• ৩১ আগস্ট ২০১৯ ১৯:৪৯:০৪
  • ৩১ আগস্ট ২০১৯ ২০:১৫:১১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

নারী নামক লিটমাস পেপার এবং পুরুষ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

ছবি : সংগৃহীত


দিলশানা পারুল :


আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে নারী এমন একটি লিটমাস পেপার যেই পেপার দিয়ে চুবানী দিলে যে কোন সমাজ বা ব্যক্তির প্রগতিশীলতার পরীক্ষা হয়ে যায়। একটি সমাজ ব্যবস্থা আগানো না পিছানো সেটা বোঝার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই সমাজে ‘নারীর অবস্থান কি?’ সেটা দেখা।

একটি তুলনা মূলক আগানো সমাজ নারীর অবস্থান, সামগ্রিকভাবে নারীকে দেখার দৃষ্টি ভঙ্গি, নারীর ওপর হওয়া শারীরিক, সামাজিক বঞ্চনা, নারীর স্বাধীনতা ভোগ সমস্ত ইন্ডিকেটরেই আগানো থাকে। আবার ধরেন অর্থনৈতিকভাবে অনেক আগানো একটি রাষ্ট্র সামাজিক ব্যবস্থায় নাই আগাতে পারে। সবচেয়ে ভালো উদাহরণ হচ্ছে ভারত এবং সৌদি আরব।

এই দুটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা যদি আপনি দেখেন তাহলে দেখবেন অর্থনৈতিকভাবে তারা খুবই শক্তিশালী অবস্থানে আছে। কিন্তু সামাজিকভাবে ভারত বা সৌদি আরব আসলে কতখানি প্রগতিশীল? খুব সহজেই আপনি এই প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যেতে পারেন। এই সব রাষ্ট্রের নাগরিক নারীরা, পুরুষ নাগরিকদের সমান সুযোগ সুবিধা ভোগ করে কিনা, সামগ্রিকভাবে নারী সমাজ এর প্রতি পুরুষ সমাজের এবং রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি কি, নারী শিক্ষার হার, কর্ম বাজারে নারীর যুক্ত হওয়ার হার, নারীর প্রতি হওয়া সহিংসতা এই সমস্ত ইন্ডিকেটরই আপনাকে আসলে বলে দেবে সমাজ হিসেবে ভারত বা সৌদি আরব আসলে কতখানি আগানো বা পিছানো।

এই একই সূত্র ব্যবহার করে আপনি মাপতে পারবেন একজন ব্যক্তি পুরুষ বা ব্যক্তি নারী চিন্তা ভাবনা আসলে কতখানি প্রগতিশীল। একজন ব্যক্তির অর্জনে বড় বড় ডিগ্রী থাকতে পারে, সামাজিক মর্যাদায় তিনি অনেক উঁচুতে থাকতে পারেন, আশ্চর্যজনকভাবে কখনো কখনো প্রচুর বই পড়াও হতে পারেন কিন্তু চিন্তা জগতে বা সমাজকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি কতখানি প্রগতিশীল সেটা টেস্টেড হয়ে যাবে যদি ওনার নারী বিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে আপনি পরিচিত হন। এবং এই নারী লিটমাস পেপারে মাপতে গেলে দুঃখজনকভাবে আমাদের সমাজের বাঘা বাঘা অনেক বুদ্ধিজিবীরাও হতাশাজনকভাবে ফেল করে, ফেল করেছে। আমাদের এ রকমই একজন নারী লিটমাস পেপার টেস্টে ফেল করা বুদ্ধিজীবী সবার শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

প্রথম আলো পত্রিকায় ৩০ আগস্ট আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘শাড়ি’ এই শিরোনামে একটি লেখা ছাপানো হয়েছে। শাড়ি পরিহিতা নারীর শরীর ওনাকে যেমন পুলকিত করে ওনার লেখাটি পড়ে আমরা নারীরাও ঠিক ততখানিই পুলকিত হয়েছি। লেখাটি অসম্ভব পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গিতেই লেখা শুধু এটুকু নয়, শাড়ি এবং নারী দুটো বিষয়কেই উনি উপস্থাপন করেছেন যৌন বস্তু হিসেবে। ঠিক যে ভাবনাটাকে আমরা নারীরা কয়েক দশক ধরে শুধু বাংলাদেশেই না উপমহাদেশে ফাইট দিচ্ছি যে নারী মানেই শরীর সর্বস্ব অস্তিত্ব না, ওনার পুরো লেখাটাই সেই ভাবনাতেই রসদ যোগানোর বাইরে আর কিছু না। পুরুষের নারীকে দেখার যে সামন্তীয় দৃষ্টিভঙ্গি পুরো লিখাটার পরতে পরতে তা উঠে এসেছে। উনি উনার লেখার প্রথম লাইনেই লিখছেন ‘শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক’ যে পোশাক যৌন আবেদন জাগায় সেই একই পোশাক বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শালীন হয় কেমন করে? আবার শালীন অশালিন এর সংজ্ঞা সম্পূর্ণ নির্ভর করে প্রেক্ষাপটের ওপর।

তিনি শাড়ি আবিষ্কারের পেছনে কোন শিল্পের বিরাট বিশাল শিল্প বোধ খুঁজে পেয়েছেন। অথচ যেকোনো পোশাকের আদি ইতিহাস এবং উদ্ভব এর সাথে সেই সময়কালীন সেই অঞ্চলের আবহাওয়া, টেকনোলজী এবং সমাজ ব্যবস্থা ওতোপ্রোতোভাবে জড়িত। রিদওয়ান আক্রাম এর লেখা বিডি নিউজ ২৪ -এ প্রকাশিত একটা গবেষণা রিপোর্ট-এ তিনি দেখাচ্ছেন শাড়ি এই উপমহাদেশে আসলে সাড়ে তিন হাজার বছরের পুরোনো। এবং আদিতে নারী পুরুষ উভয়ই এই শাড়ি পরতেন। খুব বেশি আগে না গত শতকের মাঝামাঝিতেই কিন্তু পুরুষ শাড়ি পরতো ধূতি নাম দিয়ে। এত আগে সেলাই ধারনা ছিলো না তাই মানুষ লম্বা এক হারা বুনট কাপড় পরতেন। সময়ের সাথে সাথে আমাদের পুরুষ কবি সাহিত্যিকেরা এই পোশাক কে দেখা শুরু করলেন নারীর দেহ সৌন্দর্য প্রকাশিত হওয়ার এক শিল্প হিসেবে। তা উনি শিল্প দেখতেই পারেন একটা পোশাক কে কেন্দ্র করে, কিন্তু উনি পোশাকের শিল্প দেখতে যেয়ে নারীর শরীরের উঁচু নীচু বাঁক, খাজ সমস্ত কিছুই খুলে দেখে ফেললেন এক শাড়ি রচনায়।

ততটুকুও মেনে নিতাম সাহিত্যিকরাতো কত কিছুই বলে। রমণীয় (রমন যোগ্যা যে নারী), সুকুমারী (সুন্দর কুমারী), তন্বী দেহ বল্লরী এই রকম অসংখ্য যৌন উপমায় নারীকে ভূষিত করে তিনি নারীর সৌন্দর্য বর্ণনা করলেন। ঠিকই আছে সৌন্দর্য এর সংজ্ঞা যার কাছে শুধু মাত্র শরীর কেন্দ্রিক দার কাছেতো যৌন আবেদনই একমাত্র ইন্ডিকেটর হবে। বাধ সাধলো ওনার বাঙাল নারী সৌন্দর্য বর্ণনা। বাঙালি মেয়েরা বেটে তাই অন্য কোনো পোশাকে সুন্দর না? বেশির ভাগ বাঙালি মেয়ে সুন্দর না? “শারীরিক অসমতার এত ঘাটতি থাকার পরও অন্যান্য মেকআপের মতো রূপকে নিটোলতা দেয়ার মতো এক অনন্য সাধারণ মেকআপ রয়েছে বাঙালি মেয়েদের ভাঁড়ারে। আমার মতে, এর নাম ‘শাড়ি’।” “শারীরিক অসমতার এত ঘাটতি” সিরিয়াসলি আমরা শারীরিক অসমতার এত ঘাটতি নিয়ে জন্মাই? ভাবলে ভালো লাগতো উনি বাংলাদেশের মেয়েদের সাথে মষ্করী করছেন। কিন্তু আমাদের শিল্পী সাহিত্যিকরা আসলে বাংলার রমনীকূলকে এভাবেই দেখতে চান। এর চেয়ে অন্য রুপে না তারই জ্বলন্ত প্রমান ওই লেখা। এই লেখার টাইটেল আসলে হওয়া উচিত ছিলো “নারী তোমাকে আমি যেমন দেখতে চাই।” যে দেশের একজন প্রথিত যশা বুুদ্ধিজীবী এতখানি সামন্তীয় চিন্তা রাখেন এত খানি বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রাখেন সেই দেশে নারী অবয়ব অন্য কিছু ভাবা ....মক্কা বহুদূর। বাঙালি মেয়েদের খাটো বলা, কুৎসিত বলা, শুধুমাত্র রমন যোগ্য হিসেবে দেখতে চাওয়াটা যদি ওনার সাহিত্যিক স্ট্যান্ড হয় তবে ওনাকে পুরুষতান্ত্রিক, সামন্তীয় এবং বর্ণবাদী বলাটা আমার পলিটিক্যাল স্ট্যান্ড।

লেখক: এক্টিভিস্ট, গবেষণা ও বাস্তবায়ন কর্মী।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0260 seconds.