• ১৫ অক্টোবর ২০১৯ ২১:০৮:৪৩
  • ১৫ অক্টোবর ২০১৯ ২১:০৮:৪৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

মাহবুব রহমান এর গল্প

ছবি : সংগৃহীত



অভিবাসী



যেহেতু,সে চোরা পথে যাচ্ছে,আর আছে সরকারের চোখ ফাঁকি দিয়ে সাবধানে যাবার ও গোপনীয়তা রক্ষা করার মতো সংবেদনশীল ব্যাপার,তাই বিদায় জানাতে কেউ আসে নি। তবু বিদায় বেলায় কারো স্নেহার্দ চোখ,গভীর মমতা মাখা কোনো হাতের পরশ,সাবধান যেও– বলে,ফিরে আসার গভীর আশ্বাস নিয়ে, কূলে দাঁড়িয়ে থাকবে না কেউ;– ভেবে কষ্ট হয়।  যতক্ষণ না ট্রলার ছাড়ল,সে বসে রইলো চুপচাপ; মন খারাপ করে। এই ঘন জঙ্গলের প্রান্ত ছুঁয়ে শুরু হয়েছে সমুদ্রের সীমানা,কী বিপুল জলরাশি আর সীমাহীন রহস্য নিয়ে জেগে আছে ভয়ঙ্কর সুন্দর! এখান থেকেই শুরু হবে যাত্রা।

যে যুবকের কথা বলছি,তার নাম ইয়াসিন। নিবাস উত্তরের দিকে,কেননা হেরে যেতে আসে নি উত্তরের যুবকেরা। এই গল্পের নায়ক। তাকে আপনি সহজেই আলাদা করতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত এই ছেলেটির চোখগুলো ভীষণ বুদ্ধিদীপ্ত আর মায়াকারা। তিরন্দাজ নামক সাহিত্য গোষ্ঠী সৃষ্টি ও ব্লগে লেখালেখির জন্য সে আজ ফেরারি আসামী। তার নামে ছবিসহ হুলিয়া জারি হয়েছে-এক ধরিয়ে দিন বলে । যৌথ বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে, দেখা মাত্র গুলি করার। আপাতত তার সম্পর্কে আর না জানলেও চলবে। বরং,আপনাদের আমি সেই জায়গায় নিয়ে যাই, যেখানে চোরাই পথে,ট্রলারে চেপে,কিছু ভাগ্যাহত মানুষ,সমুদ্র পাড়ি দিয়ে বিদেশ যাওয়ার আয়োজন করছে।

কিছু মুহূর্ত বিষাদের মতো ধরালো ও হিমেল কষ্ট নিয়ে আসে,অন্য ক্ষেত্রে যাকে আমরা বলি মর্মান্তিক। অনির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ কিংবা ওঁত পেতে থাকা নিদারুণ দুর্ভোগ– এই সব ভেবে ইয়াসিনের খুব কষ্ট হয়। কাজল চোখের মেয়ে,খোঁপায় যে গুজে রাখে ধূসর পেরেক,– দিলরুবার কথা ভেবে মোচড় দিয়ে ওঠে বুকের ভেতর। একদিন জল ফোয়ারার পাশে বসে দিলরুবা বলেছিল,‘সারাক্ষণ এত মন খারাপ করে থাক কেন? কষ্ট ভুলে থাকার জন্য তোমাকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দেই। অবশ্য এটা আমার নয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে ধার করা।’ ইয়াসিন বলেছিলো, ‘আমাদের তো  একটাই ঘর, একটাই আশ্রয়-রবীন্দ্রনাথ। কবি গুরুর কাছ থেকে ধার করা দোষের কিছু না।’ ‘শোন মন্ত্রটা বলি। একদা ছিল না জুতা চরণ যুগলে।’ ইয়াসিন কে হাসতে দেখে দিলরুবা বলে–  “হাসো কেন?” ইয়াসিন বলেছিলো– “এই মন্ত্র আমার কাজ করবে না। নিচে তাকানোর অভ্যাস আমার নেই। আমার দৃষ্টি হলো আকাশের দিকে।”

ট্রলারে চুপচাপ বসে সে চোখে নিমোর্হ দৃষ্টি এনে তাকিয়ে আছে ব্যস্ত মানুষের দিকে। মেদহীন খেটে খাওয়া রোগাটের চেহারার মানুষগুলোর চোখ চকচক করছে,ব্যক্তিগত দারিদ্র্য আর সীমাহীন দুর্ভোগের তটরেখাকে অতিক্রম করে,দিন পাল্টে দেবার স্বপ্নে এরা পাড়ি দিতে এসেছে সমুদ্র। হায় চাঁদ সওদাগরের বংশধর। হয়তো এদের প্রত্যেকের জীবনেই আছে একটা বিষাদময় গল্প। চোরাই পথে যে সাগর পাড়ি দিতে চায়,তার জীবনের চেয়ে ভয়ানক ট্রাজেডি আর কি বা হতে পারে! জুতা নেই বলে যার মন খারাপ,সে সান্ত্বনা পাবে কারো পা নাই– এই কথা ভেবে। কখনো কখনো এই সান্ত্বনাও তো জীবনে দরকারি হয়ে ওঠে। দিলরুবা কি মনে রাখবে ইয়াসিনকে? এই সব ভেবে ভেবে ইয়াসিনের মন ভালো হয়ে যায়।নিজে নিজেই সে বলে– “যাচ্ছি যখন,তখন খামোখা মন খারাপ করে রেখে লাভ নেই। বরং যাত্রাটাকে উপভোগ করি।”

কিন্তু যাত্রা উপভোগের হয় না। ইয়াসিন অন্যান্য অভিবাসীসহ আশ্রয়হীন হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে,আন্দামান সাগরের ধু ধু জলরাশিতে। সশস্ত্র কোস্ট গার্ড পাহারা দিয়ে রেখেছে তটরেখা। মহীসোপানের ধারে কাছে ট্রলার দেখলেই গুলি করে ঝাঝরা করে দিচ্ছে। এই সব দেশে অনুমতিহীন অভিবাসী ও অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে তৎপর হয়ে উঠেছে উপকূলীয় রাষ্ট্রগুলো।

কূলে ভেরার সব সম্ভাবনা বন্ধ হয়ে গেলে নাবিক সিন্ধান্ত দেয়,‘দিশা পরিবর্তন করে ইতালির দিকে যাওয়া ছাড়া আমাদের হাতে আর কোন উপায় নেই।”

এদিকে জাহাজে জলীয় পানি ও খাবার দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ঘোষণা দেয়া হলো,– ‘তিনদিন পর সবাই দুইটি শুকনো বিস্কুট ও এক কাপ করে পানি পাবেন। বেঁচে থাকবার জন্য এই যথেষ্ট। এর অন্যথা হলে সবাইকে না খেয়ে মরতে হবে। তাই সবাইকে সংযত আচরণ করার জন্য আহ্বান করা হলো।’ খাদ্যহীন পানিহীন আগামী দিনগুলো আর ক্রমশ ধাবমান  অসহায় মৃত্যুর কথা ভেবে সবার চোখে গভীর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কি হবে– হায় কি হবে?

পঞ্চম দিনে ট্রলারে শুরু হয় মহা বিশৃঙ্খলা। খাবার ও জলীয় পানির অভাবে তিন জন মারা যায়। অভিবাসীরা নাবিকের লোকদের সাথে তর্কবিতর্ক করেও কোন খাবার ও পানি না পেলে,মারামারি বেধে যায়। এক পর্যায়ে সবাইকে আতঙ্কিত ও বিহ্বল করে, নাবিকের লোকেরা, দুই জন অভিবাসীকে প্রকাশ্যে গুলি করে মেরে ফেলে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে ঠিকই। কিন্তু সবার মধ্যে একটা অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তম দিনে খাবার ও জলীয় পানির অভাবে আরও দুই জন লোক মারা যায়। ট্রলারের দুই তৃতীয়াংশ লোক অসুস্থ হয়ে পড়ে। নাবিক বা তার লোকদের এসব নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। এইসব অসহায় মৃত্যু ইয়াসিন মেনে নিতে পারে না। নিজেকে বড় অসহায় ও অথর্ব মনে হয়। কিন্তু কিই বা করার আছে তার!

এদিকে ট্রলারে দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে যাত্রীদের শেখানো ভদ্রতা ও প্রকৃতি, মুখ থেকে যেমন মুখোশ সরে গিয়ে বের হয়ে আসে জান্তব রূপ। এতদিন যেসব ট্রলারবাসী সুখে-দুঃখে পরস্পরের সাথে শেয়ার করেছে খাদ্য, সুখ ও পরিচর্যা, যত্ন করেছে রোগাক্রান্তকে এবং ভীষণ মানবিক আচরণ করেছে পরস্পরের প্রতি, ক্রমশ খাবার ঘাটতির সাথে সাথে তারা পর্যায়ক্রমে ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে। এ ওর খাবার কেড়ে নিচ্ছে। ছিনিয়ে নিচ্ছে পানি। সবচেয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীরা। আস্তে আস্তে এক ভয়ঙ্কর সত্য প্রকট হতে থাকে– প্রকৃতির মধ্যে সবচেয়ে মহানুভব প্রাণী যেমন মানুষ, তেমনি সবচেয়ে নৃশংস প্রাণীও মানুষ।

গভীর অন্ধকার রাত্রে চোখ খুলে শুয়ে আছে ইয়াসিন। সোঁ সোঁ সামুদ্রিক নির্জনতা। ধু ধু সমুদ্রে অন্ধকার আরও গাঢ় হয়ে আসে। এক সময় জাহাজের দুর্ভাগা মানুষের কান্না ও গোঙানির আওয়াজ বন্ধ হয়ে যায়। বিষাদের মতো নির্জনতা ভর করে আন্দামান সাগরে। সমুদ্রের জল ভেজা শীতল হাওয়া যেন মৃত্যুর গন্ধ ছড়িয়ে দিয়ে বয়ে যায়। সমুদ্রের বুকে রাতের আকাশে জলে উঠেছে অজস্র তারকারাজি। এই সৌন্দর্যেও যেন আতঙ্ক ছড়িয়ে আছে। এইসব বিভীষিকার মতো আতঙ্ক ভুলে থাকার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর কথা মনে করে ইয়াসিন।

তিরন্দাজ তখন চারদিকে সাড়া ফেলে দিয়েছে। অনলাইন ভিত্তিক এই ব্লগটি কারা চালায় সেই সব অ্যাডমিনদের হন্যে হয়ে খুঁজছে পুলিশ। এরই মধ্যে একদিন দুম করে,হলের মধ্যে চলে আসে দিলরুবা। ইয়াসিনকে বলে– ‘তোমার সাথে আমার অনেক কথা আছে। চলো।’

গনগনে দুপুরে তখন নির্জন হয়ে এসেছে কার্জন হলের ক্যাম্পাস। শুক্রবার বলে তেমন ভীড়ও ছিলো না। বড় সেই গাছটার ছায়ার নিচে বসে একমনে ঘাস ছিঁড়তে থাকে দিলরুবা। কোনো কথা বলে না। ইয়াসিন বলে– ‘গুরুত্বপূর্ণ কথা বলবে বলে আমাকে ডেকে নিয়ে এলে। কী ব্যাপার! কিছু তো বলছো না।’ দিলরুবা তবু চুপ করে থাকে। পাশে উদ্ভিদ বিদ্যা বিভাগের ফুলের বাগান। কী যেন ফুল ফুটেছে। তার তীব্র গন্ধ ছড়িয়ে গেছে চারদিকে। রোদের তীব্রতা বেড়ে যায়। একটা হলুদ রঙয়ের পাখি উড়তে উড়তে চলে যায় বাগানের দিকে। একসময় ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলে দিররুবা। বলে– ‘তোমাকে ছাড়া আমি বাচঁবো না। তুমি তিরন্দাজ ছেড়ে দাও। তোমাকে ছাড়তে হবে তিরন্দাজ।’ ইয়াসিন কিছু বলে না। চুপ করে থাকে। কত সংকটময় মুহূর্তে কত নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে বাদ দিয়ে তিরন্দাজ গোষ্ঠী তার ওপর আস্থা রেখেছে। তিরন্দাজ ছেড়ে দেয়া কি সম্ভব?

তারপর বেশ উদাস কণ্ঠে বলে, “শোনো দিলরুবা, এই যে এত বিভীষিকা, নৃশংসতা,বিকৃতি– এই পতন আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? জানি দিন দিন আমাদের বিত্ত ও বৈভব বাড়ছে। সেই সাথে সমানুপাতিক হারে বাড়ছে অসুখ ও অশান্তি। আদর্শবিহীন শিক্ষক,অমানবিক ডাক্তার,কুচক্রী উকিল,দুর্নীতি-আসক্ত ব্যাংকার, চাটুকার সংস্কৃতিকর্মী,পরদেশ লোভী মেধাবী প্রজন্ম,নষ্ট রাজনীতি ও নষ্ট নেতার খপ্পরে দেশের সব মানুষ। সুন্দরীদের কাছে লম্পটরাই আজ শ্রেষ্ঠ প্রেমিক। নীতিবানরা এখানে সংখ্যালঘু–অসহায়–অপমানিত হাস্যকর জীবন বহন করছে। ভালো মানুষ এখন– এক অধুনালুপ্ত মিথ। নজরুল ইসলামের মতো করে আজ কেউ বলছে না, ‘কাণ্ডারী, বলো ডুবিছে মানুষ, সন্তান মোর মার’। কেননা আমরা মেনে নিতে শিখেছি,পচনের ওপর পট্টি লাগিয়ে বলি– ও কিছু নয়। দিশাহীন প্রজন্ম এখন কি করবে? তাদের জন্য কে ভাবে?– কে রাখে তাদের খবর? তাদের জন্য তো সব ঘর– সব দরজা– সব জানালা বন্ধ,তাদের সামনে এমন কোন পথ,আদর্শ বা রাজনীতি নেই যাকে তারা আদর্শ ভেবে অনুসরণ করবে। পরীক্ষার আগেই পকেটে আসছে প্রশ্নপত্র। এই প্রজন্ম, যাকে আমরা নিজেরাই নষ্ট করে দিচ্ছি,তাদের কাছে কী প্রত্যাশা করবে বলো! দুর্নীতি আর স্বজনপ্রীতির কারণে অযোগ্য লোকে ভরে গেছে প্রশাসন। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জন সাধারণের জন্য মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই নষ্ট সমাজ, পঁচে যাওয়া সমাজ যে ব্যাধিতে আক্রান্ত তার কোনো নিরাময় নেই। বিদ্যমান ব্যবস্থাকে না ভাঙলে সৃষ্টিশীল কোনো কিছুর গঠন সম্ভব না। এখন পতনকে পতন দিয়েই ঠেকাতে হবে। অশ্লীলতাকে রুখতে হলে আমাদের আরও বেশি অশ্লীল হতে হবে। ছড়িয়ে দিতে হবে চারদিকে ব্যাধি ও জীবাণু। এই অচলায়তনকে না ভাঙলে কি করে মানুষের সমাজ প্রতিষ্ঠা হবে বলো? তিরন্দাজ এই কাজটি করছে। এই ভাঙনটাকে তুমি মনে করতে পারো প্রসব যন্ত্রণার মতো। মহৎ কোনো কিছু ভূমিষ্ঠ হবার জন্য এই কষ্ট আমাদের মেনে নিতে হবে, দিলরুবা।” একজন বর্ষীয়ান রাজনৈতিকের মতো একদমে বলে যায় কথাগুলো। এর উত্তরে কী বলা যায় দিলরুবার জানা নেই। শুধু বলে,“সবার জন্য তুমি এত ভাবো। আমার জন্য তোমার কোনো ভাবনা নেই।”

সেদিন একবুক অভিমান নিয়ে চলে গেছে দিলরুবা। আজ নির্জন আকাশের নিচে নির্ঘুম আতঙ্কময় রাতেও দিলরুবার জন্য বড় মায়া আর ভালবাসা অনুভব করে ইয়াসিন। প্রেমের মতো এমন সত্য আবেগ বুঝি আর নেই।

দিশাহীন নির্জন সমুদ্রে ছুটে চলেছে জাহাজ। অসহায়,অসুস্থ বুভুক্ষু মানুষগুলোর মুখের দিকে তাকানো যায় না। সিনেমায়,ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে বাতাসের সাথে ভেসে আসা ফ্লাইং ফিস আরও কত সমুদ্রের মাছের কথা সে জেনেছে। ব্যায়ার গ্রিলের মতো এ-সব খেয়েও তো বেঁচে থাকা যায়। কিন্তু থৈ থৈ লবণাক্ত জল ছাড়া  কিছই চোখে পড়ছে না। তবে কি না খেতে পেয়েই সবাই মারা যাবে?

নাবিকের ঘর থেকে যেন কিসের ফিস ফিস আলাপ শোনা যায়! ইয়াসিন কান খাড়া করে থাকে। নির্জন রাতের ফিস ফিস আলাপ তো ভয়ানক ষড়যন্ত্রের নাম। নাবিক বলে, “শোনো মিয়ারা, আমি খারাপ মানুষ না। তবে প্রয়োজনে খারাপ হওয়াটা দোষের কিছু না। ইতালি যেতে আরও ২০/২৫ দিন লাগতে পারে। আমাদের পানি ও খাবার আছে মাত্র দুই দিনের জন্য। তবে যদি আমরা ১০/১২ জন খাই তাইলে এটা আমাদের শেষ দিন পর্যন্ত সাপোর্ট দিতে পারে। আমাদের যেটা করতে হবে– সেটা হলো জনসংখ্যা কমানো। আগে ঠিক করতে হবে কাদেরকে বাঁচিয়ে রাখবো আর কাদেরকে মারবো।” এই বলে নাবিক চুপ করে যায়। ইয়াসিন একটা ছোট ছিদ্র দিয়ে দেখে যাত্রীদের মধ্যেও কেউ কেউ এই ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছে। কী করতে চায় নাবিক? সবাই এ ওর মুখ চাওয়া চাউয়ি করে।
নাবিক যাত্রীদের বলে, “তোমাগো মধ্যে আমি ১০ জনকে বাঁচিয়ে রাখবো। তুমরা এখানে ৫ জন রইছো। আর ৫ জনকে ঠিক কইরো।” একজন নাবিকের লোক বলে, “ওস্তাদ,কাজটা করুম ক্যামন? গুলি তো করন যাবো না। কার্তুজ মোটে ৫টা।” নিজেদের দুর্বলতা যাত্রীদের সামনে প্রকাশ করায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে নাবিক। “চুপ শুওয়ের বাচ্চা। একদম চাক্কু বসায় দিমু  কইলজার  মইধ্যে।” আরেকজন নাবিকের লোক ইশারায় তাকে চুপ করতে বলে।

এবার নাবিক,গলা খাদের কাছে নামিয়ে বলে,“সবাই যখন ঘুমিয়ে যাবে,তখন তোমাদের দলে দলে ভাগ হয়ে যেতে হবে। কেউ কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুই হাত পা ধরে ফেলে দিতে হবে জলে। কাজটা করতে হবে একযোগে। তবে আগে জোয়ান ও শক্তিশালীদেরকে টার্গেট করতে হবে। পরে অসুস্থ ও দুর্বলদের এমনিতেই ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারবো। ঝামেলা কম। আমরা কাউরে মারবো না। সমুদ্রের জলে আল্লাহ যাদের বাঁচায় রাখবে, রাখব; যাদের মারবে, মারবে। এটা তার বিষয়। এতে আমাদের কোনো পাপ নাই। তাছাড়া জীবন বাঁচানো ফরয,এইটা তো হাদিসেরই কথা,কি কন মিয়ারা।”

এমন ঠাণ্ডা মাথার খুনি– সবার চোখে মুখে আতঙ্ক ঠিকরে বের হতে চায়। কী ভয়ানক ব্যাপার! ইয়াসিনের গা শিউরে ওঠে। সন্তপর্ণে সরে আসে নিজের জায়গায়।

পরদিন ইয়াসিন কথাটা যাত্রীদের মধ্যে গোপনে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু অসহায়,ক্ষুধার্ত,অসুস্থ মানুষগুলো প্রতিবাদ না করে,ভয়ে ও আতঙ্কে চুপসে যায়। কারো মুখে কোন রা নেই। আন্দামান সাগরে ভাসমান এই ট্রলারে মৃত্যুর আতঙ্কময় বিভীষিকা নেমে আসে। কেউ কোনো উচ্চ বাচ্য করে না। ঘুমালে খুন হয়ে যাবে,শুধু এই ভয়ে ঘুমায় না কেউ আর!

 

** লেখক :

মাহবুব রহমান

-কবি ও গল্পকার 

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0214 seconds.