• ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৭:৪৮:৪৭
  • ১৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৮:৩৯:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

আপনি হিংসুক, আপনি খারাপ লোক, আপনি অগ্রগতির বাধা

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


বাংলাদেশে ব্যাংকের তথ্য-মতে গত এক দশকে দেশে কোটিপতি বেড়েছে ছাপান্ন হাজার। ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের গড় হিসেবে কোটিপতি বৃদ্ধির সংখ্যা প্রতি হাজারে মাত্র একজন। এ সংখ্যা এমন কোনো বেশি নয়। তবে সামাজিকমাধ্যমে এমন তথ্যের বিপরীতে পাবলিক বলছে, প্রকৃত সংখ্যা এর অনেক বেশি হবে। হওয়ারই কথা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্ট থেকে টাকা লোপাট হওয়া দেখে অনেকেই এখন ব্যাংকে টাকা রাখেন না। সম্প্রতি আইনশৃংখলা বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানে ক্যাসিনো, অফিস আর বাড়ি থেকে বেশুমার টাকা উদ্ধার তারই প্রমাণ দেয়। সুতরাং কোটিপতির সঠিক হিসাব নিয়ে সংশয় সৃষ্টি না হওয়ার কারণ নেই।

গণমাধ্যম জানান দিলো একজন সংসদ সদস্যের কথা। যিনি আট বছরে সাত থেকে আট হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে। গড়ে প্রতিবছরে এক হাজার কোটি টাকা। উন্নতির এই সূচক বেশ উৎসাহব্যঞ্জক। এই ভদ্রলোক অবশ্যই অনুসরণযোগ্য হতে পারেন। কারণ সত্যিকার উন্নতি বা অগ্রগতি এমনটাই হওয়া উচিত। ‘মার তো গন্ডার, লুট তো ভান্ডার, এমন অবস্থা আর কী।

একজন অল্পদিনের প্রাক্তন মন্ত্রী এসব বিষয়ে সবাক হয়েছেন সম্প্রতি। তার বক্তব্য অনুযায়ী গত দশ বছর ধরে শুধু লুটপাট হয়েছে। বড় আফসোসের কথা। তিনি শুধু লুটপাটই দেখলেন, ‘পতি’ বৃদ্ধির সূচকটা দেখলেন না। সাদা টাকার হিসাবেই ছাপান্ন হাজার কোটিপতি বেড়েছে। আর কালো টাকার হিসাবতো মেলানোই দুষ্কর। অফিস, বাসা-বাড়ি, এখানে-সেখানে সবখানে এখন টাকার খনি। অফিস পিয়ন থেকে শতকোটি টাকার মালিক। ম্যানহোলের ঢাকনা চোরের হাজার কোটি টাকা। রিকশাচালক থেকে নেতা, তারপর কোটিপতি। মালিও বনমালি হয়ে কোটি টাকার অধিপতি। এগুলো কি অভূতপূর্ব উন্নতির বিস্ময়কর সূচক নয়? পিয়ন হলো নিম্নবিত্ত শ্রেণির প্রতিনিধি। সুতরাং তর্কের ভাষায় ধরেই নেয়া যায়, আমাদের নিম্নবিত্ত মানুষেরাও এখন শতকোটি টাকার মালিক। এটা কি সদৃশ্য অগ্রগতি নয়? সাবেক মন্ত্রী সাহেবের চোখ হঠাৎ করেই অন্ধ হলো কী করে!

উন্নতি আর উন্নয়নের আরো কিছু দিক রয়েছে। আমরা সাইত্রিশ হাজারে পর্দা কিনি। সাত থেকে থেকে বালিশের দাম দাঁড়ায় সাতাশ হাজারে। বালিশের কভারের দাম হয় আটাশ হাজার টাকা। আমাদের এই যে ক্রয় ক্ষমতা, তা কি ধনী হবার লক্ষণ নয়! আমাদের ভিসিগণের অবস্থা দেখুন, একজনের একদিনের চায়ের বিল চল্লিশ হাজার, আরেকজন সদলবলে লিফট কেনার অভিজ্ঞতা নিতে ইউরোপ সফরে যাচ্ছেন। অন্যজন মাহের হয়েছেন কমিশনগাথায়। কোটি টাকা তিনি ভাগ বাটোয়ারা করে দিচ্ছেন।

এসব অগ্রগতি কি করে চক্ষু এড়ায়! আমাদের ক্রয় ক্ষমতা, আমাদের ভাগ করে দেবার ক্ষমতা, এসব দেখে কি মনে হয় না, আমরা এগিয়েছি! যদি না মনে না হয়, তাহলে আপনি হিংসুক, আমাদের অগ্রগতিতে আপনার জ্বলুনি হচ্ছে।

এতদিন শুনে এসেছেন টাকা-পয়সা হাতের ময়লা। যারা উন্নতির চরম শিখরে উঠে তাদের কাছে টাকা পয়সা সত্যিই অর্থহীন হয় উঠে। একদিনেই ক্যাসিনোতে দুই-চার কোটি টাকা উড়িয়ে দেয়া তেনাদের কাছে কোন ব্যাপারই না। বস্তা ভরে টাকা নিয়ে যাওয়া হয় জুয়া খেলতে। ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন থাকলে আরব শেখরাও ঠিক পিছে পড়ে যাবে।

দু’হাজার কোটি টাকা ঘুষ, বিস্ময়ের কিছু নেই, এতো আমাদের কাছে মামুলি বিষয়। অবশ্য একে ঘুষ বলাও ঠিক হবে না, এটাও এক ধরণের সেবা। দ্রুত কাজ পাবার বদলে ‘স্পিড মানি’। সেবার কথায় বিষম খেলেন, আমরাতো মানুষের সেবাতেই আছি। এই যে, চিকিৎসা সেবার কথাই ধরুন। আমরা কতটা সিরিয়াস এ ব্যাপারে, তিন হাজার টাকার স্যালাইন স্ট্যান্ড কিনছি আমরা ষাট হাজারে। তারপরেও বলবেন আমরা পিছিয়ে রয়েছি, আমাদের সূচক বাড়েনি! এমনটা বললে, আপনি অগ্রগতির বিরুদ্ধে, হিংসুক মানুষ। পরের ভালোতে আপনার জ্বলুনি হয়। আপনি খারাপ লোক।

পুনশ্চ : লেখা যখন শেষের দিকে, প্রিয় একজন মানুষ একটি খবরের লিঙ্ক পাঠালেন। সেখানে দেখলাম একটি এলইডি বাল্ব কেনা হচ্ছে পয়ষট্টি হাজার টাকায়। চুয়াল্লিশ হাজার পাঁচ’শ আটানব্বই’টি বাল্ব কেনার জন্য খরচ হচ্ছে দুই’শ ঊননব্বই কোটি টাকা! ‘অগ্রগতিতন্ত্র’ একেই বলে। টাকা-পয়সা যে সত্যিই আমাদের হাতের ময়লা, বুঝলেন তো। ‘বুঝলে বুঝপাতা, না বুঝলে তেজপাতা।’ 

ও, বাল্ব কর্মটি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের। আর খবরটি জানিয়েছে ইংরেজি দৈনিক ‘নিউ এজ’। খবরটি পড়ে একটি কথাই মনে হয়েছে, আমাদের ভবিষ্যত সত্যিই ‘উজ্জ্বল‘, একেবারে ‘এলইডি’ বাল্বের মতই ‘ফকফকা’। 

লেখক : কাকন রেজা, কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0208 seconds.