• ২৩ আগস্ট ২০১৯ ১৬:৪০:১২
  • ২৩ আগস্ট ২০১৯ ১৭:২৬:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

চুল নিয়ে চুলকানি

ছবি : সংগৃহীত


রফিউর রাব্বি :


আইয়ুব খানের শেষ সময়টিতে শাসকগোষ্ঠী দেশে কিছু নিয়ম-কানুন চালু করেছিল। বাজার থেকে মুরগি কিনলে তার পা-ধরে ঝুলিয়ে রাস্তা দিয়ে নেয়া যাবে না, পাখা ধরে বহন করে নিতে হবে, ফুল-হাতা সার্টের হাত গুটিয়ে পরা যাবে না ইত্যাদি। সেনাবাহিনীর লোকদের চুলের-ছাট, পোশাক-আশাকে নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম মেনে চলার বিধান রয়েছে, যা সাধারণের জন্য প্রযোজ্য নয়। 

সমাজে মানুষের সংস্কৃতি এক হলেও রুচিবোধ, দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তায় বৈচিত্র ও ভিন্নতা স্বাভাবিক। এটিই সংস্কৃতির সৌন্দর্য। আমাদের স্বাধীনতার পরপর দেশে লম্বা জুলফি, কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুল রাখার একটি জোয়ার শুরু হয়েছিল। তখন খদ্দরের জামা ও বেলবটম প্যান্টে (বড় চেক বা ডোরা কাটা কাপড়ে নীচের দিকটা অস্বাভাবিক ঢোলা) দেশ ছেয়ে গেল। লম্বা জুলফির হাওয়াটা অবশ্য ইউরোপ থেকে এসেছিল। গত শতকের মধ্য-ষাটের দশকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এটি ছড়িয়ে ছিল। আমাদের দেশকে সত্তর দশকের শুরুতে এটি আচ্ছন্ন করলো। ১৯৮১/৮৩ পর্যন্ত এটি চলেছিল। এটা হচ্ছে একটি ফ্যাশন। সময়ের সাথে সাথে তা বদলে যায়। 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর শেষের কবিতায় বলেছেন, ‘ফ্যাশনটা হচ্ছে মুখোশ আর স্টাইলটা হচ্ছে মুখশ্রী।’ সময়ের সাথে সাথে ফ্যাশন বদলে যায়, মুখশ্রীটাই টিকে থাকে। তাই বলে ফ্যাশনকে জোর করে বদলানো যায় না, এর স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া আছে। ফ্যাশনের সাথে রুচিবোধ, নিজস্ব-শিক্ষা, ভাবনা ও বিশ্ব-সংস্কৃতির একটি সম্পর্ক রয়েছে। এটি খোলা-জানালার মতো। ‘দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে।’ মানুষ যা ভালো মনে করবে তা গ্রহণ করবে। সমাজে মানুষের সে স্বাধীনতা থাকতে হবে। দেখার বিষয় হচ্ছে তার সে স্বাধীনতায় অন্যের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছে কী না। রাষ্ট্র বা সরকারের এখানে জোর-জবরদস্তির কোনো সুযোগ নেই এবং অধিকারও নেই। 

রাষ্ট্রের বিভিন্ন অনিয়ম, অব্যবস্থা, অন্যায়, দুর্নীতির সমাধানে সরকার বা প্রশাসন যখন ব্যর্থ হয় তখনই তারা এসবে হস্তক্ষেপ করে থাকে। এইটি একটি মূর্খতা ও রাষ্ট্রিয় বর্বরতা। সম্প্রতি দেশের কোন কোন জায়গায় ছেলেদের চুলের ছাট নিয়ে প্রশাসন থেকে যা করা হচ্ছে তা এক ধরনের বর্বরতা। আমাদের কিশোর-তরুণদের মধ্যে এখন এক ধরনের চুলছাটের প্রচলন শুরু হয়েছে। এইটি পার্শবর্তী আরো অনেক দেশে এখন চলছে। এইটি এক সময় থাকবে না। আজকে যে কিশোর বা তরুণরা এভাবে চুল কাটছে এক সময় হয়তো তারাই এ সময়টা ভেবে লজ্জা পাবে। তাই বলে এখন তাদের প্রতি জোর খাটিয়ে তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথ ও মানসিক-শক্তিতে আঘাত করা কোনোভাবেই সঙ্গত নয়।

দেশের লক্ষ-কোটি টাকা যখন বিদেশে পাচার হয়ে যাচেছ, আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা কাউকেই যখন ধর্ষণ থেকে রক্ষা করা যাচ্ছে না, মাদক ও সন্ত্রাস দমনের নামে সরকার বিরোধী মতকে দমনে যখন নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চলছে, বিচার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সর্বত্র যখন দুর্নীতিতে আচ্ছন্ন, সরকারি দলের কর্মী ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ড যখন জনগণকে নিরাপত্তাহীন করে তুলেছে তখন এসব চুলকাটা, তরুণ-তরুণীর হাতধরে হাটা না-হাটা এসব ছাই-পাশ নিয়ে মাতার অর্থ হচ্ছে জনগণের চোখে কালো চশমা এঁটে দেয়া। এসব আইয়ুব খানদের দেখানো পথ, স্বৈর-শাসকের লক্ষণ।

লেখক: সাংস্কৃতিক সংগঠক ও লেখক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0203 seconds.