• ০৮ আগস্ট ২০১৯ ১৭:৫৫:০৩
  • ০৮ আগস্ট ২০১৯ ১৭:৫৬:৫৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

কাশ্মীর সংকট : আলো আসুক

ছবি : সংগৃহীত


মিলি সাহা :


গত ৫ই অগাস্ট কাশ্মীরের স্বায়ত্বশাসন সম্বলিত ৩৭০ ধারা বিলোপ করে রাজ্যটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে নিয়ে আসার মধ্য দিয়ে দেশটির ক্ষমতাসীন সরকার বিজেপি যে শুধু তাদের নির্বাচনী ইশতেহারই পূরণ করলো তা নয়, বরং তাদের ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রদর্শনীও করলো।

তবে কাজটি কিন্তু রাতারাতি করেনি, গত পাঁচবছরের শাসনামলে বিজেপি কাশ্মীরে ভারতীয় সৈন্য বাড়িয়েছে বহুগুন, পুলওয়ামা হামলার জের ধরে দেশটির স্বাধীনতাকামী দলটির নেতৃত্বকে করেছে কোনঠাসা এবং সম্প্রতি স্থানীয় সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় বস্তুত কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণই চলছিল।

গত মার্চ মাসে কাশ্মীরের জম্মু এন্ড কাশ্মীর লিবারেশন ফ্রন্টকে (জেকেএলএফ) নিষিদ্ধ করে ও এপ্রিলে তাদের নেতা ইয়াসিন মালিককে আর্থিক অনিয়মের মামলায় গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়েই মূলত ধারাটি বিলোপ হয়ে যায়। বাকিটা শুধুই আনুষ্ঠানিকতা।

ভারতীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন মূলত দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মোদি সরকারের ব্যর্থতা থেকে জনমানুষের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে অখণ্ড ভারতের ধুয়ো তুলে এবারের মতো পরবর্তী নির্বাচন গুলিতেও সুবিধা পেতেই এটি করা হয়েছে। যদিও কাশ্মীর ইস্যু বিজেপির প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক আদর্শের সাথে বরাবরই সম্পৃক্ত, বাজপেয়ীর শাসনামলে চিত্রটি ছিল ভিন্ন।

কাশ্মীরের সাথে ভারতের সম্পর্ক তখন এতটাই ইতিবাচক ছিল যে পরবর্তীতে কংগ্রেসের নেতৃবৃন্দও বিনা দ্বিধায় সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেছেন। সেই অর্থে কাশ্মীরে সংখ্যালঘুদের পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে ডেমোগ্রাফিক পলিটিক্স বা জনমিতি রাজনীতির যে অভিযোগ উঠছে বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে তা বলতে গেলে নরেন্দ্র মোদির নিজস্ব রাজনৈতিক কৌশল। 

৩৭০ ধারাটি কাশ্মীরি জনগণের  স্বায়ত্তশাসন, সংবিধান, ও পতাকার অধিকার দিলেও যে দুর্বল দিকটি সাধারণত আলোচনায় আসেনা সেটি হলো সংখ্যালঘু কাশ্মীরি পন্ডিত তথা স্থানীয় হিন্দুদের নিরাপত্তা বা সংরক্ষণের কোনো বিধান তাতে ছিল না। ভারতের প্রধান দুই বিরোধীদল কংগ্রেস ও বামপন্থীরা মূল ভারতে তাদের ভোটব্যাংক খ্যাত ধর্মীয় সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার নিয়ে যতই মাঠ গরম করেন না কেন, নেহেরুর করা ৩৭০ ধারার অপব্যবহার করে ১৯৮৯ সালে তৎকালীন আব্দুল্লাহ সরকার যে জঙ্গিদের সহায়তায় কাশ্মিরী পন্ডিত ও তাদের পরিবারের ওপর নির্মম অত্যাচার করে তাদের প্রায় সবাইকে দেশ ছাড়া করেছেন সে বিষয়ে কখনো মুখ খোলেন না।

কথিত আছে, সে সময় ২০-২৫% সংখ্যলঘু জনগোষ্ঠী রাতারাতি ৫% এ নেমে এসেছিলো। তাদের সবাইকে শিবসেনা বাল ঠাকরে মহারাষ্ট্রে আশ্রয় দিয়েছিলেন। ভোটের বাজারে তাদের কাছে বিজেপির একধরণের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। এছাড়াও, পঞ্চাশের দশকে বিজেপির মূল প্রতিষ্ঠাতা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ৩৭০ ধারা রধের আন্দোলনের প্রাক্কালে শ্রীনগরে নিরাপত্তা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনাটিও তাদের সিদ্ধান্তের পক্ষে রাজনৈতিক সমর্থন আদায়ের জন্য ব্যবহার করা হচ্ছে।

তাই মোদি সরকার যদি দাবি করে থাকে সংখ্যালঘুদের পুনর্বাসন শেষে কাশ্মীরে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে তারা বিশেষ মর্যাদা ফিরিয়ে দিবে, তাহলে অবশ্যই ৩৭০ ধারার এই সংশোধনী সহ সাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষণ করতে হবে, অন্যথায় পাকিস্তানি মদদে কাশ্মীরে চলমান জঙ্গি হামলা অব্যহত থাকলে পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও অবিশ্বাসের  অবসান হবে না এবং অস্বাভাবিক অবস্থা চলতেই থাকবে।  

এদিকে স্বাধীনতাকামী কাশ্মীরি জনগণ এই ধারা বিলোপে শুধু রাজনৈতিক স্বাধিকারই হারায়নি, এটিকে তারা মূলত সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রাসন হিসেবেই দেখছে। বিজেপি নেতারা মূল ভারতের সাথে কাশ্মীরের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মাধ্যমে যে নতুন সম্ভাবনার কথা বলছেন, তাতে স্থানীয়রা বরং নিজ জমি ও স্বাধীন জীবিকা হারিয়ে পুঁজিবাদী বাণিজ্যের শ্রমজীবি অংশতে রূপান্তরিত হওয়ার আশংকা করছেন। রয়েছে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু হওয়ার ভয়ও। এমনকি হিন্দু ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত জম্মু ও লাদাখ অঞ্চলের জন্যও এটিই সত্য। তাদের ঐতিহ্য ও সম্পদের একচ্ছত্র অধিকার তারা হারাবেন, এটি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্বাধীনতা হরণের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর ও দুঃখজনক।

ইতোমধ্যে তারা দাবি করছেন, ৩৭০ ধারা বিলোপের পূর্ব- প্রস্তুতি হিসেবে ভারত সরকার অমরনাথ তীর্থ-যাত্রা সহ অন্যান্য পর্যটন কর্মকাণ্ড ও যোগাযোগ ব্যবস্থার যে স্থগিতাদেশ দিয়েছে তাতেই আবহাওয়া-নির্ভর মৌসুমী ব্যবসায় জড়িত অধিকাংশ গরিব কাশ্মীরিদের অপূরণীয় অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়ে গেছে। সামনের দিন বা বছর গুলোতে কি হবে সেই অনিশ্চয়তাই তাদের তীব্র ক্ষোভের বড় কারণ।

মোদি সরকারকে তাই এই ক্ষোভ প্রশমনে স্বাধীনতাকামী বা জঙ্গি আন্দোলনের মতো রাজনৈতিক বা মারমুখী আচরণ না করে সহানুভূতি ও দায়িত্ব নিয়ে সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। নতুবা তারা কাশ্মীরিদের সাথে সাথে সাধারণ ভারতীয়দের আস্থাও হারাবেন, যাতে বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা ভাঙতে সময় লাগবে না। কংগ্রেস রাজনৈতিকভাবে মোদি সরকারকে টলাতে না পারলেও অশান্ত  জম্মু-কাশ্মীর সহজেই পারবে।  

এদিকে বাংলাদেশ সহ সমগ্র মুসলিম বিশ্ব পাকিস্তানের সহায়তায় জম্মু-কাশ্মীরের স্বাধীনতার বিষয়টিকে সমাধান হিসেবে দেখলেও বিষয়টি এতটা পরিষ্কার নয়, যেখানে পাকিস্তানের পাঠান সম্প্রদায়ের আগ্রাসন ও অনধিকার প্রবেশের প্রতিবাদেই জম্মু-কাশ্মীর স্বেচ্ছায় ৩৭০ ধারার অধীনে ভারত-ভুক্ত হয়েছে যা ১৯৪৭ এর দেশ ভাগেও হয়নি। ধারা বিলুপ্তির এই সিদ্ধান্ত সেই অর্থে অবৈধও।

পাকিস্তান যুদ্ধে জয়লাভ করবে কিনা সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় হলো পর্যটন ও প্রাকৃতিক সম্পদের স্বর্গ কাশ্মীর অধিকারের লোভ জঙ্গিবাদে জর্জরিত ভঙ্গুর অর্থনীতির এই দেশ সংবরণ করতে পারব কিনা। অবশ্য তিব্বত সীমান্তবর্তী লাদাখের বিষয়ে চীনারাও যদি একই মনোভাব পোষণ করে, তাহলেও বিষয়টি একইরকম হবে।

তাছাড়া, যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার মতো নেতৃত্ব ও রসদ ভৌগোলিক কারণে  স্বাধীন জম্মু-কাশ্মীরের যেমন নেই, তেমনি স্বাধীনতার নাম করে প্রকারান্তরে ভারত, পাকিস্তান বা চীনের অধিকৃত হয়ে স্থায়ীভাবে তা হারানো অর্থহীন, যেখানে সরকার বদল হলেই ৩৭০ ধারা ফিরে আসার সম্ভবনা রয়েছে। তাই, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনৈতিক তৎপরতা ও জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে একটি তড়িৎ সমাধান অধিক কাম্য। অবরুদ্ধ ভূ-স্বর্গ যেন আক্রান্ত না হয়!  

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।         

 

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাশ্মীর মিলি সাহা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0218 seconds.