• বিদেশ ডেস্ক
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২৩:০৮:২৬
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ২৩:০৮:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

বিশ্বের বৃহত্তম কবরস্থানে জ্বীনে নাজেহাল গোরখোদকরা!

ছবি : আল জাজিরা

ফারহানা করিম :

ইরাকের ওয়াদি-উস-সালাম কবরস্থানে না কি জ্বীন কিংবা অশরীরী কিছু ঘুরে বেড়ায়। ১হাজার ৪০০ বছরের পুরনো এই কবরস্থানে এদের দৌরাত্ম্য এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে এখানে কবর খোঁড়ার কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা চাকরি ছেড়ে পালাতে শুরু করেছেন বলে দাবি স্থানীয় গোরখোদকদের।

সম্প্রতি আল জাজিরায় প্রকাশিত একটি  ফিচার প্রতিবেদনে গোরখোদকদের ভয়াবহ এসব অভিজ্ঞতার কথাই তুলে ধরা হয়েছে।

ওয়াদি-উস-সালাম অথবা শান্তির উপত্যকা হিসেবে পরিচিত কবরস্থানটি বিশ্বের বৃহত্তম কবরস্থান হিসেবে স্বীকৃত। এটি ইরাকের রাজধানী বাগদাদের ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। শিয়া মতাবলম্বীদের ১২ জন ইমামের প্রথম ইমাম হজরত আলী(রাঃ) মাজারের কাছেই এই কবরস্থান।

হানি আবো ঘনাইম। ছবি : আল জাজিরা

প্রাচীন এই কবরস্থানে ৫০ লাখের মত শিয়া মতাবলম্বী মুসলমানদের কবর দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ইরাকের যুদ্ধে নিহতরাও রয়েছেন। ওই কবরস্থানে কাজ করা গোরখোদকদের কাছে নিজেদের পেশা বিপদজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে দাবি করেন তারা। কারণ বহু পুরনো এই গোরস্থানে জ্বীন ঘুরে বেড়ায় বলে দাবি করেন তারা।

২৬ বছর বয়সি হায়দার আল হাতেমি ওয়াদি-উস-সালামের সাবেক এক গোরখোদক। সম্প্রতি আল জাজিরার কাছে তিনি নিজের ভীতিকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। হাতেমি বলেন, ‘একদিন আমার পিছন থেকে ছায়ার মত কিছু একটা আমার মাথায় জোড়ে আঘাত করে। এরপর থেকে আমি আর সোজা হয়ে হাঁটতে পারি না। মনে হয় আমার শরীরে এখনো জ্বীন ভর করে আছে।’ তিনি অস্বাভাবিক এই প্রাণীকে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ট্যান্টাল অথবা ঘ্রেরিয়া নামে উল্লেখ করেন।

হাতেমির পিতামাতা ছেলের চিকিৎসার জন্য নিজেদের একমাত্র সম্বল বাড়িটিও বিক্রি করে দিয়েছেন। কিন্তু দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরেও কাংখিত কোন ফল না পাওয়ায় তারা হতাশ। তাদের বিশ্বাস ছেলের এই অদ্ভুত অসুখ কোন ওঝার পক্ষেই সারিয়ে দেয়া সম্ভব।

ইরাকের নাজাফ শহরের বস্তির মত একটি এলাকায় অত্যন্ত দারিদ্র্য অবস্থায় দিনযাপন করছে এই পরিবারটি।  ওই ঘটনার পরে হাতেমির স্ত্রী স্বামীর আচার আচরণে ভীত হয় বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদন করেছেন।

প্রসঙ্গত, শিয়া অধ্যুষিত নাজাফের শতকরা ১৩ ভাগ এলাকাজুড়ে ওয়াদি-উস-সালাম কবরস্থানটি অবস্থিত। শিয়াদের কাছে পবিত্র এই স্থানটি রাগবি খেলার ৯০০টি মাঠের সমান।

জাতিসংঘের শিক্ষা এবং বিজ্ঞান বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো বিশ্বের ঐতিহ্যবাহী স্থানের পরীক্ষামূলক তালিকায় এই কবরস্থানের নাম রেখেছে। শান্তির উপত্যকা হিসেবে পরিচিত এই কবরস্থানটি বিশ্বের একমাত্র কবরস্থান যেখানে ১হাজার ৪ শত বছরের বেশি সময় ধরে মরদেহ দাফনের কাজ অব্যাহতভাবে চলছে।

মুর্তজা জাওয়াদ আবো সেবি। ছবি : আল জাজিরা

২৩ বছর বয়সি গোরখোদক মুর্তজা জাওয়াদ আবো সেবি জানান, তার যেসব সহকর্মী জ্বীনের হামলার শিকার হয়েছেন তারা সবাই পালিয়ে গেছেন।  এভাবে চাকরি ছেড়ে দেয়ার হার অনেক বেশি বলে উল্লেখ করেন তিনি। তরুণ এই গোরখোদকের দাবি, ২০১৩ সালে তিনিও এরকম অস্বাভাবিক একটি হামলার শিকার হন।

মুর্তজা বলেন, ‘রাতের বেলা আমি যখন একজন নারীর মরদেহ কবরের মধ্যে রাখতে যাচ্ছি এসময় তিনি খুব জোরে আমার মুখে থাপ্পড় মারেন। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি।’

২৩ বছর বয়সি এই তরুণ এখনো ভেবে পান না শক্ত করে বাঁধা একটি মরদেহ কীভাবে তাকে আঘাত করতে পারে।

চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, মৃত্যুর পরে কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির পেশি শক্ত হয়ে যায়। পরবর্তীকালে পেশি শিথিল হয়ে যাওয়ার সময় কখনো কখনো মৃতদেহ সামান্য নড়াচড়া করতে পারে।

এদিকে আবো সেবির পিতা এই ঘটনাটি নিয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেন, ‘আমার বিশ্বাস ওই নারী ডাইনি ছিল।’

মরা মানুষের হাতে চড় খাওয়ার বিষয়টি আবো সেবির মধ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। এরপর ৫ বৎসর ধরে অবিরত এই একই দৃশ্য তিনি কল্পনায় দেখতে পেতেন।  নিজেকে নিজেই ক্ষতবিক্ষত করতেন।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, ‘ভয়াবহ ভুতুড়ে এই অভিজ্ঞতা আমাকে পাগলের মত করে দিয়েছে।’

এই ঘটনায় আবো সেবি এতোটাই বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন যে বেশ কয়েকবার আত্মহত্যারও চেষ্টা করেন। পরে লেবাননের রাজধানী বৈরুতের আমেরিকান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তাকে সাইক্রিয়াটিক থেরাপি দেয়া হয়।  এতে ৭ হাজার মার্কিন ডলার খরচ হয় তার। বেশ কয়েক বছরের চেষ্টায় অবশেষে তিনি সুস্থ হন এবং বিয়ে করেন।

ইরাকে বেকারত্বের হার অনেক বেশি একারণে এতোসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরেও প্রশিক্ষিত গোরখোদকদের ওয়াদি-উস-সালামে ফিরে যাওয়া ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ারও উপায় নেই।

গোরখোদকদের এই পেশাটি বংশ পরম্পরায় চলে। আবো সেবির বাবা, দাদাও এই কাজ করেছেন। এছাড়া এই চাকরি করে মাসে সর্বোচ্চ তিন হাজার ডলার উপার্জনও করা যায়। ফলে এখানেই তাকে আবার ফিরে আসতে হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্ব পুরুষরাও এই একই কাজ করেছেন। ফলে এই প্রেতাত্মা বা অশরীরীদের ব্যাপারে আমরা আগে থেকেই জানতাম।’

ওয়াদি-উস-সালামের প্রবেশদ্বারের কাছেই অনেককেই তাবিজ বিক্রি করতে দেখা গেছে। জ্বীনের কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য মানুষ এই তাবিজগুলো কিনে নিচ্ছেন।

এদিকে ৬১ বছর বয়সি গোরখোদক হানি আবো ঘনাইম ওয়াদি-উস-সালামে বাস করেন। তার বিশ্বাস এই এলাকায় জ্বীন ঘুরে বেড়ায়।  তিনি ১১ বছরের বেশি সময় ধরে গোরখোদকের কাজ করছেন।

তার বিশ্বাস, শান্তির এই উপত্যকায় দুই ধরনের ধরনের প্রাণী বাস করে। এদের এক প্রজাতি জীবিত, অপরটি ভূত,প্রেতাত্মা বা অশরীরী কিছু।

তিনি বলেন, ‘আমি রাতের বেলা এটিকে দেখেছি, খাবারের আশায় এক কবর থেকে আরেক কবরে লাফিয়ে লাফিয়ে যেতে। এটি দেখতে বড় একটি পোকার মত অথবা ছোট একটি শিশু এবং বড় পশমের কোট পরা বিড়ালের মত দেখতে।’

হানি আবো ঘনাইম রাতের বেলা কবর দিয়ে চলাফেরা করার সময় হাতে একটি গাঁইতি রাখেন।  তিনি জানান, রাতের বেলা এসব জিনিস তার চোখে পড়লে তিনি চিৎকার করতে থাকেন যাতে এগুলো চলে যায়। 
৪৭ বছর বয়সি হুসেইন হামুদি হাবুদিও বিশ্বাস করেন, ওয়াদি-উস-সালামে জ্বীনরা ঘুরে বেড়ায়। 

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের ট্রিনিটি ইউনিভার্সিটির ধর্মবিষয়ে সহকারী অধ্যাপক সাজিদা জালাজাই আল জাজিরাকে জানান, শিয়া এবং সুন্নি মুসলমানরা জিন এবং ফেরেশতার উপর বিশ্বাস করেন।

তিনি বলেন, ‘এক ধরনের জিন আছে যারা জীবিত এবং মৃত মানুষ থেকে খাবার সংগ্রহ করে বলে বিশ্বাস করা হয়। এদেরকে ঘুলস বলে উল্লেখ করা হয়। সুতরাং এধরনের জিন কবরে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়।’

এদিকে ওয়াদি-উস-সালামের কবরখোদকদের ইউনিট ম্যানেজার আমের আল জুবোরি এসব অশরীরীদের গল্পকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, ইমাম আলী ইবনে আবি তালিবের মাজারের আশেপাশের এলাকার দাম অনেক বেশি। ফলে এধরনের গল্প বলে কবরের প্লট অবৈধভাবে অন্যদের কাছে বিক্রির পাঁয়তারা করা হয় বলে তার বিশ্বাস।

হায়দার আল হাতেমি। ছবি : আল জাজিরা

প্রতিবেদনের প্রথমেই যে হায়দার আল হাতেমির কথা বলা হয়েছে তিনি ওঝার কাছে ব্যয়বহুল চিকিৎসা করিয়ে আবার নাজাফে ফিরে এসেছেন। কিন্তু আবো সেবির মত তিনি সুস্থ হতে পারেননি। হতভাগ্য এই ব্যক্তি এখনো বিশ্বাস করেন, জ্বীন তাকে আঘাত করেছে। অশ্রু সজল চোখে তিনি বলেন, ‘আমি সবকিছুই হারিয়েছি।’

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0263 seconds.