• ২২ আগস্ট ২০১৯ ২১:৫৬:২৩
  • ২২ আগস্ট ২০১৯ ২২:০৩:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

রবি শস্য-১


শওকত শাফি :  


রবীন্দ্রনাথ শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধ কবি হিসেবেই মারা গেছেন। কবিদের কালোত্তীর্ণ সীমা অতিক্রম করতে পারেননি; চিরযৌবনবতী নন। তার লেখা বার্ধক্যে জর্জরিত। এক প্রচ্ছন্ন অহমবোধে মানুষ গোলাপকে সুন্দর বলে বটে; প্রাকৃতিক কাঠামো ভাঙনের ক্ষমতার কথা রবীন্দ্রনাথে নেই। প্রকৃতির বন্দনায় তিনি মত্ত। যদি এখানে ওখানে দু চারলাইন বার করেন তবে বলবো, ওটা তার বাস্তবিকবিচ্যুতি।

তবু রবীন্দ্রনাথই আমাদের গুরু। তিনি আমাদের অন্তরের জ্যোতি; আমাদের মহত্তম সুন্দর।

রবীন্দ্রনাথ যখন বাংলার হয়ে কলম ধরেন তখন বাংলা কথা বলা শিখে নাই। দু চারজন বাঙালি পড়তে শিখেছে কেবল। সংগত ঐতিহাসিক কারণেই রবীন্দ্রনাথ এক মায়ার জগতে আটকে গেছেন। তিনি বিজ্ঞানের চোখে সভ্যতাকে দেখতে পান নাই; দেখেছেন মায়ার চোখে, মানুষের চোখে। তিনিও প্রাচীন ঋষিদের মত খালি পায়ে হেঁটেছেন তাজা ফুলের উপর।

নানান দোষে আমাদের নিউটন-ম্যাক্সওয়েল-মার্কসের মত চিন্তাবীদ নাই। রবীন্দ্রনাথ কম্পাস ধরেছেন হৃদয়ের দিকে। ভারতীয় উপমহাদেশের চিন্তা বরাবরই শ্রমবিচ্যুত। শ্রমিকদের প্রাগৈতিহাসিক কাল হতে বলা হতো শুদ্র। শ্রমবর্জিত মানুষই দৃশ্যত হলেও মহান।

এখানে অভিজাত প্রথা ধর্মের মাধ্যমে সংরক্ষিত, এই শ্রমবর্জিত আভিজাত্যের সঙ্গা এখনো আপনার আমার মাথায়।

রবীন্দ্রনাথ শ্রমিকের হয়ে কথা বলেননি। তিনি বিজ্ঞানী ছিলেন না। তার প্রভাবিত ভাষায় আপনি আমি লিখছি; এ ভাষা তিনি তৈরি করেননি; সমৃদ্ধ করেছেন। তিনিই দেখিয়েছেন, বৃহৎ পড়ুয়াদের একজনই পড়াতে পারে; তিনি আমাদের মধ্যযুগের শেষ শিক্ষক।

ইদানিং জাতীয় সঙ্গীত বিতর্কে রবীন্দ্রনাথ নানা মহলে নানানভাবে চর্বিত; কেউ তারে সাম্প্রদায়িক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়বিরোধী, মধ্যবিত্তের ইন্দ্রিয়সুখ, যার মুখে কিচ্ছু নাই, সে-ও রবীন্দ্রনাথের মত শুদ্ধ ভাষায় বলছে, ‘সে চুরি করিয়াছে; কেবল সুরটুকুই নয়; গলাটুকু-ও।’

অনেক পরিচিত মানুষ বলছে, তারা রবীন্দ্রনাথ বর্জন করবে সমাজতন্ত্র এলে; চলমান ছোট বুর্জোয়ারাই তাদের স্বার্থে এই বৃদ্ধটাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তারা নন্দনতত্ত্বের দোহাই দিয়ে রবীন্দ্রনাথকে বাদ দেয়; তারা হয়তো মনে করে রবীন্দ্রনাথের শ্মশানে আলাদা বাজেট থাকা দরকার।

শুরুতেই বলেছিলাম, রবীন্দ্রনাথের জন্ম ধোঁয়াশার মাঝে; এখন বাংলা হাজারগুণে অন্ধকারে। তিনি সেই ধোয়াশা, অন্ধকার, এক বাকহীন পাঠকদের মাঝে বসে লিখছিলেন গদ্য-পদ্য-গীত-নাটক-কত কী, সব। তার ফুলের ঘ্রাণ ভালো; পাটায় ঘোঁষে শরবত খেলে অসুখ সারবে না।

বিজ্ঞান যদি বলে রবীন্দ্রনাথের গান অস্বাস্থ্যকর, সুরহীন, তাল লয়হীন, মগজের বিকাশের জন্য ক্ষতিকর, সভ্যতার জন্য হুমকি, মানুষের ঐক্যে বাঁধা, দৈনন্দিন জীবনের জন্য অশান্তি; তবে বাদ দিন। তিনি শ্রমিকের গান লিখেননি, তিনি সংগ্রামের কথা বলেননি, তিনি মানুষের সমতার জন্য অনশন করেননি; তিনি নোবেল পেয়েছিলেন, অতএব দালাল; সে সাম্রাজ্যবাদকে রসদ দিয়েছে; স্তুতি জানিয়ে কবিতা লিখেছে; মিলে মিলে গলে গেছে! কত কী অজুহাত! অতএব পরিত্যাজ্য।

ঈশ্বরগুপ্ত ভোর বেলায় বিদায় নিলেও রবীন্দ্রনাথই এখনো গান গায়; এ তার অপরাধ নয়। নির্বিচার প্রাণীসুলভ বুদ্ধির পক্ষেই তাকে অপরাধী সাব্যস্ত করা সম্ভব। তিনি কোন শর্তেই বিষবৃক্ষ নন; তিনি বিজ্ঞানীও নন, তিনি আনন্দ; তিনি জাদুঘরের মহৎ আয়না হয়ে চিরকাল থাকবেন বাঙালির চোখে।

লেখক : কবি ও গল্পকার

সংশ্লিষ্ট বিষয়

শওকত শাফি প্রবন্ধ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1098 seconds.