• ০৩ আগস্ট ২০১৯ ২২:৪১:২৬
  • ০৩ আগস্ট ২০১৯ ২২:৪১:২৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ঔপনিবেশিকতা

ছবি : সংগৃহীত


আনিস রায়হান :


প্রতিষ্ঠিত কতক বিষয় থাকে, যা নিয়ে কেবল প্রশংসাসূচক আলোচনাই অনুমোদিত। রবীন্দ্রনাথ তেমনই একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বকবি হিসাবে খ্যাত এই সাহিত্যিকের সমালোচনা খুবই বিপজ্জনক বিষয়। এমনকি সবচেয়ে উদার ও মুক্তমনারাও এটা সহ্য করতে পারেন না। রবীন্দ্রনাথকে তারা সব কিছুর উপরে জায়গা দিয়েছেন।

কিন্তু ভারতবর্ষ যখন দখলদার ব্রিটিশদের শোষণ-লুণ্ঠনে বিপর্যস্ত, যখন কৃষকরা একের পর সংগ্রাম পরিচালিত করে চলেছে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে, তখন রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা কী ছিল? অন্যতম প্রধান বুদ্ধিজীবী হিসেবে দেশবাসীকে তখন তিনি কী শিক্ষা দিয়েছিলেন?

এটা আজ আমাদের জানা যে, ইংরেজরা ভারতকে হিন্দু-মুসলিমে বিভক্ত করে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের সূচনা ঘটায়। ব্রিটিশ শাসকরা এ অঞ্চলে প্রথম মুসলিম ও হিন্দুদের গৌরবময় অতীতের ধারণাকে সামনে টেনে আনে এবং তাদের মুখোমুখি করে দেয়। হিন্দু ও মুসলিম অভিজাতদের নিজেদের কোলে টেনে তাদের কাছ থেকে দাসসুলভ আনুগত্য আদায় করতে সমর্থ হয় এবং ব্রিটিশ শাসনকে পাকাপোক্ত করে। আর এর মাধ্যমেই ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার এক আধুনিক কুসংস্কার।

রবীন্দ্রনাথ ও তার সাহিত্য ব্রিটিশদের এই অপরাজনীতি সম্পর্কে আমাদের কী শিক্ষা দেয়, আসুন তা এবার একটু মিলিয়ে দেখি। ১৯০৪ সালে লিখিত ‘স্বদেশী সমাজ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘গৌরব হারাইয়া আমরা যখন পুঁটলিপাঁটলা লইয়া ভীতচিত্তে কোনে বসিয়া আছি, এমন সময়ই ইংরেজ আসিবার প্রয়োজন ছিল।’ তিনি আরো বলেন, ‘যে ভারতবর্ষ অতীতে অঙ্কুরিত হইয়া ভবিষ্যতের অভিমুখে উদ্ভিন্ন হইয়া উঠিতেছে, ইংরেজ সেই ভারতের জন্য প্রেরিত হইয়া আসিয়াছে। সেই ভারতবর্ষ সমস্ত মানুষের ভারতবর্ষ- আমরা সেই ভারতবর্ষ হইতে অসময়ে ইংরেজকে দূর করিব, আমাদের এমন কী অধিকার আছে।’ (পূর্ব ও পশ্চিম, ১৯০৮)। ‘য়ুরোপের... একটি বৃহৎ প্রবল ধারা এই ভারতবর্ষে আসিয়াই বিধাতার আহবান বহন করিয়া আমাদিগকে আঘাতের দ্বারা জাগ্রত করিয়া তুলিয়াছে।’ (পথ ও পাথেয়, ১৯০৮)

এখানে দেখুন ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে আসছে একই বক্তব্য। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ভিন্ন ভিন্ন লেখায় এই একই মত প্রকাশ করেছেন। আগে-পিছে যাই বলুন, ব্রিটিশের আগমন বিষয়ে বারংবার তিনি ঐশ্বরিক ইশারার বাণী প্রকাশ করেছেন। উপরের উদ্ধৃতিগুলোয় দেখা যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের মত হচ্ছে, ব্রিটিশকে ভারতে ঈশ্বরই 'প্রেরিত' (রাসুল/সেইন্ট) করে পাঠিয়েছেন। এবং তার 'আসিবার প্রয়োজন ছিল', কারণ এটা 'বিধাতার আহবান বহন' করে। সে আমাদের জাগ্রত' করেছে।

হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের ব্রিটিশ তত্ত্বের কথা প্রথমেই বলেছি। এই প্রতিক্রিয়াশীল তৎপরতাকেও রবীন্দ্রনাথ নির্দ্বিধায় মেনে নিয়েছেন। তিনি এই ভেদ আছে জেনেই সন্তুষ্ট, ব্রিটিশ যে এই বিভেদ লাগিয়ে দিচ্ছে, তা নিয়ে ভাবতে বারণও দিয়েছেন। বলেছেন, ‘মুসলমানকে যে হিন্দুর বিরুদ্ধে লাগানো যাইতে পারে এই তথ্যটাই ভাবিয়া দেখিবার বিষয়, কে লাগাইল সেটা তত গুরুতর বিষয় নয়।’ (ব্যাধি ও প্রতিকার, ১৯০৭)

আরো বলেছেন, ‘ধর্মের নামে যে জাতির নামকরণ, ধর্মমতেই তাদের মুখ্য পরিচয়।... ভারতবর্ষের এমনই কপাল যে, এখানে হিন্দু-মুসলমানের মতো দুই জাত একত্র হয়েছে।’ (হিন্দু- মুসলমান, কালান্তর, ১৯২২) ‘এসো হে আর্য, এসো অনার্য, হিন্দু মুসলমান। এসো এসো আজ তুমি ইংরাজ, এসো এসো খৃষ্টান।’ (গীতাঞ্জলী, ১৯১০)

এখানে দেখুন, ব্রিটিশের দেখানো ধর্মীয় বিভাজনের বাইরে অন্য কোনোভাবেই ভারতের জনগণকে রবীন্দ্রনাথ মূল্যায়ন করছেন না। উপরন্তু ব্রিটিশ কর্তৃক সূচিত সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে তিনি আমলে নিলেও এ থেকে ব্রিটিশকে দায়মুক্তিও দিচ্ছেন। আর এগুলো বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও ঢুকে পড়া মত নয়, বিভিন্ন রচনায় এসেছে এই একই বাচনভঙ্গী। দেখা যাচ্ছে, বিদেশীদের স্বার্থ রক্ষা, তাদের মত প্রচার করার দায়িত্ব ব্রিটিশের শাসনকালে রবীন্দ্রনাথ কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। যদিও তিনি মহান বাঙালী! তবু তার রাজনৈতিক অবস্থান ছিল এমনই দেশবিরোধী ও গণবিরোধী।

কোনো যুক্তি দিয়েই দখলদার শক্তিকে সমর্থন দেয়া যায় না। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তার আমলে দিয়েছিলেন। কারণ চিন্তার কাঠামোর ক্ষেত্রে ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী ও রবীন্দ্রনাথের অবস্থান ছিল অভিন্ন। রবীন্দ্রনাথের ব্রিটিশ দর্শন দেখুন কিভাবে তাকে ধর্মীয় বিভাজন তত্ত্বের অনুসারীতে রূপান্তরিত করল। শুধু তাই নয়, এক্ষেত্রে তার স্পষ্ট অবস্থান ছিল হিন্দুত্ববাদের সপক্ষে। তিনি বলছেন, ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, মুসলমান, খৃষ্টান ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে পরস্পর লড়াই করিয়া মরিবে না- এইখানে তাহারা একটা সামঞ্জস্য খুঁজিয়া পাইবে। সেই সামঞ্জস্য অহিন্দু হইবে না, তাহা বিশেষভাবে হিন্দু।’ (স্বদেশী সমাজ, ১৯০৪)

রবীন্দ্রনাথের এই ঘোষণা, 'তাহা বিশেষভাবে হিন্দু'- এই শিক্ষা কি সাম্প্রদায়িকতার নোংরামিকে বহন করছে না? শুধু তাই নয়, ধর্মরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাও মূর্ত হয়েছে তার আলাপে। সেই ধর্মরাষ্ট্র একা হিন্দুর অধিকারে আসবে না তিনি জানেন, তাই তার দাবি, হিন্দু ও মুসলমান উভয়কেই কর্তা করতে হবে। লিখেছেন, ‘দেশের কর্মশক্তিকে একটি বিশেষ কর্তৃসভার মধ্যে বদ্ধ করিতে হইবে। অন্তত একজন হিন্দু ও একজন মুসলমানকে আমরা এই ভার অধিনায়ক করিব- তাঁহাদের নিকট নিজেদের সম্পূর্ণ নত করিয়া রাখিব, তাহাদের কর দান করিব, তাহাদের আদেশ পালন করিব, নির্বিচারে তাহাদের শাসন মানিয়া চলিব, তাহাদিগকে সম্মান করিয়া আমাদের দেশকে সম্মান করিব।’ (অবস্থা ও ব্যবস্থা, ১৯০৫)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল্পিত ও প্রার্থীত এই ধর্মরাষ্ট্রই আজ ভারতে দাঁড়িয়ে আছে। মুসলিম ও হিন্দুর রাজত্ব হয়েছে। তাদের আমরা কর দিচ্ছি। বিপরীতে তাদের হাতে মার খাচ্ছি। কী পাচ্ছি, কী হারাচ্ছি, এসব আলাপে রবীন্দ্রনাথ নেই। তার থাকার কথাও নয়। শাসকদের আলোচনার কেন্দ্রে কি আর দরিদ্র্যদের অভাব-অনুযোগ থাকে! রবীন্দ্রচেতনার অসাম্প্রদায়িক দিকটাকে অনেকেই সামনেই আনেন। কিন্তু তার মতাদর্শে সাম্প্রদায়িকতা এক বিরাট স্তম্ভ। এমনকি সে সময় ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য ইউরোপে যে লড়াই চলছিল রবীন্দ্রনাথ তাতেও আপত্তি তোলেন, 'দেখিতেছি, য়ুরোপের এই রাষ্ট্রীয় স্বার্থপরতা ধর্মকে প্রকাশ্যভাবে অবজ্ঞা করিতে আরম্ভ করিয়াছে। 'জোর যার মুলুক তার' এ নীতি স্বীকার করিতে আর লজ্জা বোধ করিতেছে না। ইহাও স্পষ্ট দেখিতেছি, যে ধর্মনীতি ব্যক্তিবিশেষের নিকট বরণীয় তাহা রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে আবশ্যকের অনুরোধে বর্জনীয় এ কথা একপ্রকার সর্বজনগ্রাহ্য হইয়া উঠিতেছে।' (প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সভ্যতা)

রবীন্দ্র রাজনীতির এই দিকটি আজ কোথাও তেমন আলোচনা হয় না। তিনি যে ব্রিটিশকে প্রভু গণ্য করেছেন, তাদের আসার দরকার ছিল বলে দখলকে যৌক্তিকতা দিয়েছেন, ধর্মরাষ্ট্রকে ধারণ করেছেন এবং ধর্মনিরপেক্ষতারও বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, এগুলোকে তার স্বাধীন চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গীর বিষয় বলে মেনে নিতে পারি। কিন্তু তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশপ্রেম ও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গীটা যে আজো প্রচারিত হচ্ছে, তার কী হবে?

সারা ভারতে যখন কৃষক ও বিপ্লবীরা ব্রিটিশকে তাড়াতে সংগ্রাম করছেন, জীবন দিচ্ছেন, রবীন্দ্রনাথ তখন লিখেছিলেন তার সুবিখ্যাত 'ঘরে বাইরে' উপন্যাসটি। আজো যা বহুল পঠিত ও সমাদৃত। সেই উপন্যাসে তিনি ব্রিটিশের পক্ষ নেয়া জমিদার নিখিলিশকে মহান করেছেন। যে ছিল তার নিজের চেতনা ও চরিত্রের আদলে গড়া। আর বিপ্লবী সন্দীপকে তৈরি করেছিলেন লোভী ও কাপুরুষ হিসেবে। এই উপন্যাসে শেষে নিখিলেশের জয় হয়, আর পরাজয় ঘটে সন্দ্বীপের। সাহিত্যের সারাংশে বাস করা এই রাজনীতি আজো শাসকদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করে চলেছে। তাই শাসকশ্রেণীর নিকট তিনি চরম পূজনীয়!

রবীন্দ্রনাথ অনেক বড়, এটা মানতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু তাকে আরো বড় করতে গিয়ে তার ভুলগুলোকে ঢেকে ফেলার চেষ্টা করাটা মতাদর্শিক পরাজয় এবং অবশ্যই অন্যায়। তাকে মহান বাঙালী বলার সময় তার রাজনৈতিক অবস্থান আড়াল করাটা হবে দেশ-জাতি-জনগণ ও রবীন্দ্রনাথ, সকলের সঙ্গেই প্রতারণা। কারণ, এই কথাগুলো তো রবীন্দ্রনাথ গোপনে বলেননি। এগুলোকে ঠিক মনে করেই তিনি প্রকাশ্যে লিখেছেন। জীবনের শেষ অবধি তার এই অবস্থান খুবই স্পষ্ট। তিনি কোথাও এড়িয়ে যাননি। রবীন্দ্রনাথের এসব মতকে সঠিক মনে করলে তার পক্ষে দাঁড়াতে হবে। ভুল মনে করলে বিরোধিতা করতে হবে। কিন্তু চেপে যাওয়াটা হবে পুরোপুরি ভন্ডামি। আধুনিক-প্রাচীন, অধিকাংশ রবীন্দ্রপন্থীরা এটা তো করছেনই, উপরন্তু রবীন্দ্রনাথ এত বড় প্রথায় পরিণত হয়েছেন যে, নিজের অজান্তেই অধিকাংশ মানুষ তাকে ফেরেশতা/দেবতা বানিয়ে ফেলেছেন। এই সমস্ত প্রবণতাই প্রগতিশীলতার পরিপন্থী, ঠিক রবীন্দ্রনাথেরই মতো।

লেখক: সাংবাদিক

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0203 seconds.