• ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৪:৩৫:৫৩
  • ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ ১৪:৩৫:৫৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

শাড়ি নিয়ে মহামারি এবং বিস্মিত ‘প্রায়োরিটি’

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


কাশ্মীর বিষয়ে বিবিসি’র একটি রিপোর্ট পড়ছিলাম। Kashmir ‘mass rape’ survivors fight for justice’ শিরোনামে লেখাটি পড়তে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, কাশ্মীরে মেয়েদের প্রতি যে নিষ্ঠুরতা সেই কবে থেকে আজ পর্যন্ত চলছে তা নিয়ে আমাদের কথিত নারীবাদীদের তেমন আলাপতো চোখে পড়েনি।

কাশ্মীরের বর্তমান অবস্থায় সেখানের যে সব দৃশ্যচিত্র আমরা হাতে পাচ্ছি, তার অনেকগুলোতেই নারী-শিশুদের শারীরিক নির্যাতনের প্রামান্যতা দেখা যাচ্ছে। তারপরেও ‘নারীবাদী’রা ‘স্পিকটি নট’! ‘শাড়ি’ নিয়ে একটি লেখায় তাদের যেমন মর্মবেদনা পরিলক্ষিত হচ্ছে। ‘জাত গেল, জাত গেল’ আহাজারি শোনা যাচ্ছে, তার বিন্দু-বিসর্গও তো কাশ্মীরি নারীদের জন্য দেখি না।

সারা ভারতের ‘হিন্দুত্ববাদী’রা যখন হামলে পড়ে ‘কাশ্মীরি গার্ল’ সার্চ করা শুরু করলো তখনও তারা নিশ্চুপ রইলেন। তবে কি নারীবাদের আলাদা কোনও সংজ্ঞা রয়েছে? কাশ্মীরি নারীরা কি নারী নয়! কী জানি, বাংলাদেশের ‘নারীবাদী’দের নারী বিষয়ক সংজ্ঞা আলাদাও হতে পারে। তাদের জন্য নারীবাদের ব্যাখ্যাও হয়ে উঠতে পারে অন্যরকম।

আমাদের দেশ এবং আশেপাশের দেশগুলোর ক্রাইসিস মূলত কী এবং তার সাথে রাষ্ট্র ও নাগরিক হিসেবে আমাদের সুবিধা-অসুবিধাগুলো কতটা জড়িত, এমন প্রশ্নগুলো আমাদের চিন্তার প্রায়োরিটি নির্ধারণ করে। সুতরাং চিন্তা বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে আমাদের প্রায়োরিটি নির্ধারণ করাটাই সময়োচিত কাজ। এই মুহূর্তে ‘শাড়ি’ নিয়ে তুলকালামটা জরুরি নয়। জরুরি হলো, আমাদের বহুমাত্রিক সংকট। দেশের সামাজিক শৃংখলার নাজুক অবস্থা। আর তা সামলে উঠতে রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যর্থতা। অর্থনৈতিক শৃংখলার ঘাটতি। দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তার। বালিশকান্ড, বইকাণ্ড, পুকুর খননকাণ্ডসহ নানা কাণ্ডে দেশের মূল জায়গাটাতেই অস্থিরতা। হত্যা-গুম-ধর্ষণসহ অপরাধের কথা আর নাই বললাম। 

‘গোদের উপর বিষ ফোঁড়া’র মতন রয়েছে রোহিঙ্গা সমস্যা। সাথে ভারতের ‘এনআরসি’কে কেন্দ্র করে আরেকটি সমস্যা সৃষ্টির সম্ভাবনা। এগার লাখ রোহিঙ্গা সামলাতেই আমাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। ভাগে ভাত খাওয়ার কথা এখন ভূমি ভাগের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। ভালোবাসা এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে শংকার কারণ। শখ করে কান বেঁধানোর মতন অবস্থা আর কী।

সে সময় অনেকবার বলা হয়েছে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জঘন্যতম গণহত্যা ও নিপীড়নের শিকার মানুষগুলোকে জায়গা দেয়া ফরজ। মানবিক কারণেই তা করতে হবে। আর কূটনীতিটাও করতে হবে বুদ্ধিমত্তার সাথে। যাতে এমন সংকট আমাদের জন্য ‘লায়াবিলিটিজ’ নয় ‘অ্যাসেট’ হয়ে দাঁড়ায়। দিনশেষে তা কি হয়েছে? মানবিকভাবে আমরা সফল, কিন্তু কূটনীতিতে?

ভারতের আসামে ঊনিশ লাখ লোক রাষ্ট্রহীন হয়েছে। আসামের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘১৪-১৫ লাখ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশকে বলা হবে।’ তিনি পরিষ্কার এসব মানুষকে বাংলাদেশি বলে আখ্যায়িত করেছেন। যেমনটা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে বলে থাকে মিয়ানমার। সেই একই কথা, একই ভাষ্য। সুতরাং এটাও বাংলাদেশের জন্য আরেকটা গলার কাঁটা।

এতসব কাঁটা থাকতে ‘সো কল্ড ফেমিনিস্ট’দের গলায় বিঁধলো ‘শাড়ি’! সত্যিই বিচিত্র এই দেশ!

দুই. 
কুমিরের পা ছেড়ে লাঠি ধরার গল্পটি সবার জানা। আমাদের ‘নারীবাদী’রাও সম্ভবত কুমিরের মতন। দাঁত বড় শক্ত। যা ধরেন একেবারে মরণ কামড়ে ধরেন। তবে শেয়ালের ঠ্যাং চিনতে ভুল করে ফেলেন। সামাজিক মাধ্যমে একজনের ছবি নিয়ে কথা উঠলো। সমালোচনা হলো তার সংক্ষিপ্ত পোশাক নিয়ে। সেই সমালোচনার জবাবে বলা হলো, পোশাকে অন্যের সমস্যা কী, তার কিছু দেখা গেলে অন্যের চোখে তা লাগে কেন, এমনটা। এই তারাই এখন ‘শাড়ি’ নিয়ে মেতে উঠেছেন। পুরুষতন্ত্র, বর্ণবাদসহ নানা ‘বাদে’ ব্যাখ্যা করে হচ্ছে ‘শাড়ি’র সাথে নারীর বর্ণনাটাকে।

কদিন আগে এক খবর পাঠিকা টেলিভিশনে আমাদের সামাজিক সংস্কার, তথা সংস্কৃতির সাথে যায় না, এমন একটি ব্লাউজ পরিধান করে পর্দায় এসেছিলেন। এ নিয়ে যখন সমালোচনা হলো, তখন অনেকে বললেন, ‘এতে অশ্লীলতার কি? নারীর সৌন্দর্য প্রদর্শন তার অধিকার।’ এমনটা যদি অধিকার হয়, তবে নারীর সৌন্দর্য নিয়ে কথা বলাও কি অধিকার নয়?

এই যে, পরস্পর বিরোধী কথা আর কাজ, এ নিয়ে আলোচনা করাটা জরুরি। প্রশ্নটা হলো দ্বৈত চরিত্র নিয়ে। যারা আদর্শিক বয়ান দেবেন তাদের মধ্যে দ্বি-চারিত্ব থাকবে কেন! নিজের চিন্তার সাথে নিজের কাজের ‘কনফ্লিক্ট’ হবে কেন! পহেলা বৈশাখে লালটিপ সাদা শাড়ি নিয়ে রমনায় রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনবেন, আর নিউ-ইয়ারে শর্ট ড্রেসে হিপ-হপে’র তালে নাচবেন, এমনটা হবে কেন! আগে নিজ চিন্তার ধারাটিকে ঠিক করুন, পরে না হয় অন্যের সমালোচনা করবেন। 

তিন.
একটা দেশের নিজস্ব সংস্কৃতিটা বোঝার মধ্যেই পান্ডিত্য। নিজ হৃদস্পন্দনটা জানাই শিক্ষা। প্রদর্শনবাদীতা কোনও কাজের কথা নয়। প্রদর্শনবাদের মাধ্যমে হয়তো সাময়িক পরিচিতি পাওয়া যায়, কিন্তু টিকে থাকা যায় না। অনেকটা বিতর্কিত সেই ‘ঢেলে দিই’ বা ‘বসে যান’ খ্যাত তাহেরি হুজুরের মতন। ‘কোন হইচই আছে’ বলে হয়তো ভাইরাল হওয়া যায়, দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়, বিপরীতে হৃদয়ে ঠাঁই হয় না। 

পুনশ্চ : যুক্তি আর তর্কের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যুক্তি ছাড়া তর্ক অর্থহীন। তর্কে হয়তো কাউকে থামিয়ে দেয়া যায়, হারিয়ে দেয়া যায় না। হুমায়ূন আহমেদও তর্ক করতে না করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তর্ক করতে গেলে তুমি হেরে যাবে এবং তারা তোমাকে তাদের পর্যায়ে নামিয়ে আনবে। তাই ‘শাড়ি’ বিষয়ে মাথা ঘামাতে চাইনি। কারণ এসব নিয়ে আলোচনা এখনকার জন্য জরুরি নয়। তবুও, ঠ্যাং ছেড়ে যখন লাঠি নিয়ে টানাটানি হয় তখন বাধ্য হয়েই ‘ঠ্যাং’টা চিনিয়ে দেয়ার প্রচেষ্টায় এ লেখা। আর লেখার পর্বটা এখানেই শেষ, যেহেতু এরচেয়েও জরুরি বিষয় রয়েছে। 

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0307 seconds.