• জাবি প্রতিনিধি
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৮:১৫:২৭
  • ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৮:৫৮:৫১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘আলোচনা নিয়ে আমরা আশাবাদী, তবে...’

মোহাম্মদ দিদার ও জয়নাল আবেদিন শিশির। ছবি : বাংলা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একনেকে পাশকৃত ১৪৪৫ কোটি টাকা মেগাপ্রকল্পের যে মাস্টারপ্লান তা অপরিকল্পিত দাবি করে এবং উপাচার্য ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে উঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছে ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনের মুখে গত শনিবার প্রশাসনের সাথে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু আন্দোলনের আগমুহূর্তে ছাত্রলীগ নেতার হাতে মারধরের শিকার হন আন্দোলনকারী একজন সংগঠক। এই ঘটনার প্রেক্ষিতে শনিবারের আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। প্রশাসনিকসূত্র বলছে আগামী বৃহস্পতিবার হতে যাচ্ছে স্থগিত আলোচনা। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান সামগ্রিক অবস্থা ও আন্দোলন নিয়ে বাংলা’র পক্ষ থেকে আন্দোলকারী দুই সংগঠক বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ জাবি শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক জয়নাল আবেদিন শিশির ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের জাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ দিদারের সাথে কথা বলা হয়। সাক্ষাৎকারে তারা আলোচনা নিয়ে আশাবাদ ও শঙ্কা প্রকাশ করেন।

অন্যদিকে আন্দোলনের যৌক্তিকতা তুলে ধরে ‘অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ করে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে ফেলা ঠিক হবে না’ বলে মন্তব্য করেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আমাদের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

জয়নাল আবেদিন শিশির, যুগ্ম আহ্বায়ক , বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ জাবি 

বাংলা : আগামী বৃহস্পতিবারের অনুষ্ঠিতব্য আলোচনা নিয়ে আপনারা কতটা আশাবাদী? 

জয়নাল আবেদিন শিশির : আলোচনা নিয়ে আমরা আশাবাদী থাকতে চাই। তবে ইতিহাস বলে মাননীয় উপাচার্য কথা দিয়ে কথা রাখেন না। আলোচনাকে প্রহসনের পরিণত করেন। এই জায়গা থেকে জনমনে একটা আশঙ্কা আছে এই আলোচনার আহ্বান আমাদের আন্দোলনকে স্থিমিত করে দেওয়ার কোন প্রচেষ্টা কিনা! 

বাংলা : আপনাদের আন্দোলনের দাবিসমূহ কি? 

জয়নাল আবেদিন শিশির : উন্নয়ন পরিকল্পনা যাতে স্বচ্ছভাবে ও পরিকল্পিতভাবে হয় সেইজন্য আমরা আন্দোলন করছি। আমরা দেখছি এখানে অপরিকল্পনা রয়েছে। এখানে অস্বচ্ছতা রয়েছে। তাছাড়া এই পরিকল্পনার কাজ শুরুর দিকেই একটা দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে আমরা এই অভিযোগের তদন্ত চাই।

বাংলা : প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে পত্রপত্রিকায় যেসব অভিযোগ উঠছে তা প্রমাণিত নয়, তারা এসব ‘মিথ্যাচার’ দাবি করছে।

জয়নাল আবেদিন শিশির : আমরা কাউকে দোষী বলছি না। আমরা দেখছি বাংলাদেশের অনেক জাতীয় দৈনিকে এই ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। এত বড় ঘটনা যেহেতু জাতীয় দৈনিকে আসছে তাই আমরা বলছি একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হোক। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তির ব্যাপার। তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসুক কে দোষী।

বাংলা : আপনাদের এক সংগঠককে ছাত্রলীগ নেতার মারধরের প্রেক্ষিতে গত শনিবারের আলোচনা স্থগিত হয়ে যায়। এখন আবার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যক্তিগত আক্রমণ করে কথা বলছে। এসব আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে কিনা?

জয়নাল আবেদিন শিশির : আমরা দেখতেই পাই ছাত্রলীগ আন্দোলন নিয়ে কুৎসা রটনা করতে তৎপর। তারা এখানে অন্য ধরনের আলাপ টেনে আনছে। এসব আলাপ আলোচনাকে প্রভাবিত করতে পারে। 

বাংলা : কিন্তু ছাত্রলীগ তো আপনাদের প্রতিপক্ষ না!
জয়নাল আবেদিন শিশির : যে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে সেখানে ছাত্রলীগ জড়িত তাই তারা আন্দোলনকে প্রতিপক্ষ মনে করছে । কিন্তু আমরা কোন সংগঠনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছি না। 

বাংলা : এই আন্দোলনে উপাচার্যবিরোধী রাজনীতি হচ্ছে বলে একটা অভিযোগ রয়েছে।

জয়নাল আবেদিন শিশির : মাননীয় উপাচার্য যখন দ্বিতীয় মেয়াদে উপাচার্য মনোনিত হলেন তখন তাকে ‘অগণতান্ত্রিক’ উপাচার্য বলে আন্দোলনকারী শিক্ষকরাই কিন্তু এখন তাঁর পাশে রয়েছে। তাছাড়া তাঁরাই শিক্ষার্থীদের উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনে ডেকেছিল আমরা কিন্তু সাড়া দেইনি। এখানে আমাদের স্বচ্ছতা রয়েছে। আমাদের যৌক্তিক আন্দোলনে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনের রাজনীতি খোঁজা শিক্ষকদের সস্তা রাজনৈতিক স্টান্ডবাজি ছাড়া কিছুই নয়। 

মোহাম্মদ দিদার, সাধারণ সম্পাাদক, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, জাবি শাখা

ছাত্র ফ্রন্ট সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ দিদার বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন উপাচার্যই অধ্যাপক মাজহারুল ইসলাম প্রণীত প্রথম মহাপরিকল্পনাটি অনুসরণ করেননি। যত্রতত্র যেখানে জায়গা পেয়েছে বিল্ডিং নির্মাণ করেছে। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসরণ না করলে কি পরিমাণ সংকটের সম্মুখীন হতে হয় সেটি ঢাকা শহরের দিকে তাকালেই আমরা বুঝতে পারি।

বিশ্ববিদ্যালয়েও যেখানে সেখানে ভবণ নির্মাণ করে নির্মাণ সম্ভব অনেক জায়গা নষ্ট করে ফেলা হয়েছে। আমরা অপরিকল্পিতভাবে ভবণ নির্মাণের মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘমেয়াদি নতুন সংকটের মধ্যে ঠেলে দিতে পারি না। উপাচার্য নিজেও স্বীকার করেছেন ওনার প্রথম পর্বের মেয়াদ প্রায় শেষলগ্নে হওয়ায় তিনি তাড়াহুড়া করে কাজটি করেন। কিন্তু ভাবেননি একবার কাজটি করে ফেললে সংকটটি বিশ্ববিদ্যালয়কে দীর্ঘদিন ভোগাবে।

আপনারা মহাপরিকল্পনা করার সূচনালগ্নে প্রশাসনের সাথে কথা বলেছিলেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা মহাপরিকল্পনার সূচনালগ্ন থেকেই সকলেই অংশগ্রহন নিশ্চিত করার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেও তিনি কর্ণপাত করেননি। গুটিকয়েক প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তি ছাড়া অন্যান্য শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং কোন শিক্ষার্থীর মতামত নেননি। এই প্রক্রিয়া কোনভাবেই সর্বজন বিশ্ববিদ্যালয় ধারণার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।

আপনাদের মতে মহাপরিকল্পায় আসলে কী ধরনের ত্রুটি দেখতে পাচ্ছেন ? প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,
মহাপরিকল্পনায় বড় ধরণের কিছু ঘাটতি আমরা ইতিমধ্যে তুলে ধরেছি । মহাপরিকল্পনায় প্রণয়ন কমিটির প্রধান অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ পরিকল্পনাবিদ হতে হবে এবং উক্ত পরিকল্পনাবিদের অধীন মহাপরিকল্পনা বিষয়ক অপরাপর সংশ্লিষ্ট কাজের বিশেষজ্ঞরা থাকবেন।  কিন্তু এ ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। একজন স্থপতিকে দিয়ে কাজটি করানো হয়েছে যার আওতায় কারা বিশেষজ্ঞ ছিলেন তাও স্পষ্ট করে বলা হয়নি।

সর্বোচ্চ কত সংখ্যক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিভাগ, ইনস্টিটিউট, হল, খেলার মাঠ সহ অন্যান্য সুবিধাদি আগামীতে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকবে তার একটি সার্বিক পর্যালোচনা চিত্র এবং আগামীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক বৈশিষ্ট্যের বাইরে অনাবাসিক শিক্ষা প্রদান করা হবে কিনা এর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও নেই।
মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে কাজের জন্য একটি বিস্তারিত TOR (Term of Reference) একান্ত আবশ্যক।

এই অনুযায়ী বিস্তারিত কাজগুলো চিহ্নিত করে একটি কাজের তালিকা মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন কমিটিকে দিবে এবং প্রকল্প শেষে উক্ত কমিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে কী কী ধরনের প্রতিবেদন, বিষয়ভিত্তিক ম্যাপ ও ভৌত অবকাঠামোর লে-আউট ম্যাপ প্রদান করবে তা সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত ভাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু এখানে নামেমাত্র ২৬ লাইনের একটি TOR  তৈরি করা হয়। যা ছিল এই প্রকল্পের দুর্বলতম দিক।

মহাপরিকল্পনা করতে হলে অবশ্যই পাবলিক পার্টিসিপেশন নিতে হবে। পাবলিক পার্টিসিপেশন ছাড়া কোন মহাপরিকল্পনাই গ্রহনযোগ্য না। আর এই মহাপরিকল্পনায় নামেমাত্র প্রশাসনিক মানুষের পাবলিক পার্টিসিপেশন নিলেও অন্যান্য শিক্ষক এবং কোন শিক্ষার্থীদের কোন পরামর্শ,  মতামত অথবা দৃষ্টিকোণ নেওয়া হয়নি।

তাছাড়া মহাপরিকল্পনার কাজটি বুঝে নেয়া ও মূল্যায়ন করার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন TMEC (Technical Monitoring & Evaluation Committee) থাকা একান্ত প্রয়োজন যাতে একজন পরিকল্পনাবিদসহ পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, উদ্ভিদ ও প্রাণী বিশেষজ্ঞ, ভূগোলবিদ, সমাজতত্ববিদ, তথ্য ও প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, পানি বিশেষজ্ঞ, পরিবহন বিশেষজ্ঞ, অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ ও ভৌত অবকাঠামো প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ উপস্থিত থাকবেন। বাস্তবে এ ধরনের কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।

এসব দুর্বলতাসমূহ সমাধান না করলে বিশ্ববিদ্যালয় কিছু ইটের জঙ্গলে পরিণত হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পুরান ঢাকার মতো গিঞ্জি এবং অপরিকল্পিত পরিবেশ চাই না। আমরা চাই সকলের অংশগ্রহনে সর্বজনের চাহিদা অনুযায়ী সুনির্দিষ্ট লক্ষমাত্রা নিয়ে একটি মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হোক।

বাংলা/এএএ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0258 seconds.