখেন, এই আধুনিক যন্ত্র কি তাকে গড়ে তুলতে সাহায্য করছে, পরিবারের অন্যদের মাঝে কি বন্ধন দৃঢ় করছে! অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এর উত্তর হল না। আপনার সন্তান ওর বন্ধুদের সঙ্গে বেশি সময় দিচ্ছে, ইন্টারনেটে নানান আজগুবি ব্যাপারে সময় দিচ্ছে। এতে করে ওর পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাচ্ছে। সহজেই আপনার কথায় বিরক্ত হয়ে উঠবে। বিশেষ করে যখন ইন্টারনেটে থাকবে, তখন ওকে দিয়ে অন্য কিছু করানো যাবে না বললেই চলে। এতে করে ওর সামাজিক এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ গড়ে উঠবে না। ও হয়ে উঠতে চাইবে শুধু নিজের জন্য, যার শুরুটা আপনিই করে দিয়েছেন। এই ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ, ... এগুলো হল ব্যবসায়িক সন্ত্রাস। এগুলো কেন একটি বিশেষ বয়সের আগে সবার হাতে থাকতে হবে? কেন ইন্টারনেট এত সস্তা হবে? সবারই ইন্টারনেট দরকার হবে কেন?

ওরা চাইলেই আপনি দিবেন, কারণ আপনি অন্ধ এবং মাতাল। আপনার মত দশজন মিলেই অনেক টাকার স্বপ্নে ওদের খেলার মাঠ খেয়ে ফেলেছেন, বড় দোকান তুলেছেন, এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স বানিয়েছেন, ...। এখন আপনার মাতলামি ঢাকার জন্য ওরা যা চাইবে তাই দিবেন; ছোট মানুষ সময় কাটাবে কি করে!

সন্তান এসএসসি এবং এইচএসসি পার করেছে। সন্তানকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে হবে, না হলে নিদেন পক্ষে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য কোন বিষয়ে। বুয়েট, ঢাকা মেডিক্যাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ... পাড়ার বিশ্ববিদ্যালয়, পাড়ার মেডিক্যাল কলেজ, এক ঝকমকি কাণ্ড! জাতিগত ভাবেই আমরা অন্ধ বলে বুঝতে পারছি না, একটি ছোট্ট দেশে এত বিশ্ববিদ্যালয় বা মেডিক্যাল কলেজ এল কোত্থেকে! এত এত বিশ্ববিদ্যালয় মানের “শিক্ষক” এল কোত্থেকে?

ছেলে বা মেয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি বলে, যত টাকা লাগুক না কেন, আপনার ছেলেকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানানোর জন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেই হবে; আপনি অন্ধ এবং মাতাল, টাকা আছে পড়ান। কিন্তু আপনি পুরোপুরি অসুস্থ নন। আপনি পত্রিকা পড়ে বুঝতে পারেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা মিথ্যা কথা বলেন, সত্য এড়িয়ে গিয়ে ভুল জিনিস ছাত্রদের সামনে তুলে ধরতে পারেন, ওদের লজ্জা বোধ নেই বললেই চলে ... এরকম একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়লে আপনার ছেলে বা মেয়ে নির্লজ্জ এবং আত্মসম্মানহীন হতে বাধ্য! এবং হয়েছেও তাই! কিন্তু জীবন সম্পর্কে আপনি এতটাই অন্ধ, যে ভুলে গেছেন মিথ্যার উপর দিয়ে গড়ে তোলা একটি জীবন শুধু মিথ্যেতেই হাবুডুবু খায়, জীবনের প্রকৃত মানে ধরতে পারে না।

আচ্ছা ছেলে মেয়েকে যে এত প্রাইভেট টিউটর, কোচিং এ দিচ্ছেন, এত টাকা আসে কোত্থেকে! “শিক্ষক”রা সন্ত্রাসী, আর আপনি বুঝি সাধু মহাপুরুষ! এই টাকা উপার্জন করতে গিয়ে হয় আপনিও চুরি, ডাকাতি, ঘুষ, সন্ত্রাসী, ... অথবা নিজের জীবনের মুল্যবান সময়টাকে নির্লজ্জের মত বেচে দিয়েছেন সস্তা দরে। যে সময়টি আপনার নিজের জন্য থাকতে পারত, সংসার ছেলেমেয়ের জন্য দিতে পারতেন, আপনি আপনার সময় বেচে দিয়েছেন টাকা উপার্জনে, এই করে আপনি খুশি, টাকা এসেছে, ছেলে মেয়েকে এই দিতে পেরেছেন, ঐ দিতে পেরেছেন, ... কিন্তু সত্যিকারে যেটা হয়েছে, ওদের সঙ্গে আপনার দূরত্ব বেড়ে গেছে। ওর বুঝতে শিখেছে, টাকা চাইলেই পাওয়া যায়, বাবা মার কাজই হল টাকা দেয়া, কিন্তু অন্য কিছু বলতে যান, ওদেরকে শোনাতে পারবেন না, বলে বসতে পারে, আপনি কি বুঝেন! সব বুঝে ওরা। এই দূরত্ব আর ঘোচাবার মত নয়, টাকা ঢাললেই দূরত্ব ঘুচে না, খুব যত্ন করে সময় ঢেলে দূরত্ব ঘুচাতে হয়।

সন্তানকে ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার না বানিয়ে ওদেরকে সন্তান বানানোর চেষ্টা করুন, যেন ওদের সঙ্গে সময় কাঁটাতে পারেন, ওদের মাঝে যেন প্রাণ খুঁজে পান, এমন ভাবে ওদেরকে গড়ার চেষ্টা করুন, যাতে করে ওদেরকে দেখে আপনার বাঁচার ইচ্ছেটা সদা জাগ্রত থাকে। আপনার অসুখের জন্য ডাক্তার দরকার, ডাক্তার মোড়ের ক্লিনিকেই আছে, বেশি অসুবিধা হলে দেশের বাইরের ডাক্তারও পাবেন। আপনার বাড়ি বানানোর জন্য ইঞ্জিনিয়ারও আছে। কিন্তু আপনার মনে বেঁচে থাকার স্পৃহার টিকিয়ে রাখার জন্য কিছু মানুষ দরকার, আপনার সন্তানের চেয়ে আপন মানুষ আর কোথায় পাবেন! কিন্তু টাকা দিলেই সন্তান পাওয়া যায় না, এটা জীবনের সবচে বড় এবং সুন্দর পুরষ্কার! সন্তানকে প্রতিনিয়ত গড়ে তুলতে হয়, একটি জীবন ব্যয় করে, সঙ্গে নিজেকেও আরো বেশি করে গড়ে তুলতে হয়, ওদের উপযোগী করে, একজন আরেকজনের পরিপূরক হয়ে।

আপনার সন্তান আপনার “শিক্ষিত” করার প্রক্রিয়ায় ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার যাই হোক না কেন, তখন ওদের চিন্তা একটাই, কি করে খাবলা মেরে বেশি টাকা পাওয়া যায়। ওরা শিক্ষক হলে বেশি প্রাইভেট পড়ানোর চেষ্টা করবে, কোচিং এ ছুটবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হলে চেষ্টা করবে এখানে ওখানে পার্ট টাইম পড়াতে, চেষ্টা করবে কোথায় কোন সুবিধা আছে, খামছি মেরে ধরতে, ডাক্তার হলে ক্লিনিকে ... ইঞ্জিনিয়ার হলে ...।

এখন খেয়াল করে দেখুন, ওরা তো একটা কিছু হল, কিন্তু ওদেরকে বিশ্বাস বা ওদের উপর আস্থা রাখতে পারেন কি না! আপনার আশেপাশের রাস্তার কথা দরুন, ভাঙা গর্ত, ময়লা, যানজট, ... ঐ যে ছোট কালের শিক্ষা, যা আপনি দিয়েছেন, চোখ মুখ কান বন্ধ করে কি করে লেখাপড়া করানো যায়, আজ তাই হয়ে গেছে চোখ মুখ কান বন্ধ করে টাকা উপার্জন ... একটি রাস্তা এত সহজে নষ্ট হবে কেন? কারণ, ওরা খুব দ্রুত যাচ্ছে তাই মানের জিনিস দিয়ে রাস্তা বানাবে, অন্যদল আবার এই রাস্তার উপর অনেক ভারি যানবাহন চালাবে, ... এতে সবাই জড়িত! আপনার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওরা হয়ে উঠেছে সবার জন্য দুর্ভোগ!

ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বাদেও, কেউ খাবারের দোকান দেবে, ব্যাবসা করবে, ইন্ডাস্ট্রি দেবে ... ওদের খাবারে ভেজাল থাকবে, ব্যাবসায় অসততা থাকবে, প্রোডাক্টে মিথ্যা থাকবে ... ওরা কখনো ভাবতে পারবে না, এই খাবার আমাদের শরীরে যাচ্ছে, মরণ ব্যাধির জন্ম দিতে পারে, ওরা বুধ হয়ে থাকবে টাকায় ... ওদের কথা একটাই অন্যরাও তো করে, আমি না করলেই কি হবে! এটাই আপনার দেয়া শিক্ষা, এটাই আমাদের শিক্ষালয়ে শেখানো হচ্ছে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে অপকর্মের জন্য টেনে হিঁচড়ে নামানো লাগে, যে উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে ঢুকতে দেওয়া হয় না, যে উপাচার্য দুদকের মামালায় জেলে থাকেন, যে উপাচার্য রাতের গভীরে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে আসেন, যে উপাচার্যের অনিয়মের কথা পত্রিকায় বড় বড় করে লেখার পরেও তিনি পদ আঁকড়ে ধরে রাখার জন্য উপরে দৌড়ঝাঁপ করেন, ... উপাচার্যরাই যদি এরকম হতে পারেন, তাহলে সাধারণ শিক্ষকদের মান কি! ঐ সমস্ত শিক্ষালয়ে ছাত্ররা নির্লজ্জতা আর আত্মসম্মানহীনতা ছাড়া আর কি শিখতে পারে? বাড়িতে আপনার মত “শুধুমাত্র লেখাপড়া করানো” অভিভাবক আর শিক্ষালয়ে ওরকম শিক্ষক ... ভালো কি আসা করতে পারেন আপনার সন্তানের কাছে! কারো কাছে তো ওদের ভালোটা শিখতে হবে! আশা করবেন না, ওদের কানে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিলেই ওরা ভালো হয়ে যাবে। না, মন্ত্র দিয়ে ভালো করা যায় না, কাছের মানুষের মাঝে ভালো দেখলেই ভালো হতে পারে।

আচ্ছা কোথাও কি শিক্ষক নেই, যারা মিথ্যা বলেন না, যারা সন্ত্রাসী নন! থাকতে পারে কেন, অবশ্যই আছে! ওরা পালিয়ে থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। আপনারা আছেন তাদেরকে মেরে ফেলতে! তারাও ঝুকি নিতে পারছেন না, “শিক্ষক” সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারছেন না। কারণ আপনারাও। যে শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট পড়লে সবাই এ-প্লাস পায়, আপনারা সবাই ছুটছেন তার বাড়িতে, আপনার সন্তানটা যেন এ-প্লাস পায়। অথচ আপনারা বলতে পারতেন, ক্লাসের বাইরে তিনি কাউকে পড়াতে পারবেন না। প্রাইভেট পড়ানো “সন্ত্রাসী” শিক্ষকের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে, তাকে বানিয়ে তুলছেন অর্থলোভী জীবন বিমুখ একটি প্রাণী করে ...

আপনি কিছুতেই আস্থা রাখতে পারছেন না। আপনি কিছু বিশ্বাসও করতে পারছেন না। এই যানজট, ভাঙা রাস্তা, ভেজালের সঙ্গে ময়লা মেশানো খাবার ... আপনি বেশীদিন সুস্থ্য থাকতে পারবেন না। দেশী চিকিৎসায় ভরসা রাখতে পারবেন না। আপনাকে যেতে হবে বিদেশে। ভালো একটি হাসপাতালের ঠিকানা দিয়ে দিচ্ছি - Bumrungrad International Hospital, 33 Soi Sukhumvit 3, Khwaeng Khlong Toei Nuea, Khet Watthana, Krung Thep Maha Nakhon 10110, Thailand +66 2 066 8888. আর সম্ভব হলে দেশের বাড়িতে কবরের জন্য এক টুকরা জমি! ছেলে মেয়েকে অন্ধভাবে যে শিক্ষায় গড়ে তুলেছেন, ওরা আপনার কবরের দায়িত্ব নাও নিতে পারে!

আপাতত অসুস্থ হওয়ার আগে একটি ফেইস বুক একাউন্ট খুলে রাখুন। ছেলে ডাক্তার, মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার, ওরা অ্যামেরিকায় থাকে, ... এগুলো এখন আর মোড়ের চায়ের দোকানিও শুনতে চায় না। আপনাদের দেয়া শিক্ষার আছর ওর উপরেও পড়েছে; সেও টাকা ছাড়া কিছু বুঝতে চাইছে না। আপনি কিছু বলতে চাইলে, দেখানোর অদম্য বাসনা আপনার মনের ভেতর জেগে উঠলে ফেইসবুকে বলুন, ফেইসবুকে দেখান ... বড় পদের কারো সঙ্গে সেলফি তুলে লিখুন জনাব ক্যাহাফতুষ, ই.টি., পি.টি., ব্যংলার সাহেবের সঙ্গে। কোথাও যাচ্ছেন, খাচ্ছেন, ... চেক ইন, চেক আউট, ... মারফত সবই ফেইসবুকে জানিয়ে দিন, আপনার অবস্থা জানার জন্য পুরো পৃথিবী উন্মুখ হয়ে আছে। কিন্তু একটি জিনিস ভুলে গেলে চলবে না, ফেইসবুকেও কিন্তু আপনাদের দেয়া শিক্ষায় কালপিশ্চান্ন ওলঘেন্নার দল ঘাপটি মেরে বসে আছে, ওদের আপত্তিকর মন্তব্যে আবার কষ্ট পেতে যাবেন না যেন!

আমি একজন সন্তান এবং একজন পিতা, শুধু তাই নয়, আমি চাকরির সুবাদে একজন শিক্ষকও; সন্তান হিসেবে আমি পুরোপুরি ব্যর্থ, পিতা হিসেবে আমি পালিয়ে আছি, এবং শিক্ষক পদে আমি নিতান্তই আটকা পড়ে আছি। সবকিছুতেই ব্যর্থ বলেই আমি হয়ত এই লেখাটি লিখতে পেরেছি। আর একটি কারণ হল, আমি অনেক দিন থেকেই বাস্তব জীবন থেকে অনেক অনেক দূরে আছি।

এই লেখার প্রতিটি কথাই আমাকে উদ্দেশ্য করে। কিন্তু এই লেখাটি আমার জন্য কোন কাজে দেবে না। আমি যা আছি তাই থাকব। কিন্তু একজন ভবিষ্যৎ মা (যিনি এখনো মা নন, এবং যার এখনো বিয়ে হয়নি) যদি আজ থেকেই ভাবতে শুরু করেন, তাহলে তিনি হয়ত সন্তানের সামনে মিথ্যে বলবেন না, সন্তানকে সৎ হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করবেন, শুধু মাত্র লেখাপড়া না, জীবনের বোধগুলো সন্তানের মাঝে দেয়ার চেষ্টা করবেন, ... তার জন্যে লেখাটি কাজে লাগলেও কাজে লাগতে পারে। তিনি চেষ্টা করলেই খাবার থেকে ভেজাল চলে যাবে না, রাস্তার গর্ত দূর হবে না, ... বরং তাকে অনেক ধরণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে পারে, কিন্তু একটি আশা করতে পারি, পাঁচ দশ দশক পর হয়ত মানুষের জীবন বোধে একটি পরিবর্তন আসতে পারে। এরকম কয়েকটি মা খুব জরুরী হয়ে পড়ছে।

আরেকটি কথা, আমি গল্পের জগতের মানুষ। গল্প লিখতে খুব ভালো লাগে। একটি গল্প শুনিয়ে তারপর থামব; গল্পের সত্যতা যাচাইকারীর জন্য অলিখিত এবং অনির্ধারিত একটি অভিশাপ দিয়ে রাখলাম, সাবধান!

গল্পঃ

একজন প্লেনের পাইলটকে এমন ভাবে শিক্ষা দেওয়া হয়, সে যেন সবার আগে নিজের এবং যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টি ভাবতে পারে (যে কোন যন্ত্র চালানোর প্রথম কথাই হল নিরাপত্তা)। অনেক সময় দেখা যায় পাইলট প্লেন নিয়ে আকাশে ওঠার পরেই প্লেন নিয়ে তিনি নেমে এসেছেন, যান্ত্রিক গোলযোগের জন্য কিংবা কোন একজন যাত্রীর জরুরী চিকিৎসা, যা প্লেনে দেয়া সম্ভব না, ... । এতে করে অনেক অনেক অর্থের ক্ষতি হয়। এই সমস্ত ক্ষেত্রে যাত্রীদের টিকিটের টাকা ফেরত, হোটেলে রাখা, ... আবার ফ্রি তে পৌঁছে দেওয়া, এমনকি নামানোর আগে প্লেনের ওজন কমানোর জন্য প্লেনের তেলও ফেলে দিতে হয়। কারণ, লাভ ক্ষতির হিসেব তার বিবেচ্য নয়, এর জন্য অন্য লোক আছে। তার প্রথম চিন্তাই হল, সবার নিরাপত্তা। এতে করে পাইলট এবং সেই এয়ারলাইন্সের উপর মানুষের আস্থা থাকে, বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়ে।

ঢাকার একটি মিনিবাস, যা বিভিন্ন লাইনে চলে। বেশির ভাগ মিনিবাসেরই যান্ত্রিক অবস্থা ভালো না। ব্রেক আর স্টিয়ারিং হুইল ঠিক থাকলেই হল। এখানে ড্রাইভার না বুঝে নিজের নিরাপত্তা, না বুঝে যাত্রীর নিরাপত্তা। শুধু বুঝে টাকা, একটা এক্সট্রা ট্রিপ দিতে পারলে কিছু টাকা আসবে, এজন্যে চালায় ভীষণ বেপরোয়া। স্টপেজ ছাড়া দুটো যাত্রী তুলতে পারলে নিজের পকেটে কিছু টাকা আসবে। অন্য যাত্রীদের সময়ের কি হল, বা যাত্রীর বিরক্তি কিছুতেই ওরা গা করে না। এরা অমানুষের মত সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গাড়ি চালায়! শরীরের কি হল জানে না। এর সঙ্গে জড়িত আছে বাসের মালিক থেকে ফিটনেস দেয়া অফিসার পর্যন্ত। এই ড্রাইভারকে আপনি বলে কয়ে কিছু করতে পারবেন না। ওরা সন্ত্রাসী, কখনো যদি কিছু শোনাতে চান, আপনাকে ওর চেয়েও বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। নইলে ওদের সঙ্গে পারবেন না। ঢাকায় চলাচল করতে হলে, ওদের দৌরাত্ম্য মেনে নিয়েই চলতে হবে। তাকে পাইলটের নিরাপত্তা জ্ঞান দিয়ে লাভ হবে না, তার এই সময় বা বোধ কোনটাই নেই, মিনিবাসের ড্রাইভার হওয়ার আগেই হয়ত সে মিনিবাসের কনডাক্টর ছিল, যাত্রীদের গালি খেয়ে খেয়ে ওর সব বোধ মরে গেছে, নিজেও যাত্রীদের গালি দিতে শিখে গেছে। একটি যাত্রিকে ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দিলে যে যাত্রী মরেও যেতে পারে, এই বোধ তার নেই।

চাইলেই কি মিনিবাসের ড্রাইভারকে পাইলটের মত বানানো যাবে! বাসের ভাড়া পাঁচগুণ করে দিল, ... আপনি কি চরবেন তার গাড়িতে, মালিক কি ড্রাইভারকে বিশ্বাস করবে, ভাববে এবার ড্রাইভার বেশি চুরি করবে, ... ইত্যাদি ইত্যাদি। একটি পরিবর্তন চাইলেই আনা যায় না। এতদিনের অবিশ্বাস একদিনে দূর করা যাবে না। সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে, কিছু সুযোগ ছেড়ে দিতে হবে, অন্যদের প্রতি সহনশীল আচরণ ... এগুলো আমার চেয়ে আপনি আরো ভালো করে জানেন।

এই মিনিবাসের ড্রাইভারের চেয়েও বেশি সন্ত্রাসী আমাদের দেশের “শিক্ষকরা”। একটু মিলিয়ে দেখতে পারেন। মিনিবাসে শুধু আপনার জীবন, শিক্ষকের হাতে আপনার সন্তানের জীবন, আপনার জীবন দেশের জীবন ... শিক্ষক বলতে ভাববেন না, যারা শুধুমাত্র পেশায় শিক্ষক, আপনি ওর চেয়েও অনেক বড় শিক্ষক, সন্তানের জন্য আপনি একজন সার্বক্ষণিক শিক্ষক, ... আপনিই বড় সন্ত্রাসী; সঙ্গে অন্ধ এবং মাতাল!

সবচে ভয়ানক একটি বিষয় এনে শেষ করছি। আজ আমাদের মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক একেবারেই কমে গেছে। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক, সন্তানের সঙ্গে পিতামাতার, ... যার ফলে আমরা সহজে রেগে যেতে পারি, কারণ অন্য মানুষেরও যে একটি কথা থাকতে পারে, আমরা মানতে পারছি না। রাস্তায়, দোকানে, ... নানান ধরণের বিশৃঙ্খলা লেগেই আছে। অথচ, এগুলোতে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক গড়ে উঠার কথা। আপনার দেয়া, আমার দেয়া শিক্ষায় শিক্ষিত ... মানুষ এরকম অসহনশীল হওয়ার কথা, এবং তাই হয়েছে। আসুন সবাই মিলে এখন ফল ভোগ করি! আলাদা আলাদ হয়ে অশান্তির চরমে গিয়ে ঢলে পড়তে হবে মৃত্যুর কোলে! আমাদের জন্য কোথাও বুঝি শান্তি বা স্বস্তি নেই!

লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

সন্তান শিক্ষা বিলেকাসা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0237 seconds.