• ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৬:৪৭:০৩
  • ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৬:৪৭:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

পুনরাবিষ্কারে ‘হোক কলরব’

ছবি : সংগৃহীত

(২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শহর কলকাতা উত্তাল হয়ে উঠেছিলো যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা ‘হোক কলরব’ আন্দোলনকে ঘিরে। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানীর প্রতিবাদে গড়ে উঠেছিলো এ আন্দোলন। দোষীদের বিচার দাবিতে উপাচার্যের ভবন ঘেরাও করলে ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে বিশ্ববিদ্যালয় ব্লাক আউট করে (বিদ্যুৎ বন্ধ করে) হামলা চালায় পুলিশ ও শাসক দলের কর্মীরা।

এই হামলার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে কলকাতা। ২০ সেপ্টেম্বর কলকাতার পথে নামে মিছিলের জনস্রোত। যৌন হেনেস্থাকারীদের সাথে উপাচার্যেরও পদত্যাগের দাবি ওঠে। আন্দোলনে সমর্থন জানায় ভারত ও বাংলাদেশসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। হ্যাশট্যাগ হোক কলরবে অনলাইনেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সেই হোক কলরবের উত্তাল ঢেউ আজো দোলায় যাদবপুরকে। ১৭ সেপ্টেম্বর থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩ দিনব্যাপী আয়োজন চলছে ‘হোক কলরব’ স্মরণে।)

পাঁচ-বছর আগের সেই আন্দোলনের স্মরণে লিখেছেন, হোক কলরব আন্দোলনের সংগঠক যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী - সম্ভব চাকী

পাঁচ-পাঁচটা বছর পেরিয়ে গেল। অনেকের কাছে পাঁচটা বছর পাঁচটা মিনিট মাত্র...। এই তো খানিক আগেই বৃষ্টিভেজা লাল চোখে বাড়ি ফিরলাম... এখনো ঘোর কাটে না যেন! আর যারা নতুন, তাদের কাছে 'কলরব' যেন নতুন এক 'চাঁদের পাহাড়'। সিনিয়রদের থেকে শোনার জন্য অধীর এক প্রতীক্ষা। তারপর, তারপর, তারপর...যে গল্পের শেষ নেই...।

রোমন্থনে কলরব। কালের সেতুবন্ধনে কলরব। প্রবাহের পুনর্মিলনে কলরব। নতুন প্রাণের সঞ্জীবনী কলরব। অযান্ত্রিক কলরব। ২০শে সেপ্টেম্বর ২০১৪-এর জল-থইথই বিকেলের মহামিছিল যেন 'এই নশ্বর জীবনের মানে শুধু তোমাকেই চাই'...

কলরব মানে শুধু ২০শে সেপ্টেম্বরের মিছিল নয়। কলরব মানে শুধু যাদবপুর নয়। কলরব মানে যাদবপুরের গন্ডি ছাড়িয়ে যাদবপুর... প্রেসিডেন্সি, জেভিয়ার্স, আশুতোষ, মেডিকেল, টেকনো, হেরিটেজ ইত্যাদি অসংখ্য কলেজের মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া...। কলরব মানে শুধু যাদবপুরের ভিসি তাড়ানো নয়, যাদবপুরের সীমানা ছাড়িয়ে ব্যাপক ছাত্রছাত্রী সমাজের অব্যক্ত ক্ষোভ-অপমান-বিদ্রোহের আওয়াজে আকাশ-বাতাস-মাটির কেঁপে ওঠা...

কলরব'-এর শেষ ১২ই জানুয়ারি ২০১৫ শাসকের মাথা নোয়ানোয় নয়। কলরব একটা মশালের মত। যাদবপুর হয়ে তা ই.এস.আই. জোকা, বিশ্বভারতী, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, সি.ইউ, প্রেসিডেন্সী... একহাত থেকে অন্যহাতে স্থানান্তরিত হয়ে চলেছে মাত্র। কোথাও 'হোক প্রতিবাদ' তো কোথাও 'বাঁধ ভেঙে দাও', কোথাও বা 'হোক আলোড়ন'.... সুদূর মালদা'র GKCIET'র প্রতারিত লড়াকু ছাত্রছাত্রীরা কলরবকে নিয়ে গেছে অন্য মাত্রায়...

কলরব শুধু হার-না-মানা জেদী প্রতিবাদ নয়, সকলে মিলে নতুন করে বাঁচতে চাওয়ার আর এক নাম। কলরব তাই নিজের গতিতেই ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছিল নেপালের ভূমিকম্প-পীড়িত দুর্গত মানুষদের জন্য অভিযানে, উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গ-কেরালার বন্যা-কবলিত মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর সময়ে, কিংবা পোস্তা-মাঝেরহাট উড়ালপুল-বিপর্যয়ের সময় রক্তদান শিবিরের আয়োজনের মধ্যে দিয়ে। কিংবা, বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন বুনে দেওয়া কলরব মাথা তোলে গার্হস্থ্য হিংসার বলি মিতা-নাজিয়া-পায়েল'এর বিচার চাওয়ার লড়াইয়ে।

কলরব মানে জাত-বর্ণ-জাতি-ধর্মের ভেদভাবের উর্ধ্বে উঠে এক স্বপ্নের আজাদী চাওয়া। তাই তো 'হোক ইউনিয়ন' আজ রাজপথে তুলেছে যৌবনের হিল্লোল।

কিন্তু এই শক্তি এলো কোথা থেকে? নির্ভয়া-সুজেট-কামদুনি-সুটিয়া-পরবর্তী ছাত্রছাত্রী সমাজের বৈচিত্র‍্যপূর্ণ স্বর-সমারোহ এক কালবৈশাখীর আগমনীকেই ধ্বনিত করেছিল। ৩৭৭ ধারা-বিরোধী রামধনু আন্দোলনেও ছিল বসন্তের পূর্বাভাষ। কলরবকে জেদ দিয়েছে জয়িতাপুর-পসকো-কুদানকুলাম-নিয়মগিরি। স্বতঃস্ফূর্ত ভাষা দিয়েছে অকুপাই ওয়াল স্ট্রীট, আরব বসন্তের তাহিরির স্কোয়ার, স্পেনের ইনডিগনেডো, শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর। কে জানে কলরবের ভ্রূণে হয়তো পুষ্টি যুগিয়েছে ৫০ বছর আগের উত্তাল দিগন্তভেদী মে'৬৮-র ফ্রান্স। কলরব বোধহয় এভাবেই প্রজন্মান্তরে বয়ে চলে কাঁটাতারের বেড়া পেরিয়ে। এই নিরন্তর বহমানতার ব্যাটনই হয়তো তুলে নিয়েছিল ২০১৮'র বাংলাদেশের দামাল বিদ্রোহী কিশোররা।

কলরবের স্মৃতিচারণ তাই কোনো মৃত ইতিহাস-কথা নয়। কলরব প্রতিদিনের, প্রতিমুহূর্তের। এই কলরব তাই বারে বারে ফিরে আসবে। প্রতিদিন তাই ২০ সেপ্টেম্বর।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0227 seconds.