• ০২ নভেম্বর ২০১৯ ১৮:০৯:৩৭
  • ০২ নভেম্বর ২০১৯ ১৮:০৯:৩৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

‘সহিংসতা’ এড়াতে জাবি ভিসি’র অপসারণ জরুরি

ছবি : সংগৃহীত


আদনান ফরহাদ :


উপাচার্যের পদত্যাগ দাবিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান আন্দোলন ক্রমশ ধোঁয়াশচ্ছান্ন হচ্ছে। সর্বশেষ আন্দোলনকারীদেরকে ‘শিবির’ তকমা দেয়ায় এটি আরো বেশি ধোঁয়াশাচ্ছান্ন হয়ে গেছে, যা যে কোনো সময় বড় কোনো সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আমি এ লেখায় অনুমান নির্ভর কোনো কথা বলার পরিবর্তে বরং কিছু তথ্য নির্ভর কথা লেখার চেষ্টা করবো।

উপাচার্যের বিরুদ্ধে শুরুতে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিলো, তা ছিলো খুবই নগণ্য এবং যৌক্তিক বিষয়। তবে আমাদের দেশের প্রশাসকরা তাদের বিরোদ্ধে কোনো সমালোচনাই সহ্য করতে পারে না। ঠিক এমনটিই হয়েছে জাবি উপাচার্যের ক্ষেত্রে। প্রথম যখন আন্দোলনকারীরা পরিবেশ রক্ষা বা অল্প জায়গার মধ্যে বেশি হল করার বিরোধীতা করেছিলো, তখন বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব ছিলো। কিন্তু সেটি ধর্মঘট পর্যন্ত গড়াল।

এর মধ্যেই চলে আসলো ছাত্রলীগের ‘ঈদ সেলামী’র’ ২ কোটি টাকা এবং প্রশাসনিক কাজে উপাচার্যের পরিবারের সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ। আসলে উপাচার্য ছাত্রলীগ-কে ২ কোটি টাকা ‘ঈদ সেলামী’ দিয়েছেন এই তথ্যটা কোনো সাংবাদিক বা আন্দোলনকারীরা ফাঁস করেননি। বরং এটি ফাঁস করছে, ঐ টাকার সুবিধাভোগী ছাত্রলীগ নিজেই। প্রশ্ন আসাটা স্বাভাবিক, ছাত্রলীগ টাকা নিয়ে হজম করতে পারলো না কেন? আসল তথ্যটা হলো প্রথম ১ কোটি টাকা ক্যাম্পাস ছাত্রলীগকে দেয়া হয়েছিলো সেটা কেউ জানতো না। সব ঠিকঠাক-ই ছিলো।

কিন্তু বাগড়া বাঁধালো কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ক্যাম্পাস ছাত্রলীগকে ১ কোটি টাকা দেয়ার বিপরীতে তারা পুরো উন্নয়ন বাজেটের ৪-৬ শতাংশ কমিশন দাবি করে বসে। এটি নিয়ে উপাচার্যের সাথে আলোচনার এক পর্যায়ে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সভাপতি-সম্পাদককে ১ কোটি টাকা নগদ প্রদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রভাবশালী শিক্ষকের মতে, “কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ-কে ১ কোটি টাকা দেয়ার পর সেখান থেকে উপাচার্য-পুত্র কিছু টাকা রেখে দেয়। ফলে কেন্দ্রীয় নেতারা ক্ষুব্ধ হন।’ 

এরপরই উপাচার্য এবং ছাত্রলীগ নেতাদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়, যা ইতোমধ্যে সংবাদপত্র মারফত কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ সম্পাদক ও উপাচার্যের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়। আর উপাচার্যের পরিবার কতটা দুর্নীতিগ্রস্ত তা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাই অবগত। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু স্বার্থান্বেষী মেরুদন্ডহীন শিক্ষক নিজেদের লাভের আশায় উপাচার্যের স্বামী ও পুত্রের সকল দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। উপাচার্যের পরিবারের দুর্নীতি আজ আমার লেখার বিষয় না।

আসল কথায় আসি, পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন খুব দ্রুতই দুর্নীতি-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নিলো। জাবিতে সাধারণত বামপন্থী শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং সাংস্কৃতিক জোটের নেতা-কর্মীরাই যে কোনো অন্যায় বা অনিয়মের বিরোদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে থাকেন। এবারও এর ব্যতিক্রম হলো না। এদিকে প্রশাসন সব সময়ই তাদেরকে প্রতিপক্ষ মনে করে। ফলে তারা কোনো যৌক্তিক দাবি করলেও প্রথমেই এটাকে উপেক্ষা করা হয়। পরবর্তীতে নানা কায়দায় সেটিকে বিতর্কিত করা হয়। 

এই আন্দোলনের ফলে যেটি হয়েছে, প্রথমেই আন্দোলনকে পাত্তাই দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কিন্তু যখন দেখলো আন্দোলন কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে, তখন তারা এটিকে বিতর্কিত করতে সেই ‘তকমা’ দেয়ার পুরোনা রাস্তায় হাটলো। অর্থাৎ বলা শুরু করলো এই আন্দোলনে শিবিরের ইন্ধন আছে। সেটিকে প্রমাণ করার জন্য প্রশাসন গত ২৩ অক্টোবর উপাচার্য বিরোধী আন্দোলনকারীদের মশাল মিছিল চলাকালে নিজেরা একটি তালিকা তৈরী করে কোনো একজন শিক্ষার্থীকে আটক করে শিবির বলে চালিয়ে দেয়ার চক্রান্ত আঁটে। 

ক্যাম্পাসে যেহেতু শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ, তাই যাকে তাকে শিবির বানানো খুবই সহজ। এতে তারা অনেকটাই সফল হয়। কিন্তু বিপত্তি বাঁধে পুলিশি কার্যক্রমে। তাদের ধারনা ছিলো, কোনো তালিকা দিলেই হয়তো পুলিশ ঐ আটকৃতকে শিবির বলে বিবৃতি দিয়ে বলে দিবে যে, তার কাছ থেকে তালিকা উদ্ধার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা, পুলিশ গ্রেপ্তারের পর ঐ শিক্ষার্থীকে রিমান্ডে নেয় ঠিকই, কিন্তু তাকে শিবির বলে আখ্যাও দেয়নি এবং তার কাছ থেকে কোনো তালিকা পাওয়া গেছে বলেও বিবৃতি দেয়নি। ফলে প্রশাসনের এই চক্রান্ত ভেস্তে যায়। 

ফলে তারা আরো একটি চক্রান্ত করে, তা হলো আটককৃত ছাত্রের ফোন থেকে উদ্ধার করার নামে কিছু একপাক্ষিক অডিও ফাঁস করতে থাকে যেখানে শুনা যাচ্ছ যে, সে আন্দোলনরত নেতাদের দিক নির্দেশনা দিচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত ফাঁস হওয়া অডিওতে কোথাও শিবির শব্দটি পাওয়া যায়নি। মজার বিষয় হলো, একটি ফেইসবুক চ্যাটের স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে আটককৃত শিক্ষার্থী এমনভাবে আন্দোলন করতে বলছে, যাতে ভর্তি পরীক্ষা বানচাল না হয়। আমি খুবই অবাক হলাম এই ভেবে যে, এই শিবির কোন শিবির। আমরা যে শিবিরকে জানি তার তো বলার কথাছিলো ভর্তি পরীক্ষা বানচাল করে দাও।

এটাও খুব একটা কাজে আসেনি। কারণ কেউ বিশ্বাস করছে না। তাছাড়া, শিক্ষার্থী আটকের পর ফোন চলে গেছে পুলিশের হাতে, তাহলে এখন এসব কোথা থেকে আসছে? অথচ পুলিশ কিছুই বলছে না! ফলে কারো আর বুঝার বাকি নাই যে, প্রশাসন এসব বানাচ্ছে আর আন্দোলনকারীদের দুর্বল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু বস্তুত তাতে প্রশাসন নিজেই ফেঁসে যাচ্ছে। এরপর আসলো সহকারী প্রক্টরের উপর আন্দোলনকারীদের ‘হামলা’(?)। এটিও ধোপে টিকলো না, কারণ যিনি আহত হয়েছেন বলে যে দাবি করছেন, তার করা ভিডিও প্রমাণ করছে যে আসলে তিনিই আন্দোলনকারীদের উপর হামলার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। 

যাই  হোক, এখন পর্যন্ত প্রশাসন যত কৌশলই নিয়েছে, কোনোটিই কাজে আসেনি। ফলে প্রশাসন এখন হার্ড লাইনে যাওয়ার চিন্তা করছে। অপরদিকে ভিসিপন্থী শিক্ষকরা আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের শিবির আখ্যা দিয়ে এখনই তাদের উপর হামলা করার এবং তাদেরকে পুলিশে দেয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। এ সংক্রান্ত কিছু স্ক্রিনশট আমি এখানে যুক্ত করে দিচ্ছি, যা প্রশাসনপন্থীদের নিজস্বগ্রুপে আলোচনা হচ্ছে। 
 .. . . . . . . . . . . .

এই আলোচনাগুলোর সারাংশ হলো আন্দোলকারী তথা শিবিরের উপর হামলা করতে হবে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। সাংবাদিকরা নিরপেক্ষ জায়গায় থেকে সংবাদ প্রকাশ করায় প্রশাসন তাদের উপরও ক্ষেপে আছে। তবে তাদের প্রথম পরিকল্পনা হলো আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী, যারা নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদেরকে ’শিবির’ বলে দমন করা। পরে ধাপে ধাপে বাকি টার্গেটকৃতদের দমন করা। এমনকি তারা ক্যাম্পাসে বাম রাজনীতি নিষিদ্ধ করারও পাঁয়তারা করছে। 

ফলে, এখন যদি আন্দোলনকারীরা পিছু হটে তাহলে সহিংসতা নিশ্চিত। কারণ প্রশাসন এখন ছাত্রলীগকে খুব ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বলছে। কথিত ‘শত্রু’ চিনে রাখতে নির্দেশ দিচ্ছে। সময়মত এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে আেেলাচনা। তাই এই অনাকাঙ্খিত ‘সহিংসতা’ এড়াতেই উপাচার্যকে দ্রুত অপসারণ করা জরুরি।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ এই সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাঁচাতে হবে। শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। এ জন্য একজন যোগ্য ব্যক্তিকে যথাস্থানে বসানোর ব্যবস্থা করেন। কারণ সরকার দলীয় যোগ্য শিক্ষকের-তো অভাব নেই। তাহলে শুধু শুধু কেনো একজন ’বিতর্কিত’ ব্যক্তিকে পরিপূর্ণ দুই মেয়াদে উপাচার্য রাখতে হবে। বরং অন্য যারা দলের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদেরও সুযোগ দেয়া উচিৎ বলে মনে করি। 

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0231 seconds.