• ২৮ আগস্ট ২০১৯ ১৯:৫৬:১৫
  • ২৮ আগস্ট ২০১৯ ২০:৪৮:১৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

অরুন্ধতী কি ৭১-এর গণহত্যা অস্বীকার করেছেন?

অরুন্ধতী রায়। ছবি : সংগৃহীত


সারোয়ার তুষার :


১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইড প্রসঙ্গে অরুন্ধতী রায়ের ২০১১ সালে করা এক মন্তব্যকে ঘিরে সম্প্রতি বেশ আলোচনা সমালোচনা চলছে।  বাংলাদেশের একটি ইংরেজি দৈনিক ঢাকা ট্রিবিউন সেই মন্তব্যের শিরোনাম করেছে " "Pakistan never used army against its people". 

শিরোনামটি দেখে বেশ আহতই হলাম বলতে হবে। অরুন্ধতীর একজন নিবিষ্ট পাঠক হিসেবে খুব সঙ্গত কারণেই এরকম অনৈতিহাসিক ও জেনোসাইড ডিনায়ালের সমতুল্য এক মন্তব্যে মনঃক্ষুণ্ণ না হয়ে কোন উপায় নেই। 

তারপর অরুন্ধতীর সেই বিতর্কিত মন্তব্যটির খোঁজ করলাম। খোঁজ করতে গিয়ে যে তথ্য পেলাম তাতে এরকম একটি স্পর্শকাতর ইস্যুতে সংবাদ পরিবেশনের ধরন ও দায়িত্বশীলতাই বরং বিরক্তির কারণ হল। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেককেই এই সূত্র ধরে আলোচনা-সমালোচনা করছেন।

স্বাভাবিক ভাবেই পত্রিকাটি যে শিরোনামে করেছে, তাতে পুরো প্রেক্ষাপট না জানা ও অরুন্ধতীর মূল বক্তব্য না শোনা যে কোন ব্যক্তির মনে হবে, অরুন্ধতী রায় ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি মিলিটারি-পলিটিকাল  এস্টাবলিশমেন্ট কর্তৃক  বাংলাদেশে সংঘটিত ভয়াবহ জেনোসাইড (গণহত্যা) অস্বীকার করেছেন। কারণ ঢাকা ট্রিবিউনের শিরোনাম বলছে, ‘অরুন্ধতী বলেছেন পাকিস্তান কখনোই তার জনগণের বিরুদ্ধে আর্মিকে লেলিয়ে দেয়নি।’

কিন্তু আসলেই কি অরুন্ধতী তাই বলেছেন? ২০১১ সালে ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টমিনিস্টারে এক কনভার্সেশনে অংশ নেন অরুন্ধতী রায়। Dibyesh Anand এর সাথে সেই কনভার্সেশনের শিরোনাম ছিল "Democracy and Dissent in China & India". খুব স্বাভাবিকভাবেই পুরো আলোচনাটা গড়িয়েছে ইন্ডিয়া ও চীনের রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, উন্নয়ন মডেল, এই দুই রাষ্ট্রের শাসনপ্রণালীর আপাত পার্থক্যের অন্তরালে সাদৃশ্যের জায়গাগুলো নিয়ে।

অরুন্ধতী অত্যন্ত চমৎকারভাবে যুক্তি দেখিয়েছেন, কথিত 'বৃহৎ গণতন্ত্রের দেশ' ভারত কেন ও কীভাবে তার বিভিন্ন অঞ্চলের ন্যায়সঙ্গত বিদ্রোহ দমন, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে যেকোন দৃশ্যমান সামরিক শাসন কিংবা একদলীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা রাষ্ট্রের মতোই নৃশংস, কোন কোন ক্ষেত্রে বিদ্রোহ প্রবণ অঞ্চলে সেনাবাহিনী নিয়োগের মাধ্যমে নির্মম অত্যাচারে ভারত রাষ্ট্র অন্য যেকোন রাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যায়। যেমন কাশ্মীর এখনো পৃথিবীর অন্যতম ঘন সামরিকায়িত অঞ্চল।

এছাড়াও আছে আসাম, ত্রিপুরা,  মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যাণ্ড, পাঞ্জাব, তেলেঙ্গানাসহ আত্মনিয়ন্ত্রণ ও স্বাধীনতাকামী ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল। এসব অঞ্চলে Armed forces special power act (AFSPA), নামক চরম বিতর্কিত ও ঔপনিবেশিক আইনের মাধ্যমে ভারতের সেনাবাহিনী নিজের জনগণকে সর্বপ্রকারের দায়মুক্তি উপভোগ করার মাধ্যমে নিপীড়ন-গুম-খুন-ধর্ষণ করতে পারে। 

পৃথিবীতে আর একটিও 'গণতান্ত্রিক' রাষ্ট্র পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ, যেখানে ন্যায্য স্বাধীকার আন্দোলন ও বিদ্রোহ দমন করতে, স্থানীয় অধিবাসীদের উন্নয়নের নামে বলপ্রয়োগপূর্বক উচ্ছেদের উদ্দেশ্যে কার্যত সামরিক শাসন জারি রাখা হয়েছে। 

নয়া উদারনৈতিক মডেলের উন্নয়ন বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে আদিবাসী সম্প্রদায় সমূহকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা ও স্বাধীকার আন্দোলন দমন করার ঔপনিবেশিক পন্থাই অনুসরণ করছে 'গণতান্ত্রিক' ভারত রাষ্ট্র। কেবলমাত্র নির্বাচনী ব্যবস্থা থাকাই কোন রাষ্ট্রকে 'গণতান্ত্রিক' হিসেবে হাজির করে না। কোন রাষ্ট্র তার জনগণের দাবি দাওয়া-আন্দোলনকে কীভাবে ডিল করছে, সেটাই তার গণতন্ত্রের স্মারক।

অরুন্ধতী এই প্রসঙ্গেই এক পর্যায়ে মন্তব্য করেছেন, "The state of Pakistan has never deployed its army against its own people the way the democratic Indian state has."

অর্থাৎ দীর্ঘকাল সামরিক শাসনে পর্যুদস্ত পাকিস্তান রাষ্ট্রও  'গণতান্ত্রিক' ভারত রাষ্ট্র যে মাত্রায় সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছে নিজ জনগণের বিরুদ্ধে, সেই মাত্রায় সেনাবাহিনী ব্যবহার করেনি। এই বক্তব্য থেকে ঠিক কীভাবে বোঝা গেল যে অরুন্ধতী রায় বলেছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র কখনোই তার জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ব্যবহার করেনি?

"পাকিস্তান কখনো তার জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেনি" এবং "পাকিস্তান কখনো ভারতের মতো করে তার জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেনি" এই দুটি বক্তব্য কি এক? 

পাকিস্তান ভারতের মত করে তার রাষ্ট্রের জনগণের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ব্যবহার করেছে কি করেনি, সেটা নিয়ে আলোচনা হতে পারে কিন্তু যা অরুন্ধতী বলেননি তা তাঁর নাম করে চালানোর উদ্দেশ্য কী?

দীর্ঘকাল সামরিক শাসনের অধীন থাকা পাকিস্তান রাষ্ট্র তো বোধগম্য কারণেই সেনাবাহিনীর উপর নির্ভরশীল ও সেনাবাহিনী দ্বারা চালিত হবে, কিন্তু 'গণতান্ত্রিক' ভারতকেও কেন একই পন্থার উপর নির্ভরশীল হতে হয়? অরুন্ধতীর বক্তব্যের মূল বক্তব্য এটাই।

মূলত অরুন্ধতী বহুল প্রশংসিত 'ইন্ডিয়ান ডেমক্রেসির' অন্তঃসারশূন্যতা ও ভণ্ডামোকে এক্সপোজ করতে গিয়ে একটা মিলিটারি রেজিমের সাথে তুলনা করেছেন। তুলনা করতে গিয়ে বলেছেন, "ডেমক্রেটিক" ইন্ডিয়া যে মাত্রায় নিজের জনগণের উপর আর্মি লেলিয়ে দিয়েছে, সেই মাত্রায় এমনকি মিলিটারি স্টেট পাকিস্তানও দেয়নি।

এই কথাটার মানে কোনদিক দিয়ে 'পাকিস্তান কখনোই নিজের জনগণের বিরুদ্ধে আর্মি লেলিয়ে দেয়নি' এরকম হয় ? উনার বক্তব্যের ঝোঁকটা হলো প্রচলিত 'ডেমক্রেসি' এত আকাঙ্ক্ষিত, গোটা পশ্চিমা এস্টাবলিশমেন্ট ভারতের গণতন্ত্রের প্রশংসায় পঞ্চমুখ, সেই গণতন্ত্র কেন নিজের দেশের বিরুদ্ধে এইভাবে মিলিটারিস্টিক নিপীড়ন চালায়, যেটার তুলনা একটা মিলিটারি স্টেটের সাথেই কেবল করা যায়?

মিলিটারি স্টেট তো মিলিটারি দিয়েই নিপীড়ন চালাবে, একটা ডেমক্রেসিও কেন মিলিটারির ব্যবহারে মিলিটারি রাষ্ট্রের সাথে তুলনীয় হওয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে? এটাই হলো অরুন্ধতীর জিজ্ঞাসা।

গতকাল আরব আমিরাত ভিত্তিক গালফ নিউজ প্রথম এই অসত্য ও বিভ্রান্তিকর শিরোনামের নিউজ করার পরে ঢাকা ট্রিবিউনও একই কাজ করেছে। অরুন্ধতীর উল্লেখিত মন্তব্যের কোথাও "Pakistan never used army against its people" কথাটি নেই, অথচ দিব্যি এই লাইনটিকেই শিরোনাম করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে। আর সেই সূত্র ধরে অরুন্ধতী বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যাকে অস্বীকার করেছেন এই প্রচারণাও চলছে সমানতালে।

অথচ যে ভিডিওটি নিয়ে এত সমালোচনা, সেই ভিডিওটিরই ২৯ মিনিট ৩০-৪০ সেকেণ্ড অংশে অরুন্ধতী স্পষ্টতই বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইডের কথা উল্লেখ করেছেন।

এছাড়াও অরুন্ধতী রায় তাঁর "Fields Notes On Democracy: Listening to Grasshoppers" বইয়ের "Azadi" প্রবন্ধেও বাংলাদেশে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যার কথা উল্লেখ করেছেন :

"...It’s easy to scoff at the idea of a “freedom struggle” that wishes to distance itself from a country that is supposed to be a democracy and align itself with another that has, for the most part been ruled by military dictators. A country whose army has committed genocide in what is now Bangladesh. A country that is even now being torn apart by its own ethnic war. These are important questions, but right now perhaps it’s more useful to wonder what this so-called democracy did in Kashmir to make people hate it so?..."

বিভ্রান্তির ফাঁদে পা দেয়ার আগে একটু খোঁজখবর করলেই প্রকৃত তথ্য বের করা সম্ভব। কিন্তু উদ্দেশ্যই যদি হয় অরুন্ধতী রায়কে নিয়ে ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের প্রোপাগান্ডার পালে হাওয়া দেয়া, তাহলে এই প্রোপাগান্ডা স্বাভাবিক ও অরুন্ধতী রায়ের বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও সাহসিকতার 'কর্তৃপক্ষীয়' অনুমোদন।

লেখক: অ্যাক্টিভিস্ট।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0220 seconds.