• বাংলা ডেস্ক
  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৪:১৫:২৬
  • ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৫:১১:৫০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

যেন বন্দি থাকাই চাকরি তাদের

ছবি : সংগৃহীত

রাজধানীরা উত্তরায় লাইফওয়ে নামে এক কোম্পানিতে অভিযান চালিয়ে আটকে রাখা ১৫০ তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার করেছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। ওই তরুণ-তরুণীদের কাছ থেকে চাকরি দেয়ার নাম করে হাতিয়ে নেয়া হয়েছে টাকা। দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়েছে রুমে।

এছাড়াও করা হয়েছে শারীরিকভাবে নির্যাতন। এমনকি নারীদেরও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়েছে। সারাবাংলা’র এক প্রতিবেদনে এমন খবর প্রকাশ করা হয়।

ভুক্তোভোগীদের মধ্যে একজন ২০ বছর বছর বয়সী মোহাম্মদ মিলন। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আলাইয়াপুর ইউনিয়নে তার বাড়ি। প্রিয় বন্ধু জিয়ার ডাকে সাড়া দিয়ে ঢাকার উত্তরায় আসেন। গত ১৫ জুলাই উত্তরায় লাইফওয়ে কোম্পানির ওই অফিসে ঢোকার আগে তার বন্ধু জানান, এখানে যারা কাজ করেন, তারা সবাই সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা। এখানে চাকরি করলে ভালো সুযোগ-সুবিধা আছে।

এরপর অফিসে সিনিয়র কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেন মিলন। এ সময় সিনিয়র কর্মকর্তারা বলেন, কোম্পানিতে কাজ হবে অনলাইনে অ্যাড দেয়া। পোস্ট হবে সিনিয়র অ্যাডভাইজার। মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেতন, থাকা-খাওয়া ও চিকিৎসা ফ্রি। তবে এখানে যোগ দেয়ার আগে জামানত হিসেবে ৫০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। আইডি কার্ড ও অন্যান্য বাবদ আরো ৫০০ টাকা দিতে হবে। টাকা দিতে সময় নিচ্ছিলাম।

এরই মধ্যে বন্ধু জিয়া জানায়, সে ভালো আছে। চাইলে আমিও (মিলন) ভালো থাকতে পারবো। এটা সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কোম্পানি। এরা পালাবে না। ভালো চাকরি পেতে হলে টাকা কিছু দিতেই হয়। বন্ধুর ‘পরামর্শে’ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা জামানত হিসেবে জমা দেন মিলন। এরপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় একটি ভবনে। সেখানকার এক রুমে গিয়ে দেখেন, আরো ১৫ জনের মতো তরুণ। তারা বলেন, তারা ভুল করেছেন, একই ভুল মিলনও করেছেন।

মিলন বলেন, ‘আমাকে কোম্পানির পক্ষ থেকে বোঝানো হয়, কারো কথা না শোনার জন্য বলা হয়। আমাকে খুশি রাখার জন্য বিভিন্ন সময় ডিজে পার্টিতে নিয়ে যেত। গাড়িতে করে ঘুরানো হতো। ভালো ভালো রেস্টুরেন্টে নিয়ে যেত। এক সপ্তাহ পর কোম্পানির এক লোক এসে পরিচালক পরিচয় দিয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি রুমে আমাকে বলা হলো, অনেক দিন তো আরাম করলেন। এবার কাজ শুরু করেন। আপনার পরিচিত বন্ধু-বান্ধবদের এখানে ডেকে আনেন। শুধু আপনি ভালো থাকতে চান, নাকি কাছের বন্ধু বান্ধবদেরও ভালো রাখতে চান?’

মিলন বলেন, ‘তাদের কথায় রাজি না হলে আমাকে প্রথমে মানসিকভাবে নির্যাতন করা হতো। তিন দিন খেতে দেয়া হয়নি আমাকে। এরপর শারীরিক নির্যাতন শুরু করে। তাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আমার জীবনের সবচেয়ে ভালো বন্ধু রুবেল ও ফরহাদকে ডেকে নিয়ে আসি। তাদের বুঝিয়ে বলি, আমি ও জিয়া এখানে টাকা দিয়েছি। ভালো চাকরি করছি। তোরাও টাকা দে, ভালো হবে। আমার কথা মতো রুবেল ও ফরহাদ ৫০ হাজার ৫০০ টাকা করে দেয়। এভাবে তারাও আরো কয়েকজনকে নিয়ে আসে এবং তারাও একই পদ্ধতিতে টাকা দেয় কোম্পানিতে।’

মিলন আরো থাকেন, ‘একটি রুমে থাকা-খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই এখানে। আমরা সবাই বুঝতে পারছি যে এখানে লোক এনে টাকা দেয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই। একটা রুমের মধ্যে ১০-১৫ জনকে আটকে রাখা হতো। কেউ ঝামেলা করলে তাকে অন্য জায়গায় নিয়ে রাখা হতো। নতুন ও পুরনোদের এক জায়গায় রাখা হতো না। অনেক মেয়ে বন্ধুকেও নিয়ে আসতে বাধ্য করেছে কোম্পানির কর্মকর্তারা। তবে আমি কোনো নারীকে নিয়ে আসিনি। আর বন্ধু জিয়া পরে আমার কাছে স্বীকার করেছে, নির্যাতন সহ্য করতে না পেরেই আমাকে নিয়ে এসেছিল এই প্রতারণার ফাঁদে।’

মিলন আরো জানান, নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে গত সপ্তাহে এক মামাকে খুলে বলেন সব কথা। পরে সেই মামা র‌্যাব-১-এ অভিযোগ দিলে তারা অভিযান চালায়। তবে সবাইকে উদ্ধার করা যায়নি। নোয়াখালী থেকে যে ১৫ জনের মতো এসেছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র তিন জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি ১২ জনের কাউকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি।

মিলন আরো বলেন, ‘এখানকার কয়েকজন কর্মকর্তা কক্সবাজারে যাওয়ার কথা বলে বেরিয়ে গেছেন। আমাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজনকে তারা নিয়ে গেছেন। আমরা র‌্যাবের কাছে তাদের কথা বলেছি। র‌্যাব জানিয়েছে, তাদের উদ্ধার করতে অভিযান চালাবে।’

মিলনের মতো একইভাবে প্রতারিত হয়ে নিঃস্ব হয়েছেন পটুয়াখালী থেকে আসা সানজিদা আক্তার (ছদ্ম নাম)। তিনি বলেন, ‘বন্ধুর পরামর্শে এসে টাকাও হারিয়েছি, সম্মানও হারিয়েছি। এরকম সময় যেন কারো জীবনে না আসে, সেটাই চাই। এখানে আসার সিদ্ধান্ত ছিল জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। বাবাকে হারিয়েছি আগেই, মায়ের কষ্টের টাকায় জেলা শহরে পড়ছিলাম। স্বপ্ন দেখতে গিয়ে জীবনটাই শেষ হতে চলেছে। মান-সম্মান, টাকা সবই গেল।’

সানজিদা আরো বলেন, ‘অনেক সময় তারা বলত, বড় কোনো জায়গায় পাঠাতে চাইলে যাবেন কি না। সরকারি বড় কর্মকর্তাদের কাছে গেলে মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়া যাবে নাকি। রাজি না হওয়ায় খেতে দেয়া হয়নি। অন্য নারীকে দিয়ে শারীরিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়েছে। র‌্যাবের অভিযানে আজ সেই জিম্মি দশা থেকে মুক্তি পেলাম।’

লাইফওয়ে কোম্পানির প্রতারণার শিকার আরেক তরুণ ফারুক হোসেন, এসেছিলেন শরীয়তপুর থেকে। এক বন্ধুর মাধ্যমে এসে প্রায় মাসখানেক জিম্মি থাকার পর উদ্ধার হয়েছেন।

ফারুক হোসেন বলেন, ‘লাইফওয়েতে চাকরি করার চেয়ে বাড়িতে না খেয়ে মরা ভালো। এদের ফাঁদে পড়ে যেন কেউ টাকা-পয়সা না দেয়। কারো প্ররোচনায় যেন চাকরি করতে না আসে কেউ। এখানে লোক ঠকানো ছাড়া কোনো কাজ নেই। কোনো পণ্য নেই, যা মার্কেটিং করে টাকা উপার্জন করা যেত।’

এই অভিযানের বিষয়ে র‌্যাব-১-এর অভিযান চালানো কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) সুজয় সরকার বলেন, ‘অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাবের পক্ষ থেকে তদন্ত করা হয়। তদন্তে সত্যতা মেলায় উত্তরার তুরাগ এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় ৮ প্রতারককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ওই এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়ি থেকে দেড়শ তরুণ-তরুণীকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩০ জন নারী।’

সুজয় সরকার আরো বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এসব বেকার তরুণ-তরুণীরা চাকরির আশায় এসেছিলেন। জামানতের নামে ৫০ হাজার ৫০০ টাকা করে নেয়া হয়েছে প্রত্যেকের কাছে। টাকা দেয়ার পর এক থেকে দুই মাস প্রশিক্ষণ শেখানোর নামে যে কৌশল অবলম্বন করা হয়, তা মূলত প্রতারণার কৌশল। টাকা দিতে পারলে কিছু কমিশন পাওয়া যায়।’

র‌্যাবের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘প্রশিক্ষণের সময় প্রতারক চক্রের সদস্যরা ভিকটিমের মোবাইল ফোন নিয়ে নিজেদের কাছে রেখে দেয় এবং তাদের নজরবন্দি করে রাখে, যেন তারা বাড়িতে কিংবা বাইরের কারো সঙ্গে যোগাযোগ করতে না পারে। এছাড়াও ভিকটিমরা নিজেদের মধ্যে যেন ঘনিষ্ঠ হতে না পারে, সেজন্য ঘন ঘন তাদের রুম পরিবর্তন করানো হয়। অনেকে এই কাজে অস্বীকৃতি জানায় এবং জামানত ফেরত চায়। যারা তাদের সঙ্গে কাজ করতে অস্বীকৃতি জানায়, তাদের জামানতের টাকা ফেরত না দিয়ে খালি স্ট্যাম্পে নেয়া সইয়ের কথা বলে ভয় দেখানো হতো। এছাড়াও প্রতারক চক্রটি নিজেদের সামরিক বহিনীর সদস্য বলে পরিচয় দিয়ে হুমকি দিয়ে আসত। ফলে জিম্মি তরুণ-তরুণীরাও নিরুপায় হয়ে তাদের সব কথা মেনে নিতে বাধ্য হতো।’

র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া আট জন হলেন— জামালপুর জেলার দেওয়ানগঞ্জের মো. মর্তুজা (২৮), গাজীপুর জয়দেবপুরের মো. হোসাইন আহম্মেদ খাঁন ওরফে শাহাদৎ (২২), রাজশাহীর বাঘা উপজেলার মো. আরিফ হোসেন ওরফে আহসান হাবিব (২০), মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মো. আমিনুল ইসলাম (২২), পাবনার আতাইকুলার মো. ওবাইদুল হক (২৭), যশোরের অভয়নগর উপজেলার মো. ইয়ামিন ইসলাম (২০), পাবনা সদরের মোছা. নাজনীন সুলতানা নিশা (২৯) ও রাজশাহী চারঘাটের মো. ইসমাইল হোসেন (২৭)।

এ সময় চাকরিপ্রত্যাশীদের উদ্দেশে র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘যেখানে চাকরি করবেন সেখানকার সবকিছু যাচাই-বাছাই করে যোগ দেবেন।’ কারো কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চাকরি বা চাকরির নামে টাকা লেনদেন না করার পরামর্শ দেন তিনি।

এ ঘটনায় তুরাগ থানায় ভুক্তভোগী মোহাম্মদ মিলন বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। সেই মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে প্রতারক চক্রের সদস্যদের আদালতে পাঠানো হয়েছে।

বাংলা/এনএস

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0235 seconds.