• বিদেশ ডেস্ক
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৩:৫৪:২৬
  • ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৩:৫৪:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

সামান্য কয়েকজনের চিন্তা যেভাবে দেশের ভাগ্য নির্ধারণ করে

ছবি : বিবিসি থেকে নেয়া

আপনি কি বুঝতে পারছেন যে রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে বিতর্ক বৃদ্ধি পেয়েছে? সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে একটি চরম সংকট দেখা যাচ্ছে। আমার যা মনে হয়, সামান্য সমঝোতার মধ্য দিয়ে একগুঁয়েমি করে আবারো তারা একই বিষয়ে নতুন করে বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এটা হতাশাজনক, এককথায় বিরক্তিকর এবং সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলে সামান্য হতবুদ্ধিকর।

কিন্তু সম্পূর্ণরূপে যদি প্রত্যাশিত মেরুকরণ না হয়? সর্বশেষ কিছু গবেষণা দেখায় যে, একটি মাত্র কারণ বর্তমানে রাজনৈতিক মেরুকরণ লোপ পেয়েছে, কতিপয় অপ্রত্যাশিত প্রভাবশালী মানুষের জন্য।

সমাজ বিজ্ঞানীরা ইতিহাসের আলোকে ব্যাখ্যা করেন, অযৌক্তিক চিন্তার ফলাফল হলো রাজনৈতিক মেরুকরণ। নিশ্চিতভাবে কোন যুক্তিযুক্ত কিন্তু ভুলতথ্য যখন মানুষ গ্রহণ করে তখন তারা ভুলই করে। আর বিতর্ক চলতেই থাকে। কোন একজন একগুঁয়েমি করে তার ভুল বিশ্বাসে অনড় থাকে। 

কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত এক  গবেষণা, সেই সাধারণ তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। কার্যত, বিজ্ঞব্যক্তি সঠিকভাবে জনগণের মাঝে মেরুকরণ ঘটাতে পারেন যখন মানুষের বুদ্ধির সীমাবদ্ধতাকে বিবেচনা করবেন।

যৌক্তিক এবং অযৌক্তিক বিশ্বাস থেকে একটি সমস্যা পর্যবেষণ করাকে কোন  মানুষ সম্পূর্ণ যুক্তিসঙ্গত বলতে পারে না। একই সাথে এটা আগাম বলা কঠিন, যখন কারো প্রতিক্রিয়া হতে পারে যৌক্তিক বা অযৌক্তিক অথবা গবেষণার সময় আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে। তাই যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, বেলজিয়াম এবং দক্ষিণ কোরিয়ার এক দল গবেষক কম্পিউটার মডেল এজেন্টের মাধ্যমে গবেষণা চালিয়ে এমনটি দেখতে পান।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফর্নিয়ার ক্ল্যারমন্ট স্নাতক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিন জুং বলেন, ‘এই এজেন্টগুলোর কাজ মতামত দেয়া, কিন্তু অন্য এজেন্টের সাথে যোগাযোগের পর তারা মতামত পরিবর্তন করতে পারবে।তাদের সবাই যদি যৌক্তিকভাবে অংশ নেয়, তাহলে আপনি আশা করতে পারেন তারা মতামত আদান-প্রদান করবে এবং কাউকে যদি খুঁজে পায় তাহলে তীব্র বিতর্ক মধ্যে দিয়ে অনেক সময় তারা নিজেদের মত পরিবর্তন করবে।

এজেন্টরা তাদের মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে যৌক্তিক বা অযৌক্তিক আচরণ করতো। কিছু এজেন্ট যথাযথ জবাব দিয়েছিল, যখন অনেকেই স্মৃতিহীনতার পরিচয় দিয়েছিল।

জিন জুং বলেন, ‘যাদের স্মৃতিশক্তি বেশি তারা যে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে যেকোন ধরণের বিতর্ক করতে পারে।আর ভুলে যাওয়াদের দুভাগে ভাগ করা হয়েছিল। এদের মধ্যে কেউ সাধারণ ভাবেই ভুলে গেছেন এবং অন্যরা দূর্বল বা পুরনো বিতর্কের কারণে ভুলে গেছেন।’

জিন জুং বলেন, ‘যেসব প্রতিনিধির স্মৃতিশক্তি বেশি তাদের মেরুকরণ ঘটেনি।’ কিন্তু কোনো মানুষেরই পরিপূর্ণ স্মৃতিশক্তি থাকে না। আরো মজার ঘটনা ঘটে আমরা যখন প্রকৃত ঘটনা বোঝার জন্য মনযোগ দেই। তখন দেখি যে, ঘটনারকাল, স্মৃতি এবং বিতর্কের শক্তিরও পরিবর্তন করতে পারে।

জিন জুং বলেন, ‘আমরা যদি যুক্তি দিয়ে সীমিত আকারে স্মৃতিশক্তির বিকাশ ঘটাই, তাহলে একটি দলের মধ্যে দ্বিমেরুকরণ হবে।’

তিনি বলেন, ‘এমন কি আমরা যদি সম্পূর্ণ যুক্তিসম্পন্নও হই, আমাদের সমাজে সমাবর্তন (মেরুকরণ) হতে পারে কারণ আমরা অন্যদের যুক্তি ভুলে যাই।’

জিন জুং বলেন, ‘কিভাবে মেরুকরণ দলের সাথে কথা বলতে হবে এই গবেষণা সেই পথ দেখাতে সাহায্য করবে।’

যখন আমাদের এমন কারো সাথে দেখা হবে যিনি ভিন্ন বিশ্বাস ধারণ করেন, তখন আমরা আলোচনা অযৌক্তিকভাবে শেষ করার চেষ্টা করবো না। আমারা চাই তাদের চিন্তার পরিবর্তনের জন্য ‘সঠিক’ ধারণা বা পুনরায় শিক্ষিত করতে। এটা তাদের মতামতের উপর কি প্রতিফলন ঘটায় তা আমরা বিবেচনা করতে পারি। দুর্বল স্মৃতি, মানোসিক চাপ, অনিশ্চয়তা, বৈষম্য- এই জিনিসগুলো মানুষকে আদর্শ থেকে দূরে ঠেলে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফর্নিয়ার হাম্বোল্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক মনোবিদ অ্যাম্বার গাফনি বলেন, আমাদের বিশ্বাসের পরীক্ষা করতে গিয়ে অনেক সময় ক্ষমতা বা ইচ্ছাশাক্তির অভাবের কারণে দোষী হতে পারি। তাই, অধিকাংশ যৌক্তিক চিন্তাবিদরা যদি মেরুকরণের জন্য ক্ষতিকর হয়, তখন তাদের কোন পথে ঠেলে দেব? ছোট সংখ্যালঘুরা একটি দৃঢ় দৃষ্টিভঙ্গিদ্বারা আশ্চর্যজনক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু আপনি যেভাবে আশা করছেন সেভাবে নাও হতে পারে।

গাফনি বলেন, ‘অধিকাংশ মানুষ তাদের উগ্রপন্থী হিসেবে মনে করে না। কিন্তু তারা উপলবদ্ধি করার পর বুঝতে পারে তাদের কিছু মিল রয়েছে। যখন টি পার্টি আন্দোলন (২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ট্যাক্স বিরোধী আন্দোলন) বড় আকারে একটা প্রভাব ফেলে, তাদের প্রায় বার্তাগুলো মধ্যপন্থী রক্ষণশীলদের জন্য চরম মাত্রার বার্তা ছিল। কিন্তু মধ্যপন্থী রক্ষণশীলরা টি পার্টি আন্দোলন থেকে অন্য দিকে সরে যায়।’

টি পার্টি আন্দোলনের সব সদস্য এবং মধ্যপন্থী রক্ষণশীলদের যুক্তরাষ্ট্রে রিপাবলিকান দলের সদস্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর ফলে, টি পার্টি আন্দোলন মধ্যপন্থী রক্ষণশীলরা ডেমোক্রেটদের চেয়ে নিজেদের স্বার্থ বেশি দেখেছিল, যদিও মধ্যপন্থী রক্ষণশীলরা ছাড় দিয়ে ডেমোক্রেটদের সাথে ঐক্য করতে পারতো। এমন পরিস্থিতিতে, ডেমোক্রেটরা বাহিরে - তারা বহিরাগত হিসেবে গণ্য হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রভাবশালী চিন্তার মানুষ অল্প কয়েকজন হলেও তাদের সাথে অতিমাত্রায় কাজ করলে বিস্ময়করভাবে আপনার মত পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে।

গাফনির গবেষণাটি পরিচালিত হয় উইলিয়াম ক্রানোর কাজের উপর ভিত্তি করে। যিনি একটি পরিষ্কার বার্তা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,  আপনি যদি এটার সাথে একমত না হন, তাহলে অন্য বিষয় নিয়ে আলোচনা করা। 

তার অন্য এক গবেষণায়, ক্রানো ছাত্রদের ক্ষুদ্র একটি অংশকে পর্যবেক্ষণ করেন যারা সেনাবাহিনীতে সমকামি লোকদের নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিমত পোষণ করেন। আবার অধিকাংশ ছাত্রই ওই নীতির সাথে এক মত নয়, কিন্তু তারা আরো অধিক রক্ষণশীল তাদের বন্দুক নিয়ন্ত্রয়ণ নীতিমালা সংস্কার নিয়ে।

গাফানি বলেন, ‘যখন একজন কোন এক দিকে অবস্থান করে তখন আমরা প্রায়ই তার সাথে একা যেতে চাই না। আমরা ক্ষুদ্রাংশের মতামতের সাথে একমত পোষণ করি না, কারণ এটা আমাদের চিন্তায় ছেদ ঘটাবে।’

কিন্তু, ক্রানোর পরামর্শ চুড়ান্ত মতামত আপনার পুরো বিশ্বাসের উপর চাপ সৃষ্টি করে। অতিদ্রুত আপনার মনোভাব পরিবর্তন নাও হতে পারে, তবে এটা আপনার অন্য বিশ্বাসগুলোকে দুর্বল করে দেবে। এর অর্থ, তাদের পরিবর্তন পরে হবে।  

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের একজন সাবেক সংসদ সদস্য স্টক সান টুইট করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে বিক্রিত প্রতিটি ছুরির হাতলে অবশ্যই জিপিএস শনাক্তকরণ লাগাতে হবে। এটাই সময়, আমাদের একটা জতীয় তথ্য ভাণ্ডার করার যেমনটা আমরা বন্দুকের জন্য করি। আপনি যদি এটা বহন করেন তাহলে রক্তাক্তের ভালো ব্যাখ্যা থাকতে পারে। মাছ ধরা বা এই সব বিষয় থেকে অবশ্যই ছাড়া পাবে।’ অনেক মানুষ তার এ মন্তব্যটির ত্রুটি বের করে।

যদিও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিটি ছুরিতে জিপিএস শনাক্তকরণ লাগানো সম্ভবত অসফল একটি ধারণা, গাফনি এবং ক্রানো যা বোঝাতে চেয়েছেন তার জন্য এটি একটি ভালো উদাহারণ হতে পারে। অধিকাংশরাই বলে জিপিএস শনাক্তকরণ ছুরি অপরাধ বন্ধ করতে পারবে না, কিন্তু টুইটটি ‘ট্রোজান ঘোড়ার’ মত এই বিষয়ে মানুষের মনোভাব ফেরাতে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি, যেমন রাস্তার অপরাধ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায়?

অধ্যবসায় এবং দৃঢ়তাই সংখ্যালঘু মতের পক্ষে সমর্থন আদায় করার একমাত্র চাবিকাঠি। 

জুং বলেন, ‘যে সব সংখ্যালঘুরা সঙ্গতপূর্ণ ব্যবহারে দক্ষ অথবা নিজেস্ব স্বার্থে ঝুঁকি নেয় তারা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। যখন আপনি তিব্বতের সন্ন্যাসীদের সম্পর্কে ভাবেন তারা নিজেরাই আগুনে আত্মাহুতি দেন, তারা যা করেছিল তার নির্মমতা অনেক মধ্যপন্থী মানুষদের নাড়া দিয়েছিল। আমার যদি কোন দৃঢ় মত না থাকে এবং তখন যদি দেখি যে কেউ একজন এমন করেছে, হঠাৎ করেই আমি চিন্তা করবো যে আমি মনে হয় ভুল এবং আমার মনোভাব পরিবর্তন করতে চাইবো।’

দলের আকারো গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষুদ্র শাত্তিও খুব দরকারী হতে পারে। যখন দল ছোট থাকে তখন তারা রড় দলের সাথে স্বাধীনভাবে পার্থক্য করতে পারে। ছোট দলগুলোর একটি পরিষ্কার বার্তা থাকতে পারে, যেখানে বড় দলগুলোর বিভিন্ন বার্তা প্রদানের জন্য বিভিন্ন রকমের মাধ্যম ব্যবহার করে, এই পার্থক্যই ছোট দলগুলোকে আরো প্রভাবশালী করে। বিশেষত তারা যদি তাদের মতামতেই দৃঢ় থাকে। অনুরূপভাবে, জনগণের মধ্যে আরো যদি অনিশ্চয়তা থাকে, তখন সংখ্যালঘু দল আরো প্রভাবশালী হতে পারে।

গাফনি বলেন, ‘যখন মানুষ অনিশ্চিয়তা অনুভব করবে তখন তারা দৃঢ় মূল্যবোধের মাধ্যমে তাদের নির্ধারণ করবে। যখন মানুষ নিজেদের অনেক বেশি অনিশ্চিত মনে করবে, তখন তাদের প্রেরণার জন্য ভিন্ন ধরণের নেতৃত্ব আকর্ষনীয় হবে, যেমন গণতান্ত্রিক সমাজে স্বৈরাচারী নেতা।’

গাফনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী নেতারা প্রায় এই অনিশ্চয়তার উপর নির্ভর করে।’ using rhetoric like ‘We’re losing who we are.’

জুং বলেন, ‘এটা দুঃখজনক কারণ পৃথিবীতে মানুষ যখন তার স্থান সম্পর্কে অনিশ্চিত থাকে, তারা একটি দল খুঁজে যেটা বেশি আমূল সংস্কারে বিশ্বাসী, যেটার একটি কর্তৃত্ববাদী নেতা, একটি পরিষ্কার আদর্শ ও সীমারেখা আছে।’ যখন মানুষ জানে না তারা কে, তখন তাদের ভাল দিক এবং মন্দ দিক কম গুরুত্ব পায়, তাই তারা তাদের কাজের ভালো বা মন্দ নিয়ে ভাবার প্রযোজন মনে করে না।’

জুং আরো যোগ করেন, ‘এটা বিশেষত প্রান্তিক দল গুলোর ক্ষেত্রে ঘটে। নিপীড়িত জনগণ দেখেন সংখ্যাগরিষ্ঠরা খারাপ, তাই তারা ভাবে সংখ্যালঘুরা অবশ্যই ভালো হবে।’

গাফনি বলেন, ‘কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে একই নীতি ব্যবহার করে ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তন সম্ভব। আসলেই। কয়েকটি বড় ধরণের ইতিবাচক সামাজিক পরিবর্তনের ফলে সংখ্যালঘু দলের দৃঢ় সংহতি এবং একটি আত্ম পরিচয় ঘটে।’

গাফনি বলেন, ‘যখন আমরা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন দেখি, এটা সংখ্যালঘু থেকেই আসে। নাগরিক অধিকার আন্দোলনের কথা চিন্তা করুণ, নারীদের ভোট।’ এগুলো সবাই অবিশ্বাস্যভাবেই ইতিবাচক, কিন্তু এগুলোর শুরু হয়েছিল সংখ্যালঘু দলের মাধ্যমে। তারা বহিরাগত হিসেবেই এসব প্রথাগত আচরণের বিরুদ্ধে কাজ করেছিল।’

আমরা সবাই ছোট ছোট উপ-দলের অংশ হিসেবে সমাজের জটিল নেটওয়ার্কের মধ্যে বাস করি। বৃহৎ আকারে অতি সংখ্যালঘুদের ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দুই ধরণের প্রভাব থাকতে পারে। এবং এমনকি আপনি যখন একজনের ধারণাকে আজেবাজে বলে খারিজ করে দেবেন, মনে রাখবেন, হয় তো এর মধ্যেই তারা আপনার চিন্তা করার পদ্ধতিকে পরিবর্তন করে দিয়েছে।

(সম্প্রতি বিবিসিতে প্রকাশিত উলিয়াম পার্কের লেখা থেকে অনুদিত)

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0222 seconds.