• ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৮:৩৫:৫৫
  • ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৮:৩৫:৫৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

ঘোষিত লস এঞ্জেলসে ক্যাসিনো নিয়ে বিস্ময়ের কি আছে

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


এক.
আশ্চর্য! সবাই ক্যাসিনো নিয়ে মেতে আছেন। এটা কি নতুন কিছু! দেশ যে লস এঞ্জেলস, সিঙ্গাপুর, কানাডা হয়ে গেছে সাম্প্রতিকের এই কথাগুলো হঠাতই কি বিস্মৃত হয়েছেন কেউ কেউ! তা না হলে এসব নিয়ে এত আলাপ কেন। অবস্থা এমনটা যেন মাটি ফুঁড়ে এসব ক্যাসিনো এক রাত্তিরেই গজিয়ে উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে, ‘এতদিন কি করেছেন’, প্রশ্নটা উপেক্ষিত হবার সুযোগ নেই।

ঢাকা কোনো বিশাল শহর নয়। ঢাকার ‘পশ’ এলাকাও হাতেগোনা, যেখানে এসব ক্যাসিনো চলতে পারে। দৃষ্টির অগোচরে এমন কাজ প্রায় দুঃসাধ্য। এমন কি গণমাধ্যমের দৃষ্টির আড়ালেও। প্রশ্নটা করছি গণমাধ্যমকে নিয়েই। এতদিন কি করলো গণমাধ্যম? যখন সবুজ বাতিটা জ্বলে উঠলো, তখনই সুড়সুড় করে প্রকাশের মাঠে নামলেন তারা।

এখন দেখি ক্যাসিনোর অ্যানাটমি হচ্ছে। সাপের মাথা ছুঁয়ে জুয়া খেলা শুরু হতো। মডেলরা আসতেন। অমুক বড় বড় অস্ত্র আর দেহরক্ষী নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন। এছাড়া কে কোন ক্যাসিনোর সভাপতি। কোন সংসদের ক্লাব চালায় ক্যাসিনো। ইত্যাদিসব খবরে গণমাধ্যম ঠাসা। চেনা একটি শহরে, ততোধিক চেনা ‘পশ’ এলাকা, সেখানে ষাটটি ক্যাসিনো চলে। সাথে কথা উঠেছে পাঁচশতাধিকের উপরে রয়েছে এমন ক্যাসিনো বা অবৈধ আড্ডার স্থান। এটা কি দৃষ্টি এড়িয়ে সম্ভব! অন্যদের নয় নানা ফ্যাঁকড়া রয়েছে, কিন্তু গনমাধ্যম! গণমাধ্যমের দৃষ্টি এড়িয়ে কী করে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে চোখ ধাঁধানো ক্যাসিনো বাণিজ্য! অন্যদের দায় দেয়, অথচ নিজের দায়িত্বের কথা বেমালুম চেপে যায়, এমন ‘মাধ্যম’ কখনো ‘গণ’র হতে পারে না। আর তা না হওয়ার কারণেই ‘গণ’ ছুটে সামাজিকমাধ্যমের পেছনে। ক্রমেই দৌড়ে হারতে থাকে গণদের ‘মাধ্যম’।

দুই.
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতির দায় কি শুধু ছাত্র সংগঠন ও তার নেতাকর্মীদের। শিক্ষককুলের সবাই কি নিষ্পাপ? শিক্ষার্থীরা ভুল করবেন এটাই স্বাভাবিক। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ শুধু পড়াশোনা করানো নয়, শিক্ষার্থীদের সৎ ও যোগ্য নাগরিকের পাঠ দেয়াটাও সে কাজেরই অংশ। আচার্য শব্দটির সাথে ধর্মের একটি যোগসূত্র রয়েছে। প্রাচীনকালে এই উপমহাদেশে সংস্কৃত শিক্ষালয়ের প্রধানকে বলা হতো আচার্য। আর সেই শিক্ষালয়গুলোর কাজ ছিল ধর্মীয়সহ বিভিন্ন শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতার শিক্ষা প্রদানও।

আচার্য শব্দটার পরের শব্দটি হলো উপাচার্য। আচার্য ‘উপ’ হবার পরও তার দায়িত্ব কিন্তু কিছুটা কমে না। তারও কাজ ছাত্রদের পড়াশোনার পাশাপাশি নৈতিকভাবেও সৎ ও যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা। এখন যদি উপাচার্য নিজে ঊনিশ জন কর্মচারির সেবা নেন। তিন-চারটি গাড়ি ব্যবহার করেন। নিজেতো করেনই স্বামী-পুত্র এমনকি পুত্রবধুও বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি ব্যবহার করেন। এমন উপাচার্য’র কাছে কি শিক্ষা পাবে শিক্ষার্থীরা! অসৎ হবার শিক্ষাতো স্বয়ং তিনি দিচ্ছেন।

শিক্ষা ব্যবস্থায় এমনিতেই ক্রান্তিকাল চলছে আমাদের। ‘আই এম জিপিএ ফাইভ’ ধরণের শিক্ষা আমাদের শিক্ষার্থীদের হাস্যকর করে তুলেছে সবার সামনে। অথচ আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের মতন মেধাবী কম দেশেই আছেন। কদিন আগে মার্কিন রাষ্ট্রদূতও কথাটা স্বীকার করেছেন। অথচ এই মেধাবীদেরই আমাদের ব্যবস্থাগত কারণে পড়তে হচ্ছে লজ্জায়।

সারা বিশ্বের একহাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের রয়েছে, শ্রীলংকার রয়েছে, রয়েছে পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ও। অথচ আমাদের নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে এক সময়ে গর্ব করা হতো। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ নাম ডাকতেন অনেকেই। সময়ের বিবর্তনে, প্রবর্তনের ব্যর্থতায় এই ডাকটাই এখন ‘গালি’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মশহুর হয়ে উঠেছে ‘ছা, ছমুছা, ছপে’র উপাখ্যানে।

আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য’র কাণ্ড সবারই জানা। একজন গণমাধ্যমকর্মীকে বহিষ্কার করেছেন তিনি, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে। ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’র এমন হাস্যকর অভিযোগ নিয়ে আলাপ পারতেও দ্বিধা হয়। নিজেকে ছোট মনে হয়।

সেই গণমাধ্যমকর্মী ‘ফাতেমা-তুজ-জিনিয়া’, নিজের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছেন। তরুণ গণমাধ্যমকর্মীদের নিরাপত্তা আজ সবখানেই বিঘ্নিত। নিরাপত্তা বিঘ্নের নিশ্চিত প্রমান আমি নিজে। আমার তরুণ পুত্র একটি গণমাধ্যমের ইংরেজি বিভাগের সাব এডিটর ছিলেন। ‘ইহসান ইবনে রেজা ফাগুন’, যাকে ফাগুন রেজা নামেই চিনতেই সবাই। তাকে খুন করা হয়েছে। তার লাশ পাওয়া গেছে জামালপুরের এক রেলসড়কের পার্শ্বে। আজ চার মাস হয়ে যাচ্ছে। এখনো তার হত্যার রহস্য অনুদঘাটিত, হত্যাকারীদের কেউ গ্রেপ্তারও হয়নি। ফাগুন রেজা’র জন্যও মানববন্ধন হয়েছে, গণমাধ্যমকর্মী, বিশেষ করে তরুণরা প্রতিবাদ জানিয়েছেন। প্রতিবাদ জানিয়েছেন, দেশবরেণ্য অনেকেই। তবু কিছু হয়নি, হচ্ছে না।  

আর সে কারণেই জিনিয়া’র নিজ নিরাপত্তায় করা জিডি’র গুরুত্বটা আমি বুঝি। নিজে গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে জানি আজকের গণমাধ্যমগুলোতে কাজ করা কতটা প্রতিকূলতার, কতটা বিপদের। বিশেষ করে যেখানে গণমাধ্যমের মালিকরা তাদের কর্মীদের বিপদে থাকেন অনেকটাই নির্লিপ্ত। নেতাদের অনেকেই থাকেন ধরি মাছ না ছুঁই পানি অবস্থায়।

তিন.
অনেকে প্রশ্ন করবেন, আপনি শুধু গণমাধ্যমের বিষয়ে বলছেন কেন? উত্তরটা কঠিন নয়, সরকার আর রাজনীতির বাইরে এই একটিই জায়গা, মানুষ যে জায়গাটির দিকে তাকিয়ে থাকে, আশায় থাকে। যাকে রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। যে জায়গাটিতে সত্যের ক্ষেত্রে কোনো পক্ষপাতিত্ব থাকে না, সত্য প্রকাশেও থাকে জড়তাহীন। সুতরাং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রগুলো, রাজনৈতিক ব্যবস্থাগুলো যখন ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠে তখন, সাধারণ মানুষের বড় ভরসার জায়গা হয়ে দাঁড়ায় গণমাধ্যম। তাদের মনের কথা প্রকাশের বিকল্প মাধ্যম, ‘পাবলিক ভয়েস’ উঠে গণমাধ্যমই। যখন সেই গণমাধ্যম পথ হারায়, তখন তো কথা বলতেই হয়। সব হারানো মানুষের, আশা ভরসাটির জায়গা নিয়ে না বলার তো কোনো কারণ নেই। আছে কি?

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0284 seconds.