• ০৬ আগস্ট ২০১৯ ২১:৪০:২২
  • ০৬ আগস্ট ২০১৯ ২১:৫০:৪০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

কাশ্মীর বধ : ৩৭০ অনুচ্ছেদ একটু উল্টে পাল্টে দেখা যাক

ছবি : সংগৃহীত

১৯৪৭ সাল, ভারতে ব্রিটিশ শাসনের ঘণ্টা বেজে গেছে। হুড়মুড় করে ভারত ছেড়ে যেতে পারলেই বাঁচি; এমন দশা ২০০ বছর ধরে ভারত শাসন করা ব্রিটিশদের। নানা রাজনৈতিক পরিক্রমায় তবে ভারতকে অখণ্ড রেখে পালানোর দশা নেই তখন। একদিকে মুসলিমরা চায় আলাদা মুসলিম রাষ্ট্র, হিন্দুরাও আর মুসলিমদের সাথে থাকতে রাজি নয়।

দেশ ভাগ করতে হলে চাই একজন মানচিত্র বিশারদ, অনেক সময়। কিন্তু ‘ব্যস্ত’ ব্রিটিশদের হাতে সে সময় নেই। আর এতো কম সময়ে অখণ্ড দেশকে দ্বিখণ্ডিত করতেও রাজি নয় কোনো মানচিত্র বিশারদ কিংবা আইনজীবী। তাই ব্রিটিশদের দরকার ছিলো সহজ উপায়। আর সেই সহজ উপায় খুঁজতে গিয়ে ভারত কেটে ভাগ করার জন্য লর্ড মাউন্টব্যাটেন ব্রিটিশ পানশালা থেকে সিরিল র‌্যাডক্লিফকে পাকড়াও করে ভারতে নিয়ে আসেন।

এর আগে র‌্যাডক্লিফ কখনো ভারতে আসেননি, এমনকি দেশটি সম্পর্কে তিনি তেমন কিছু জানতেনও না। এই অজ্ঞতা নিয়ে একটা দেশ কেটে ভাগ করা যে খুব কঠিন ব্যাপার, সে কথা র‌্যাডক্লিফ অবশ্য মাউন্টব্যাটেনকে বলেছিলেন! উল্টো র‌্যাডক্লিফকে রাজি করানোর জন্য মাউন্টব্যাটেন ৪০ হাজার রুপি দিতে চান; যেটা তৎকালীন একটা বড়ো অঙ্কের অর্থই বটে। কিন্তু টাকার চেয়েও র‌্যাডক্লিফকে অন্য একটি বিষয় বেশি প্রলুব্ধ করে; তা হলো—দুটি নতুন দেশ সৃষ্টির মোহ; যা তাকে রাতারাতি এনে দেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। তাই ‘নেশাগ্রস্ত’ এই ব্রিটিশ আইনজীবী নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির এই মোহকে অস্বীকার করতে পারেননি।

দেশভাগ করতে এসে র‌্যাডক্লিফ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের কাছে ভারতের জেলাগুলোর মানচিত্র চেয়েছিলেন। কিন্তু তাকে কোনো পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র দেওয়া যায়নি; শেষ পর্যন্ত অফিস ও স্কুলে ব্যবহার্য সাধারণ মানচিত্র তুলে দেওয়া হয় র‌্যাডক্লিফের হাতে। অবাক করা বিষয় হলো, র‌্যাডক্লিফও কিছু না ভেবে সেই সাধারণ মানচিত্র দিয়েই একটি দেশকে ‘অসাধারণ’ভাবে ভাগ করে ফেলেন। ইঁদুরে কাটার মতো কুটকুট করে ভাগ হয়ে গেলো ভারতবর্ষ! দাঙ্গায় মারা গেলো এক কোটি মানুষ, উদ্বাস্তু হলো আরো অসংখ্য। তবে মহান র‌্যাডক্লিফ কখনোই তার প্রাপ্য ৪০ হাজার রুপি নেননি, কারণ তিনি নাকি একধরনের পাপবোধে ভুগতেন! যদিও ইতিহাসের নিক্তিতে তার এ অনুশোচনার কোনো মূল্য নেই। কারণ, যা ঘটার তা ঘটে গেছে।

সবাই ভেবেছিলেন র‌্যাডক্লিফের ভাগ মেনে মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর চলে যাবে পাকিস্তানে। কিন্তু তেমনটা হয়নি। তৎকালীন কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং পাকিস্তান বা ভারত কারো সাথে যেতে চাননি। চেয়েছিলেন কাশ্মীর জম্মু ও কাশ্মীর নিয়ে হবে স্বাধীন রাষ্ট্র। তবে এক অজানা আতঙ্ক জেঁকে বসে হরি সিংয়ের কাঁধে। তার মনে হয় যেকোনো সময় পাকিস্তানের আদিবাসী গোষ্ঠীর আক্রমণে তিনি ক্ষমতা হারাবেন।  তাই বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে তিনি রাজি হন ভারতের সাথে যুক্ত হতে। আর হরি সিংয়ের কাশ্মীরকে সুরক্ষা দিয়ে নিজেদের দলে ভেড়াতেই ১৯৪৯ সালে ভারতীয় সংবিধানে যুক্ত হয় নতুন অনুচ্ছেদ। এর নাম আর্টিকেল ৩৭০।

এই ধারা অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অংশ হলেও রাজ্যটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদা পায়। কাশ্মীর আরো পায় নিজস্ব সংবিধান ও পাতাকা হয়। এছাড়া পররাষ্ট্র, প্রতিরক্ষা ও যোগাযোগ ছাড়া বাকি সব বিষয়ে রাজ্য সরকারকে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারও দেয়া হয়। এমনকি, কেন্দ্র সরকার বা ভারতীয় পার্লামেন্টের কাশ্মীর সরকারের সহমত ছাড়া জম্মু ও কাশ্মীরে কোনো আইন প্রণয়ন করতে পারতো না। পরে অনুচ্ছেদ ৩৭০ এর সাথে ৩৫-এ নামে নতুন একটি ধারা যোগ করা হয়।

এই ধারা অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীরের স্থায়ী বাসিন্দারা আরো বিশেষ সুবিধার অধিকারী হন। যেমন, স্থায়ী বাসিন্দা ছাড়া অন্য রাজ্যের কেউ কাশ্মীরে জমি কিনতে পারবে না। কিনতে হলে অন্তত ১০ বছর জম্মু-কাশ্মীরে থাকতে হত। কাশ্মীরের বাইরের কেউ সরকারি চাকরির আবেদনও  করতে পারতো না। দিতে পারতো না ভোটও।

আর ৩৫-এ ধারা অনুযায়ী, জম্মু ও কাশ্মীর বিধানসভাই ঠিক করতে পারত, রাজ্যের স্থায়ী বাসিন্দা কারা এবং তারা কী ধরনের অধিকার ভোগ করবেন। এছাড়া রাজ্যের কোনও নারী রাজ্যের বাইরের কাউকে বিয়ে করলে তিনি সেখানকার সম্পত্তির অধিকার থেকে বঞ্চিত হতেন। মানে সম্পত্তিতে তার আর কোনো অধিকার থাকত না তার। এমনকি, তার উত্তরাধিকারীরাও ওই সম্পত্তির মালিকানা থেকে বঞ্চিত হতো।

৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫ এ ধারা বাতিল হওয়ায় এখন আর কাশ্মীর ভারতের বিশেষ রাজ্য নয়। ফলে দিল্লি, গোয়ার মতো দেশের বাকি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোর সাথে আর কোনও পার্থক্য থাকছে না জম্মু ও কাশ্মীরের। আগে কাশ্মীরিদের ছিল দ্বৈত নাগরিকত্ব। মানে তারা বিশেষ সংবিধানের কারণে একই সাথে কাশ্মীর ও ভারতের নাগরিকত্বের সুবিধা ভোগ করতো। সেই সুবিধা আর থাকছে না, তারা এখন কেবল ভারতের নাগরিক। আলাদা পতাকার যে গৌরব ছিলো রাজ্যটির, সেটিও আর থাকছে না। কাশ্মীরের আকাশে এখন থেকে কেবল দোল খাবে ভারতের তিনরঙা পতাকা।

এছাড়া ভারতীয় সংবিধানের ৩৬০ ধারার জোরে যেকোনো রাজ্যে অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা জারি করা গেলেও কাশ্মীর ছিলো এর আওতামুক্ত। তবে এখন এই ধারার আওতায় খুব সহজেই কাশ্মীরেও অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা কার্যকর করতে পারবে মোদী সরকার। অন্য রাজ্যের বাসিন্দারাও অনায়াসেই কাশ্মীরে জমি কেনার সুবিধা পাবেন, কাশ্মীরিদের সাথে পাল্লা দিয়ে করতে পারবেন সরকারি চাকরির আবেদন। এছাড়া আগে কাশ্মীরে সংখ্যালঘু আইন কার্যকর ছিলো না ভারতের অন্য রাজ্যগুলোর মতো।

এখন থেকে রাজ্যটিতে কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু সংরক্ষণ আইনও কার্যকর হবে। যার ফলে বিশেষ সুবিধা পাবে কাশ্মীরের সংখ্যালঘু হিন্দুরা। পাশাপাশি কমবে কাশ্মীর বিধানসভার মেয়াদ। আগে বিশেষ ক্ষমতাবলে কাশ্মীর বিধানসভার মেয়াদ ছিলো ছয় বছর, এখ তা অন্য রাজ্যগুলোর মতো নেমে আসবে পাঁচে। 

এরপর যা ঘটবে কাশ্মীরে
আগেই এক কাশ্মীরকে তিনভাগ করে এক মহাগোল বাঁধিয়ে রেখে গেছে মহান ব্রিটিশরা। সেই গোলের শোরগোলে ভূস্বর্গ নির্ভেজাল নরক আজ। আর সেই নরককে পাকাপোক্ত রূপ দিতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি প্রস্তুতি নিচ্ছিলো বহুবছর আগে থেকেই। কাশ্মীরে স্বায়ত্বশাসন বাতিলের দাবিটা সম্ভবত প্রথম তুলেছিলেন, ভারতীয় জনসংঘের প্রতিষ্ঠাতা শ্যামা প্রসাদ। এই জনসঙ্ঘই বিজেপির পিতৃসংগঠন।

২০১৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে বিজেপি বলেছিলো, দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসলেই বাতিল করা হবে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫-এ ধারা। কথা রেখেছে বিজেপি। পথের কাঁটা সরিয়েছে ক্ষমতায় বসেই। যার মূল কলকাঠি নেড়েছেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ। যার মাথা থেকেই এসেছে আসামের নাগরিকপঞ্জি করার বুদ্ধি। যে নাগরিক তালিকার জোরে আসামের লাখো বাসিন্দাকে নিমিষেই অনুপ্রবেশকারী বলে তাড়িয়ে দেয়া যাবে।

কাশ্মীরকে দ্বিখণ্ডিত করার বুদ্ধিটাও অমিতের। চাইলে জনসংখ্যার ভিত্তিতে কাশ্মীরকে তিন ভাগ করা যেতো। ধূর্ত অমিত সেটা করেননি। বৌদ্ধ প্রধান লাদাখকে আগেই আলাদা করে দিলেন। বাকি থাকলো হিন্দু প্রধান জম্মু আর মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মীর। এদুটো রইলো একসাথে। কিন্তু কেনো? 'একই বৃন্তে দুইটি কুসুম হিন্দু মুসলমান' এই আবেগ থেকে কাশ্মীরকে জম্মু থেকে আলাদা করেননি অমিত? এমনটা ভাবলে বোকার স্বর্গে নয় আপনি এখনো আদিম সাম্যবাদী জঙ্গলবাসেই আছেন।

অমিত জম্মু ও কাশ্মীরকে এক সাথে রেখেছেন অন্য কারণে। তা হলো, এবার গণমিতি মেলাবেন। সেটেলার এনে কাশ্মীর ভরে ফেলবেন। সংখ্যাগুরু মুসলিমদের কোণঠাসা করবেন আদিম ক্রুসেডিয় তরিকায়। আজানের ধ্বনি ঢেকে দেবেন ঘণ্টায়, মিনার ঢেকে দেবে শিবসেনার ত্রিশূলের অগ্রভাগ। হরিবোল, তকবিরে যুদ্ধ হবে। ফায়দা লুটবে হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র ভারত। এতোদিন যে কাজটা জনপ্রতি আটজন সেনা মোতায়েন করেও সহজসাধ্য করতে পারেননি অমিত। এবার সেটা অনায়াসেই পেরে যাবেন গণমিতির ফর্মুলায়।

পুনশ্চ : খানিকটা তথ্য ম্যাজিক লণ্ঠন নামক চলচ্চিত্র বিষয় পত্রিকায় ‘নাজমুল রানা’র চতুর গৌতমের অলীক বাংলা-প্রেম নিয়ে ‘শঙ্খচিল’ শিরোনামের লেখা থেকে নেয়া। আর কিছুটা অনলাইনের বিভিন্ন সূত্র থেকে।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

কাশ্মীর

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0214 seconds.