• ২২ অক্টোবর ২০১৯ ১১:০৪:৩৫
  • ২২ অক্টোবর ২০১৯ ১১:০৪:৩৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

জীবনানন্দকে তার শহরে ফিরতে দাও...

ছবি: আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি:


বাংলার নদী মাঠ খেত ভালোবাসে এখানেই ফিরে আসতে চেয়েছেন বার বার কবি জীবনানন্দ দাশ। এই মাটি নদী প্রাণ প্রকৃতি ভালোবাসে ফিরে আসার আকুতি নিয়ে লিখেছেন-

আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে— এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে,

হয়তো ভোরের কাক হ'য়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে।

জীবনানন্দ দাশ যে বাংলার প্রান্তরে ফিরে আসতে চেয়েছেন, যে ধানসিড়ি নদীর তীরে ফিরতে চেয়েছেন সেই নদী কোথায় আছে? কেমন আছে? কোন শহরে ফিরবেন কবি? চেনা যাবেতো সেই রুপসী বাংলার সেই শহরকে, সেই নদীকে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে যদি আমরা বর্তমানে তাকাই, তাহলে থমকে যেতে হবে। সেই কলমির গন্ধে ভরা জীবনের রং-রুপ ছড়ানো শহরের মুখচ্ছবি বদলে গেছে। এ এক অচেনা শহর এখন! আর সেই ধানসিড়ি নদীর রুপ বদলে পরিনত হয়েছে মরা খালে! চিরচেনা বাংলার যে রুপ তিনি দেখেছেন সেই রুপ জৌলস আজ কিছুই নেই। মরে গেছে ধানসিড়ি। দিন দিন রুগ্ন আর মরনাপন্ন হয়ে উঠছে এখানকার প্রাণ প্রকৃতি। হারিয়ে যাচ্ছে ধান শালিকের মাঠ, আম-জাম-জারুলের বন।

তথাকথিত উন্নয়নের নামে দিন দিন বিপন্ন হচ্ছে প্রাণ প্রকৃতি। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে কত শত পাখি কীট পতঙ্গ জীবন! যারা কবি জীবনানন্দ দাশকে ভালোবাসেন, যারা তার কবিতায় জীবনের প্রাণের সন্ধান পান তারা যদি একটু বর্তমান দুনিয়ার দিকে তাকান তাহলেই দেখতে পাবেন জীবন প্রাণ প্রকৃতি আজ কতটাই রুগ্ন ও ধূসর হয়ে উঠেছে।

একটি ছোট্ট জলাশয় ঘিরেও যত রকম বৈচিত্রময় প্রাণের অস্তিত্ব দেখা যেতো এখন কি সেসব আছে? জলাশয়গুলো বিলীন হয়ে যাচ্ছে, একের পর এক নদী মরে যাচ্ছে, অসংখ্য নদী খাল দখল হয়ে গেছে তথাকথিত উন্নয়নের চক্রে। জীবনানন্দ দাশের শহর বরিশাল ছিলো খাল বিল পুকুর নদী পরিবেষ্টিত এক অপরুপ স্নিগ্ধ শহর। এই নগরীর বুকের ভেতর দিয়ে একেবেকে জালের মতো জড়িয়ে ছিলো ২২টি খাল। যার প্রায় সবই এখন মৃত! অধিকাংশ খালের রেখা চিহ্নটিও অবশিষ্ট নেই এখন। হাতে গোনা যে কয়টি খালের অস্তিত্ব পাওয়া যায় তার অবস্থাও শোচনীয়। বন্ধ হয়ে গেছে পানি প্রবাহ। দখল-দূষণে ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা।

কবি জীবনানন্দ দাশ

হারিয়ে যাচ্ছে পুকুরগুলো। ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে নদী। ফসলের মাঠ এখন কংক্রিটের জঙ্গল। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে নানা রকম পাখি-কীট পতঙ্গ। এই শহরে এখন আর লক্ষীপেঁচার দেখা মেলে না! ঘুঘু ডেকে ওঠেনা মধ্য দুপুরে। ভেজা মেঘের দুপুরে উড়ে উড়ে কাঁদে না চিল। বউ কথাকও পাখিরা দৃষ্টির আড়াল হয়ে যাচ্ছে। কোথায় চলে যাচ্ছে সব? কলমীর গন্ধভরা জলের ঢেউ কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে?

প্রতিদিন এভাবেই একটু একটু করে মরে যাচ্ছে প্রকৃতি। বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণ। মানুষের লোভ-লালসার শিকার হয়ে দখল-দূষণ সন্ত্রাসের কবলে পরে আজ বিপন্ন হতে বসেছে এই পৃথিবী। জীবনানন্দ দাশ যে বাংলার রুপের বর্ণনা করে গেছেন সেই রুপ আজ অতীত হতে বসেছে। সেখানে এখন ভুল উন্নয়নের ছবি, জীবনের নামে উন্নয়নের নামে ধ্বংসের কারখানা চারিদিকে। যতদূর পৌঁছে গেছে উন্নয়ন ততদূর পৌঁছে গেছে দূষণ ধ্বংসলীলা। উন্নয়নের নামে মানুষ তিল তিল করে বিষিয়ে তুলেছে জীবন। বিষিয়ে তুলেছে মাটি-পানি-বাতাশ।

এখানে উন্নয়ন বলতে দানবীয় অট্টালিকা আর কংক্রিটের জঙ্গলকে বোঝানো হয়। প্রাণ প্রকৃতি ধ্বংস করে, পরিবেশকে বিপন্ন করে একের পর ক্ষতিকর প্রকল্প করা হচ্ছে। এইসব প্রকল্প করতে গিয়ে বন-জঙ্গল, নদী-খাল-জলাশয়গুলোকে হত্যা করা হচ্ছে। ফসলের মাঠকে পরিত্যাক্ত ভূমি দেখিয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে বিভিন্ন কলকারখানা। অথচ ফসলের মাঠের চেয়ে বড় বিশুদ্ধ ‘ইন্ডাস্ট্রি’ আর কি হতে পারে? এসবই হচ্ছে উন্নয়নের নামে। আধুনিক জীবন গড়ার নামে! অথচ উন্নয়ন মানে প্রাণের স্পন্দন থামিয়ে দেয়া না, উন্নয়ন মানে হলো প্রাণের সম্মিলন ঘটানো। মানুষ পাখি গাছপালা প্রাণ প্রকৃতির নিরাপদ বেঁচে থাকাটাই উন্নয়ন। বিশুদ্ধ বাতাসে শ্বাস নিতে পারাটাই উন্নত জীবনের গল্প হতে পারতো।

এই বিপন্ন প্রাণ প্রকৃতি জীবনের মাঝে কোথায় দাঁড়িয়ে আমরা জীবনানন্দ চর্চা করবো? জীবনানন্দকে যদি পড়তে হয় তাহলে জীবনের স্পন্দনকে বাদ দিয়ে কিভাবে জীবনানন্দ পাঠ করা যায়? রুপসী বাংলার রুপকে গিলে খেয়ে কিভাবে আমরা জীবনানন্দের বন্দনা করি? ধানসিড়ি নদীকে মৃত ফেলে রেখে কিভাবে জীবনানন্দ উৎসব হবে? এই মাঠ পুকুর জলায়শ প্রাণ প্রকৃতি বাদ দিয়ে জীবনানন্দ কে অনুভব করা যাবে? পশুপাখির আবাসস্থল ধ্বংস করে তাদের জীবনকে বিপন্ন করে কিভাবে জীবনানন্দকে স্মরণ করি? জীবনানন্দ দাশের রুপসী বাংলাকে মরে যেতে দিয়ে ধবধবে পোষাক পরে শীতাতাপ নিয়ন্ত্রিত অডিটেরিয়ামে জীবনানন্দ পাঠের আসর বসানো আদতে জীবনের সাথে প্রতারনা করা। এই দখল দূষণের বিরুদ্ধে না দাঁড়িয়ে জীবনানন্দের কবিতাকে অনুভব করা যাবে না। যদি জীবনকেই অনুভব করা না যায়, তাহলে জীবনানন্দের সৃষ্টিকে বুঝবেন কি করে?

জীবনানন্দ দাশের কবিতা শুধু ছাপার অক্ষরে বাস করেনা, জীবনানন্দ দাশের কবিতাকে খুঁজে পাওয়া যায় বাংলার মাঠে, নদীর ঢেউয়ে, হিজলের শাখায়, সবুজ ঘাসে, খয়রি ডানার শালিকের পাখায়, সোনালী চিলের ডানায়, বটের লাল লাল ফলের ভেতর...। জল জমি জঙ্গল লুট হয়ে গেলে জীবনানন্দ দাশের কবিতাও লুট হয়ে যাবে।

২২ অক্টোবর কবি জীবনানন্দ দাশের মহা প্রয়ান দিবসে তাকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করতে গিয়েই বলছি- ‘দখল দূষন বন্ধ করো জীবনানন্দের রুপসী বাংলা ফিরিয়ে আনো’। জীবনানন্দের কবিতার মতোই এই প্রকৃতির রুপ জৌলসকে ধরে রাখতে হবে। প্রাণ প্রকৃতি বাঁচলে জীবনানন্দ দাশের কবিতারা বাঁচবে...। এই কবিতার ভেতরই তো বেঁচে আছেন প্রকৃতির শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ। জীবনের স্পন্দনকে অনুভব করে লিখেছেন- ‘রাঙা মেঘ সাতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে দেখিবে ধবল বক, আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভীড়ে-’।

এইসব প্রাণের মাঝেই ফিরে আসতে চেয়েছেন কবি। কবিকে তার শহরে ফিরতে দাও...।

লেখক: সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কবি জীবনানন্দ দাশ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0227 seconds.