• ০৩ আগস্ট ২০১৯ ২১:৫৩:৪৬
  • ০৩ আগস্ট ২০১৯ ২২:২৭:০২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

সেই লস অ্যাঞ্জেলসের মতো শহরটির হাসপাতালগুলোতে সিট খালি নাই

ছবি : সংগৃহীত

কক্সবাজারের মেয়ে উখেং নু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ফার্মেসি বিভাগে পড়তে এসেছিলো। সেখানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বাড়ি যায়। ফিরে যাওয়ার সময় বন্ধুদের বলেছিলো ‘আবার দেখা হবে’। আর দেখা হয়নি। উখেংনু মারা গেছে। একসময় প্রীতিলতা হলের গণরুমে ঘুমানো মেয়েটি এখন একলা ঘুমায় অন্তিম শয়নে। 

রাজধানীর মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র রাইয়ানের ১১ তম জন্মদিন ছিলো ৩১ জুলাই। সেদিনই ধরা পরলো তার ডেঙ্গু হয়েছে। এরপর স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ আগস্ট মারা গেলো রাইয়ান। ১১তম জন্মদিনে তার দীর্ঘ জীবন কামনায় যে প্রার্থনা করেছিলো স্বজনরা তা রাইয়ানকে ফিরিয়ে আনতে পারেনি হাসপাতালের ‘লাইফ সার্পোট’ থেকে।

১ আগস্ট বৃহস্পতিবার পড়লাম হতভাগা শফিকুলের খবর। ২৮ জুলাই ডেঙ্গু আক্রান্ত স্ত্রী মরিয়ম ও শিশু সুমাইয়াকে রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন। ডেঙ্গুর কাছে টিকতে পারেনি স্ত্রী মরিয়ম। চারদিন পর মারা যায়। বৃহস্পতিবার তাকে দাফন করে কাঁদতে কাঁদতে আবার ছুটে এসেছেন হাসপাতালে। কারণ তখনো তার শিশু সন্তান সুমাইয়া লড়াই করছে ডেঙ্গুর সাথে। আর হতভাগ্য শফিকুল বেদনা আর দায়িত্বের ভারে নির্বাক লড়াই করছেন ভেতরে-বাহিরে।

প্রতিদিনই আসছে এমন মৃত্যুর খবর। আসছে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির খবর। আর খবরের বাইরের খবরগুলো অজানাই থেকে যাচ্ছে। সরকারের হিসেবে মতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা ১৪ জন। অন্যদিকে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বলছে এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি। দৈনিক পত্রিকা প্রথম আলো’র হিসেবে এখন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ৬৯ জন। সরকারি হিসেবে আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার ছাড়িয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগি নিয়ে সরকার যে হিসেবে দিচ্ছে আক্রান্তের সংখ্যাটা তার চেয়েও অনেক বেশি বলে দাবি করেছেন বিশেষজ্ঞরা। হাসপাতাল গুলোতে সিট খালি নাই। ধারন ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি রোগি ভর্তি হচ্ছে।

আমার এক বন্ধু জানালো তার ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করতে ধানমন্ডির একটি হাসপাতালের মালিকপক্ষের কাছে পর্যন্ত যেতে হয়েছে। কারণ সিট কোথাও খালি নেই। সন্তানের চিকিৎসার জন্য এক আত্মীয়র মাধ্যমে হাসপাতালের মালিকের কাছে অনুরোধ করে একটি সিটের ব্যবস্থা করেছেন। গত ২ আগস্ট নাজমুল হাসান নামের এক ব্যক্তি তার ডেঙ্গু আক্রান্ত স্বজনকে কোনো হাসপাতালে ভর্তি করতে না পেরে ফেসবুকে সাহায্য চেয়ে লিখেছেন, ‘এখন জরুরি ভিত্তিতে রোগিকে হাসপাতালে ভর্তি করানো দরকার। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেও কোন হাসপাতালে সিট পাচ্ছি না। এ অবস্থায় রোগিকে কোনভাবেই বাসায় রাখা সম্ভব নয়। কেউ কী সাহায্য করতে পারেন?।’ শেষ পর্যন্ত আর জানতে পারিনি সেই রোগির ভাগ্যে কি ঘটেছিলো। এরকম অসংখ্য ঘটনার জন্ম হচ্ছে প্রতিদিন।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই দাবি তুলেছেন জরুরি পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। সেই পদক্ষেপ লোক দেখানো নয়, কার্যকরী পদক্ষেপ, যা মানুষকে মুক্তি দেবে এই ‘ডেঙ্গু আতঙ্ক’ থেকে। সরাসরি ‘হেলথ ইমার্জেন্সি’, ‘রেড এলার্ট’ জারির অনুরোধ জানাচ্ছেন অনেকে। এলাকাভিত্তিক জরুরি মেডিকেল ক্যাম্প করার দাবি উঠেছে। স্কুল কলেজ বন্ধ ঘোষণা করার দাবি তুলেছেন অনেক অভিভাবক। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও একই দাবি তুলেছেন। কিন্তু তেমন কোন ঘোষণা আসেনি এখনো। এমন কিছু ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়নি বলে দাবি করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।

শনিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী গণমাধ্যমকে বলছেন ‘মহামারী ঘোষণার মতো আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নাই’। আমরা তার কথামত আতঙ্কিত না হয়ে আমাদের চারপাশে যদি তাকাই, তাহলে দেখতে পাই ঢাকা থেকে শুরু হওয়া এই রোগের বিস্তার ঘটেছে এখন সারাদেশে। হাজার হাজার শিশু এখন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে লড়ছেন বাঁচার জন্য। শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের নিয়ে পরিবারে পরিবারে রয়েছে উদ্বেগ উৎকণ্ঠা। প্রতিদিনই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তির আকুতি নিয়ে ঘরছে মানুষ। গণমাধ্যমের দেয়া হিসেবে গত দুই/তিন দিনে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ৭০ জন হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে।

এডিশ মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদগুলোই বলে দিচ্ছে পরিস্থিতি আসলে কোন পর্যায়ে আছে। দক্ষিণের মেয়র সাইদ খোকন যখন ঢাকার বেশ কয়েকটি এলাকাকে এডিশ মশা মুক্ত ঘোষণা করলেন, তখন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে সেসব এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগির সন্ধান পাওয়া গেছে। বিভিন্ন হাসপাতালে দেখা দিয়েছে ডেঙ্গু রোগ পরীক্ষা করার কিট সংকট। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এডিশ মশা নিধনে নতুন ওষুধ কবে আসবে সে বিষয়টি এখনো নির্ধারন হয়নি। আমদানি জটিলতায় এক মাসের ভেতর এই ওষুধ আসার সম্ভবনা খুবই কম বলে জানিয়েছে খোদ সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুর ভরা মৌসুম। এ সময়ের বৃষ্টি ও তাপমাত্রা এডিস মশার বংশ বিস্তারের খুবই সহায়ক।

এসব তথ্য উপাত্ত, মশার নিয়ন্ত্রণে সরকারের উদ্যোগ ও এর গতি এবং আমাদের চারপাশের ঘটনা বিচার করে খুব স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায় ডেঙ্গু রোগের এই প্রকোপ আগামি এক দেড় মাসে কোন পর্যায়ে গিয়ে দাঁড়াবে। ২০১৩ সালে ডেঙ্গু রোগের বিস্তারে হেলথ ইমার্জেন্সি জারি করেছিলো কোস্টারিকা, হুন্ডুরাস ও এলসালভাদর। চলতি বছরই ফিলিপাইনে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগির সংখ্যা একলাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার পরই রেড এলার্ট জারি করেছে দেশটি।

কিন্তু বাংলাদেশেতো সরকারি হিসেব মতে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ২১ হাজার আর এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃতের সংখ্যা ১৪ জন। অতএব এটাকে মহামারী ঘোষণা দিয়ে সেভাবে মোকাবেলার মতো পরিস্থিতি মনে করনি সরকার। যদিও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন। সরকারের হিসেবে নিহতের চেয়ে ৫ গুন বেশি মানুষ মারা গেছে ডেঙ্গু রোগে। আক্রান্তের হিসেবটাও কয়েকগুন বেশি।

সরকারের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন ও কন্ট্রোল রুমের সংগৃহীত তথ্য বিশ্লেষন করে ‘প্রথম আলো’ তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, ‘ঢাকা শহরের ১২টি সরকারি, আধা সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত এবং ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতালের তথ্য সংকলন করা হয়। সেই সংকলনের তথ্যই সরকার ব্যবহার করে।’ অর্থাৎ ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগির যে পরিসংখ্যান প্রকাশ পাচ্ছে তার বাইরেও বহু সংখ্যাক রোগি রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডাক্তারদের ব্যক্তিগত চেম্বারে যাওয়া রোগিদের ভেতর সবার তথ্য সংগ্রহ হচ্ছে না। সরকারি সংকলন হিসেবে ২০১৮ সালে ১০ হাজার ১৪৮ জন আক্রান্ত রোগি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। কিন্তু বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমিত হিসেবে ৫ লাখ ৭ হাজার ৪০০ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিল।

এই রকম একটা পরিস্থিতিতে আসলে নতুন করে বলার কিছু নেই। এটা জীবন দিয়ে জীবনকে উপলব্ধির বিষয়। পরিসংখ্যান যা বলছে তার যুক্তি-পাল্টা যুক্তি দিয়ে রাজনৈতিক তর্কে-বিতর্কে মাঠ গরম হতে পারে কিন্তু মানুষের কাছেতো এসব নেহায়েত পরিসংখ্যানের বিষয় না। আমাদের কাছেতো এগুলো বেঁচে থাকার প্রশ্ন। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাওয়া ডাক্তার ও নার্সরাও আছেন আতঙ্কে। শ্রমজীবী মানুষের প্রতিটা মুহূর্ত ঝুঁকির ভেতর আছে।

ধানমন্ডির এক হকারকে প্রশ্ন করেছিলাম এই যে রাস্তায় বসে কাজ করছেন ডেঙ্গুর ভয় করে না। উত্তরে সেই মধ্য বয়স্ক হকার বললেন, ‘যার কেউ নাই তার আল্লাহ আছে। আমাগো আল্লায়ই বাঁচাইবো।’ একটু চুপ থেকে বললেন, ‘এছাড়া আর কি কমু বাপ? কি করনের আছে...?’

সেই হকারকে পাশ কাটিয়ে হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে বাড়ি ফেরার বাহন খুঁজতে খুঁজতে শুনি হাসপাতালের নিরাপত্তা রক্ষী তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটিকে বলেছে হাসপাতালে বেড খালি নাই। আকাশ থেকে দেখে আমাদের অনেক কর্তা-ব্যক্তির কাছে এই ঢাকা শহরকে লস অ্যাঞ্জেলস বলে মনে হলেও জমিনের বাস্তবতা ভিন্ন। জমিনে নামলে দেখা যায় সেই ‘লস অ্যাঞ্জেলস’-এর বাস্তবতা হচ্ছে- ‘হাসপাতালে সিট খালি নাই...’।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ডেঙ্গু

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0208 seconds.