• ২২ আগস্ট ২০১৯ ০১:৩৭:২৫
  • ২২ আগস্ট ২০১৯ ০১:৩৭:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

মব লিঞ্চিং, একজন প্রদীপ দাস এবং নিভে যাওয়া আলো

ছবি : সংগৃহীত

কাকন রেজা :

গণপিটুনির শিকার এক ব্যক্তিকে বাঁচাতে গিয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছেন গণমাধ্যমকর্মী প্রদীপ দাস। এই প্রদীপ দাসকে আমি চিনি, যিনি অন্যায় দেখে চোখ ‍বুঁজে পাশ কাটিয়ে যাবার লোক নন। নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় নিজ দায়িত্ব পালনের সময় তিনি আক্রান্ত হয়েছিলেন। কিন্তু দায়িত্ব থেকে সরে যাননি কিংবা পালিয়ে বাঁচেননি। ঢাকার গণমাধ্যমে তরুণদের যে কয়জন এখনো বুকে পেশাদারিত্ব পুষে রাখেন, তাদেরই একজন প্রদীপ।

কারওয়ান বাজারে ‘চুরি’র অভিযোগে এক যুবককে গণপিটুনি দেয়া হচ্ছিল, তার বাধ সেধেছিলেন প্রদীপ। কিন্তু উল্টো হেনস্থার শিকার হয়েছেন তিনি। কদিন আগে ‘গুজবে’র জেরে গণপিটুনিতে রেনুর মৃত্যু সারাদেশকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখন মোটামুটি ছেলেধরার সে ‘গুজব’ নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ‘গণপিটুনি’ কি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে? থাকলে ‘চোর’ বলে একজন মানুষকে কেন বেধরক মারধর করা হবে। তাও আবার আইনশৃংখলা বাহিনীর লোকজন উপস্থিত থাকতে! তবে কি ‘ছেলেধরা’র পর গণপিটুনির নতুন স্পেল ‘চোর’!

প্রদীপ দাস অভিযোগ করেছেন, তিনি গণপিটুনি থেকে মানুষজনকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করলে উল্টো আইনশৃংখ্লা রক্ষায় নিয়োজিতরা তাকে হেনস্থা করেন। আশ্চর্য হতে হয়। যেখানে সরকার ‘গণপিটুনি’র বিরোধীতা করছেন নানাভাবে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থেকে শুরু করে পুলিশের বড়কর্তারা ‘গণপিটুনি’র বিরোধীতা করে সভা-সেমিনার করছেন। মানুষকে সচেতন করতে রাস্তায় নেমেছেন। সেখানে ঢাকার কাওরান বাজারের মতন জনবহুল স্থানে গণপিটুনির এমন ঘটনা ঘটে কিভাবে, তাও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোক উপস্থিত থাকা অবস্থায়, সেটাই প্রশ্ন ও বিষ্ময়ের বিষয়।

আমি আগেও বলেছি ‘মব জাস্টিস’র কথা। অনেকবারই বলেছি। ‘মব জাস্টিস’র এর কারণ বলতে গেলে উঠে আসে জাস্টিস ডিনাইড বা ডিলেইড এর কথা। মানুষ যখন আইনের উপর বীতশ্রদ্ধ হয় তখন, যখন সঠিকভাবে আইন প্রয়োগের সম্ভাবনা, বিচারের সম্ভাবনার উপর মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হয় তখনই ঘটে ‘মব জাস্টিসে’র উত্থান। আর ‘মব জাস্টিসে’র পরবর্তী অধ্যায় ‘লিঞ্চিং’। হালের ভাষায় যা হলো ‘গণপিটুনি’।

‘মব’ যখন সৃষ্টি হয় তখন আর স্বাভাবিক বিবেক বোধ কাজ করে না। মানুষ তখন আগেপিছু চিন্তা না করে তাৎক্ষণিক বিচার চায়। ‘মব জাস্টিস’ হলো সেই তাৎক্ষণিক বিচার। আর সেই বিচারের রায় এবং শাস্তির প্রক্রিয়াও হয় তাৎক্ষণিক, যা হলো ‘মব লিঞ্চিং’। সুতরাং একে সমর্থন করা বা এমনটা করতে দেয়া কোন বিবেক ও বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্ম নয়। এমন একজন মানুষ চোখের সামনে এহেন দুষ্কর্ম ঘটতে দেখলে বাধা দেবে, প্রদীপ দাস তাই করেছে।

এখানে প্রদীপ অবশ্যই ধন্যবাদ পাবার যোগ্য, অথচ উল্টো হয়েছেন হেনস্থার শিকার। অবস্থা যদি এমনটা হয় তবে মানুষ কেন ভালো কাজে এগিয়ে আসবে! একজন রাস্তায় আহত হয়ে পড়ে আছেন। তাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে গেলে যদি নিজের পুলিশী ঝামেলায় পড়তে হয়, থানায় চক্কর কাটতে হয়। তাহলে সে কেন নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে।

একটি ঘটনা বলি, দরিদ্র এক তরুণ একটি মোবাইল কুড়িয়ে পেয়েছিলেন। দামী মোবাইল। তাই সে মোবাইলটি এক দায়িত্বশীলকে দিতে গেলেন। কিন্তু গিয়েছেন তো মরেছেন। প্রথমেই সেই দায়িত্বশীলের ‘তুই’ বলে সম্বোধন। তারপর ঝাড়ি, ‘এই মোবাইল তুই কোথায় পেলি, চুরি করেছিস, এখন ধরা পড়ার ভয়ে দিয়ে দিচ্ছিস।’ যে বেচারি মোবাইলটা দিতে গিয়েছে তার অবস্থাটা বুঝুন। সে কি ভুলেও কোনদিন কারো উপকার করতে যাবে? যাবে না।

এই যে মানুষের ভালো কাজে এগিয়ে না যাওয়ার সৃষ্ট অবস্থা এতে সামাজিক শৃংখলা নষ্ট হচ্ছে। আগেও অনেকবার বলেছি আমাদের সামাজিক শৃংখলা ভেঙে পড়েছে। তার কারণ মানুষকে ভালো কাজে উৎসাহিত না করা। বিদেশে হলে যে কাজের জন্য মানুষ পুরস্কৃত হতো, এখানে হতে হয় তিরস্কৃত।

বলতে পারেন, মানুষকে উৎসাহিত করতে নানাবিধ কার্যকলাপই তো চোখে পড়ে। হ্যাঁ পড়ে। সাথে পড়ে ময়লা ঢেলে ময়লা পরিষ্কার করার দৃশ্যচিত্রও। মূল কাজের অনেক ক্ষেত্রেই কি হয় তার প্রমান তো প্রদীপ দাস। সেতো উৎসাহিত হয়েই ‘মব লিঞ্চিং’ ঠেকাতে গিয়েছিল।

এমনিতেই সামাজিক শৃংখলা ভেঙে পড়ছে। স্বয়ং হাইকোর্ট বিস্মিত হচ্ছেন। রিফাত হত্যাকান্ডের বিষয়ে বলতে গিয়ে হাইকোর্ট বিস্মিত হয়েছেন, রিফাতকে বাঁচাতে মানুষের না এগিয়ে আসাতে। মানুষ মানুষের বিপদে এগিয়ে আসছে না। এই না আসা সামাজিক শৃংখলা ভেঙে পড়ার লক্ষণ।

সমাজের ভেঙে পড়া ঠেকাতে প্রদীপ দাসদের প্রতিরোধের আলোকে নিভিয়ে দেয়ার চেষ্টাটা আত্মঘাতী। বরং প্রতিরোধের এই আলোকে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা উচিত। এমনিতেই ক্রমশ অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি আমরা। চারিদিকে হত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, নিখোঁজের ঘটনা সেই অন্ধকারেরই দৃশ্যমান রূপ। সামাজিক ভাবে, নাগরিক সভ্যতায় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি। এরমধ্যে যে সামান্য আলোটুকু আছে তাও যদি নিভে যায় তাহলে এক ভয়ংকর আঁধার গ্রাস করবে আমাদের। আমরা সবাই হয়ে উঠবো অন্ধকারের জীব। সৃষ্টিকর্তা যেন এমন দিন থেকে আমাদের রক্ষা করেন।

লেখক : কলাম লেখক ও সাংবাদিক।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0219 seconds.