• ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২১:৪৯:০১
  • ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২১:৪৯:০১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

শত কোটি টাকার আমানত নিয়ে ভারতে পালিয়েছে পাঁচ স্বর্ণ ব্যবসায়ী!

ছবি : সংগৃহীত

কুমিল্লা প্রতিনিধি :

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে গ্রাহকের প্রায় শত কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পাঁচ স্বর্ণ ব্যবসায়ী ভারতে পালিয়েছে গেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তাদের প্রত্যেকে ভারতে নিজস্ব বাড়িতে অবস্থান করে সেখানকার স্থানীয় বাজারে নতুন করে স্বর্ণ ব্যবসা শুরু করছে বলেও জানা গেছে।

এদিকে পালিয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের দায় দায়িত্ব নিতে নারাজ স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি। হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা ও স্বর্ণ পাচার করে বাড়ি-গাড়ি করেছেন একাধিক প্রতারক ব্যবসায়ী। স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের এমন প্রতারণা থেকে বাঁচতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ঘেঁষা ভারত সীমান্তবর্তী এলাকায় অবস্থিত চৌদ্দগ্রাম বাজার। এ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে স্থায়ী ও অস্থায়ী ৩৮জন ব্যবসায়ী নামমাত্র ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছেন। এদের প্রত্যেকে সাধারণ গ্রাহকদের প্রলোভন দেখিয়ে স্ট্যাম্প ও ব্যাংক চেকের মাধ্যমে আমানত সংগ্রহ করে। এছাড়াও চড়া সুদের মাধ্যমে গ্রাহকের থেকে স্বর্ণ বন্ধক রাখে। এ হিসেবে বাজারের স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা আমানত সংগ্রহ করে রাখে। পরে প্রতিমাসে গ্রাহকের আমানতের কিছুটা লভ্যাংশ প্রদান করে। অনেক গ্রাহক তাদের আমানতের টাকা ফেরত চাইলে ব্যবসায়ীরা নানা ধরনের টালবাহানা করতে থাকে। বেশির ভাগ গ্রাহক প্রবাসীদের স্ত্রী হওয়ায় তারা সঠিকভাবে প্রতিবাদ করতেও পারে না।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এ সকল আমানতের টাকা কৌশলে হুন্ডির মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী ভারতের বেলঘড়িয়া, শিলিগুড়ি, আগরতলায় পাচার করে। তারা সেখানে বাড়ি-গাড়ি করে আলিশান জীবন যাপনের ব্যবস্থা করে রেখেছে। অনেকে আবার কৌশলে চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা ও ফেনী সীমান্ত দিয়ে ভারতে স্বর্ণ পাচার করে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সাধারন গ্রাহকের প্রায় ৯৪ কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে ছয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী আত্মগোপন করে। তাদের মধ্যে চারজনই ভারতে পাড়ি জমিয়ে সেখানে নতুন করে স্বর্ণ ব্যবসা পরিচালনা করছে বলে জানা গেছে।

পালিয়ে যাওয়া স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা হচ্ছে; চৌদ্দগ্রাম বাজারের পিংকি জুয়েলার্সের মালিক গোবিন্দ বণিক, জলিল জুয়েলার্সের জাকির, শ্রী দুর্গা জুয়েলার্সের মালিক রঞ্জিত বণিক, অর্পা জুয়েলার্সের মালিক অলক ও জয় জুয়েলার্সের মালিক সুমন দত্ত। গোবিন্দ বণিক প্রায় ৫০ কোটি টাকা, জাকির ১৫ কোটি, রঞ্জিত বণিক ২০ কোটি, অলক ৫ কোটি, সুমন দত্ত ৪ কোটিসহ মোট ৯৪ কোটি টাকার আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়। তবে পালিয়ে যাওয়া জাকির ঢাকায় অবস্থান করছে। যে কোনো মুহূর্তে ইউরোপে পাড়ি দেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।

জানা যায়, গ্রাহক থেকে কোটি কোটি টাকা আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে মজুদ রেখেছেন আরো ছয় ব্যবসায়ী। যে কোনো সময় ভারতে পাড়ি জমাতে পারেন তারা। ব্যবসায়ীরা হলেন; অর্পন জুয়েলার্সের মালিক মানিক দে, দত্ত জুয়েলার্সের মাণিক কৃষ্ণা, ফ্যাশন জুয়েলার্সের মালিক টুটুল বণিক, সুমন জুয়েলার্সের মালিক সুশান্ত, সজিব জুয়েলার্সের মালিক সজিব ও ভাই ভাই জুয়েলার্সের মালিক তরুন। এদের কেউ চৌদ্দগ্রামের বাসিন্দা নয়। তাদের বাড়ি ভারত সীমান্তবর্তী ফেনীর ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাই উপজেলায়।

অপরদিকে চৌদ্দগ্রাম বাজারে স্বর্ণ ব্যবসার মাধ্যমে গ্রাহকের থেকে আমানত সংগ্রহ করে কৌশলে হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে টাকা পাচার করে সুশেন জুয়েলার্সের মালিক ভারতের বেলগুড়িয়ায় দুইটি বাড়ি, শিলিগুড়িতে দুই ও আগরতলায় একটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়েছে। এছাড়াও বিশ্বজিৎ বণিক আগরতলা থেকে দুইটি বাড়ি, তার ভাই চন্দ্র বণিক একটি বাড়ি তৈরি করে রেখেছে। এদের সকলের গডফাদার হিসেবে তদারকি করে আসছে মিন্টু জুয়েলার্সের পিন্টু দাস। তিনি ভারতের আগরতলায় একটি আলিশান বাড়ি ও বাংলাদেশের ঢাকা-চট্টগ্রামে একাধিক ফ্ল্যাট এবং গাড়ি আছে বলে জানা গেছে।

পিংকি জুয়েলার্সের প্রতারণার শিকার জসিম উদ্দিন, প্রবাসী শফিকুর রহমান, শ্রী দূর্গা জুয়েলার্সের প্রতারণার শিকার ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিনসহ অনেক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের বিশ্বাস করে লাখ লাখ আমানত রাখি। কিন্তু হঠাৎ করে তারা দোকানে তালা মেরে উধাও হয়েছে। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে জানতে পারি-জমাকৃত আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে তারা ভারতে চলে গেছে। আর কোনো স্বর্ণ ব্যবসায়ী যাতে গ্রাহকের সাথে প্রতারণা করতে না পারে সেজন্য স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের থেকে আমানত তুলে নেয়াসহ প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর জোরদাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী গ্রাহকরা।

এ ব্যাপারে চৌদ্দগ্রাম বাজার স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি নরেশ বণিক দায়-দায়িত্ব নিতে অপারগতা প্রকাশ করে বলেন, ‘এতে স্বর্ণ ব্যবসায়ী সমিতি জড়িত নয়। গ্রাহকেরা নিজের ইচ্ছাতে সমিতিকে না জানিয়ে উধাও হয়ে যাওয়া ব্যবসায়ীদের নিকট আমানত ও স্বর্ণ বন্ধক রেখেছে। এতে আমাদের কিছু করার নেই।’

চৌদ্দগ্রাম বাজার পরিচালনা কমিটির কমিটির সাধারন সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা উধাও হয়ে যাওয়ায় জনগণের মাঝে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ যদি আইনের আশ্রয় নিতে যায়, আমরা তাদেরকে সহযোগিতা করবো’।

চৌদ্দগ্রাম পৌরসভার মেয়র মিজানুর রহমান বলেন, ‘স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা যেভাবে গ্রাহকের আমানত ও স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে, এতে জনমনে ব্যাপক সংশয় সৃষ্টি হচ্ছে।

তিনি সাধারন গ্রাহকদেরকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা ছাড়া যাতে গ্রাহকেরা জুয়েলারী ব্যবসায়ীদের নিকট কোন আমানত জমা না রাখে।’

চৌদ্দগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল্লাহ আল মাহফুজ বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের কেউ থানায় লিখিত অভিযোগ দিলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

 

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0190 seconds.