• ০৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৮:২৫:৪৮
  • ০৮ অক্টোবর ২০১৯ ১৮:২৫:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ছাত্র রাজনীতি নয়, প্রতিরোধ গড়েই দুর্বৃত্তদের নিষিদ্ধ করুন

ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


ছাত্রলীগ নেতাদের নির্যাতনে নিহত বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার বিচার চাইতে গিয়ে অনেকে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের স্লোগান তুলেছেন। এইযে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ভাবনাটা তৈরি হলো এই ভাবনাটা আসলে কেন এসেছে? কিভাবে এসেছে? ছাত্র রাজনীতি বন্ধের দাবি আসলে একটি- ‘এরশাদীয় দাবি’, মূলত এটি একটি স্বৈরাচারী প্রেসক্রিপশন।

১৯৮২ সালে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করার পর সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দেশে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার জন্য মন্ত্রিসভা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। স্বৈরাচারী শাসন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছে দেয় যে সাধারন মানুষ যেন ‘ছাত্র রাজনীতি’ বন্ধের দাবি তুলে। কারণ বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার ভীত নাড়াতে এই ছাত্ররাই হুমকি হয়ে ওঠে। যেকোনো স্বৈরশাসকের জন্যই ছাত্র রাজনীতি বিপজ্জনক এবং হুমকির। আর এ জন্যই সে বিভিন্ন পন্থায় দমন পীড়নের আশ্রয় নেয়। এই দমন পীড়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করে থাকেন তার পালিত ছাত্র সংগঠন, শিক্ষক এবং প্রশাসনকে। 

মূলত দাবিটি হবে দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি বন্ধের। এই যে আজ আবরার ফরহাদের হত্যার দাবির বিপরীতে সাধারন ছাত্র জনতা দাঁড়িয়েছে এটাওতো রাজনীতি; দুর্বৃত্তের বিরুদ্ধের মুক্তির রাজনীতি। আবার ফরহাদ যে কথা লিখতে গিয়ে মারা গেলো সেটাও রাজনীতি; দাসত্বের বিরুদ্ধে মুক্তির রাজনীতি।

স্বৈরাচারী কাঠামোতে নির্যাতন চালাতে রাজনীতি করতে হয় না, রাজনীতি বন্ধ করতে হয়। যারা আবরারের উপর নির্যাতন করে হত্যা করলো তারাতো রাজনীতি করতে চায়নি রাজনীতি বন্ধ করতে চেয়েছেন। এইযে সাধারন মানুষের শক্তি যেন সংগঠিত আকারে দাঁড়াতে না পারে, ভিন্ন মত পথ প্রকাশ হতে না পারে সেসব বন্ধ করে দেয়াটাই মূলত স্বৈরাচার পন্থী রাজনীতির কাজ, দুর্বৃত্তদের কাজ।

একটি স্বৈরাচারী শাসন কাঠামো পরিচালনা করতে গেলে শাষকদের মুক্ত রাজনৈতিক চর্চার পরিবেশকে সংকুচিত করে আনতে হয়। এই কাঠামোতে শুধু সুবিধাভোগী শ্রেণিরাই প্রকাশ্যে তোষামোদি রাজনৈতিক চর্চা করার স্বাধীনতা পায়। বাকিদের কণ্ঠরোধ করাই ওই শাসন কাঠামোর কাজ। আর এই মুক্ত রাজনৈতিক চর্চা বন্ধে বড় বাধা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ইতিহাসতো তেমনটাই বলে। এ কারণেই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করতে পারলে শাসকদের একটি বড় সস্তির জায়গা তৈরি হবে। আর সেজন্যই ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে সুবিধা পেয়ে উচ্ছিষ্ট ভোগী বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ মিডিয়ায় এসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের কথা বলে যায়। এই দাবিটিকে তারা প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ খুঁজে বারবার।

ছাত্রদের রাজনীতি বিমুখ করে রাখতে নানা রকম পরিস্থিতি তৈরি করে রাখা হয়েছে। রাজনীতি বলতে আপনি গেস্টরুমে নির্যাতনকারীকে বোঝেন, কিন্তু এই নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারীদের বোঝেন না। রাজনীতি বলতে আপনি নির্যাতনকারী-লুটপাটকারী-খুনিদের প্রতিনিধিদের বোঝেন কিন্তু এদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া জনগণকে সংগঠিত করা সংগঠকদের বোঝেন না। কিন্তু কেন? কারণ আপনার সামনে রাজনীতির ছবিটা এইভাবেই প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে। আদতে যেটা হবে কু-রাজনীতি, দুর্বৃত্তের রাজনীতি সেটাকেই আপনি  ছাত্র রাজনীতি ভেবে নিষিদ্ধের দাবি তুলছেন। কিন্তু মূলত এই দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে রাজনীতি গড়ে ওঠা দরকার। এই সব দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়াকে আপনি রাজনীতি হিসেবে শনাক্ত করতে পারছেন না। কারণ আপনাকে সেই চিন্তা থেকে দুরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। সেই চিন্তা আপনার ভেতরে তৈরি হতে দিচ্ছে না। আর দিচ্ছে না বলেই আপনি বলছেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করুন।

কিন্তু এই অনগ্রসরগামী চিন্তা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবেই বেঁচে থাকার রাজনীতিটি করতে হবে। দুর্বৃত্তের রাজনীতি, লুটপাট-হিংসা-নির্যাতন-দাসত্বের রাজনীতি বন্ধ করতে হবে। আপনাকে গলা ছেড়ে চিৎকার করার অধিকারটি ফিরিয়ে আনতে হবে। আপনার চিন্তার স্বাধীনতাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। নিজের মতো করে বাঁচার শেখার বোঝার স্বাধীনতাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য লড়তে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি তার ক্যাম্পাসেই মত প্রকাশের জন্য বাধাগ্রস্থ হয়, খুন হয় নির্যাতনের শিকার হয় তাহলে সেই নির্যাতকদের বিরুদ্ধেই দাঁড়াতে হবে। ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে ক্ষমতার ছত্রছায়ায় যে নির্যাতন চলে তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদেরকেই দাঁড়াতে হবে শক্ত হবে। সংগঠিতভাবে যে কোন ধরনের নির্যাতনকে মোকাবেলা করতে হবে। নির্যাতনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধতাই একটি রাজনীতি। বেঁচে থাকার রাজনীতি। বাঁচিয়ে রাখার রাজনীতি। সেই রাজনীতি গড়ে তোলার আওয়াজ তলুন এবং স্বৈরাচারদের দেয়া মুখস্থবানীকে পরিত্যাগ করে মুক্তভাবে ভাবুন। ভাবা প্রাকটিস করুন।

লেখক: সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ছাত্র রাজনীতি

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0214 seconds.