• ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ১৫:৫৫:৫৫
  • ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ১৫:৫৫:৫৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

প্রতিবাদের নিরাপদ ইভেন্ট, মহিলার গাছ কাটা এপিসোড

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


দু’দিন সামাজিকমাধ্যমে তুমুল শোরগোল তুললো এক মহিলার গাছ কাটার দৃশ্য। মানুষেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন। ওই মহিলাকে ধরতে পুলিশ এলো, র‌্যাব এলো, এলো ভ্রাম্যমাণ আদালত। বলতে পারেন হৈহৈ কাণ্ড রৈ রৈ ব্যাপার।

সামাজিকমাধ্যমে এমন প্রতিবাদ দেখে আমাদের সম্পর্কে জানেন না, এমন মানুষেরা ভাবতে পারেন, কী প্রতিবাদী এ দেশের মানুষ। এমন একটা সামান্য ঘটনাও তাদের হাত গলে ফসকে যায় না। প্রকৃতিপ্রেম সাথে সব প্রেমের দরিয়া এ দেশের মানুষজন।

এমন প্রেমের ভাবনার পাশাপাশি যদি আগে-পিছু চোখ মেলে দেখেন তারা, তাদের চক্ষু কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইবে। তারা দেখবে, যারা ছাদের গাছ কাটা নিয়ে প্রতিবাদে জানপ্রাণ দিয়ে ফেলেন, তারা নিশ্চুপ সুন্দরবন প্রশ্নে। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে সারাবিশ্বে যে বিদ্যুৎ প্রকল্প প্রায় পরিত্যক্ত হয়েছে, সেই প্রকল্প হচ্ছে সুন্দরবনে। দশ-বিশটা গাছের জন্য যাদের প্রাণ কেঁদে উঠে, তারা ‘স্পিকটি নট’ লক্ষ-কোটি বৃক্ষরাজীর সম্ভাব্য সর্বনাশে! অবশ্য এর উত্তরও রয়েছে। তারা হয়তো অল্প শোকে কাতর, ওই মহিলার গাছ কাটা হলো সেই অল্প শোক। আর যে অধিক শোকে পাথর, কথা বলতে পারছেন না, তা হলো সুন্দরবনের সম্ভাব্য বিপর্যয়। 

রসিকতা থাক, আসল কথায় আসি। আমাদের প্রতিবাদ মূলত, নিজের নিরাপত্তা দেখে। কোনো প্রতিবাদে আমি কতটুকু নিরাপদ সে ভেবেই আমরা প্রতিবাদ করি। ওই মহিলার গাছ কাটার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করাটা নিরাপদ, তিনি সাধারণ গৃহিণী, ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের ঝগড়াটে ক্যারেক্টার। তার বিরুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লে, জেল-জুলুম-হুলিয়া’র ভয় নেই। সুতরাং ‘মাভৈ’ বলে ঝাপিয়ে পড়া যায়। এতে এক্টিভিস্ট হিসাবেও নিজেকে জাহির করা গেলো এবং ‘আমিও পারি’ তাও মুফতে জানান দেয়া হলো। সুন্দরবন নিয়ে প্রতিবাদ করলে আম-ছালা দুটোই যেতে পারে। কী দরকার, অতটা রিস্ক নেয়ার।

কর্পোরেট বিশ্বে মানুষ ক্রমেই স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে। অন্যভাবে বলা যায়, ক্রমেই একা হয়ে যাচ্ছে। আর যতই একা হচ্ছে ততই দুর্বল হয়ে পড়ছে, নৈতিকভাবে নত হয়ে পড়ছে। একা মানুষ বলেই তারা প্রতিবাদেও নিরাপদ থাকতে চায়, প্রতিরোধে পা বাড়ায় না। সঙ্গত কারণেই তাদের নিজ নিরাপত্তা বলয়টাও ক্রমে ছোট হয়ে আসছে। প্রতিরোধটা দশের লাঠি না হয়ে একের বোঝায় রূপ নিচ্ছে।

এ অবস্থায় ক্রমেই শক্তিমান হচ্ছে অপশক্তিগুলো। অথচ অমন অপ’দের ঠেকাতে প্রয়োজন দশের। সদ্য উদাহরণ ক্রিকেটারদের আন্দোলন। অনেকে এই আন্দোলনের মূল চরিত্রটাকে মূল্যায়িত না করে ‘দোষায়িত’ করছেন। তারা একবার কি ভেবে দেখেছেন, আন্দোলনের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যটা। ক্রিকেটাররা গুটি কয়েকের চিন্তা করেননি, করেছেন সাকুল্যে, রুট লেভেল থেকে। যার ফলে সার্বিকতার সংগ্রামী রূপ ছিলো এই মুভমেন্টে এবং তারা অনেকটাই সফল হয়েছেন। কিন্তু এই আন্দোলনটাই বিফলে যেতো, বোঝা হতো, যদি ‘এক’ অর্থাৎ গুটিকয়েকের চিন্তা করে করা হতো। যারা এর বিরোধীতা করেছেন তারা আন্দোলনের মূল দিকটা অবলোকনে ব্যর্থ হয়েছেন।

এই আন্দোলন থেকে আমাদের রাজনীতিবিদদেরও অনেক কিছু শেখার রয়েছে। তারা যদি তাদের আন্দোলনে সামগ্রিকতা আনতে পারতেন তারাও সফল হতেন। আমাদের রাজনীতিবিদরাও মহিলার গাছ কাটার মতন প্রতিবাদের নিরাপদ ইভেন্ট খোঁজেন। মুফতে জাহির করার কোশেশ করেন। এই নিজে নিরাপদ থেকে জাহিরের স্বার্থপর চেষ্টা তাদের ক্রমেই বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে রাজনীতি এমনকি সমাজ থেকেও। তারা ক্রমেই দশের লাঠি ছেড়ে নিজেরা একের বোঝা হয়ে উঠছেন। অথচ সময় তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই এমন বোঝাদের ঝেড়ে ফেলবে, এটাই সময়ের বহমান স্বাভাবিকতা। কালের স্রোত কখনোই আবর্জনা ধরে রাখে না। 

লেখক : কাকন রেজা, কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

সুন্দরবন গাছ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0204 seconds.