• ০৩ অক্টোবর ২০১৯ ২১:২৪:৩০
  • ০৩ অক্টোবর ২০১৯ ২১:২৪:৩০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল রাবি, উপ-উপাচার্যের নতুন ব্যাখ্যা

উপ-উপাচার্য চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া। ছবি : সংগৃহীত

রাবি প্রতিনিধি :

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগে চাকরি প্রত্যাশী নুরুল হুদার স্ত্রী সাদিয়ার সঙ্গে অর্থ নিয়ে দর-কষাকষির ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার ঘটনায় উত্তাল হয়ে উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন ক্রিয়াশীল সংগঠনের আন্দোলনের চাপে নতুন ব্যাখ্যা করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন উপ-উপাচার্য চৌধুরী মোহাম্মদ জাকারিয়া। 

অধ্যাপক জাকারিয়া দাবি করেন, কথোপকথনে যে টাকার বিষয়ে কথা হয়েছিল, সেই টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নান নিয়েছিল। এবং যে একাউন্টে লেনদেন করা হয় সেটার স্বত্বাধিকারী তিনি।

আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক মোহাম্মদ আব্দুল হান্নানের দাবি, যে টাকা এসেছিল সেটা ব্যবসায়িক কাজে ধার করা হয়েছিল। এটা নিয়োগ সংক্রান্ত নয়। বরং তার বিরুদ্ধে অসত্য তথ্য ছড়ানো হচ্ছে।

তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি অর্থদাতা। একই সঙ্গে এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি করেছেন অধ্যাপক জাকারিয়া।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে প্রশাসনের অপসারণ চান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এরই পরিপ্রেক্ষিতে বিকেল সাড়ে চারটায় সিনেট ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে ব্যাখ্যা তুলে ধরেন উপ-উপাচার্য। এর আগে ৩০ সেপ্টেম্বর রাতে চাকরি প্রার্থী নুরুল হুদার স্ত্রী সাদিয়ার সঙ্গে উপ-উপাচার্যের অর্থ লেনদেন সংক্রান্ত ‘ফোনালাপ’ ফাঁস হলে পরদিন এ ঘটনার প্রতিবাদ জানান তিনি।

আজকের সংবাদ সম্মেলনে উপ-উপাচার্য জাকারিয়া লিখিত বক্তব্যে বলেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত তার ফোনালাপ একটি স্বার্থন্বেষী মহল কর্তৃক আংশিক, খণ্ডিত ও অসৎ উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। আইন বিভাগে শিক্ষক নিয়োগের বোর্ড ছিল ১৩ নভেম্বর ২০১৮। এর ৯ দিন আগে ৪ নভেম্বর ২০১৮ তারিখে নিয়োগ সংক্রান্ত একটি দুর্নীতির নথি আমার নজরে আসে। যা ইসলামী ব্যাংকে ২ লক্ষ টাকার একটি লেনদেনের রিসিপ্ট। সেই বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমি হুদার স্ত্রীর নিকট হতে টাকার উৎসটি জানার চেষ্টা করি।’

‘আমি যে রিসিপ্টটা পেয়েছিলাম, সেটা ছিল ডিসেন্ট ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী, আইন বিভাগের সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল হান্নানের নামে। সেখানে মোহাম্মদ হান্নানের ছবি ও স্বাক্ষর রয়েছে। আমাকে ফাঁসিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর, আমি যখন প্রতিবাদলিপি দিয়েছিলাম, তারপর থেকেই গত ২ অক্টোবর হঠাৎ করে টাকা লেনদেনের সেই একাউন্ট বন্ধ করে দেয়া হয়েছে’ বলে দাবি করেন উপ-উপাচার্য।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্যের পক্ষে ডিসেন্ট ট্রেডার্সের লেনদেন সংক্রান্ত রসিদ, টাকা ফেরত বিষয়ে অধ্যাপক হান্নান ও হুদার কল রেকর্ড ডকুমেন্ট হিসেবে উপস্থাপন করেন উপ-উপাচার্য।

কথোপকথন হলো-

হুদা : স্যার একটা তো ঝামেলা হয়ে গেছে। সেদিন আপনি আমার কাছে ২ লক্ষ টাকা ধার নিলেন না; আপনি বললেন না ইমিডিয়েটলি টাকাটা কালকের মধ্যে ইয়ে করতে হবে? তো আমার অ্যাকাউন্টে ছিলো অল্প কিছু টাকা, তো এখন শ্বশুর বাড়ি থেকে টাকাটা নিয়েছিলাম। আমি স্যার এই পর্যন্ত শ্বশুর বাড়ি থেকে কোনোদিন টাকা নেইনি। স্যার এইবারেই প্রথম আমি শ্বশুর বাড়ি থেকে নিয়েছি। এখন আপনি বুঝেন তো ওয়াইফের আচরণ বুঝেন না? তো এখন আমি ইমিডিয়েটলি টাকাটা তাদের ব্যাক করার চেষ্টা করতেছি। আপনি তো মনে হয় বলেছিলেন টাকাটা ব্যাক করবেন! তাহলে এটা কি সামনে হবে?

অধ্যাপক হান্নান : কবে হইলে হবে তোমার?

হুদা : আপনি যেভাবে বলবেন। না না, আপনি যদি ইয়ে করতে চান তাহলে আমিও ইয়েতে থাকব, মানসিক স্বস্থিতে থাকব যে, স্যার আমাকে এতদিনের মধ্যে ইয়ে করবে তাহলে আমি ওভাবে কথা বলে ইয়ে করব।

অধ্যাপক হান্নান : অহ, রবি/সোমবারের দিকে।

হুদা : রবি, সোমবারের দিকে স্যার?

অধ্যাপক হান্নান : হ্যাঁ।

হুদা- স্যার, এখন শোনেন আমি আপনার এখানে..

স্যার- না হবে না।

হুদা- মানে হইছে কি স্যার, আমি তো এখান থেকে ২টা অ্যাকাউন্ট থেকে ইয়ে করতে চেয়েছিলাম। এখান থেকে কিছু ওখান থেকে কিছু। পরে আমাকে বলল যে হুদা সমস্যা নেই। যেহেতু তোমার স্যারের লাগতেছে হ্যাঁ, স্যার যেহেতু ধার চাইতেছে স্যারের লাগতেছে এখন। স্যার বলল, আমরা দিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু স্যার আমরা দেয়ার পর আমি কখন লাইফে নেই নাই এই জন্য যে শ্বশুরবাড়ি থেকে টাকাপয়সা নেয়, কত নেগেটিভ জিনিস। বোঝেন নাই স্যার? এখন তো বুঝতে পারছি তাই ফোন করলাম। মাইন্ড করবেন না স্যার।

অধ্যাপক হান্নান : না না, মাইন্ড করব না।...

উপ-উপাচার্যের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যাপক মোহাম্মদ হান্নান বলেন, ‘উপ-উপাচার্য সংবাদ সম্মেলন করে যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তাতে এটা স্পষ্ট যে, টাকার লেনদেন আমি করেছি। এবং এর জন্য আমি দায়ী। তবে আমার একাউন্টে টাকা এসেছিল এটা সত্য। কিন্তু তা নিয়োগ সংক্রান্ত নয়।’

তিনি দাবি করেন, ‘নুরুল হুদা (চাকরি প্রত্যাশী) হঠাৎ একদিন আমার ব্যবসায়িক অফিসে (ডিসেন্ট ট্রেডার্স) যায়। ওই সময় আমার এক জায়গা থেকে টাকা আসার কথা ছিল, কিন্তু না আসায় আমি চিন্তিত ছিলাম। কথার পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে আমি এ বিষয়ে হুদাকে বলি। তখন ও আমাকে যেকোনোভাবে ব্যবস্থা করে দিতে চায়। এবং সৈয়দপুর থেকে ডিপোজিট ক্যাশ করা হয় ডিসেন্ট ট্রেডার্স একাউন্টে।’

‘৪ নভেম্বর ২০১৮ আমার একাউন্টে টাকা পাঠালে ১১ নভেম্বর ফেরত হিসেবে চেক জমা দেই এবং ১৩ তারিখে তা জমা হয়।’

তবে ‘গত বছরের ১১ নভেম্বর টাকা জমার রসিদটি আপনার (উপ-উপাচার্য) ভাগিনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সহকারী প্রক্টর গাজী তৌহিদুর রহমানকে পাঠিয়েছিলেন হুদা’; প্রশ্নোত্তর পর্বে সাংবাদিকের করা এ প্রশ্নের উত্তরে উপ-উপাচার্য বলেন, ‘বিষয়টি বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হোক। তাহলে সবার সংশ্লিষ্টতা স্পষ্টভাবে বেরিয়ে আসবে।’

এদিকে ফোনালাপের বিষয়ে অধ্যাপক হান্নান বলেন, ‘যে কল রেকর্ড উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটা ধার করা টাকা ফেরত সংক্রান্ত। এবং ওই নিয়োগের এক সপ্তাহ আগেই।’

তিনি দাবি করেন, ‘ডিসেন্ট ট্রেডার্সের লেনদেন সংক্রান্ত যে রিসিপ্টটি উপস্থাপন করা হয়েছে সেটাতে ব্যাংক সংবলিত আমার ছবির ওপর সিল-স্বাক্ষর থাকার কথা। অথচ সেটা দেখে মনে হয়, ছবিটা পেস্ট করা।’

তবে অধ্যাপক হান্নানের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো ২ লাখ টাকা ধার নাকি নিয়োগের স্বার্থে সে বিষয়ে নুরুল হুদার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এখন অবধি আমি পর্যবেক্ষণ করছি। এসব বিষয়ে কথা বলার মত সময় এখনও হয়নি বলে আমি মনে করি। সময় হলেই আমি পুরো বিষয়ে বিবৃতি দেব।’

এর আগে বৃহস্পতিবার সকাল ১১টায় ‘দুর্নীতিবাজ’ প্রশাসনের অপসারণ চেয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে। সাড়ে ১১টায় ‘স্বাধীনতাবিরোধী ও দুর্নীতিবাজ’ প্রশাসনের অপসারণ দাবি চেয়ে সিনেট ভবনের সামনে মানববন্ধন করে দুর্নীতিবিরোধী শিক্ষক সমাজ। পরে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে একাত্ব প্রকাশ করে।

এদিকে দুর্নীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গনের দাবিতে জোহা চত্বরে খালি পায়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. ফরিদ খান। একই সঙ্গে বেলা সাড়ে ১১টায় ‘অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের’ ব্যানারে রাকসু আন্দোলন মঞ্চ, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ রাবি শাখা ও ছাত্র ফেডারেশন সমন্বিতভাবে গ্রন্থাগারের সামনে মানববন্ধন করে।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0262 seconds.