• ০৬ অক্টোবর ২০১৯ ২২:৩২:৫৫
  • ০৬ অক্টোবর ২০১৯ ২২:৩২:৫৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

মাহবুব রহমান এর ভ্রমণ কণিকা

ছবি : সংগৃহীত

পুরুলিয়ার ভ্রমণ কণিকা :

সুবিনয় বিশু—কবি ও সাঁওতাল বন্ধু, ফেইসবুকেই পরিচয়, একদিন নিমন্ত্রণ জানালো তার জেলা শহর পুরুলিয়ায়, কবিতার বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে। ইদানীং পরিবর্তনহীন নাগরিক জীবন টানতে টানতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। একটা স্থির সময়, যেন স্রোত আটকে মজে গেছে, আর  আমি হাঁসফাঁস করছিলাম, এই অচলায়তন থেকে বের হবো বলে। তখনই ডাক এল ওপার বাংলা থেকে। যুক্ত হলো কীর্তনখোলা পাড়ের আরেক বন্ধু গাতক মতুয়া সঞ্জয়।

বর্ডার যখন অতিক্রম করছি, তখন বার বার মনে হচ্ছিল, এই বর্ডার মানব জাতির ইতিহাসে কতোটা কালো চিতার আতংক ও আগ্রাসনের জন্ম দিয়েছে, দিয়ে যাচ্ছে। ফিলিস্তিন, কোরিয়া, কাস্মীর থেকে লাইন অব সনোরা , কিংবা রোহিঙ্গা ক্রাইসিস সর্বত্র যেন মানুষের বিপক্ষে মানুষ। অথচ সৃষ্টিকর্তার প্রকৃতিতে কোন কাঁটাতার ছিল না। জন লেলনের ইমাজিন গানাটার কথা মনে পড়ে যায়। ইমাজিন দেয়ার ইজ নো বর্ডার।

সুবিনয় বিশু,—পরম সুহৃদের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, আজকেই ওর প্রোগ্রাম। আমি হোটেল রুম থেকে তাকে বিদায় জানিয়ে, স্নান করে, ঘুমুতে গেলাম। ঘুম ভাঙ্গলো সঞ্জয়ের ডাকে। “কীরে খাবি টাবি না। ওয়েটার খাবার দিয়ে গেছে।“  

প্রোগ্রাম সন্ধ্যায় বলে, আমরা বের হলাম চারপাশটা দেখবো বলে। দেখি, বাইরে গাড়ি রেডি হয়ে আছে। “স্যার, কোথায় যাবেন।“ সে অনেক রিসোর্ট টিসোর্ট এর নাম বলছিল। প্রথাগত টুরিস্টদের মতো ভীড়-বাট্টার মধ্যে ঘুরে বেড়ানো আমার কাছে এক ধরনের বাতুলতা। বললাম, “আশে পাশে জঙ্গল বা নদী আছে কোন?”  সে আমাদের কংসাবতী নদীর পাড়ে নিয়ে এলো। এটি এই অঞ্চলের বিখ্যাত নদী।

পাহাড়ি ঝুমুর গানে কতবার এই নদীর নাম শুনেছি। বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের ‘উত্তরা’ সিনেমায় , এই পুরুলিয়ার লোকগানের ব্যবহার দেখে, —এর তাল, লয়, মসুর, মাদল, ঢোল ও গানের প্রতি এক ধরনের মুগ্ধতায় বুঁদ হয়েছিলাম বহুদিন। আজও ঝুমুর গানের প্রতি সেই মুগ্ধতা এতটুকু  কমেনি। নদীর ধার ঘেঁষে শুকনো ডালপালা কুড়োচ্ছে এক সাঁওতাল কিশোরী, সঞ্জয়  কাঠ কুড়ানো কিশোরী কে জিজ্ঞেস করে, “কি নাম তোমার?”  সে সপ্রতিভ উত্তর দেয়,“ ছাহেব, হামার নাম ব্যারোনিয়া।”  ব্যারোনিয়া যেতে যেতে বার বার ফিরে তাকাচ্ছিল। বিকেল বেলা, এই বাগমুন্ডি জঙলা জঙলা গ্রামটি, যার পাশ দিয়ে বয়ে গেছে স্বচ্ছতোয়া কংসাবতী নদী , বড় অপরূপ লাগে।

সুবিনয় বিশু’র কবিতা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন  ও পাঠোত্তর  আলোচনা সভা শেষ হলে , সেখানে আমাদের সাথে পরিচয় ঘটলো,  জঙ্গল মহালের ফরেস্ট রেঞ্চারের সাথে। সাঁওতাল কবি হিসেবে সুবিনয় বিশুর পরিচিতি যথেষ্টই, ফরেস্ট রেঞ্জারকে বললো,— "স্যার, এ আমার বাংলাদেশের বন্ধু, বন পাহাড় দেখবে বলে, পুরুলিয়া এসেছে।" জানা গেল, রেঞ্জার সাহেব নিজেও কবিটা টবিতা লেখেন। হোটেলে উঠছি জেনে ভদ্রলোক খুব পিড়াপিড়ি করে, তার জিপ গাড়িতে তুলে , আমাদের বাঙলোয় নিয়ে গেলেন। আমাদের বসতে বলে তিনি ভেতরে গেলেন। ফরেস্ট বাংলোর এই ঝুলন বারান্দা থেকে কংসাবতী নদী দেখা যায়।

সুবিনয় বিশু বলে, "দাদা, সাহেব একা থাকেন। আড্ডাপ্রিয় মানুষ। নির্জনতা পছন্দ নয়। ভাগ্যের ফেরে পেয়েছেন ফরেস্ট রেঞ্জারের চাকুরী। মানুষ জনের সঙ্গ তাঁর কাছে অর্থের চেয়েও দামী। গল্প শুরু করলে আর থামার নাম নেই। নিজে কবিতা লেখেন বলে এ লাইনের লোকজনকে খুব সমাদর করতে পছন্দ করেন। "

রাতে ঝুমুর গানের আসর বসানো হলো। আশে পাশের পাহাড়ি লোকজন , স্থানীয় কয়েকজন  যারা এই বাংলোয় চাকরি করেন, এসেছেন। একটা বিষয় খুব সহজেই চোখে পড়ে। এই সব আদিবাসীর খোলসবিহীন অকৃত্রিম সরলতা। গান শুরু হয়েছে, গানের কথায় উঠে এসেছে তাদের সরল জীবন, এখানকার ভূগোল , জলবায়ু , বাগমুন্ডি পাহাড় ও কংসাবতী নদীর কথা।  গান পাগল সঞ্জয় গানের নেশায় মেতে উঠে, ওদের সাথে সুর মিলিয়ে গাইতে থাকে। “নদীর ধারে চাষে বধূ মিছাই করো আশ,  ঝিরিঝিরি  বাঁকা লদী বইছে বারো মাস ।” একটি গানে আছে— “গাছের মধ্যে তুলসী, পাতার মধ্যে পান, নারীর মধ্যে রাধিকা ,পুরুষে ভগবান।“ কথা শুনে বেশ চমক লাগে। এক সময় আসর শেষ হয়ে যায়। কানের মধ্যে অনুরণিত হয় ঝুমুর গানের কথা ও সুর । একটা ঘোর লাগা ভাবালুতা নিয়ে আমরা রুমে ফিরে আসি। মনে হয়, এত দিন কৌটার মুগ্ধ মক্ষিকার মতো চার দেয়ালে বন্দী হযে ক্রমাগত জীবনের অপচয় করে গেছি। 

লাল মাটির পাহাড়ের দেশে, এই কংসাবতী পাড়ে, নির্জন বাংলোতে, রাতে আর ঘুম আসে না। শুয়ে শুয়ে কত কথা, কত অতীত, কত কত ব্যর্থতা, কত সফলতা, চিন্তার বুদ্বুদের মতো ভেসে ওঠে, গোল হয়ে হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে ফেটে হারিয়ে যায় শূন্যে। পাশের রুমে সঞ্জয় বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। মাথার ওপর ঘর ঘর করে ঘুরছে বৈদ্যুতিক পাখা। ভ্যাপসা গরম হলেও, আপন কক্ষে, ঘুর্ণায়মান বৈদ্যুতিক পাখা, আমার একটি অপছন্দনীয় প্রয়োজন। পাখার একটানা বোঁ বোঁ শব্দ , — পাখা বন্ধ হলেই জেগে ওঠে চরাচর। শুকনো পাতা খসে পড়ার শব্দ, সবুজ পল্লব থেকে জল ফোঁটা খসে পড়ার শব্দ, বাতাসে মৃদু ঢেউ তুলে উড়ে যায় ক্ষুদ্র ডানার পোকা—একটা ব্যঞ্জনা তৈরি করে। পাখার একটানা বোঁ বোঁ শব্দ প্রতিবেশের বিপুল নীরব কলতান কে ব্লক করে দেয় বলেই, কলের পাখা আমার কাছে একটি অনৈচ্ছিক দরকার।

ঘুম ভাঙলো প্রায় দুপুর বেলা। স্নান করে বাইরে এসে দেখি, দুপুরের রোদে গনগন করছে চারদিক। সহস্র অদৃশ্য রশ্মীর মতো, পাইপ লাগিয়ে, যেন কংসাবতীর জল শুষে নিচ্ছে, মধ্য দিনের সূর্য। রৌদ্র মন্থনে নদীজল তৃপ্ত প্রেমিকার মত ধীরে বয়ে যায়। পাশে কোথাও বুনো ফুল ফুটেছে। তার সুতীব্র গন্ধ বাতাসে ব্যাকুল হয়ে ছুটে যায় চারপাশ মাতিয়ে। নদীর ওপর দিয়ে গাঙ টি টি পাখি উড়ে যায় শিস দিয়ে। ঈশান কোণে পেঁচানো তুলোর মতো সাদা মেঘ শুভ্র হয়ে ছড়িয়ে আছে আকাশে আকাশে। সঞ্জয় পাশে এসে দাঁড়ায় , গুণগুণ করে গাইতে থাকে পরুলিয়ার লোক গান , —

“ ভালো ঘাটের জল লিবি, ভালো করে ছেঁকে খাবি, বেঘাট গেলে কেট্টে দিবে জোঁকে, ও মন বেহুঁশ হলে কেড়ে লিবে তোকে।“

বাইরে একটা জীপ এসে থামলো। চুড়ি আর শাড়ির খচ খচ শব্দে আমরা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই। সুবিনয় বিশু জানালো, রেঞ্জার সাহেবের বিবি ও শ্যালিকা। সাহেব রাত্রে তাদের ফোন করে আসতে বলেছে।  সুশ্রী মুখ যুগল বিশুর দিকে তাকিয়ে, মিষ্টি স্বাগত জানানো হাসি হেসে, অন্দর মহলে চলে যায়।

বিকেলে আমরা বের হলাম , সাথে রেঞ্জার সাহেবের ফ্যামিলি। জানালেন, এখানে কংসাবতী নদী, কাঁসাই নদী, পাশেই মেদিনীপুরের দামোদর নদ—বিদ্যাসাগর মায়ের সাথে দেখা করার জন্য যে নদী সাতরে পাড়ি দিয়ে দিয়েছিলেন। আছে অযোধ্যা পাহাড়, বাঘমুন্ডি পাহাড় আর জয়চন্ডি  পাহাড়—সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশে সিনেমার সুট্যিং হয়েছিল এই পাহাড়ে । আছে পলাশ ফুল আর মহুয়া ফুলের বন। বাঘমুন্ডি রোড ধরে সাঁ সাঁ করে ছুটে চলেছে আমাদের হাই এস গাড়ি। দু পাশে শালের বন , যেন হরর সিনেমার কোন হন্টেড জঙ্গল। গাড়ির মধ্যে সঞ্জয়ের গান; রেণুকা—রেঞ্জার সাহেবের আত্মীয়া মেয়েটি, যে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে নাট্যকলা বিভাগে পড়ে, খুব মুগ্ধতা নিয়ে শুনছে। সামনের সিটে রেঞ্জার সাহেব ও সুবিনয় বিশু সত্তর দশকের পশ্চিম বাংলার সাহিত্য আন্দোলন হাঙরি জেনারেশন নিয়ে তুমুল আলোচনা নাকি ঝগড়া করছে। 

যৌবনের শেষ প্রান্তে এসেছেন মিসেস রেঞ্জার, তবু মেজাজ ধরে রাখার জন্য প্রানান্ত প্রচেষ্টা, খুব চান সবাই তাকে গুরুত্ব দিক, জোলি মাইন্ড নিয়ে হেসে হেসে কথা বলেন। মহিলার ভয়েসটোনটি সত্যি আকর্ষণীয় । আমাকে বললেন, ভাই , উৎসবের দিনগুলোতে পুরুলিয়া রীতিমত জমে উঠে। করব পরব, মকর পরব আর টুসু উৎসবে এলে দেখে প্রাণ ভরে যাবে। বিভিন্ন স্পটে আমরা নামলাম। বন পাহাড় নদী ঘেরা এই অঞ্চল কী এমন ক্ষণিক দেখায় তৃপ্ত হয়? প্রত্যেকটি অঞ্চলের আলাদা আলাদা ক্যারেক্টার থাকে। কিছুদিন থেকে, লোকালয়ের মানুষের সাথে মিশে, বার বার ঘুরে এলে  সেই বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্যগুলো চোখে ধরা পড়ে। ঘটে অঞ্চলের সাথে হৃদয়ের পরিণয়। মনের মধ্যে একটা দাগ টেনে দেয়।

কাল ফিরে যেতে হবে, এই কথা ভেবে সঞ্জয়ের কি খুব মন খারাপ? ইতোমধ্যে রেণুকার সাথে তার বেশ বন্ধুত্ব হয়েছে। কাঁসাই নদীর পাড়ে কাশফুলের বনে এসে আমিও মনে মনে শপথ করি এখানে , এই পুরুলিয়ায় ফিরে আসবো বারবার। কাল সকাল হলে, ফিরে আসবো নিজ দেশে, নিজ বাসভূমে। এই লাল মাটি, মহুয়ার দেশ, শালবন, সাঁওতাল পরগণা আর ঝিরিঝিরি বয়ে যাওয়া কংসাবতী নদী ছেড়ে চলে যাবো। ওরা বলে মহুল ফুল, কাল লাল পলাশের বন আরও রঙিন হবে, আরও মাদকতা নিয়ে ফুটবে মহুল ফুল . বন্ধু ও সুহৃদ সুবিনয় বিশু মন খারাপ করা চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে  থাকবে প্লাটফর্মে।             

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0243 seconds.