• ০৪ অক্টোবর ২০১৯ ২২:৩১:৪৯
  • ০৪ অক্টোবর ২০১৯ ২২:৩১:৪৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

মুশফিক নবীন এর ভ্রমণকাহিনী

ছবিঃ সংগৃহীত

আলোর সাথে একটি দিন; নাহয় কিছু জমলো ঋণ!

‘হেমন্ত’ এসেছে কিনা জানা ছিল না। বাইরে বেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ পেরোতেই দেখলাম ‘হেমন্তের ঝরা শিশির’। পাশে থাকা গণিত বিভাগের রাজেন্দ্র স্যারকে দেখিয়ে বললাম, “স্যার, দেখেন তো হেমন্তের শিশির কিনা”। তিনি বললেন, নাহ, হেমন্তের তো এখনো দেরি। দুজনই একটু দ্রুত হাঁটছিলাম। আমাদের স্টেশনে পৌঁছাতে হবে দ্রুত।

মনে মনে ভাবছিলাম, এমন কি সম্ভব যে একজন মানুষ নিজের অর্থে বই কিনে সেই বই নিজেই কাঁধে ঝুলিয়ে মানুষের বাড়িতে বাড়িতে হেঁটে যাচ্ছেন? এক টুকরো আলো, একটি স্বপ্ন নিয়ে উপস্থিত হচ্ছেন প্রতি সকালে মানুষের দ্বারে! এমন সীমাহীন আত্মকেন্দ্রিকতার যুগে, অদ্ভুত আঁধার নেমে আসা এই সময়ে – এমন মানুষও কি আছেন, যিনি মানুষের শুভবোধ জাগরণের আশায় সামষ্টিক সামর্থ্যকে তুলে ধরছেন পাশে থাকা প্রতিটি মানুষের বিবেকের সামনে! এইসব ভাবনাগুলোকে নিয়ে এলোমেলো হতেই রাজেন্দ্র স্যার তাড়া দিলেন, 'টিকেট কাটা শেষ, চলেন ওঠা যাক'।

রওনা হয়েছিলাম ‘আলোর ফেরিওয়ালা’ সাদা মনের মানুষ রাজশাহীর পলান সরকারের সাথে দেখা করার জন্য, কিছু সময় তাঁর সাথে কাটানোর জন্য। যিনি তাঁর সারাটা জীবন কাটিয়েছেন মানুষকে বই পড়তে উৎসাহিত করবার পেছনে। সদ্য চালু হওয়া পাবনা-রাজশাহী পথের ট্রেনে উঠে পড়লাম। ট্রেন ধীরে চলা শুরু করলো। শহরের রেশ কেটে বেরোতেই দুপাশের দৃশ্য স্পষ্ট হলো। সুন্দর দৃশ্য। আখক্ষেতের পাশে পদ্মবিল। কিছু দূরে ধানক্ষেতের পাশে ছিপছিপে সর। কী অদ্ভুত! ঐ তো শঙ্খচিল, শালিখ। ঐ তো কলমীর গন্ধভরা জলে হাঁসের দল ভেসে বেড়াচ্ছে। এদের কোন একটির পায়ে ভালবেসে কিশোরীর দেয়া রঙ্গিন ঘুঙুর অবশ্যই আছে। এভাবে জীবনানন্দের সাথেও দেখা হয়ে যাবে, এই সকালে, এতো দ্রুত, ভাবিনি! প্রিয় কবির দেখা পেয়ে মন অনেকটা ভালো হয়ে গেলো।

সকাল নয়টার কিছু আগেই ট্রেন বাঘা উপজেলার আড়ানী স্টেশনে থামল। ছোট সুন্দর স্টেশন। কয়েকটা চায়ের দোকান। নিরিবিলি বাজার একপাশে। স্টেশন মাস্টারের অফিসের পাশেই পর পর তিনটি অশথগাছ। তার ফাঁকে ছোট একটা খাবারের দোকান। সেখানেই সকালের নাশতা খেয়ে নিলাম। খেতে খেতে দোকানী ছেলেটাকে বলছিলাম পলান সরকারের কথা। চিনতে পারল না । না পারারই কথা। সেখান থেকে তাঁর বাড়ি আরও কিছু দক্ষিণ-পশ্চিমে, বাউসা গ্রামে। ভ্যানে করে বাউসা বাজারে গিয়ে তাঁর কথা বলতেই সবাই চিনতে পারলেন অবশ্য। রাস্তা দেখিয়ে দিচ্ছিলেন সবাই তাঁর পাঠাগারের। বাজারেই চায়ের তৃষ্ণা মিটিয়ে হেঁটে হেঁটে এগোতে থাকলাম। ঘড়িতে তখন ১০ টার মতো। মিনিট দশেক হাঁটার পর একটা মোড় ঘুরতেই হাতের ডানে চোখ পড়লো সাদা মাঝারি একতলা একটা বাড়ির মতন। হ্যাঁ, এই পলান সরকার পাঠাগার। দেয়ালের লেখাগুলো পড়ছিলাম। ২০০৭-০৮ সেটি বাস্তবায়ন করেছে রাজশাহী জেলা পরিষদ। বাহিরের দিক থেকে ছবি তোলার জন্য ক্যামেরা বের করেছি, হটাত খালি গায়ের মাথায় গামছা পেঁচানো বয়স্ক একজন মানুষ একদম পাশে এসে দাঁড়াল। বেশ আগের ছবি দেখেছি, তবু চিনতে খুব অসুবিধা হলো না। ইনিই এই অদ্ভুত আঁধার নেমে আসা পৃথিবীতে আলো নিয়ে যাত্রা করা দুঃসাহসী ব্যতিক্রমীদের একজন। মানুষটি বুঝতে পারলেন আমরা এসেছি ওনার সাথেই কথা বলবার জন্য। শুরুতেই বললেন, কানের অসুবিধা হওয়াতে ভালো শুনতে পারেন না। ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন একটু পাশের পাড়ায় যাবার জন্য, আমাদের দেখে আপাতত যাওয়া বাতিল করলেন। লাঠি হাতে অনেকটা সোজা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। শরীরের শক্তি কমে এসেছে কিন্তু একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় নি। অনেক আত্মপ্রত্যয় নিয়ে আমাদের উচ্চস্বরে বলা কথাগুলোর উত্তর দিচ্ছিলেন। পাঠাগারের দরজার তালা তখনো খোলা হয় নি। বললাম আসেন একটু বসে কথা বলি। সাথে সাথেই দ্রুত হেঁটে পাঠাগারের একটু পেছনের এক বাড়ির সামনে গিয়ে কাউকে ডাকতে থাকলেন। এবার ভালভাবে খেয়াল করলাম শতবর্ষের বার্ধক্য ওনাকে পুরোপুরি ঘায়েল করতে না পারলেও, বয়সের ভাড়ে অনেকটাই ক্লান্ত। ওনার ডাকে সাড়া না পাওয়ায় রাজেন্দ্র স্যার গেটে শব্দ করতেই বেড়িয়ে আসলেন হাসিমুখের এক তরুণী। ওনার নাতনি, নাম বৈশাখী। পড়ালেখা শেষে একটা চাকুরি করছেন রাজশাহীতে। নিজেদের পরিচয় দেয়াতে দ্রুত পাঠাগার খুলে আমাদের ভেতরে বসতে দিলেন।

ভেতরে দুটো মাঝারি আকারের কক্ষ। বামদিকেরটাতেই বইপত্র র‍্যাকে সাজানো। পাশেরটাতে বসার টেবিল। সৌর চালিত পাখা আছে ভেতরে। ছাড়া হলো। পড়ার টেবিলের পাশের চেয়ারে বসলাম। জানালা খুলে দেয়া হলো। আলো এসে পড়লো আমাদের মাঝে। কিন্তু সে আলোর দরকার থাকলেও প্রয়োজনীয়তা ছিল সামান্যই। আমাদের সামনে যে জীবন্ত আলোর উৎস বসা!

আমাদের কথাবার্তার মাঝে কিছু সময়ের জন্য বৈশাখীও থাকলেন। আমাকে কথা বলতে হচ্ছিল উচ্চস্বরে। তবুও বুঝতে পারছিলাম উনি অনেক কথাই শুনতে পারছিলেন না। সেক্ষেত্রে ওনার নাতনি সাহায্য করছিলেন। প্রথমেই জানতে চাইলাম, কেমন আছেন? এরপরও এই প্রশ্ন একাধিকবার করেছিলাম। প্রত্যেকবারই বলেছেন তিনি শারীরিক- মানসিক উভয়ভাবেই ভালো আছেন। প্রতিবারই বিস্মিত হয়েছি। আমাদের দেশের মানুষ তো অনেক অল্পেই বার্ধক্যে আক্রান্ত হয় এবং প্রতিনিয়ত নানা অসুবিধার অভিযোগ করেন। অথচ শত বছর বয়স হলেও কী সাবলীলভাবে বলছেন, তিনি ভাল আছেন। বিস্মিত হতেই হয়। এই শক্তি আসলে ‘আলোর উৎসের’ অন্তর্নিহিত শক্তি। যাই হোক, নিজের সুস্থতা নিশ্চিত করলেও গভীর বেদনার সাথে জানাচ্ছিলেন নিজের প্রিয় স্ত্রীর অসুস্থতার কথা। নব্বই ঊর্ধ্ব জীবনসঙ্গিনীর কথা বলতে গিয়ে গাঢ় বেদনার মায়ায় চোখদুটো ভরে উঠছিল মানুষটির। বলছিলেন খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল তাঁদের। পাঁচ মাস বয়সে বাবা মারা গেলে সেই অল্প বয়সেই মাসহ আশ্রয় নেন নানা বাড়িতে। সেখানেই আপন খালাতো বোনের সাথে বিয়ে হয় তাঁর। একসাথে ছোটবেলায় খেলাধুলা করেছেন বন্ধুর মতো।

সারাজীবন কাটিয়েছেন সেই বন্ধুত্বের রেশে রেশে। আজ তাই প্রাণপ্রিয় স্ত্রীর এই কষ্টের কথা বলতেও বেদনায় চোখ নীল হয়ে আসছে। বলছিলেন বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেন নি তিনি। আর্থিক কারণে। যুবক বয়সে যাত্রাদলের সাথে জড়িত ছিলেন। কিছু ছবি দেখালেন সে বিষয়ের। নানার কাছ থেকে কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলেন। তাই দিয়েই সংসার চলতো। বিদ্যানুরাগী নির্লোভ এই মানুষটি সেই প্রাপ্ত সম্পত্তি থেকেই জমি দান করেছেন স্থানীয় হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায়। তাঁর নয় ছেলে-মেয়ের সবাই এখন বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত। জিজ্ঞেস করেছিলাম ছেলেমেয়ে, নাতিপুতিরা খোঁজখবর বা সেবাযত্ন করেন কিনা। হ্যাঁ উত্তর দিয়েছেন। কিন্তু আবারও নিজের স্ত্রীর কষ্টের কথাই বলেছেন গাঢ় বেদনা নিয়ে।

ঠিক অসংলগ্ন নয়, কিন্তু অপ্রাসঙ্গিকভাবে দুএকটা কথা বলছিলেন। বুঝলাম বয়সজনিত কারণে । মায়ের কথা মনে আছে কিনা জিজ্ঞেস করতেই বললেন, মা কবে মারা গেছে তাঁর ঠিক মনে নেই (অন্যান্য কথা থেকে মনে হলো মুক্তিযুদ্ধের পরেই হবে)। জন্মের পরেই বাবা মারা যাওয়ায় তাঁর আর কোন ভাইবোন ছিল না। নিজের সন্তান হওয়ার পরে তাঁর মাই তাদের দেখে রাখতেন। সেই ছোট সময় থেকেই জ্ঞানের প্রতি সম্মান আর আকাঙ্খা ছিল তাঁর। আর যেহেতু দানের মধ্যে জ্ঞানদান সব থেকে বড়, তাই তিনি সব থেকে বড়টিকেই বেছে নিয়েছেন দান করবেন বলে।

প্রশ্ন করেছিলাম সরাসরি, মানুষের ভেতর বই পড়ার আগ্রহ কেমন দেখছেন এখন। সরাসরি উত্তর করলেন আগ্রহ অনেক কম। বই আছে, পাঠক নেই। শ্রুতি সমস্যার কারণে বড় বাক্যে প্রশ্ন করতে পারছিলাম না। আগ্রহ কমে যাওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে রইলেন। ভাবলাম বুঝতে পারেন নি। আবার পুরো প্রশ্ন করবো কিনা ভাবছি তখনি এলোমেলোভাবে বলছিলেন, বয়স্করা তো পড়তে চায় না, আর ছেলেমেয়েরা কিছু আসে কিন্তু পড়ার অনেক চাপ। বুঝতে পারছিলাম একাডেমিক পড়ার কথা বলছেন। এখনকার ছেলেমেয়েদের তো কোচিং-প্রাইভেট, মডেল টেস্ট, বাবা-মার চাপ সামলানোর পর আর কোন সময় থাকে না।

একটু ভিন্নপ্রসঙ্গে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। ২০১১ সালে একুশে পদক পাওয়ার পরে ওনার ভাবনায় পরিবর্তন এসেছিল কিনা? প্রশ্ন শুনে শুধু সে সময়ের দুএকটা স্মৃতির কথা বললেন মাত্র। বুঝতে পারলাম পুরোপুরি নির্মোহ, প্রচার-বিমুখ, খাঁটি এই মানুষটির কাছে পুরস্কার কিংবা স্বীকৃতি কোন প্রাপ্তি নয়। মানুষের দ্বারে স্বপ্ন নিয়ে যাওয়াই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। সাধ্যের দূরত্বের মধ্যে তিনি সবার কাছে বই পৌঁছে দিতে চান, ভাংতে চান পাঠহীনতার সংস্কৃতি। এই তাঁর একমাত্র প্রাপ্তি। শারীরিক দুর্বলতার কারণে এখন আর তাঁর ছেলেমেয়েরা তাঁকে আর খুব একটা বই নিয়ে বাইরে বের হতে দেন না। তবুও তিনি সুযোগ পেলেই বেড়িয়ে পড়েন বইয়ের ঝোলা নিয়ে। কারণ এই তো তাঁর স্বপ্ন, এটাই তো তাঁর শান্তি, প্রাপ্তি।

আরও কথা শুনতে পারলে ভাল লাগত। কিন্তু দেখতে পেলাম উনি ক্লান্তবোধ করছেন। ধন্যবাদের মতো কিছু একটা বলতে চাইছিলাম কিন্তু তাঁর আগেই বললেন, তিনি স্নান করার জন্য উঠতে চান। খালি গায়েই তিনি এতক্ষণ আমাদের সাথে কথা বলছিলেন। অনুরোধ করলাম পাঞ্জাবি পরে আসলে একটা ছবি তুলতাম। উঠে পরে পাঠাগার থেকে পেছনের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। আসতে বললেন আমাদেরও। হাঁটার সময় ওনার পায়ের দিকে খেয়াল করে দেখলাম একজিমার মতো হয়ে গেছে। নখের একটা দিক থেকে খানিকটা রক্ত ঝরছে। খারাপ লাগলো এই ভেবে এইসব মানুষের আমরা কতটুকু খোঁজ রাখি। রাষ্ট্র-সমাজের কথা বাদই দিলাম। কিন্তু আমরা যারা নিজেদের হৃদয়কে এখনও শৃগাল কুকুরের খাদ্য হয়ে যায় নি বলে দাবী করি, তারা কতটুকু কী করছি! মূল বাড়ির উঠানে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতেই পাঞ্জাবি পরে আসলেন মানুষটি। কাঁপা হাতে বোতাম লাগানোর চেষ্টা করছেন। দেখলাম কষ্ট হচ্ছে। নিজেই লাগিয়ে দিলাম। ছবি তুললেন আমাদের সাথে। ধন্যবাদ জানিয়ে দোয়া চাইলাম। হেসে বললেন আমি সামান্য মানুষ- ঈশ্বরের কাছে কি আমার কথা পৌঁছাবে! অদ্ভুত বিশ্বাসে মানুষটির ক্ষীণ হয়ে আসা চোখের দিকে তাকালাম। সেখান থেকে যে নক্ষত্রের আভা ছড়িয়ে পড়ছে- সেই আলোর মঙ্গলবারতাই আসলে মানুষের কল্যাণ, মানুষের প্রগতি।

চলে আসছিলাম। শেষবারের মতো আরও একবার পেছনে ফিরে তাকালাম। দরজার আড়ালে চলে গেলেন মানুষটি। ভাবলাম এই ক্ষয়িষ্ণু সমাজে পলান সরকারের মতো মানুষদের চলে যাওয়া আরো কতটা ক্ষতির হবে ? সকালের শুভ্রতায় জীবনানন্দের সাথে দেখা হয়েছিল। সে জীবনানন্দই এসে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দিলেন। নক্ষত্রেরও তো একদিন মরে যেতে হবে। কিন্তু ভালবাসা তো নদীর জলের মতো হয়ে রবে। জলের থেকেও ছিঁড়ে গিয়েও জল আবার যেমন জোড়া লাগে নিবিড় জলে এসে!

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মুশফিক নবীন গল্প

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0224 seconds.