• ৩১ আগস্ট ২০১৯ ২০:২৩:০৩
  • ৩১ আগস্ট ২০১৯ ২০:২৩:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

আসামে এনআরসি...জাতিবাদী রাজনীতির একদফা নৈতিক পরাজয়

ছবি : সংগৃহীত


আলতাফ পারভেজ :


২০১১ শুমারির আলোকে আসামে এখন জনসংখ্যা হওয়ার কথা ৩.৫৫ কোটি (প্রজেকটেড)। এর ১৯ লাখ আপাতত বে-নাগরিক ঘোষিত হয়েছে। গত বছর ঘোষিত হয়েছিল ৪০ লাখ।

ভারতীয় প্রশাসনের পেশাদারিত্ব দেখেন-- এনআরসি/নাগরিকপঞ্জি প্রক্রিয়াকে এক দফা চ্যালেঞ্জ করতেই সংখ্যাটা ৪০ থেকে ১৯-এ নেমে গেল-- ২১ লাখ মানুষ বিজয়ী হলেন!

যেহেতু আবেদন প্রক্রিয়া আরেক দফা শুরু হবে-- সুতরাং কথিত বে-নাগরিকের সংখ্যা আরও কমে যাবে। বর্তমান লেখক গত এক বছর প্রতিটি প্রবন্ধে জেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান দিয়ে তাই দাবি করেছিলেন।

সর্বশেষ আজকের সংখ্যার দিকে যদি মনযোগ দেয়া হয়, তাহলে দেখা যায়, আসামের মাত্র ৫ ভাগ মানুষ আপাতত বে-নাগরিক। আবারও উল্লেখ করছি, মাত্র ৫ ভাগ। দক্ষিণ এশিয়ায় কেবল প্রত্যেক দেশে নয়-- প্রত্যেক জেলাতেও ৪-৫ শতাংশ বাসিন্দার কাছে নাগরিকত্বের কাগজপত্র থাকে না।

সকলেরই জানা, এতদিন আসামের জনসংখ্যার প্রায় চার ভাগের একভাগকেই ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ বলা হতো। আসামের গভর্নরদের এই মর্মে লিখিত চিঠি রয়েছে-- তারা দাবি করেছেন আসামে ৪০ লাখ ‘বাংলাদেশী’ রয়েছে। অসমিয়া রাজনীতিবিদরা এই সংখ্যা ৮০ লাখ বলতেন।
আজ তাঁদের কাছে জবাব চাওয়ার দিন।

পশ্চিমবঙ্গেও বাংলাদেশীদের কথিত অভিবাসনের ধারণটা যে রাজনৈতিক পণ্য বৈ আর কিছু নয় তার স্পষ্ট ইঙ্গিত আসামের এনআরসি। বাংলাদেশের কাছে অসমিয়া রাজনীতিবিদদের এবং কেন্দ্রীয় ভারতের নেতৃবৃন্দের প্রাথমিকভাবে আজই এক দফা দুঃখ প্রকাশ করা উচিত। তারা দুঃখ প্রকাশ না করলেও ইতিহাস সাক্ষী-- আজ জাতিবাদী/বর্ণবাদী রাজনীতির জন্য একটা খারাপ দিন। 

প্রত্যেক অসমিয়া তরুণ-তরুণী আজ তাঁদের নেতাদের বর্ণবাদী রাজনীতি নিয়ে আরেকবার ভাববেন বলেই প্রত্যাশা করা যায়।

ইতিহাসের বড় কৌতুক, বিজেপিও এখন এনআরসির বিরুদ্ধে বলছে। এর কারণ আসামের এনআরসিতে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বেশি বাদ পড়ে গেছে। পুরো বিষয়টিকে ধর্মের চোখ দিয়ে দেখা যে কত বড় ভুল ও আত্মঘাতি এক পদক্ষেপ-- বিজেপির তা উপলব্ধির সময় এসেছে। আমরা বরাবরই ধর্ম নয়-- ‘প্রকল্প’টিকে বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখতে চেয়েছি। যদিও তার একটা প্রবল ধর্মীয় রূপও ছিল।

কথিত অভিবাসনের বিষয়টি ছিল বাংলাভাষী ‘মিঞা’দের বিরুদ্ধে একটা অপপ্রচার। তাদের কোনঠাসা রাখার পদ্ধতিগত চেষ্টা। আসামে আজকে আংশিকভাবে হলেও ‘মিঞা’দের নৈতিক বিজয় হয়েছে। আজকে বেঁচে থাকলে সবচেয়ে বেশি খুশী হতেন মওলানা ভাসানী। আসামের মিঞারা আজ নিশ্চয়ই তাঁকে স্মরণ করবে।

বাংলাদেশের জন্যও আসামের আজকের ঘটনা এক বড় বিজয়। যদিও বাংলাদেশের কম বুদ্ধিজীবী, সংবাদপত্র এবং গবেষকই এই বিজয় উপভোগ করবে। কারণ এ বিষয়ে এতদিন তাদের কোন নৈতিক অবস্থানই ছিল না।

যে ১৯ লাখ মানুষকে এখনও নাগরিকপঞ্জির বাইরে রাখা হয়েছে-- তাদের জীবন এমুহূর্তে চরম হতাশাময়। নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে প্রমাণ করতে গত দুই বছরে অনেকেই আর্থিকভাবে সর্বশান্ত হয়েছেন। আমরা আশা করতে পারি, আসামের মানবাধিকার কর্মীরা বিগত দিনগুলোর মতোই আরও কিছুদিন এই ১৯ লাখ মানুষকেও মদদ দিয়ে যাবেন এবং শিগগির আসাম বে-নাগরিক শূন্য প্রমাণিত হবে।

আসামের এই মানবাধিকার কর্মীরা গত কয়েকটি বছর বিশ্বের শ্রদ্ধা আদায়ের মতো কাজ করে গেছেন নীরবে। বিজেপি ও অসমিয়াদের পাতা ফাঁদে পা দেননি তাঁরা। ধর্মনির্বিশেষে তাঁরা সকল বে-নাগরিকের জন্য কাজ করছেন। তাঁদের পরিশ্রম প্রমাণ করছে--দক্ষিণ এশিয়া থেকে এনআরসি’র মতো ধারণার বিদায় ঘটবে। 
এখানে পঞ্জিকা তৈরি হতে হবে কেবল সাম্য-মৈত্রী-স্বাধীনতার ভিত্তিতে!
এবং সেই-লড়াইয়ের-পথ-অনেক-দীর্ঘ!

লেখক ও সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

আসাম ভারত নাগরিক তালিকা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0205 seconds.