• ২৩ অক্টোবর ২০১৯ ১৯:১২:২৭
  • ২৩ অক্টোবর ২০১৯ ১৯:১২:২৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

বন উজাড় করা উন্নয়নের রাষ্ট্র কবে নিজেই নিজেকে গ্রেপ্তার করবে?

ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


১.
মঙ্গলবার রাত। ফেসবুকে একটি ভিডিও দেখেছিলাম। বিবাদে জড়িয়ে এক ফ্ল্যাটের বাসিন্দা অন্য ফ্ল্যাটের বাসিন্দার লাগানো গাছ কুপিয়ে কেটে ফেলছেন। ভিডিওতে দেখা গেলো, কি ভয়ানক আক্রোশ নিয়ে গাছগুলোকে কেটে চলছেন এক নারী। সাথে রয়েছেন তার ছেলে এবং সাঙ্গপাঙ্গরা।

নির্বিচারে কুপিয়ে ছাদের সেই বাগান নষ্ট করে ফেলার দৃশ্য যারা দেখেছেন তারা নিঃসন্দেহে একমত হয়েছেন যে, ওই মহিলা রাগে অন্ধ হয়ে উন্মাদের মতো এই জঘন্য কাজটি করেছেন। এই দৃশ্য কোন স্বাভাবিক বিবেকবান মানুষের পক্ষে সহ্য হওয়ার কথা না। ভিডিওটি রাতেই ভাইরাল হয়ে যায় এবং দেশব্যাপী নিন্দা সমালোচনা শুরু হয়। অনেকেই এর নিন্দা জানিয়ে বিচার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে এই আলোচনার সাথে সাথে উঠে এসেছে দেশব্যাপী বিভিন্ন অজুহাতে বন-জঙ্গল ধ্বংস করার বিষয়টিও।

২.
বুধবার সকাল। গাছকাটার যে ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছিলো সেই ভিডিওটিসহ আরো একটি ভিডিও এবং সংবাদ ঘুরে বেড়াচ্ছে ফেসবুকে। গাছকাটার পুরোনো ভিডিওর সাথে নতুন ভিডিওটি ছিলো অভিযুক্ত সেই নারীকে পুলিশ এসে তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাচ্ছে।

সাভারে যে ঘটনা নিয়ে আলোড়ন উঠলো এর ঠিক পাশের এলাকাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। কয়েকদিন আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে গাছ কাটার প্রতিবাদ জানিয়ে আন্দোলন করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গাছ কাটা শুরু করে কর্তৃপক্ষ। তখন আন্দোলন করে শিক্ষার্থীরা গাছ কাটা বন্ধ করায়। কিন্তু ততোদিনে অনেক গাছ কাটা পরে। এর আগে শিক্ষার্থীরা গাছ না কাটার যে দাবি তুলেছিলো তা শুনলে এতো গাছ কাটা পরতো না। এই যে অপরিপক্ক উন্নয়ন কিংবা ধ্বংসাত্মক উন্নয়ন প্রক্রিয়ার কারণে এতো গাছ কাটাহলো সেই সিদ্ধান্তের শিরোমনি হিসেবে যিনি ছিলেন সেই উপাচার্যকে গ্রেপ্তার করবে কে?

৩.
ঠিক একইভাবে এর চেয়ে জঘন্য অপরাধ করছেন রাষ্ট্র ও তার উন্নয়নের অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলো। যুগযুগ ধরে এসব হচ্ছে। বিভিন্ন উছিলায় ধ্বংস করা হচ্ছে আমাদের বনভূমি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় মনোগ্রাভ বন সুন্দরবনকে ঘিরে ফেলা হয়েছে বিভিন্ন কোম্পানি দিয়ে। যেখানে এই বনকে সুরক্ষা বেষ্টনি দিয়ে ঘিরে রাখা উচিত সেখানে উল্টো বিভিন্ন কারখানা বসছে এর চারিদিকে। সংবাদ পত্রের মাধ্যমেই জেনেছি ৩শটি কারখানার অনুমোদন দেয়া হয়েছে সুন্দরবনকে ঘিরে। সুন্দরবনের কাছে গড়ে তোলা হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত হিসেবে স্বীকৃত কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুত কারখানা প্রকল্প। এই নবায়নযোগ্য জ্বালানির জুগে কয়লা বিদ্যুত প্রকল্প হলো দূষিত প্রকল্প। তেমনই দূষিত প্রকল্প রামপাল বিদ্যুত কেন্দ্র সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে ফেলবে সে কথা সারা বিশ্বজানলেও আমাদের রাষ্ট্রীয় কর্তাব্যক্তিরা বলছেন উল্টো কথা। দেশের মানুষের বিরোধীতা স্বত্বেও কেন প্রাণ-বৈচিত্রকে বিপর্যস্ত করে সুন্দরবনকে হুমকির মুখে ফেলে কয়লা বিদ্যুত কেন্দ্র বানানো হচ্ছে? বাংলাদেশের রক্ষা কবজ প্রাণবৈচিত্রের আধার সুন্দরবনকে ধ্বংসের মুখে যারা ফেলছেন তাদের গ্রেপ্তার করবে কে?

৪.
সম্প্রতি জানলাম দেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপবন মহেষখালীতে একরের পর একর বন পাহাড় কেটে ব্যাপক ‘উন্নয়ন’ হচ্ছে। দ্বীপের যে পাহাড় ছিলো সবুজ ঘন বন, সেখানে এখন দানবীয় ইঞ্জিনের গর্জন। সব উজাড় করা হয়েছে। পাহাড় কেটে রাস্তা করা হচ্ছে, ভবন উঠছে। এখানকার মাটি ওখানে, ওখানকার মাটি সেখানে চলে যাচ্ছে...। এইসব চলছে উন্নয়নের নামে। সেখানে গড়ে তোলা হবে উন্নয়নের ‘বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল’। ওইযে পাহাড়ি অরণ্য ধ্বংস হলো, প্রাণ প্রকৃতি উচ্ছেদ হলো এসব কিছুই হয়েছে উন্নয়নের প্রয়োজনে! এই বন প্রাণ প্রকৃতি উজাড়কারীদের শাস্তি দিবে কে?

৫.
সারা দেশজুড়েই উন্নয়নের প্রয়োজনে এসব হচ্ছে। সারা বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বন উজাড়, শতবর্ষী গাছ কেটে ফেলার খবর আসছে। এইতো চলতি বছরেই ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে রাস্তা প্রশস্ত করতে কেটে ফেলা হলো ৩৩০টি গাছ। পরিবেশবিদরা বলছিলো, এই গাছগুলো রেখেই রাস্তা বড় করা সম্ভব। কিন্তু কে শোনে কার কথা। মানিকগঞ্জের আঞ্চলিক মহাসড়ক বড় করতে গিয়ে চার হাজার গাছ কাটা হলো। একই চিত্র দেখা গিয়েছে ঐতিহ্যবাহী যশোর রোডের ক্ষেত্রেও। আন্দোলন করে সেখানে গাছ কাটা বন্ধ রাখা গেছে সাময়িক সময়ের জন্য।

এইরাষ্ট্রে এইসব খবর তো নিয়মিত ঘটনা। যেখানেই এই তথাকথিত উন্নয়ন পৌঁছে গেছে সেখানেই প্রাণ প্রকৃতি জীবন ধ্বংস হয়েছে-হচ্ছে। এই উন্নয়ন এক বিষাক্ত ভবিষ্যতের দুনিয়া রচনা করছে। মাঝে মাঝে এসব ঘটনার প্রতিবাদ করছে মানুষ। কখনো কখনো আন্দোলনও গড়ে তুলছে প্রাণ প্রকৃতি রক্ষার জন্য। এই মাঠ, নদী, বন খেকোদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধেরও ডাক ওঠে। আবার একই সাথে অসংখ্য ঘটনা চোখের আড়ালেই ঘটে যাচ্ছে। নির্বিচারে প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংস করে ফেলা হচ্ছে। এসব নিয়ে প্রশ্ন তুললেই বলা হচ্ছে উন্নয়নের প্রয়োজনে এসব হচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়ন কাঠামো নিয়ে যে প্রশ্ন উঠছে সেই প্রশ্নের উত্তর দেয়ার চেয়ে তা দমন করতেই রাষ্ট্রপক্ষ বেশি পারদর্শী।

এখানে সামনে আনা হচ্ছে না, যে উন্নয়নে জীবন ধ্বংস করে, প্রাণ প্রকৃতি বিপন্ন করে তা আসলেই উন্নয়ন কিনা? এক তরফা ভাবে শুধু কংক্রিটের কাঠামো আর কারখানাকেই উন্নয়ন হিসেবে গেলানো হচ্ছে। এই উন্নয়ন কোন ভবিষ্যতকে উপহার দিচ্ছে, কোন পৃথিবী তৈরি করতে যাচ্ছে সেই দৃশ্য বা ছবি এখানে তুলে আনা হচ্ছে না।

৬.
একটি দেশের মোট আয়তনের ন্যুনতম ২৫ ভাগ বনভূমি থাকা প্রয়োজন। বাংলাদেশের বনবিভাগ বলছে দেশে রয়েছে ১৭ ভাগ বন। কিন্তু জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থা (এফএও) ২০১৮ সালে প্রকাশিত বন বিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বন রয়েছে মাত্র মোট আয়তনের ১৩ ভাগ।

বনভূমি পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফরেস্ট ওয়াচ (জিএফও) ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্স ইনস্টিটিউট (ডব্লিউআরআই) ২০১৮ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সাত বছরে বাংলাদেশে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বনভূমি উজাড় হয়েছে।

এইবার প্রশ্নটি তুলতেই পারেন এই বন কারা খেলো? যারা এই বন উজার কিভাবে হলো? কারা এর পেছনে কিভাবে ভূমিকা রেখেছে? এইযে ৩ লাখ ৩২ হাজার একর বন ভূমি উজাড় করা হয়েছে তাদের শান্তি হবে কবে?

৭.
একটি ভিডিওতে দেখলাম সাভারে গ্রেপ্তার হওয়া সেই নারীকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিলো আপনি কেন কাটলেন গাছগুলো... উত্তরে তিনি বলেছিলেন- আমার সন্তানের চেয়ে তো গাছ বড় না। (এর আগে গাছের ক্ষতি করায় ‘অভিশাপ’ দিয়েছিলেন গাছের মালিক তার প্রেক্ষিতে তিনি এই কথা বলেন। অর্থ্যাৎ যে গাছের জন্য গাছের মালিক ছেলেকে অভিশাপ দিয়েছে সেই গাছ তিনি কেটে ফেলেছেন।)

ঠিক একইভাবে বন উজার করে বিভিন্ন প্রকল্প করা এই রাষ্ট্রের উন্নয়ন কর্তাদের প্রশ্ন করা হলে তারাও বলে যা হচ্ছে তারাও প্রায়ই একই ধরনের উত্তর দেন। তারা বলেন যেসব গাছ কাটা হয় তা উন্নয়নের প্রয়োজনে...। 

‘অভিশাপ’ দেয়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে ছেলেকে বাঁচাতে সেই নারী গাছ কেটেছিলেন এবং তীব্র সমালোচনার মুখে আমরা দেখেছি সেই মহিলাকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ঠিক একইভাবে কবে এই তথাকথিত উন্নয়নের নামে বন-নদী উজার করার অভিযোগে জনগণ যখন বুকের পাজর দিয়ে ব্যারিকেড গড়ে তুলতে চায় তখন উন্নয়নের রাষ্ট্রের উচিত নিজেই নিজেকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়া। এই রাষ্ট্র কাঠামো কবে এইসব অপরাধের দায় স্বীকার করে নিজেকে নিজে গ্রেপ্তার করবে?

লেখক: সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বন গাছ বাংলাদেশ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0219 seconds.