• ০১ আগস্ট ২০১৯ ২০:৪৭:১৫
  • ০১ আগস্ট ২০১৯ ২০:৪৭:১৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

ডেঙ্গু নিয়ে অবহেলা আর অব্যবস্থাপনাতেই আজ এই পরিস্থিতি

ছবি : সংগৃহীত


কল্লোল মোস্তফা :


প্রচলিত কীটনাশকে এডিস মশা মরছে না- গবেষণার এরকম একটা ফলাফল গত ২০১৮ সালের ২২ মে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন আইসিডিডিআরবি'র বিজ্ঞানীরা।  

কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।  

২০১৯ সালের মার্চ মাসে ঢাকা শহরের মশা জরিপ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্টদের সর্তক করেছিলো যে, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে মশা আরো বাড়বে।  
কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।

(সূত্র: মশার ওষুধ কেনায় যত অনিয়ম, প্রথম আলো ৩১ জুলাই ২০১৯)

অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে পরিস্কার পানিতে জন্মানো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের সিটি কর্পোরেশন কি করতে পারে বা পারতো? কারো ঘরবাড়ি ও তার আশপাশে যেন পানি জমে না থাকে সেটা নিশ্চিত করা কি নাগরিকদের দ্বায়িত্ব নয়?

প্রথমত, এডিশ মশা শুধু মানুষের ঘরের ফুলের টবে কিংবা ছাদে জমে থাকা পরিস্কার পানিতেই হয়, তা নয়। বিভিন্ন পাবলিক প্লেস এবং বিশেষত সরকারি বেসরকারি নির্মাণাধীন ভবন ও স্থাপনায় পড়ে থাকা বোতল, প্যাকেট, ডাবের খোসা, কনটেইনার, ড্রাম, ব্যারেল, পরিত্যক্ত টায়ার, ইটের গর্ত ইত্যাদিতে জমে থাকা পানিতে জন্মাতে পারে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার ওয়েবসাইট অনুসারে- "এডিস মশার জন্মস্থান হলো বিভিন্ন পানির পাত্র যেমন পুরাতন টায়ার, বোতল, ভাঙা জিনিসপত্র, প্লাস্টিকের কনটেইনার ইত্যাদি যা আপনার ঘরের ভেতরে বা বাইরে যে কোন স্থানে থাকতে পারে।... কন্সট্রাকশান সাইট বা নির্মানাধীন স্থাপনা হলো এডিস মশা জন্মানোর একটি বৃহৎ ক্ষেত্র।" (সূত্র: http://www.searo.who.int/bangladesh/aedesmosquitoes/en/)

এসব নিয়মিত পরিষ্কার করা একটা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ, যা ঠিকঠাক মতো পালন করার দ্বায়িত্ব সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের। 

দ্বিতীয়ত, এমনকি ব্যক্তি মালিকানাধীন হাউজিং প্রপার্টিতে জমে থাকা পানি পরিষ্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানি ও ব্যক্তিদের উদ্বুদ্ধ করা ও বাধ্য করার দ্বায়িত্বটাও জনগণের করের টাকায় চলা সিটি কর্পোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরের।

এর বাস্তব দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা দেখতে পারি কলকাতা সিটি কর্পোরেশন এডিশ মশা দমানোর জন্য কি ধরণের পদক্ষেপ নিয়ে থাকে:

* ১৪৪ টা ওয়ার্ডের প্রতিটাতেই সিটি কর্পোরেশনের ২০ থেকে ২৫ জন করে কর্মী আছে, যাদের মধ্যে একদল প্রচারের কাজ চালায়, আর অন্য দল জল জমছে কী না কোথাও, সেটার ওপরে নজর রাখে।

* ১৬টি বরোর প্রত্যেকটার জন্য একটা করে র‌্যাপিড অ্যাকশন টিম। তাতে ৮ থেকে ১০ জন লোক থাকে সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে, গাড়িও থাকে তাদের কাছে। কোনও জায়গায় ডেঙ্গুর খবর পাওয়া গেলে অতি দ্রুত তারা সেখানে পৌঁছে এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে।

* যেসব জায়গায় জল জমে থাকতে দেখছে কর্পোরেশনের নজরদারী কর্মীরা, সেই ভবনগুলোর ওপরে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত জরিমানা ধার্য করার জন্য আইন পরিবর্তন করা হয়েছে।

* আবার জল পরিষ্কার করে দেওয়ার খরচ বাবদ বিল, বাড়ির বার্ষিক করের বিলের সঙ্গে পাঠিয়ে দিচ্ছে কর্পোরেশন।

(সূত্র: ডেঙ্গু দমনে ঢাকা যখন ব্যর্থ তখন কলকাতা কীভাবে সফল, বিবিসি বাংলা, কলকাতা, ৩০ জুলাই ২০১৯)

জমে থাকা পানি পরিষ্কার করে দেয়ার খরচ বিদ্যামান করের টাকা থেকে বহন করা হবে নাকি বাড়তি কর হিসেবে বাড়ির মালিকদের কাছ থেকে আদায় করা উচিত- সেটা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে কিন্তু এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি কর্পোরেশন কি ধরনের ভূমিকা ও দ্বায়িত্ব পালন করতে পারে কলকাতার উদাহরণ থেকে তা নিশ্চয়ই বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে না।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্রীয় প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ কেমন হতে পারে তার একটা দুর্দান্ত দৃষ্টান্ত হলো সিঙ্গাপুর। মিনাকো ইয়োশিকাওয়ার গবেষণা পত্র "ভেক্টর কন্ট্রোল এন্ড সার্ভেইলেন্স অপারেশনস ইন দ্যা রিপাবলিক অব সিঙ্গাপুর", ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির (এনইএ) এর ওয়েবাসাইট ও সিঙ্গাপুরের সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুসারে সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির (এনইএ) কর্মীরা নিয়মিত মানুষের ঘরে ঘরে এবং এলাকায় এলাকায় গিয়ে পাবলিক স্পেস, কনস্ট্রাকশান সাইট এবং হাউজিং এস্টেটে ডেঙ্গু মশার জন্মস্থল খুঁজে ধ্বংস করে থাকে। 

এ বছর জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২ লাখ ২৪ হাজার পরিদর্শন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে যার মধ্যে ১ হাজার ৮০০ অভিযান চালানো হয়েছে বিভিন্ন কন্সট্রাকশন সাইটে। এনইএ এর মাধ্যমে ২ হাজার ৯০০ ব্রিডিং গ্রাউন্ড বা মশার আবাসস্থল খুঁজে বের করে ধ্বংস করেছে। ২০১৮ সালে এনইএ মোট ১০ লাখ পরিদর্শন কার্যক্রম চালিয়েছে যার মধ্যে ৯ হাজারটি ছিল কনস্ট্রাকশন সাইটে। এর মাধ্যমে সে বছর মশার প্রায় ১৮ হাজার ব্রিডিং গ্রাউন্ড বা জন্মস্থল ধ্বংস করা হয়।

পরিদর্শন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে কনস্ট্রাকশন সাইটের মতো সম্ভাব্য বিপদজনক স্থানের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেয়া হয়। সিঙ্গুপুরের আইন অনুসারে নির্মাণ কাজের সময় কন্ট্রাক্টরদেরকে পেস্ট কন্ট্রোল অফিসার ও পরিচ্ছন্ন কর্মী নিয়োগ দিতে হয় যাদের কাজ হলো প্রতিদিন সকালে মেঝে পরিষ্কার করা এবং দুই সপ্তাতে একবার মশকরোধী তেল প্রয়োগ করা যেন এসব সাইটে জমা পানিতে মশা জন্মাতে না পারে, বায়ু চলাচল বন্ধ হয়ে মর্শার লার্ভা মারা যায়। এনইএ প্রতি মাসে অন্তত একবার কন্সট্রাকশন সাইটগুলো পরিদর্শন করে, আইন ভঙ্গ করলে জরিমানা করা হয় এমনকি সাময়িকভাবে কাজ বন্ধ করেও দেয়া হয়।২০১৮ সালে এরকম ৪০টি নির্মাণকাজ বন্ধ করার আদেশ প্রদান করা হয়। এভাবে নিয়মিত নজরদারির ফলে ২০১৩ সালে যেখানে ১১ শতাংশ কনস্ট্রাকশন সাইটে ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া গিয়েছিলে, সেখানে ২০১৯ সালে তা মাত্র ৪ শতাংশে নেমে আসে।

এনইএ'র নিজস্ব কর্মীর পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রিভেনশান ভলান্টিয়ারের মাধ্যমেও আবাসিক এলাকায় পরিদর্শন কার্যক্রম চালানো হয়। এনইএ এরকম ৮ হাজার ৫০০ ভলান্টিয়ার বা স্বেচ্ছাসেবককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে যারা এলাকায় এলাকায় মানুষকে সচেতন করার কাজ করে।

ডেঙ্গু মশার বৃদ্ধির উপর নজর রাখার জন্য এনইএ গোটা সিঙ্গাপুর জুড়ে ৫০ হাজার গ্রেভিট্র্যাপ (Gravitrap- ডিমপাড়তে ইচ্ছুক স্ত্রী এডিশ মশা আটকানোর বিশেষ ফাঁদ) স্থাপন করেছে। এর ফাঁদের মধ্যে আটকানো মশার তথ্য থেকে এনইএ ধারণা করতে পারে কোন কোন এলাকায় এডিশ মশার প্রাদুর্ভাব বেশি হচ্ছে, ফলে সীমিত সংখ্যক লোকবল দিয়ে কোথায় কোথায় অভিযান পরিচালনা করলে সবচেয়ে কার্যকর ফলাফল পাওয়া যাবে। তাছাড়া এই ফাঁদের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যক প্রাপ্তবয়স্ক এডিশ মশা মারা সম্ভব হয়। এই গ্রেভিট্র্যাপ নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে এনইএ ২০১৭ সালের তুলনায় ২০১৮ সালে ২১ শতাংশ বেশি মশার জন্মস্থান ধ্বংস করতে সক্ষম হয়।

আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা দেখলাম, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় স্রেফ আগাম সতর্কতা জানিয়ে দায়িত্ব সারল। সিটি কর্পোরেশন মার্চ মাসে আগাম সতর্কতা পাওয়ার পরও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের কোন কার্যকরা উদ্যোগ নিল না, এমনকি জুন মাসে যখন ডেঙ্গু রোগি বাড়তে শুরু করল তখনও কোন উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ বোধ করল না। উল্টো ডেঙ্গু নিয়ে ছেলে ধরার মতো গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে তর্জন গর্জন করা হলো।

জুলাই মাসে ডেঙ্গু মহামারির আকার ধারণ করলেও ডেঙ্গু আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো চলতে থাকল। আজকে যখন ডেঙ্গু সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে, একের পর এক বিভিন্ন মানুষের মৃত্যুর খবর আসছে, হাজার হাজার মানুষ অবর্ণনীয় দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন, শারীরিক মানসিক ও আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, তখনো মহামারি ঘোষণা করে মেডিক্যাল ইমার্জেন্সি জারি করে ঢাকা সহ সারা দেশে মশক নিধন ও ডেঙ্গুর চিকিৎসার জন্য সরকারের সামরিক বেসামরিক সমস্ত বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানকে মাঠে নামিয়ে যে ধরণের উদ্যেগ নেয়া প্রয়োজন তার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এরকম মারাত্বক অবহেলা, অব্যবস্থাপনা ও স্বেচ্ছাচারিতা শুধু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেই না, সড়ক দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে সন্ত্রাস দমন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, পরিবেশ রক্ষা, ব্যাংক ও আর্থিক খাত কিংবা বন্যা ব্যবস্থাপনা সকল ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। বিভিন্ন বাস্তব ঘটনাকে নির্লজ্জের মতো অস্বীকার করা হচ্ছে, মিথ্যাচার করা হচ্ছে, গুজব বলে চালিয়ে দেয়া হচ্ছে।

একটা দেশের সরকার ও প্রশাসনকে যদি জনগণের কাছে কোন ধরণের জবাবদিহিতা করতে না হয়, যদি ক্ষমতা থাকা বা পুনরায় আসার জন্য জনগণের ভোটের কোন প্রয়োজন না থাকে- তাহলে এ ধরণের ঘটনা বার বার ঘটা স্বাভাবিক। ভোটাধিকার থাকলেই যে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে তা না, কিন্তু অন্তত ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতাকে শায়েস্তা করার একটা ন্যূনতম সুযোগ নাগরিকদের হাতে থাকে। কিন্তু ভোটাধিকার বা গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক জবাদিহিতার ন্যুনতম কোন সুযোগ না থাকলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই নাগরিকদের ক্ষমতার সামনে এভাবে অসহায় বোধ করতে হয়। যারা বিভিন্ন ব্যক্তিগত গোষ্ঠীগত কারণে, চেতনা রক্ষা করা বা উন্নয়ন অব্যহত রাখা ইত্যাদি অযুহাতে এ ধরণের জবাবদিহিতাবিহীন শাসন ব্যবস্থাকে সমর্থন দিয়েছেন বা দিচ্ছেন, সারা দেশের অসংখ্য সাধারণ মানুষের সাথে সাথে তারাও কিন্তু এ ধরণের শাসন ব্যবস্থার কুফল থেকে রক্ষা পাবেন না যার, বিভিন্ন দৃষ্টান্ত এর মধ্যেই দেখা যাচ্ছে।

লেখক : প্রকৌশলী ও গবেষক

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ডেঙ্গু কল্লোল মোস্তফা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0224 seconds.