• ২৮ আগস্ট ২০১৯ ১৬:৩১:১৪
  • ২৮ আগস্ট ২০১৯ ১৬:৩১:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

গোপন ক্যামেরা, গণমাধ্যম, অনুভূতির প্রকাশ ও অন্যান্য

ছবি : সংগৃহীত


কাকন রেজা :


দেশে একটা ডিজিটাল অ্যাক্ট আছে না, যেখানে সম্ভবত বলা আছে, গোপন ক্যামেরা কিংবা রেকর্ডার ধরণের কোন জিনিস নিয়ে সরকারি অফিসে যাওয়া নিষিদ্ধ। নিয়ে গেলে শাস্তির বিধানটা বড় কড়া। যা নিয়ে গণমাধ্যমকর্মীরা অনেক চিৎকার চেচামেচি করেছে কিন্তু কাজের কাজ হয়নি কিছুই।

জামালপুরের সদ্য সাবেক জেলা প্রশাসক আহমেদ কবীরের অফিসে গোপন ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং তার ‘রাসলীলা’র চিত্র তাতে উঠে এসেছে। আর এই ‘রাসলীলা’ নিয়ে মেতেছে দেশ। গণমাধ্যমকর্মীরাতো রীতিমত উব্দেলিত-উত্তেজিত এমন ফুটেজ হাতে আসায়।

অথচ তারা একবারও প্রশ্ন করলো না, গোপন ক্যামেরা বা রেকর্ডার যদি সরকারি অফিসে আমরা বহণ করতে না পারি, তবে গোপন ক্যামেরায় ডিসির লীলা দৃশ্যবন্দী হলো কিভাবে? করেছেন কেউ প্রশ্ন? করেননি। কেন করেননি, এটাওতো প্রাসঙ্গিক ছিলো? আচ্ছা, না হয় কর্মীরা করলো না, কিন্তু বার্তা বিভাগে যারা আছেন, তারা কি করলেন? তারাও তো কর্মীদের বললেন না, ফলোআপে এটাও পাঠান। এর সাথে মাধ্যমকর্মীদেরও স্বার্থ জড়িত।

কিন্তু কে ভাবে কার কথা। যদি ভাবতোই, তবে তরুণ গণমাধ্যমকর্মীদের লাঞ্ছিত হতে হতো না। আহত বা নিহত হবার ঘটনাও ঘটতো না। এই না ভাবার কারণেই গণমাধ্যমকর্মীরা বিপদে পড়ছেন। 

কোথায় যেন পড়লাম আমাদের ক্রিকেট দলের নতুন কোচ বাংলাদেশে পা রেখে এত গণমাধ্যমকর্মী দেখে অবাক হয়েছিলেন। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের তারিখে একজন লিখলেন, ‘এখানে রোহিঙ্গাদের চেয়ে সাংবাদিকের সংখ্যা বেশি।’ এখানেই কোয়ালিটি আর কোয়ান্টিটির প্রশ্নটা। বেশি ‘সাংবাদিক’ থাকার বিপরীতে সত্যিকার অর্থে ‘সংবাদ’কই। যে মাধ্যম খবরের প্রায়োরিটি নির্ধারণে ব্যর্থ হয়, সে মাধ্যমে খবরের কর্মী গড়ে উঠা সম্ভব নয়। আমাদের অনেক মাধ্যমেরই একই অবস্থা। 

কদিন আগে আমার জেলা শেরপুরে এসেছিলেন এমপি ও ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেন মাশরাফি। এখানে তার গৃহ পরিচারিকার বাড়ি। এই আসা নিয়ে কোন গণমাধ্যম খবর করলো, এমন কি শিরোনামও হলো, মাশরাফি সেই বাড়িতে কি কি দিয়ে খেলেন, সেই খাদ্য তালিকার! ‘মাশরাফি ভাত খেলেন মাছ, মাংস দিয়ে’ এমনতর শিরোনাম দেখে বিস্মিত হবারই কথা। যারা সাংবাদিকতা বোঝেন, তাদের চোখ কপালে উঠার কথা।

অনেকে বলবেন, ‘তাহলে মোদি আসার খবরে খাবারের আইটেম নিয়ে যে লেখা হয়।’ এমন প্রশ্ন করার আগেই উত্তরটা দিয়ে রাখি, মোদি আর মাশরাফির পার্থক্যটা যদি না বোঝেন, প্রায়োরিটি লেভেলটা যদি বোধে না থাকে, তবে প্রশ্নটা জিভের আগায় আসার আগে গিলে ফেলাই ভালো।  

দুই. 
‘বাংলাদেশ প্রতিদিন’ খবর করেছে, ‘ফিটলিস্টে নাম ছিল না, প্রতিমন্ত্রীর চাপে ডিসি করা হয় কবীরকে’ এমন শিরোনামে। খবরের ভেতরে বলা হয়েছে, ফিটলিস্টেতো নাম ছিলই না, ডিসি হবার মতন কোন যোগ্যতাই তার ছিল না। সিনিয়র অফিসারদের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও তাকে ডিসি করা হয়েছিল। 

জামালপুরের ডিসির যৌনতা বিষয়ে মাতামাতির বিরোধীতা করায় আমার উপর অনেকেই গোস্বা হয়েছিলেন। তাদের বলি, যশোরের স্থানীয় সরকারের উপ-পরিচালকের দায়িত্বে থাকাকালীন এই আহমেদ কবীরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, আত্মসাতসহ নারী কেলেংকারীর অভিযোগও ছিল। কিন্তু তারপরও তাকে ডিসি করা হয়েছে এবং করা হয়েছে প্রতিমন্ত্রীর চাপে, এমনটাই জানানো হয়েছে খবরে। 

যারা ডিসির অক্ষম যৌনতায় অস্থির তারা কি বলবেন, তাকে ডিসি বানানোর দায়টা কার? অযোগ্য মানুষের কাছ থেকে কিভাবে আপনি যোগ্য আচরণ আশা করেন? একজন অযোগ্য লোককে যোগ্য জায়গায় বসালে তো ফলাফল এমনটাই হবে। সুতরাং অসুখ সারানোর চেয়ে অসুখের কারণ নির্ণয়ের প্রয়োজনটা বেশি। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধটা জরুরি। 

তিন. 
স্কুলে কি পড়ানো হয় অভিভাবকরা তাকি জানেন? যারা ডিসি’র যৌনতা নিয়ে উদ্বেলিত-উৎকন্ঠিত তারা কি জানেন, স্কুলে ‘নিজেকে জানো’ নামে একটি বই রয়েছে, অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের যা পড়ানো হয়। তার এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘একটি ছেলে ও একটি মেয়ের মধ্যে ভালোলাগার পরের পর্যায়ে যৌন অনুভূতি এমনকি যৌন আকর্ষণও সৃষ্টি হতে পারে।’ আরো লেখা রয়েছে, ‘যৌন অনুভূতি প্রকাশ করা দোষের কিছু নয়, তবে সেটা হতে হয় দুইজনের সম্মতিতে, মার্জিত ও শালীনভাবে।’

বলি, ডিসি সাহেব কি এর কোন ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন? ট্রলের ভাষায় বলি, ‘পরিবেশতো সুন্দর ছিল, কোন হইচই ছিল না, ছিল?’ তাহলে আপনাদের এত তড়পানি কেন! ক্লাশের এইটের বাচ্চারা যদি জানতে পারে ‘যৌন আকর্ষণ দোষের কিছু নয় এবং উভয়ের সম্মতিতে শালীনভাবে করা যায়’, তাহলে প্রাপ্তবয়স্ক ডিসি কি দোষ করেছেন?

অনেকে বলবেন, বাচ্চাদের আধুনিক বানানো হচ্ছে। আরেকটু এগিয়ে বলতে পারেন, ‘উত্তর আধুনিক’! একটি জাতি-গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের সামাজিক আচার-আচরণ, যাপিত-জীবন আহরিত সংস্কৃতিকে আপটি হুট করে বদলে দেবেন এটাতো হতে পারে না। প্রতিটি জাতি-গোষ্ঠীরই নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যাকে বলে স্বকিয়তা। আর সেটাই সেই জাতি-গোষ্ঠীকে আলাদা হিসাবে চিহ্নিত করে। আমাদের আচার-আচরণ, তথা সংস্কৃতি সেভাবেই আমাদের অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

আমেরিকার সাথে আমাদের পার্থক্য এখানেই। ইউরোপের মানুষের চেয়ে আদবে-অনুভূতিতে আমাদের প্রকাশ ভিন্ন। আপনি যদি সামাজিকভাবে এই ট্রেন্ডকে পরিবর্তন করতে চান, তাহলে এরজন্য সময়ের প্রয়োজন। আপনি যদি আপনার সংস্কৃতিকে অন্যের আদলে সাজাতে চান, তারজন্য প্রয়োজন সঠিক যুক্তি এবং ব্যাখ্যা। সমাজ শেখাবে এক, স্কুলে পড়াবে আরেক, তাতে তো সাংস্কৃতিক সংঘাত বাড়বে।

আপনি চুল কাটাকে ‘বখাটে কাটিং’ আখ্যা দিয়ে চুলে ‘কদমছাট’ দেয়াতে বাধ্য করবেন বাচ্চাদের। আর বইয়ে পড়াবেন যৌন অনুভূতির প্রকাশ দোষের কিছু নয়, তাতো হতে পারে না। আপনি শাসনে ইসলামী হতে চাইবেন, আবার স্কুলে পড়াবেন ছেলেমেয়ের যৌন আকাঙ্খা দোষের নয়। তাকে উৎসাহিত করবেন উভয়ের সম্মতিতে করার জন্য, এমনটাও মানানসই নয়। দ্বি-চারিত্ব প্রকাশ করবেন সবখানে, সংঘাত জিইয়ে রাখবেন, তবে কি করে হবে! স্বভাবতই পরিবেশ সুন্দর থাকবে না, হইচই হবে।

চার.
জানি আমার এই লেখাতেও অনেকে বিরক্ত হবেন। কেন আমি এখনো এক বিষয়ে লিখছি, সেই উষ্মার মুখেও পড়তে পারি। এসব মাথায় রেখেই বলছি, ধারাবাহিকতা না থাকায় আমাদের বারবার ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে। সিনেমা-নাটকে যেমন ‘কন্টিনিউটি’ বলে একটি ব্যাপার রয়েছে। দৃশ্যান্তরে সেই ‘কন্টিনিউটি’ ধরে রাখা হয়। একটি বাড়ির দেয়ালে ছবি টানানো রয়েছে এমনটা দেখা গেলো আগের দৃশ্যে, পরের দৃশ্যে ছবিটি নেই, তাতে ছন্দপতন ঘটে। দৃশ্যচিত্রের মান নষ্ট হয়। তেমনি আমাদের ‘কন্টিনিউটি’ না থাকায় মানের বারোটা বেজেছে। 

‘ফিটলিস্টে’র ‘কন্টিনিউটি’ ধরে রাখা গেলে আমাদের আহমেদ কবীরদের সইতে হতো না। গণতন্ত্রে ‘কন্টিনিউটি’থাকলে আমাদের নিয়ে বাইরের শক্তি খেলতে সাহস পেতো না। রোহিঙ্গাদের নিয়ে ‘মাইনকা চিপায়’পড়াটাও একটা উদাহরণ। এই যে, একটা টপিকের আড়ালে আরেকটা টপিক হারিয়ে যাচ্ছে। একটি ঘটনা ভুলিয়ে দিচ্ছে আগের ঘটনাকে, এমনটা ঘটতো না। 

এই হারানো আর ভোলানোর চক্রে আমরা ক্রমেই দিশা হারাচ্ছি। যার ফলে সমস্যার মূলে যাওয়া হচ্ছে না আমাদের, আমাদের ভুল পাহাড়সম হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আর সেই ভুলের নিচে ক্রমশই চাপা পড়ছি আমরা। 

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0542 seconds.