• ফিচার ডেস্ক
  • ৩০ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:৩১:০৯
  • ৩০ অক্টোবর ২০১৯ ১৩:৩১:০৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

শুধুই মন খারাপ, নাকি বিষণ্নতা?

ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশের নারীদের বয়স বাড়তে থাকলেই নানা স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। এর মধ্যে মাথা জ্বলা, শরীর জ্বালাপোড়া, ঘুম না হওয়া, সবসময়ই মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকা অন্যতম। এসবের কারণ খুঁজলে দেখা যায়, এদের অধিকাংশই বিষণ্নতায় ভুগছেন। 

আমাদের দেশের শতকরা ৫ থেকে ৯ শতাংশ নারী কোন না কোনভাবে এ বিষণ্নতায় ভুগছেন। প্রায় পৃথিবীর সব দেশের জন্যও এই পরিসংখ্যান একইরকম হবে। এদের অধিকাংশ রোগী ডাক্তারের পর ডাক্তারের কাছে ছুটেও সমস্যার সমাধান পান না। নানা পরীক্ষায়ও যখন কোন রোগ ধরতে পারা যায় না, তখন নিজেদের পাশাপাশি তাদের বিষণ্নতা ছড়িয়ে দেন পরিবারেও!

কেন বিষণ্নতায় ভুগেন নারীরা?

১. আমাদের দেশে নারীরা ছোটবেলা থেকেই ঘরের বাইরে যেতে একরকম নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হন। এভাবেই পারিপার্শ্বিক জগৎ থেকে দেখতে দেখতে তাদের মধ্যে তৈরি হয় হীনম্মন্যতা বোধ।

২. আরো রয়েছে হরমোন জনিত কারণ।

৩. সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক কারণ।

৪. রিপ্রোডাক্টিভ লাইফের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সময় যেমন- সন্তান জন্মের পর, মেনোপোজ ইত্যাদি কারণ হিসেবে বলা যেতে পারে।

৫. পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, যে সব মায়ের তিনটি সন্তানের বয়স ১৪ বছরের নিচে, ঘর-গেরস্থালিই যাদের প্রধান কাজ এবং স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়, তার মধ্যে বিষণ্নতার প্রবণতা বেশি।

৬. সন্তান ডেলিভারির পর বিষণ্ন হওয়ার নির্দিষ্ট কিছু কারণ আছে:

ক. এ সময় হঠাৎ করে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন ইস্টোজেন, প্রজেস্টেরন ও থাইরয়েড হরমোন।

খ. বাচ্চার যত্নের জন্য অতিরিক্ত শারীরিক-মানসিক ধকল।

গ. জীবনের একদমই  নতুন একটি অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হওয়া।

ঘ. স্বামী-আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে সদ্যপ্রসূতি মা যদি সঠিক সময়ে যদি সহযোগিতা না পায়, তবে এটা সেই নারীর জন্য বাড়তি মানসিক চাপ হিসেবে দেখা দেয়।

৭. সাধারণ কারণের মধ্যে হতে পারে কোন বিয়োগাত্মক ঘটনা। যেমন প্রিয়জনের মৃত্যু, স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদ, স্বামীর দ্বিতীয় সংসার বা বড় ধরনের কোন মানসিক আঘাত।

৮. ডায়াবেটিস, প্রেসার, হাঁপানি, ক্যান্সার, আর্থ্রাইটিস ও স্ট্রোকের মতো দীর্ঘ মেয়াদি রোগে ভুগলে বিষণ্নতা দেখা দিতে পারে।

৯. এছাড়াও বিষণ্নতার কারণ হতে পারে সামাজিক, পারিবারিক, অর্থনৈতিক চাপ। এছাড়াও জীবনের নানা দুঃখজনক ঘটনা তো রয়েছেই।

১০. শারীরিক কারণের মধ্যে বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের পরিবর্তন, যেমন সেরোটনিন, নরএপিনেফ্রিন ও ডোপামিনের উঠানামা।

যেসব লক্ষণে বুঝবেন পাশের নারীটি বিষণ্নতায় ভুগছেন :

১. শারীরিক লক্ষণের মধ্যে হলো, মাথা জ্বালাপোড়া ও শরীরের নানা অঙ্গে জ্বলুনি। কখনো কখনো পুরো শরীর জ্বালাপোড়ার সমস্যা দেখা দেয়।

২. মাথা-নাক-কান দিয়ে গরম ভাঁপ উঠে। কেউ কেউ বলেন ভাত সিদ্ধ করলে যে রকম ভাঁপ উঠে ঠিক সেই রকমই ভাঁপ তাদের কান-নাক দিয়ে বের হয়। এদের মাথা ঠাণ্ডা করতে বারবার তেলমিশ্রিত পানি দিতে হয়।

৩. কাউকে কাউকে মাথার চুল মাঝখান থেকে ফেলে দিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করার জন্য বিভিন্ন গাছের পাতা বেটে দিতে দেখা যায়।

৪. বেশিরভাগ রোগীই অনিদ্রায় ভুগতে থাকেন। কারো কারো একদমই ঘুম হয় না, মাঝরাতেই তাদের ঘুম ভেঙে যায় এবং সকালে তাদের তুলনামূলক বেশি খারাপ লাগে।

৫. যদি কোন বয়স্ক নারীকে দুঃখের কথা বলতে গেলেই প্রায় কেঁদে ফেলতে দেখা যায়, তখন তিনি বিষণ্নতায় ভুগছেন বলেই সন্দেহ করা যায়।

৬. মুখের কথা শুনে আপনি কিছুটা আন্দাজ করতে পারবেন। যেমন : এসব রোগী খুব কম কথা বলে এবং খুব আস্তে আস্তে কথা বলে। একটা প্রশ্ন করলে অনেক সময় পর উত্তর দেয়, মাঝে মাঝে কোন কথাই বলতে চায় না। কেউ জিজ্ঞাসা না করলে কথা বলতে চায় না। তারপর ধীরে ধীরে এমন একটা অবস্থায় চলে যায় যে, ধীরে ধীরে একদমই কথা বলা বন্ধ করে দেন।

৭. মন খারাপ থাকা, এটাই আসল লক্ষণ : এই মন খারাপের প্রকাশ বিভিন্ন মানুষের বিভিন্নভাবে হতে পারে। বেশিরভাগ রোগী নিজের মনের দুঃখভাব সরাসরি বলতে চায় না। তারা সাধারণত বেশিরভাগ সময় বিরক্তভাবে থাকে, অন্যের কথা সহ্য করতে পারে না, কথা বললে রেগে যায়, বেশিরভাগ সময় মনমরা হয়ে থাকে, কারো সঙ্গে মিশতে চায় না, কাছে ছোট ছোট বাচ্চারা চেঁচামেচি করলে বিরক্ত হন। আগে নিয়মিত টেলিভিশন দেখলেও ইদানীয় দেখতে অনাগ্রহী। আগে সবার সঙ্গে মিশতেন, এখন কিছুই ভাল লাগে না। ছোটখাট ব্যাপার নিয়েই কেঁদে ফেলে এবং অতীতের দুঃখের ঘটনাগুলো বার বার বলতে চায়। এসবই কিন্তু মন খারাপের লক্ষণ।

৮. সন্তান জন্মের পর বিষণ্নতা নামক রোগটির ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ সময় বেশিরভাগ মায়ের অভিযোগ থাকে- শরীর বেশি দুর্বল লাগে, মন বিরক্ত থাকে, ঘুম হয় না। আত্মীয়স্বজনরা বলেন, ‘ও যেন ইদানীং বেশি খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে।’ ভীতু ও দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখা যায়। গ্রামাঞ্চলে এই সমস্যাগুলো ‘সুত্রিকা’ বলে কবিরাজরা চিকিৎসা করেন, অথচ এই নারী ভুগছেন বিষণ্নতায়!

৯. এই সমস্ত রোগীর আনন্দ-ফুর্তি, সাজগোজ, হাসিঠাট্টা, গল্প করা, ধীরে ধীরে সকল আনন্দদায়ক ও স্বাভাবিক কাজকর্ম লোপ পেতে থাকে।

১০. খাওয়ার প্রতি অনীহা দেখা দেয়। খেতে বললেই তাদের বলতে শোনা যায়, ‘খেয়ে কি লাভ হবে, বেঁচে থেকে কী লাভ হবে?’

১১. কাউকে গালে হাত দিয়ে, মাথা নিচু করে জড়বস্তুর মতো বসে থাকতে দেখা যায়।

১২. অনেক বিষন্ন রোগীকে দেখা যায়, কথা বলার মাঝখানে দীর্ঘশ্বাস ফেলছেন। এটাও এমন রোগের একটা লক্ষণ।

১৩. এদের কারো শরীরের ওজন কমতে আবার কারো বাড়তেও দেখা যায়।

যেসব কারণে চিকিৎসা দরকার :

১. এ রোগে আক্রান্তদের ১০-১৭% আত্মহত্যা করে ফেলতে পারেন।

২. অন্তত ৫০% রোগী কোন না কোনভাবে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।

৩. বিষণ্নতা দূর করতে গিয়ে অনেকেই আবার নেশাসক্তও হয়ে যান।

৪. এরা কর্মক্ষেত্রে আগ্রহ, উৎসাহ ও উদ্দীপনা হারিয়ে ফেলে।

৫. এদের যৌনজীবনেও অশান্তি দেখা দেয়।

৬. যদি সময়মতো সঠিক চিকিৎসা না করা হয়, তবে এসব রোগী পরিবার-সমাজ ও জাতির বোঝা হয়ে যেতে পারেন।

চিকিৎসা :

১. সামাজিক প্রচলিত কুসংস্কারগুলো ঝেরে ফেলতে হবে প্রথমে। যেমন, আলগা দোষ, জিন-ভূতের আছড়, পানিপড়া, তেলপড়ার পথ ত্যাগ করতে হবে।

২. ঝুঁকিপূর্ণ মায়েদের চিহ্নিত করে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. মনোরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে চিকিৎসা করা ও নিয়মিত ফলোআপে আসা।

বাংলা/এসএ

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মন খারাপ বিষণ্নতা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0202 seconds.