• ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ১০:৪৭:০১
  • ২৪ অক্টোবর ২০১৯ ১১:২৬:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

‘বিশ্ব পাগলের মেলায়’ মাদক-জুয়ার রমরমা আসর

ছবি : বাংলা

কুমিল্লা প্রতিনিধি :

কুমিল্লার দেবিদ্বারে শুরু হয়েছে ৭ দিনব্যাপী ‘বিশ্ব পাগলের মেলা’। উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের ভৈষরকোট গ্রামের এই মেলাতে ‘পাগল’ ছাড়াও বিভিন্ন উপজেলার কৌতুহলী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে বিশ্ব পাগলের মেলা এখন জমজমাট ভিন্ন কারণে। কারণ সেখানে এখন চলছে জুয়া আর মাদকের রমরমা কারবার। 

এই মেলার অন্যতম আকর্ষণ সুজন পাগলা। বয়স তার পঞ্চাশের কাছাকাছি। সুজন পাগলা আবার সুজন ভাণ্ডারী বা ‘তালা বাবা’ নামেও পরিচিত। এই সুজন পাগলের পুরো শরীরেই শিকল বাঁধা ও তালা লাগানো রয়েছে। শরীরে কাপড় না থাকলেও লজ্জাস্থানে রয়েছে ছোট্ট লাল কাপড়ের একটি নেংটি। দুই হাতে লম্বা লম্বা কাটা দাগ দেখে মনে হবে কেউ তাকে দুই হাতে কুপিয়েছে। দীর্ঘ ৩৬ বছর নাকি তিনি এ অবস্থাতেই থাকেন।

তার একজন সেবক জানান, গত ২০ বছর ধরে তিনি কাঁচা মাংস ও মাছ ছাড়া কিছুই নাকি আহার করেন না। তাকে তালা বাবা নামেও ডাকা হয়। তার কোন সংসার নেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার খড়মপুর মাজারেই কাটে তার বেশির ভাগ সময়। পুরো মেলায় এভাবে ছোট ছোট তাবুতে আগরবাতি আর বড় বড় মোমবাতি জ্বালিয়ে গভীর ধ্যানে মগ্ন শত শত পাগল। এভাবেই চলছে ‘ভণ্ডামি’!

পুরো মেলা ঘুরে দেখা যায়, বিশাল গেটের ভিতরে টিন ও কাঠ দিয়ে বানানো শামিয়ানার মত প্যান্ডেলের ভিতরে চলছে ওয়াজ-নসিহত। প্যান্ডেলের পশ্চিমাংশে রয়েছে ছোট ছোট তাবু। তাবুর বেশির ভাগই বানানো লাল-সালু কাপড় দিয়ে। বড় বড় মোমবাতি ও আগরবাতি জ্বালিয়ে তাবুর ভিতরে নারী-পুরুষ ভক্তদের গানের জলসা চলছে। ঢোলের তালে তালে গান-বাজনা আর মাদকের ঘ্রাণে পুরো এলাকাই যেন পরিণত হয়েছে মাদকের খোলা হাট-বাজারে। প্যান্ডেলের পূর্বপাশে দুইশ’ গজ দূরে একটি বাঁশঝাড়ের ভিতরের অবস্থা আরো ভয়াবহ। এখানে রাত যত গভীর হয় ততই মাদকের হাট জমে ওঠে। নারী-পুরুষ একত্রে মিলে এক সাথে চলে মাদক সেবন আর গান-বাজনা। এ যেন সত্যিই পাগলের হাট।

মাদক সেবন ও জুয়ায় যোগ দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা যুবকরাও। তারা মনে করেন মেলায় এসেছেন আর গাঁজা খাবেন না তা কি করে হয়? সব মিলিয়ে এ যেনো মাদকসেবী ও জুয়াড়িদেরও মিলন মেলা।

এখানে বাইর থেকে আসা সন্দেহভাজন কাউকে দেখা মাত্রই নিরাপত্তায় থাকা স্বেচ্ছাসেবীর বাঁশির ফুঁয়ে সবাই সর্তক হয়ে যান। সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে চারদিক থেকে আসা বাঁশির শব্দে স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছিলো এটি মাদক সেবন ও জুয়াড়িদের জন্য একটি সতর্কমূলক বার্তা। এসময় সাংবাদিকদের দেখে মাদক সেবনকারীরা তাদের ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও লুকাতে চেষ্টা করেন। মাদকের ঘ্রাণে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে এখানে নারী-পুরুষ প্রায় সকলেই মাদক সেবনরত অবস্থায় ছিলেন।

মেলার উদ্যোক্তা নুরুল ইসলাম দয়াল সুজন জানান, নবীর আশেকানদেরকে এ বিশ্ব পাগলের মেলায় একত্র করা হয়। এ মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নবীর আশেক ও পাগল ভক্তরা জড়ো হয় নবীর সহবত পাওয়ার জন্য। 

তিনি আরো জানান, তিনি নিজেও নবীর পাগল, ভাবেন অন্য ‘পাগলদের’ নিয়েও। তাই গত ৪ বছর ধরে তার গ্রামে ‘পাগলের মেলা’র আয়োজন করছেন তিনি।

ইসলামী শরিয়তে এ ব্যাপারে কি নির্দেশনা রয়েছে এমন প্রশ্নে দেবিদ্বার ইসলামিয়া ফাযিল মাদ্রাসার আরবি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বাশার মিরাজী বাংলা’কে জানান, কোরআন-হাদিসের কোথাও এমন পাগলের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। রাসুলের প্রেমে পাগল বলতে এসব ছন্নছাড়া মাদকসেবী, যাদের পরনে কাপড় নেই, ফরজ গোসল নেই, পাক-পবিত্রতা নেই এমন পাগলদের বুঝানো হয়নি। তারা বিশ্বব্যাপী ইসলামকে বিকৃত করছেন। ইসলামে এসবের ন্যূনতম স্থানও নেই।

দেবিদ্বার থানার ওসি মো. জহিরুল আনোয়ার জানান, যেকোন সময় পাগলের মেলায় অভিযান চালানো হবে। মাদকের সাথে যাদেরকে পাওয়া যাবে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।

এ ব্যাপারে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাকিব হাসান বাংলা’কে বলেন, ‘বিশ্ব পাগলের মেলার খবর আপনার মাধ্যমেই প্রথম জানলাম। উনারা কার কাছ থেকে এ মেলার অনুমতি নিয়েছেন আমার জানা নেই। আমি স্পষ্টই বলে দিতে চাই, মাদকের সাথে ন্যুনতম কেউ জড়িত থাকলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ অচিরেই এ বিশ্ব পাগলের মেলার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

জানা গেছে, গত ২২ অক্টোবর, মঙ্গলবার থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্ব পাগলের মেলা চলবে আগামী ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত।

বাংলা/এআর/এসএ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0192 seconds.