• ২৪ আগস্ট ২০১৯ ২১:২০:১৯
  • ২৪ আগস্ট ২০১৯ ২১:২০:১৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

ফুলবাড়ী প্রতিরোধ কী বার্তা দেয়?

ছবি : সংগৃহীত


আনু মুহাম্মদ :


এই বছরের ২৬ আগস্ট ঐতিহাসিক ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানের তেরো বছর (২০০৬-২০১৮) পূর্তি হচ্ছে। প্রতিরোধের এই বার্ষিকীতে আমরা আবারও সালাম জানাই শহীদ তরিকুল, সালেকিন, আল আমিন; বীর যোদ্ধা বাবলু রায়, প্রদীপ, শ্রীমন বাস্কেসহ অগণিত সংগ্রামী মানুষকে।

কী ছিলো ফুলবাড়ী প্রকল্প যার বিরুদ্ধে জনগণকে জীবন দিতে হয়েছে, তেরো বছর পরও একটানা প্রতিরোধ জারি রাখতে হচ্ছে? এই প্রকল্প অনুযায়ী বাংলাদেশের জন্য শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটি দিয়ে নবগঠিত অনভিজ্ঞ একটি বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জি (এখন নাম জিসিএম) ছয় থানা জুড়ে বিস্তৃত কয়লা খনির পুরো স্বত্ত্ব লাভ করতে চেয়েছিল, শতকরা ৮০ ভাগ কয়লা রপ্তানি করে মুনাফা নিশ্চিত করবার আয়োজন করেছিলো। সুন্দরবন পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করে সুন্দরবন বিপর্যস্ত করে সেই কয়লা রপ্তানি হতো, তার আয় পুরোটাই পেতো কোম্পানি। আর সেই রেললাইন নির্মাণের খরচ যোগাতে হতো বাংলাদেশের ভাগের সেই ৬ শতাংশ রয়্যালটি থেকে! উন্মুক্ত খনির মাধ্যমে তিনফসলী এবং বাংলাদেশের শস্য ভান্ডার বলে পরিচিত অঞ্চল ধ্বংস করে কয়লাসম্পদও নিয়ে যেতো লুটেরা গোষ্ঠী। কয়েক লক্ষ মানুষকে উদ্বাস্তু হতে হতো। দেশের আবাদী জমি, পানিসম্পদ ও মানুষের সর্বনাশ করে শতকরা মাত্র ৬ ভাগ রয়্যালটি দিয়ে দেশের কয়লা বিদেশে পাচারের এই প্রকল্পকেই ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ বলে ঢোল পেটানো হয়েছিলো।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট প্রায় লক্ষ মানুষের মিছিল সমাবেশ হয় এর বিরুদ্ধেই। হামলা, খুন আর জখম করেও কোম্পানিমুখি সরকার থামাতে পারেনি মানুষকে। গণঅভ্যুত্থান ছড়িয়ে পড়েছিল। ৩০ আগস্ট তৎকালীন সরকার ঐ কোম্পানি বহিষ্কার ও উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ সহ ৭ দফা দাবি মেনে জনগণের সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল। তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এই চুক্তির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তা বাস্তবায়নে অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এতোবছরেও চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়ায় দেশি-বিদেশি দুষ্টজোটের অপতৎপরতা থামেনি। 

কোম্পানি ২০০৬ সালে জনরোষ থেকে বাঁচতে অঞ্চল থেকে পালিয়েছে, কিন্তু দূর থেকে এখনও চক্রান্ত চালাচ্ছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে আন্দোলনের নেতৃবৃন্দকে হয়রানি করা হচ্ছে। এখন আবার চীনা কোম্পানিকে সাথে নিয়ে জোর বাড়ানোর চেষ্টা করছে প্রত্যাখ্যাত খুনি ও জালিয়াত এই কোম্পানি। কোন বৈধ অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের ফুলবাড়ী কয়লা খনি দেখিয়ে এশিয়া এনার্জি (জিসিএম) লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করছে গত প্রায় ১৪ বছর ধরে। এর মধ্যে চারটি সরকার ক্ষমতায় থেকেছে, কোন সরকারই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি।

এ পর্যন্ত বিভিন্ন সরকারের উদ্যোগে বেশ কয়টি কমিটি করা হয়েছে; ড. নুরুল ইসলামের নেতৃত্বে কমিটি করা হয়েছিল ২০০৬ সালে, ২০০৭ সালে আবদুল মতিন পাটোয়ারির নেতৃত্বাধীন এবং ২০০৮ সালে সেটির পর্যালোচনা কমিটি, ২০১১ সালের মোশাররফ হোসেন কমিটি। বিভিন্ন ধরনের চাপ ও কূটকৌশল থাকা স্বত্ত্বেও কোনো কমিটিই এশিয়া এনার্জির ফুলবাড়ি কয়লা প্রকল্পের পক্ষে দাঁড়ানোর যুক্তি পায়নি, বরং কোম্পানি বা উন্মুক্ত খনির বিরুদ্ধেই মত দিয়েছে। এতোসব তথ্য প্রমাণের পরও সরকার চক্রান্ত থামাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়নি। এটা খুব বিস্ময়কর যে, দেশে সরকার থাকতে কী করে একটি বিদেশি কোম্পানি দেশের সম্পদ নিয়ে বিদেশে অবৈধভাবে শেয়ারব্যবসা করতে পারে? দেখা যাচ্ছে, শেয়ার ব্যবসার মুনাফার একাংশ ছড়িয়েই দেশে কোম্পানি তার খুঁটি ধরে রেখেছে। 

জনবিধ্বংসী উন্নয়ন দর্শনের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত জনবিরোধী রাজনীতি, স্বৈরতন্ত্রী ক্ষমতা। উন্নয়নের মূলা ঝুলিয়েই বিভিন্ন কালের ক্ষমতাসীনরা বারবার ভয়ংকর প্রকল্প নিয়ে এসেছে। মার্কিন কোম্পানির মালিকানায় দেশের গ্যাসসম্পদ ভারতে রপ্তানির জন্য একসময়ে শোরগোল তুলেছিলো সরকারের মন্ত্রী, আমলা, কনসালট্যান্ট, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, বিভিন্ন দূতাবাস। এরা সবাই মিলে হৈ হৈ করছিলো এই বলে যে, দেশ গ্যাসের ওপর ভাসছে, অতি শীগগির এই গ্যাস রপ্তানি না করলে দেশের সর্বনাশ হবে। গ্যাস রপ্তানি করলে দেশ উন্নয়নে ভরে যাবে। তখন দেশের ব্যবসায়ীদের কতিপয় নেতা মার্কিন কোম্পানির কমিশনভোগী হিসেবে এই প্রচারে যোগ দিয়েছিলো। এমন প্রচারও হয়েছিলো যে, গ্যাস রপ্তানি না করলে মার্কিন বাজারে গার্মেন্টস প্রবেশ বন্ধ হয়ে যাবে, গার্মেন্টস শিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে এবং বেকার হয়ে পড়বে লক্ষ লক্ষ মানুষ। আমরা তখন এই প্রবল আওয়াজের বিরুদ্ধে না বলেছিলাম, জনগণ আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন, এবং গ্যাস রপ্তানির ভয়াবহ আয়োজন পরাস্ত হয়েছিলো। এটা হয়েছিলো বলে দেশে এখনও গ্যাস আছে, বাতি জ্বলে, কারখানা চলে, ব্যবসা চলে, সিএনজির কারণে ঢাকা শহরে এখনও শ্বাস নেওয়া যায়। যদি তখন এই গ্যাস রপ্তানি হতো তাহলে আজ অর্ধেক বিদ্যুতও উৎপাদন করা সম্ভব হতো না। 

যারা তখন এই গ্যাস রপ্তানির জন্য লম্ফঝম্ফ করছিলো তারাই কয়েকবছর পর শুরু করলো বিদেশি আনাড়ি কোম্পানির মাধ্যমে উন্মুক্ত খনি আর কয়লা রপ্তানির পক্ষে প্রচার। উত্তরবঙ্গে গ্যাস না দিয়ে সেই গ্যাস বিদেশে রপ্তানি করতে চেয়েছিলো যারা, তারাই প্রচার করতে থাকলো উন্মুক্ত খনি ছাড়া উত্তরবঙ্গের উন্নয়নের, বিদ্যুতায়নের আর কোন পথ নেই! তাদেরই কেউ কেউ এখন সুন্দরবনবিনাশী প্রকল্পের পক্ষে ভাড়া খেটে যাচ্ছে। 

ফুলবাড়ী, সুন্দরবন সহ বিভিন্ন জন গুরুত্বসম্পন্ন আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এরকম প্রশ্ন আমরা প্রায়ই শুনি যে, ‘আপনারা কয়লা উত্তোলন করতে দিচ্ছেন না, গ্যাস উত্তোলন করতে দিচ্ছেন না। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের বিরোধিতা করছেন, পারমাণবিক বিদ্যুতের বিরোধিতা করছেন। তাহলে বিদ্যুৎ কীভাবে হবে? উন্নয়ন কীভাবে হবে?’ কেউ কেউ প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করেন, ‘আপনারা আসলে কী চান? আপনারা তো সবকিছুরই বিরোধিতা করেন। আপনারা টিকফার বিরোধিতা করেন, তেল গ্যাস নিয়ে চুক্তির বিরোধিতা করেন, গ্যাস রপ্তানির বিরোধিতা করেন, উন্মুক্ত খনির বিরোধিতা করেন, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করেন, রেন্টাল কুইক রেন্টালের বিরোধিতা করেন, বিশ্বব্যাংকের বিরোধিতা করেন, ট্রানজিটের বিরোধিতা করেন। বাংলাদেশকে আসলে আপনারা কোথায় নিতে চান?’ আমি এইসব ভদ্রলোকের উদ্দেশ্যে বলি, আপনারা প্রশ্নটা আরও সংক্ষেপে এইভাবে করতে পারতেন যে, ‘আপনারা কেনো জনগণের সম্পদ ডাকাতি, দুর্নীতি, অস্বচ্ছতা আর জনবিরোধী তৎপরতার বিরোধিতা করেন? কেন প্রাণ প্রকৃতি দেশকে বিপন্ন করবার প্রকল্পের বিরোধিতা করেন?’

হ্যাঁ, আমরা এগুলোর বিরোধিতা করি। আমরা এগুলোতে না বলি কেননা আমরা মনে করি দেশকে যা বিপন্ন করে তা উন্নয়ন নয়। আমরা চাই, দেশের সকল সম্পদ জনগণের, তার মালিকানায় তার স্বার্থে এগুলোর সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই, দেশের সীমিত সম্পদ কতিপয় দেশি বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে রপ্তানির নামে পাচার না হোক। এর শতভাগ দেশের কাজে লাগুক। আমরা চাই, বর্তমানের জন্য ভবিষ্যতকে ধ্বংস করা যাবে না। আমরা চাই, দেশের উন্নয়ন নীতির কেন্দ্রে থাকবে মানুষ, কতিপয় গোষ্ঠীর মুনাফা নয়। উন্নয়নের নামে যখন দেশের প্রধান আশ্রয় সুন্দরবনকেও ধ্বংস করার আয়োজন চলে তখন আমাদের দায়িত্ব প্রবল না দিয়ে সুন্দরবন রক্ষা করা। যখন উন্নয়নের নামে ফুলবাড়ীসহ উত্তরবঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ করে কয়লাসহ খনিজ সম্পদ লুট করার উদ্যোগ নেয়া হয় তখন তার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করা আমাদের দায়িত্ব।   

বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে হবে নিশ্চয়ই, কিন্তু তার জন্য নিজেদের গলাকাটার প্রস্তাব মানুষ কেন গ্রহণ করবে? ২০১৭ সালের ২২ জুলাই জাতীয় কমিটির প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনায় বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের যে রূপরেখা দেয়া হয়েছে তাতে স্পষ্ট হয় যে, সমাধান খুবই সম্ভব। তারজন্য ফুলবাড়ী, রামপাল, রূপপুর, পায়রা, বাঁশখালীর মতো প্রাণ প্রকৃতি সম্পদ ধ্বংসকারী ঋণনির্ভর প্রকল্প দরকার নেই। সৌর ও বায়ু বিদ্যুতের বিশাল সম্ভাবনা কাজে লাগালে কয়লা বা পারমাণবিকের মতো বিপজ্জনক পথে হাঁটতে হবে না। জাতীয় সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে নবায়নযোগ্য ও অনবায়নযোগ্য জ্বালানীর সমন্বয়ে সমাধানের যে পথনকশা জাতীয় কমিটি থেকে প্রস্তাব করা হয়েছে তা সারাদেশে সুলভে, নিরবচ্ছিন্ন, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ যোগান দিতে সক্ষম। 

তাই এই বছরে দাবি উঠেছে: অবিলম্বে এশিয়া এনার্জি (জিসিএম)কে দেশ থেকে বহিষ্কারসহ ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে। ফুলবাড়ী নেতৃবৃন্দের নামে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। দুর্নীতির দায়মুক্তি আইন ও সুন্দরবনবিনাশী রামপাল প্রকল্প বাতিল করে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সকল প্রকল্প নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। মন্ত্রী ও জ্বালানি উপদেষ্টাদের ভূমিকা তদন্ত করে এই জ্বালানি অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করতে হবে। জাতীয় সক্ষমতার বিকাশের মাধ্যমে শতভাগ গ্যাস দেশের কাজে লাগাতে হবে। সারাদেশে সুলভে সার্বক্ষণিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে জাতীয় কমিটির প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। 

আনু মুহাম্মদ: শিক্ষক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। সম্পাদক: সর্বজনকথা
ইমেইল: anu@juniv.edu

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ফুলবাড়ী

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0295 seconds.