• ২১ আগস্ট ২০১৯ ২২:৫৩:১৮
  • ২১ আগস্ট ২০১৯ ২২:৫৩:১৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

বিচারকাজে বিস্ময়!

ছবি : সংগৃহীত

আসিফ আল আজাদ, ঝিনাইদহ থেকে ফিরে :

ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. তাজুল ইসলাম (যুগ্ম জেলা জজ) ছয় মাসে ৮০০ দেওয়ানী প্রকৃতির ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করেছেন। মামলার দ্রুত নিষ্পত্তিতে একে দৃষ্টান্ত বলছেন আদালত সংশ্লিষ্টরা।

সারাদেশে ৩০ লাখেরও বেশি মামলা জট রয়েছে। বিচার প্রার্থীদের হয়রানী বন্ধ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি থেকে মুক্তি দিতে বারবার আহ্বান জানানো হচ্ছে। তবে পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি দেখা যাচ্ছে না। বরং মামলা জট দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই পরিস্থিতিতে একজন বিচারকের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগে প্রশংসা পেয়েছেন মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে জজ কোর্ট ও সুপ্রীম কোর্ট আইনজীবীদের মুখে।

সদ্য বিদায়ী আইন সচিব আবু সালেহ মো. জহিরুল হক বলেন, ‘দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি অবশ্যই ভাল দিক একজন দক্ষ বিচারকের। সুপ্রীম কোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী নিম্ন আদালতের একজন বিচারকের মাসে ০৬ টি করে দেওয়ানী মামলা নিষ্পত্তি করতে হয়। আর ফৌজদারী মামলার ক্ষেত্রে কোন ধরাবাধা নিয়ম নাই।’

জেলা জজ আদালত ঝিনাইদহ সূত্রে জানা গেছে, ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) মো. তাজুল ইসলাম গত বছরের ২৫ শে নভেম্বর ২০১৮ যোগদান করেন। তিনি জেলা ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল (যুগ্ম জেলা জজ) হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। আদালতে যোগদানের পর প্রায় ৩,০০০ হাজার এর বেশি ল্যান্ড সার্ভে মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন তিনি। দায়িত্ব নেয়ার সময় তার এখতিয়ারে বিচারধীন ল্যান্ড সার্ভে মামলাসহ অন্যান্য মিস কেস ছিল ২৯৫৪ টিরও বেশি।

দায়িত্ব পালনের ছয় মাসে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনাল মামলা ৮০০ ওর বেশি নিষ্পত্তি হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮০ টি মামলা বেশ পুরানো। এই মামলা গুলো ২০১৪ সাল থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে দায়ের হয়েছে। এগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এই ছয় মাস ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলায় স্থানীয় প্রায় ১০০০ সাক্ষীর জবানবন্দি নিয়েছেন বিচারক। মিস মামলায়ও ২০০ এরও বেশি সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রায় ২০০ টি নতুন মোকদ্দমায় ট্রাইব্যুনালে ইস্যু গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। এছাড়া আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ মোকদ্দমা ফাইল তথা দাখিলের ০৬ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করেছে। এমন আরো অনেক মামলা চার/পাঁচ মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই বিচারক ইতিপূর্বে ঠাকুরগাঁও ও মেহেরপুর জেলা জজ আদালতে যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে কর্মরত থাকাকালে উক্ত দ্বিতীয় আদালত সমূহে সারা দেশে কোথাও স্টেনোগ্রাফার না থাকা স্বত্ত্বেও যুগ্ম জেলা জজ তাজুল ইসলাম নিজে টাইপ করে রায় লিখে ঘোষণা করতেন। রাত-অবধি তিনি বিচারিক কাজ করতেন নিজ উদ্যেগে। আদালত সমূহের সকল প্রকার মামলায় সাক্ষীদের হাজির করে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতেন যা এই ট্রাইব্যুনালেও অব্যহত আছে। এসব কারণে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হচ্ছেন এই বিচারক।

যুগ্ম জেলা জজ হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর এই বিচারক ঠাকুরগাঁওয়ে এবং মেহেরপুরের জেলা জজ আদালতের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতের দায়িত্বে থাকাকালে ওই আদালতের ফৌজদারি ৮০০ মামলা এবং দেওয়ানি ৭০০ মামলা নিষ্পত্তি করেছেন।

জানতে চাইলে ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) এজিপি দীল আফরোজ বলেন, ‘এই আদালতের বিচারক সব সময়ই চেষ্টা করেন দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করতে। তিনি বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) বিষয়ে বেশ গুরুত্ব দেন। অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তিনি বিচার কাজ করেন। অনেক সময় দেন। অফিসের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও তিনি কাজ করেন। ফলে আমাদের জেলা জজ আদালতে সবচেয়ে বেশি মামলা নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হচ্ছেন তিনি।’

ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের তথা জেলা জজ আদলতের জিপি সুবির কুমার সমাদ্দার এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের আদালতে সাক্ষীর উপস্থিতির হার ভালো। সাক্ষী গ্রহণ হয় ভালো। বিশেষ করে আমাদের বিচারকরা বেশ আন্তরিক। তারাও চেষ্টা করছেন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে। বিশেষ করে ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) তাজুল ইসলাম অত্যন্ত দক্ষ একজন বিচারক। তিনি অনেক মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করছেন। তিনি যে হারে মামলা নিষ্পত্তি করেছেন তাকে রেকর্ড বলা যায়।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) তাজুল ইসলাম বাংলা'কে বলেন, ‘আমার আদালতে সাক্ষী এলে ফেরত যায় না। আদালতের সময় শেষ হলেও সাক্ষীর সাক্ষ্য নিয়ে তাকে বিদায় দিই। পুরাতন মামলার সাক্ষীদের আদালতে এনে সাক্ষ্য প্রদান করতে নিজে জিপি অফিসের মাধ্যমে ওই সংশ্লিষ্ট মামলার সাক্ষীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে সাক্ষী আনার ব্যবস্থা করেন তিনি।’

দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির বিভিন্ন দিক তুলে ধরে এই বিচারক আরো বলেন, ‘প্রত্যেক মামলার ধার্য তারিখ ওপেন এজলাসে ঘোষণা করি। রায় লেখাসহ প্রত্যেক দিনের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করার চেষ্টা করি। প্রত্যেকটি মামলার নথি পুঙ্খনাপুঙ্খভাবে দেখে পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করি। এরপর এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ করি। নতুন মামলা দায়ের হওয়ার পর পক্ষগণের ওপর নোটিশ জারি হওয়ার জন্য জোর তাগিদ দিই।’

এছাড়া ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের মামলার সাক্ষী হাজির করানোর জন্য সমন যথাযথ স্থানে পৌঁছাচ্ছে কিনা তা প্রতিনিয়ত তদারকি করেন এই বিচারক। তিনি বলেন, ‘আমি রাত ৯টা পর্যন্ত অফিস করি। অনেক সময়ই বাসায় বসেও আদালতের কাজ করি। তাছাড়া এই ট্রাইব্যুনালের সাথে সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ সহকারী ও সেরেস্তা সহকারীগণ অত্যন্ত আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ থেকে মামলা নিষ্পত্তির পর ডিক্রি লেখাসহ অন্যান্য কাজ সঠিকভাবে দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করে দিচ্ছে। এ কারণে বেশি মামলার রায় দেয়া সম্ভব হচ্ছে।’

বিচারক তাজুল ইসলাম বলেন, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমেই অনেক মামলা নিষ্পত্তি করা যায়। সেটির ওপরই আমি বেশি জোর দিচ্ছি এবং ২৫০ টির অধিক কেস এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে নিস্পত্তি করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘আমি আইনমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকাকালে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির জন্য এডিআর বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিধান চালু করে দিয়েছি। সেটি হতে পারে দেশের মামলা জট নিরসনের সবচেয়ে প্রকৃষ্ট দিক। এটি ফৌজদারি মামলার ক্ষেত্রে সম্ভব। আমি দেখেছি কানাডা ৯৫ শতাংশ মামলা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়। ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) সেটা করে সফলতা দেখিয়েছেন। আমি এটি দেশেরসব নিম্ন আদালতের জন্য বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করছি। আমি মনে করি এটা অপশনাল না থেকে বাধ্যতামূলক করা উচিত।’

আদালতের বিভিন্ন ভোগান্তির দিক তুলে ধরে শফিক আহমেদ বলেন, ‘অনেক বিচারক আছেন, বৃহস্পতিবার আধাবেলা অফিস করে ঢাকায় আসেন। আবার রবিবার যেতে যেতে অর্ধেক সময় চলে যায়। একারণে এখন ৩০ লাখের ও বেশি মামলার জট তৈরি হয়েছে। তবে ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) মামলা নিষ্পত্তির যে উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন সেটি আমাদের বিচারকরদের অনুসরণ করা উচিত। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’

সুপ্রীম কোর্টের জ্যোষ্ঠ আইনজীবী শ. ম. রেজাউল করিম প্রতিবেদককে বলেন, ‘মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সময়ের দাবি। সারা দেশের বিচারকরা যদি সচেষ্ট হন তাহলে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করা সম্ভব, যেটা ঝিনাইদহের ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালের বিচারক (যুগ্ম জেলা জজ) করে দেখাচ্ছেন। এটি অবশ্যই বিচার বিভাগের জন্য ইতিবাচক এবং প্রশংসনীয় উদ্যোগ।’

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0194 seconds.