• ০৩ নভেম্বর ২০১৯ ০১:০৫:১০
  • ০৩ নভেম্বর ২০১৯ ০১:০৫:১০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

সরকারের ইলিশ আর আমাদের কুবেররা

ছবি : সংগৃহীত


দিলশানা পারুল :


সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি দারুন এডভেঞ্চারাস ভিডিও ঘুরে বেরাচ্ছে। ভীষণ গতির স্পীডবোটে করে একদল পুলিশ সমুদ্রে একদল দস্যুকে ধাওয়া করে বেরাচ্ছে। পুলিশের দলনেতা সমানে চিৎকার করছে ওই গুলি কর গুলি কর, একটাও যেন পালাতে না পারে...। না এইটা কোনো বাংলা সিনেমা থেকে কাট করা দৃশ্য না। আমাদের দারুন শক্তীশালী, ন্যায় পরায়ন, ডিউটিফুল পুলিশবাহিনী সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় আমাদের জেলেদের ধাওয়া করছিলেন।

তাদের অপরাধ তারা সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ মাছ ধরছিলেন। এই ধরপাকর দফায় দফায় চলছে। ১৬ই অক্টোবর বাংলা ট্রিবিউন ছবিসহ একটি রিপোর্ট করেছে। ভোলার নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইলিশ ধরার অপরাধে ভ্রাম্যমাণ আদালত ১২ জেলেকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে। এই যে ১২ জন জেলে ছবিতে দেখা যাচ্ছে এর সবাই কিশোর এবং পরনে শুধুমাত্র লুঙ্গি আছে।

১৯ অক্টোবর এই বাংলা ট্রিবিউনই রিপোর্ট করছে “৬৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ১০ জেলেকে ছেড়ে দিলেন এসআই।” ১৯ অক্টোবর বাংলা ট্রিবিউন আরেকটি রিপোর্ট করেছে “ইলিশ ধরার অপরাধে বাউফলে ১৪ জেলের দণ্ড”। ছবিতে দেখা যাচ্ছে সরকারি অফিসে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে ১৪ জন জেলে, যাদের সবাই উদোম গা, পরনে শুধু লুঙ্গি আর গামছা। “জেলেদের দেড় মণ ইলিশ ভাগাভাগি করে নিল সাংবাদিক-পুলিশ” - জাগো নিউজ নভেম্বর ২।

এই যে বাংলা সিনেমার কমান্ড স্টাইলে যাদের ধরতে যাওয়া হচ্ছে, দফায় দফায় ধরপাকর হচ্ছে, তারপরও যে জেলেরা সমুদ্রে মাছ ধরতে যাচ্ছে, এরা আসলে কারা? কেনই বা যাচ্ছে মাছ ধরতে?

কোস্ট ট্রাস্ট এবং বাংলাদেশ ফিশ ওয়ারর্কাস এসোসিয়েশনের রিপোর্ট অনুযায়ী সমুদ্র উপকূলীয় ১২টি জেলায় নিবন্ধিত জেলে আছে মোট চার লাখ কিন্তু কোস্ট ট্রাস্টের রিপোর্ট বলছে এই সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার মাত্র এক তৃতীয়াংশ। ২০১৫ সালে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগ মহীপুরের ইলিশ জেলেদের অবস্থার উপর একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে।

সেই গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের জেলেদের গড়ে বছরে আয় ৩০ হাজার টাকার কম। মানে প্রতি পরিবারে মাসে আয় গড়ে ২৫০০ টাকা। এদের শতকরা ৭৬ ভাগ কাঁচা ঘর মানে মাটির বা চা্টাইয়ের ঘরে থাকে এবং কাঁচা টয়লেট ব্যবহার করে। এবং এই সমস্ত জেলেদের শতকরা ৬৩ ভাগের কোনো নিজস্ব টিউবওয়েল নাই এরা সরকারি চাপকল থেকে পানি খায়। এবং এদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা গড়ে ৫ থেকে ৭ জন।

এখন এই কথাগুলো বলার মানে কি? মানে সমুদ্র তীরবর্তী এইসব জেলেরা যে গরিবের চেয়েও গরিব সেইটা বলার চেষ্টা করলাম। এরা যে গরিব আপনারা যদি না মানেন তাই গবেষণা রিপোর্ট থেকে উল্লেখ করতে হলো। ৭ জনের একটা পরিবারে মাসে ২৫শ টাকা দিয়ে আসলে কিভাবে চলে সেইটা আমার জানা নাই। যেই দেশে সর্বনিম্ন চালের দাম ৩০ টাকা কেজি সেই দেশে ২৫শ টাকা দিয়ে মাস চলে ৭ জনের একটা পরিবার, শুধু ভাতও আসলে জোটার কথা না। এই যে ২৫০০ টাকার কথা বললাম সেইটাও শুধুমাত্র সম্ভব যদি এই সব জেলেরা সারা বছর সমুদ্রে মাছ ধরতে পারে। এই মৎস্য শ্রমিকদের বিরাট একটা অংশ বছরের শুরুতে অগ্রিম বেতন নিয়ে মহাজনদের কাছে সারা বছরের জন্য শ্রম বিক্রি করে দেয়, অনেকটা ক্রীতদাসের মতো। কোস্ট ট্রাস্টের রিপোর্ট বলছে এই সংখ্যা শুধু মহেশখালিতেই আছে ৪০ হাজার মৎস্য শ্রমিক। 

২০১৯ সালে সরকার প্রথম দফা মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ২০ মে থেকে ২৩ জুলাই মোট ৬৫ দিনের জন্য। দ্বিতীয় দফায় মাছ ধরা নিষেধ করে ৯ থেকে ৩০ অক্টোবর ২২ দিনের জন্য। তার মানে সর্বমোট এই বছরে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে ৮৭ দিনের। তিনদিন কম তিন মাস। আবার বছরের ৮ মাস ৯ ইঞ্চির উপরে মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকে এমনিতেই। এই তিন মাস যাদের একমাত্র জীবিকা মাছ ধরা তারা আসলে কি খেয়ে বেঁচে থাকবে? সরকার প্রথম ৬৫ দিনের জন্য জেলে প্রতি মাত্র ৪০ কেজি চাল বরাদ্দ করেছে। পরের ২২ দিনের জন্য এরকম কোনো রেসন এর বরাদ্দের খবর পাওয়া যায়নি। ৪০ কেজি চালে ৭ জনের একটা পরিবার আসলে ৮৭ দিন চলতে পারে কিনা? পরিবারের পুষ্টিযুক্ত অন্যান্য খাবারের কথা বাদই দিলাম।

এই যে ৪০ কেজি চাল সেটাও কিন্তু সব মৎস্য শ্রমিক পাবে না। শুধুমাত্র নিবন্ধিত জেলেরাই এই রেসন পাবে। ৬ই জুন ২০১৯ ডেইলি স্টার রিপোর্ট করছে “মেলেনি সরকারি সহায়তা তাই ঈদও নিরানন্দ জেলে গ্রামে”। কোস্ট ট্রাস্টের রিপোর্টেই দেখা যাচ্ছে কক্সবাজারের ৪০ হাজার জেলের মধ্যে এই রেসনের আওতায় আসবে মাত্র ১০ হাজার জেলে। আবার এই যে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সেইটাও স্বচ্ছ না। জেলেদের এ নিবন্ধনে নাম তোলার জন্য আগাম টাকার হিস্যা দিতে হয় এলাকার মেম্বার/চেয়ারম্যানদেরকে আর নইলে নিবন্ধনে নাম উঠে না। আবার নিবন্ধনের সময় সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার কারণে বাদ পরেছে এরকম জেলের সংখ্যাও অনেক।

যেই সময় বাংলাদেশের জলসীমায় ইলিশ মাছ ধরা নিষেধ থাকে একই সময় মিয়ানমার এবং ভারতের জেলেরা বাংলাদেশের জলসীমায় ঢুকে মাছ শিকার করে। বিভিন্ন পত্রিকায় এই রিপোর্টগুলো এসেছে। জেলেদের বদৌলতে প্রতিকার রিপোর্টগুলো জানাচ্ছে ভারতীয় জেলেদের কাছে যেহেতু বড় বড় ট্রলার থাকে তারা সমুদ্রের অনেক গভীরে গিয়ে মাছ ধরতে পারে। বাংলাদেশে এই নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী ছোট ছোট দেশি নৌকা সম্বল করে যে সমস্ত স্বল্প আয়ের জেলেরা মাছ ধরে তারা, একদম প্রান্তিক জেলে যারা আছে তারা। “পূজায় ভারতকে ৫০০ মেট্রিক টন ইলিশ দেবে বাংলাদেশ ” -যুগান্তর রিপোর্ট ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯। এবং আগামী অর্থ বছরে আমরা শুনতে পাব ইলিশ রপ্তানি করে কি বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে বাংলাদেশ। যে পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা আসবে তাতে আসলে আমাদের কোস্টাল এলাকার জেলেদের জীবনের মান পরির্তন হবে না হয়েছে? এই বিপুল পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে আমাদের জেলেদের কি যাবে আসবে বলেনতো? যেই তিন মাস তারা মাছ ধরছে না, তাদের ভাতা ৪০ কেজি চাল থেকে বারবে না তাদের সন্তান স্কুলে যেতে পারবে? তাদের বাৎসরিক আয় ৩০ হাজার থেকে বাড়বে?

তাহলে এই ইলিশ রপ্তানি করে বা শহুরে মানুষের জন্য ইলিশ বড় করে আমার প্রান্তিক জেলেদের কি লাভ? তিন মাস পরিবার পরিজনসহ না খেয়ে আধ পেটা খেয়ে রাষ্ট্রীয় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়িয়ে আমার প্রান্তিক জেলেদের কি লাভ? এই দেশে সমস্ত আইন তৈরী হয় বড় লোকের কথা মাথা রেখে। এমন কোনো নিয়ম আইন আমরা বানাই না যাতে গরিব দুটো খেয়ে বাঁচে, বাঁচতে পারে।

লেখক: এক্টিভিস্ট, গবেষণা ও বাস্তবায়ন কর্মী।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ইলিশ দিলশানা পারুল

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0200 seconds.