• ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৬:৫৬:৩৭
  • ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৬:৫৬:৩৭
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

আমি এক বহিষ্কৃত বলছি!

ছবি : সংগৃহীত


আব্দুল্লাহ আল নোমান :


অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলাম। আমার ভাবনার জগতে বিশ্ববিদ্যালয় মানে জ্ঞানের মুক্তকোষ। একাডেমিক পড়া-লেখার পাশাপাশি আমাদের চিন্তা ভাবনায় নতুন নতুন দিগন্তের পথ রেখা সৃষ্টি করবে। ক্যাম্পাস মানে আমার কাছে ছাত্র-ছাত্রীদের মুক্ত মনে বিচরনের অভয়ারণ্য।

এখানে আমরা শিখবো, তর্ক করবো, দাবি তুলবো নতুন নতুন মতের পথের রেখা সৃষ্টি করবো...। কত কত স্বপ্ন কত ভাবনা। কিন্তু বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার যোজন যোজন দূরত্ব দেখে হোঁচট খাই। 

বুশেমুরবিপ্রবির একজন শিক্ষার্থী ছিলাম আমি। এখন নেই। শিক্ষা জীবন পার করে সাবেক হয়ে গেছি। কিন্তু শিক্ষার্থী হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের যে সোনালী অধ্যায় পার করার কথা ছিলো তার দেখা পাইনি কোনদিন। বরং এক স্বৈরাচারি ভিসির তৈরি কারাগারে ছটফট করেছি মুক্তির জন্য। কেমন ছিলো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় জানেন? আপনারা যারা বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষার্থীদের মুক্তাজ্ঞন মনে করেন তারা রীতিমত হোঁচট খাবেন এখানকার শিক্ষার্থীদের আবদ্ধ শিক্ষাজীবন দেখে।

অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানাচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমান উপাচার্য প্রফেসর ড. খন্দোকার নাসির উদ্দিন উপাচার্যের দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যায় একটি মুক্তিকামী প্রতিষ্ঠনের পরিবর্তে একটি স্বৈরতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিনত হয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছাড়াও শিক্ষক কর্মচারীরাও তার হাতে জিম্মি।

আমরা মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রে অবরুদ্ধ থেকেছি। আমরা মুক্ত মনে কথা বলা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমরা একটি মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিন্ডলে বেড়ে ওঠা থেকে বঞ্চিত হয়েছি। আমাদের ভিসির নির্দিষ্ট করে দেয়া চিন্তার বাইরে ভাবতে দেয়া হয়নি। এখানে গিটার বাজিয়ে গান গেয়ে শিক্ষার্থী বহিষ্কার হয়। এখানে সমস্যার সমাধান চাইলে বহিষ্কার হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি বিউটি পার্লার খুলেছেন। তার প্রতিবাদ করায় শিক্ষার্থীরা বহিষ্কার হয়েছে! আমি সেই বহিষ্কৃতদের একজন! এ নিয়ে আমার বিশেষ দুঃখ নেই। আমি বরং গর্বিত বোধ করি হ্যাঁ আমি অবরুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বৈরাচারী ভিসির কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করে বহিষ্কার হয়েছিলাম। এভাবেই প্রতিনিয়ত নানা কারণে বহিষ্কৃত হতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। তাদের বাবা-মাকে ডেকে এনে অপমান অপদস্থ করা হচ্ছে। এমনই এক স্বৈরাচারের তত্বাবধানে আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়টি!

দেশবাসী আপনারা জানেন, সম্প্রতি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ‘ফাতেমাতুজ জিনিয়া’কে ফেসবুকে স্টাটাসের মাধ্যমে "বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কি?" জানতে চাওয়ায় উপাচার্য বহিষ্কার করেন। গত ১৮ জুলাই ২০১৭ তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম বহির্ভূতভাবে "জনাব আসিকুজ্জামান ভূইয়ার" পদোন্নতি ,  একইসাথে চেয়ারম্যান ও ডীন হওয়ার কথা উল্লেখ করে একটি সচেতনতা মূলক স্টাটাসের ভিত্তিতে "চয়ন মল্লিককে" বহিষ্কার করেন। চয়নের অবৈধ বহিষ্কার আদেশ পত্যাহারের জন্য করা আবেদন করায় সেই সময়ে আরো ৭ জনকে বহিষ্কার করেন। এভাবেই বহিষ্কার আতংকে শিক্ষার্থীরা।

দেশবাসী জেনে থাকবেন যে সাম্প্রতিক সময়ে ডেঙ্গুর হাত থেকে বাঁচতে চেয়ে ক্লাসরুম ও বিশ্ববিদ্যালয় পরিষ্কার পরিচ্ছন্নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়  প্রসাশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ফেসবুকে স্টাটাস দেয়ায়  EEE ডিপার্টমেন্টের ৪ জনকে বহিষ্কার করে। এভাবে কোন বৈধ কারণ ছাড়াই ৬৯ জনকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হয়। তিনি শুধু বহিষ্কার করে ক্ষ্যন্ত থাকেন না। তিনি শিক্ষার্থীদের অভিভাবক ডেকে অকথ্য  ভাষায় গালাগাল করেন।

সেইসব ভাষার ধরন কি জানবেন? একটি নমুনা দিচ্ছি ১২ -১৩ সেশনের শিক্ষার্থী সভ্যসাচী রায়ের মাকে ডেকে নিয়ে ভিসি বলেন ‘আপনার গর্ভে সমস্যা আছে।’ হ্যা এবং সেই ভিসি এসব বলেই বহাল তবিয়তে তার ত্রাস রাজত্ব চালু রেখেছেন। সকলে অবগত আছে যে "অর্ঘ্য বিশ্বাস" এর আত্মহত্যার একমাত্র কারন তার সামনে তার বাবা মাকে ভিসি স্যারের অকথ্য ভাষায় গালি ও অপমানিত করা।

আমার বাবা ও নানা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. কায়কোবাদ মিয়াকে অস্রাব্য গালাগাল করেন। শিক্ষার্থীদের সাথেও গালাগালমূলক আচরণ করেন। এই দেশের জনগণের ঘামের শ্রমের টাকায় কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চেয়েছে কেউ?

উপাচার্য নাসিরউদ্দিনের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। উপাচার্যের দুর্নীতি যেমন, নারী কেলেঙ্কারীসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু ম্যুরালের নামে আড়াই কোটি টাকা লোপাট, বিশ্ববিদ্যালয়ে গাছ লাগানোর জন্য ২ কোটি টাকার গোবর ক্রয়, ৬ জনের মিটিংয়ের চা নাস্তা খরচ ৪০ হাজার টাকা, নিয়ম না মেনে ছাত্র কল্যাণ তাহবিলের টাকা ব্যয়, অসংখ্য অবৈধ শিক্ষার্থী ভর্তি, অর্থ ও শারিরীক সম্পর্কের ভিত্তিতে শিক্ষক-কর্মচারী-কর্মকর্তা নিয়োগ৷ বিউটি পার্লার খুলে সেখানে এক নারীর সাথে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তাকে স্বীকৃতি না দেয়া।

হ্যাঁ, আমরা এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি যার উপাচার্যের বিরুদ্ধে এমনই অনৈতিক সব খবর ছড়ানো আছে। আমাদের সামনে আমাদের শিক্ষক উপাচার্য এমনই দৃষ্টান্ত স্থাপন করছে। এমন উপাচার্যের তত্ববধানে যদি একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় তাহলে নবীন শিক্ষার্থীদের সামনে কেমন দৃষ্টান্ত স্থাপন হবে আপনারাই বলুন। একবার ভাবুন আমরা কি শিক্ষা নিবো যদি এরাই আমাদের শিক্ষাগুরুর আসনে থাকেন? 

আপনি কি চান আপনার সন্তানটি  আপনার ভাইটি এমন এক শিক্ষকের ছায়ায় থাকুক, যে মানুষকে সন্মান করতে শেখায় না, মুক্ত মনে ভাবে ভাবতে শেখায় না, গালাগালি করে, অনৈতিক সম্পর্ক করে, দুর্নীতি করে, প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় অবৈধ ও অনৈতিক সব পন্থা অবলম্বন করে? আপনি কি চান আমরা এভাবেই বেড়ে উঠি? যদি তেমনটা না চান তাহলে অবশ্যই এই উপাচার্যকে পদচ্যুত করুন।

আমার যে সকল ভাই ও বোনেরা এই আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অসীম সাহসিকতাকে সেলুট জানাই। এই মুক্তির লড়াই চলবে। আপনারা অবশ্যই বিজয়ী হবেন। আপনাদের পক্ষে সারা দেশের মানুষ। আপনাদের দিকে তাকিয়ে আছে বশেমুরবিপ্রবির ভবিষ্যত। আজ আপনাদের দৃঢ় লড়াইয়েই হয়তো রচিত হবে নতুন সংস্কৃতি নতুন দিন।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং দেশবাসীর কাছে  আবেদন জানাই এই দুর্নীতিবাজ, নীতিহীন ভিসিকে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অপসারণ করুন। বঙ্গবন্ধ শেখ মুজিবর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়কে এই দানবের হাত থেকে বাঁচান। আমরা চাইনা আমাদের মতোই তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে আমাদের ছোট ভাইয়েরা বোনেরা পড়াশুনা করতে বাধ্য হোক। দেশের মানুষের কষ্টের টাকায় গড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়কে মুক্ত করুন।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, বশেমুরবিপ্রবি।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বশেমুরবিপ্রবি আন্দোলন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0258 seconds.