• ১১ আগস্ট ২০১৯ ১৯:৪৮:২৫
  • ১১ আগস্ট ২০১৯ ১৯:৪৮:২৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

হিন্দু তালেবান দ্বারা শাসিত হচ্ছে ভারত

নরেন্দ্র মোদি। ছবি : সংগৃহীত

হিন্দুদের অন্যতম প্রধান দেবতা বিষ্ণুর অনেকগুলো অবতার রয়েছে। এসব অবতারের মধ্যে মানুষরূপী অবতারের সংখ্যাই বেশি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিষ্ণুর এই অবতারের সর্বশেষ সংযোজন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মোদি ডান হাত তুলে ধরেছেন, সমগ্র ভারতজুড়েই মোদির এই  ছবিটিই সবচেয়ে বেশি প্রচারিত।

কিন্তু মোদির এই শক্তিশালী এবং অনুপ্রাণিত করা ইমেজের আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে ভীতি জাগানিয়া এক বাস্তবতা। মূলত এই ইমেজের আড়ালে মোদি শাসিত ভারতের হিন্দুত্ববাদীদের ক্রমবর্ধমান উগ্রতা লুকানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

বর্তমানে ভারতের ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী (৫০০ মিলিয়নের বেশি) এবং আঞ্চলিক ভিন্নতা গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। সম্প্রতি মোদির ভারতে গেরুয়াধারী হিন্দুত্ববাদীদের দাপট বেশি। যদিও বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ সরকার সরাসরি তাদের উৎসাহ দিচ্ছে না কিন্তু তাদের কর্মকাণ্ডের প্রতি যে একধরনের নীরব সম্মতি রয়েছে তা স্পষ্টই বোঝা যায়। এসব হিন্দুত্ববাদীরা সংখ্যালঘুদের একধরনের পর্যবেক্ষণের মধ্যে রাখেন। বিশেষ করে গরুর মাংস সংক্রান্ত যে কোন ব্যাপারেই তাদের উৎসাহ অনেক বেশি বলেই প্রমাণিত হয়েছে। গোরক্ষক নামে পরিচিত এই হিন্দু কর্মীরা গরু রক্ষার নামে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি নির্মম আচরণ করছে। এমনকি গরুর মাংস খাওয়ার সন্দেহে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের পিটিয়ে মেরে ফেলতেও দ্বিধাবোধ করছে না তারা।

বিশ্বজুড়ে অনেকেই ভারতকে কাশ্মীরীদের প্রতি নৃশংস আচরণের জন্য, ক্রিকেটে পরাক্রমশালী দেশ অথবা ভয়াবহ ধর্ষণের দেশ হিসেবেই জানে। কিন্তু এগুলোর বাইরেও অনেকেই জানেন না বর্তমানে ভারত চীনের অনুকরণে নিজেকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত করার ব্যাপারেই বেশি আগ্রহী। বিপুল জনগোষ্ঠীর বিশাল এই দেশ পশ্চিমাদের কাছে আকর্ষণীয় বাজার এবং বিনিয়োগের সুবিধা নিয়েই হাজির হচ্ছে।

এর ফলে মানবাধিকার লংঘনের ঘটনাগুলো বাণিজ্যের কাছে হার মেনে যাচ্ছে। ফলে ক্রমবর্ধমান হিন্দুত্বের জোয়ারে ভারতীয় সংখ্যালঘুরা ভেসে গেলেও পাশ্চাত্য দেশগুলোর কাছে বিষয়টি খুব একটা উদ্বেগজনক বলে মনে হচ্ছে না।

মানবাধিকার লংঘনের কারণে অথবা জোচ্চুরি করার কারণে কেউ তাকে জবাবদিহিতার জন্য বাধ্য করছে না।  বিগত ৫ বছর ধরে তিনি ভারত শাসন করে আসছেন তার শাসনামলে এটি সুস্পষ্ট যে, তার সমালোচনাকে তিনি সহৃদয়তার সঙ্গে কখনোই গ্রহণ করেননি। এমনকি তার প্রশাসন যে অবিরত ভিন্ন মতাবলম্বীদের কণ্ঠরোধ করে দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে সে ব্যাপারেও পাশ্চাত্যের নেতাদের কোন মাথাব্যথা নেই।

সম্প্রতি ভারতে সরকারের সমালোচনা করা সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা করারও হুমকি দেয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে সমাজকর্মী তিস্তা শীতলভাদের কথা বলা যেতে পারে। ২০০২ সালে গুজরাটের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য  ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় আছেন তিনি। প্রসঙ্গত, সে সময় নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে তাকে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে।

এমনকি আদিবাসীদের উপর পুলিশের নির্যাতনের ব্যাপারে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করার অপরাধে সন্তোষ যাদব নামে একজন সাংবাদিককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের ধারণা,তাকে মিথ্যা অভিযোগে ফাঁসানো হয়েছে।

গণতন্ত্রের এই উদ্বেগজনক অবক্ষয় একটি পিচ্ছিল ঢালের মত। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে টার্গেট করেই যার যাত্রা শুরু তার শেষ গন্তব্যস্থল হয়তো দেশের অভ্যন্তরে যে কোন ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমন করার মধ্যেই পরিণতি লাভ করবে। বর্তমানে দেশজুড়ে একটি ভীতির পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। এটি অ্যাকটিভিস্ট, শিল্পী এবং বুদ্ধিজীবীদের নীরব থাকার হুমকি দিচ্ছে। এর আগে কখনো এই ব্যাপারে তাদের কোন ধারণা ছিল না।

ভারতে বর্তমানে তালেবানের হিন্দু সংস্করণ কায়েম করা হয়েছে। এই শাসন ব্যবস্থায় জনগণকে বলা হচ্ছে, আমার মতামতই সঠিক। যারা ভিন্ন মতাবলম্বী তাদের উপর প্রবল চাপ রয়েছে। মোদির প্রথম শাসনামলে ভারতজুড়ে প্রগতিশীল লেখকদের মধ্যে পুরষ্কার ফিরিয়ে দেয়ার হিড়িক উঠেছিল। মূলত গরুকে কেন্দ্র করে মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা এবং বুদ্ধিজীবিদের উপর হামলার প্রতিবাদে তারা নিজেদের পাওয়া সব সরকারী পুরষ্কার ফিরিয়ে দিতে শুরু করেন।

১.২৫ বিলিয়ন মানুষের দেশ ভারত। এদের মধ্যে ৯৬৫ মিলিয়ন হিন্দু এবং ১৭০ মিলিয়ন মুসলমান। এতসব ভিন্নতা থাকা সত্ত্বেও দেশটিতে সহিষ্ণুতার দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। বৈচিত্র্যতা নিয়েই বিশাল এই দেশটি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু বর্তমান সরকারের হিন্দু জঙ্গিবাদ অন্যান্য ধর্মের মানুষকে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীতে পরিণত করার পাশাপাশি সব সম্প্রদায়ের মধ্যে যে বন্ধন ছিল তাও ছিন্নভিন্ন করে ফেলছে। সামনে আরো কি ঘটতে চলেছে সেটি নিয়ে আতংকে আছেন ভিন্ন মতাবলম্বীসহ শুভবুদ্ধির অনেকেই।

চলতি বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের জাতীয় নির্বাচনে বিপুল পরিমাণ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন নরেন্দ্র মোদি। এবার তার দল বিজেপি লোকসভার ৫৪৩ টি আসনের মধ্যে ৩০৩ টি আসনে জয়লাভ করে। ফলে নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অন্য দলের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে না তাদের। আর এই সুযোগের মোক্ষম ব্যবহারই করল মোদি সরকার। সোমবার এক মুহূর্তের সিদ্ধান্তেই মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বিলুপ্ত করে দেয়া হয়। এর ফলে রাজ্যটি এতদিন ধরে যে স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে আসছিল তা বাতিল হয়ে যায়। এছাড়া জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যটিকে ভেঙ্গে দুই টুকরা করা হয়। ফলে কেবল স্বায়ত্তশাসনই নয় রাজ্যের মর্যাদাও হারিয়ে ফেলে এই অঞ্চলটি।

এদিন ৩৭০ ধারার পাশাপাশি ৩৫ এ ধারাটিও বাতিল করা হয়। এই ধারা অনুযায়ী, ভারতের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের কোন বাসিন্দা কাশ্মীরে জমি কিনতে পারতো না। কিন্তু এখন এটি বাতিল করে দেয়ার ফলে আশংকা করা হচ্ছে, ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ কাশ্মীরে জমি কিনবে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কাশ্মীরের ডেমোগ্রাফি বা জনসংখ্যাগত চরিত্র বদলে দেয়ার জন্যই মোদির হিন্দুত্ববাদী সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে। অথচ কাশ্মীর ছাড়াও ভারতের আরো ১১টি রাজ্যেই রাজ্যের অধিবাসী ছাড়া অন্য কেউ জমি কিনতে পারে না। অনেকেই প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন কেবলমাত্র মুসলমান বলেই কি কাশ্মিরীদের প্রতি এই অন্যায় আচরণ করা হয়েছে।

কাশ্মীরের অধিবাসীদের ১৪৪ ধারা কারফিউ জারি করে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এমনকি রাজ্যটির রাজনৈতিক নেতাদের গৃহবন্দী করে রাখা হয়। এখনো পর্যন্ত ওই এলাকায় কারফিউ বলবৎ রয়েছে। অথচ দুই দিন পরেই মুসলমানদের পবিত্র ঈদ উল আজহা পালিত হবে। এবারের ঈদ তারা কীভাবে উদযাপন করবে এই ব্যাপারে মোদি সরকারের কোন মাথাব্যথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। এদিকে রাজ্যের মর্যাদা হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে কাশ্মীরের জনগণ।

মোদির প্রথম শাসনামলে গোরক্ষকদের তান্ডবে মুসলমান এবং দলিত সম্প্রদায়ের লোকজন বেশ বিপাকেই পড়েছিলেন। বিশেষ করে মুসলমানদের লক্ষ্য করেই বেশিরভাগ হামলা এবং হত্যার ঘটনা ঘটেছে।

এবার মোদির দ্বিতীয় শাসনামলে গোরক্ষকদের পাশাপাশি জয় শ্রীরাম স্লোগান দেয়া কিছু হিন্দুত্ববাদীদের আবির্ভাব ঘটেছে। এদের  মূল লক্ষ্য হল মুসলমান তরুণ, যুবকদের জোর করে জয় শ্রীরাম স্লোগান দিতে বাধ্য করা। এমনকি কট্টর হিন্দুত্ববাদীদের মারের ভয়ে জয় শ্রীরাম বলার পরেও রেহাই মিলেনি তবরেজ আনসারি নামের ঝাড়খন্ডের ২৪ বছর বয়সি এক তরুণের। তাকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে তারা। গোরক্ষদের দমনের ক্ষেত্রে মোদির কন্ঠস্বর যেমন খুব জোরালো ছিল না, তেমনি জয় শ্রীরাম স্লোগানের ক্ষেত্রেও তাকে খুব একটা সরব হতে দেখা যায়নি।

এদিকে বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, ভারতের অর্থনীতির অবস্থা বেশ খারাপের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতীয়দের ভালো দিনের স্বপ্ন দেখিয়ে প্রথমবার নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে তিনি সফল হতে পারেননি। এবারের নির্বাচনে তার স্লোগান ছিল মোদির পক্ষেই সব কিছু করা সম্ভব। এবারও ভারতীয় ভোটাররা তাকে নিরাশ করেননি। তার সব ব্যর্থতাকে পাশ কাটিয়েই বিপুল ভোটে তাকে নির্বাচিত করেছেন।  কিন্তু সুড়ঙ্গের শেষে আলোর কোন রেখাই দেখা যাচ্ছে না। তাই জাতীয়তাবাদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদের মিশ্রণ ঘটিয়ে ভারতকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখিয়ে যাচ্ছেন মোদি।

(২০১৫ সালে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানে প্রকাশিত ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ ভাস্কর অনীশ কাপুরের লেখা অবলম্বনে লিখেছেন ফারহানা করিম।)

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ভারত তালেবান কাশ্মীর

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0244 seconds.