• ২৪ জুলাই ২০১৯ ১৭:৫৬:৫৮
  • ২৪ জুলাই ২০১৯ ১৮:০৬:০৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

আমরা যেন এক ট্রমার টানেলে ঢুকে পড়েছি

ফাইল ছবি

এ এক অদ্ভুত সময় পার করছি আমরা। জীবনানন্দ দাশের ‘সেই অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ পৃথিবীতে আজ...’। এ এক এমনই আঁধার অস্পষ্ট ভাবেও কেউ কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছে না। সব যেন অন্ধ হয়ে গেছে, নেমে আসছে অন্ধকার। এই অন্ধকার এমনই অন্ধ যে, কে কাকে মারছে, কারা মারছে, কারা মরছে কিছুই বোঝা যায় না। কানে আসে শুধু আর্তনাদ, চাপা গোঙ্গানি কিংবা নিঃসঙ্গতার চিৎকারগুলো।

এমন আর্তনাদের ভেতর, স্বপ্নের ভেতর কল্পনার ভেতর অজস্র রকমের শব্দের ভেতর থেকে আমরা আলাদা করে শুনতে পাই- ‘মার মার মেরে ফেল’, ‘পুলিশে দিয়ে লাভ নাই’...। সাথে দপ করে ভেসে ওঠে একেকজন রেনুর মুখ! চলতি পথে মনে হয় এই বুঝি কেউ আমাকেও সন্দেহ করছে। এই বুঝি আমার দিকে কেউ আঙুল তাক করে বলছে- ওই একটা ছেলেধরা! ধর ধর...। আমিও ভয়ে কুঁকড়ে যাই। ভেতরটা ভয়ে দুমরে মুচরে যায়।

এমনই অনুভূতি নিয়ে একজন মা তার শিশু সন্তান নিয়ে স্কুলে যেতে গিয়ে আতঙ্কে ভোগে। ভাই তার বোনকে নিয়ে বেরুতে ভয় পায়, বাবা তার ছেলেকে নিয়ে বেরুলে আতঙ্কে থাকে। গত কয়েকদিনে অনেক মানুষের সাথে আলাপ করে একটাই বিষয় উঠে এলো, যার সার কথা হচ্ছে ‘রাস্তায় বেরুতে ভয় পাই’। আমার বোন তার ছোট্ট শিশু সন্তানকে স্কুলে দিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছে। আমার বন্ধু তার শিশু সন্তান নিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে পাড়ি দিতে গিয়ে আতঙ্কে কাটিয়েছে দীর্ঘপথ! কী ভয়ংকর কথা নিজের শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে পিতার মুখ ভয়ে নীল হয়ে আসে। হ্যাঁ, এ এক এমনই অন্ধ সময়। আমার সহকর্মী জানালো স্কুলে ভর্তি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করতে যেতে আতঙ্ক বোধ করছে। কিশোর-তরুণ, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই আজ আতঙ্ক গ্রস্থ।

এইতো আজকেই (বুধবার) নুসরাত জাহান নামের এক নারী তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লিখেছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। তারও রেনুর মতো পরিনতি হতে যাচ্ছিলো। বাচ্চাকে স্কুলে আনতে গিয়ে তিনিও কিছু উন্মাদের খপ্পরে পড়েন। তাকে ছেলেধরা সন্দেহ করে জেরা শুরু করা হয়। তবে তিনি সাহস না হারিয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তখন আরেক লোক এসে তাকে ওই অবস্থা থেকে উদ্ধার করেন।

একের পর এক গণধোলাইয়ের খবর সাধারন মানুষকে আতঙ্কিত করে তুলেছে। মানসিক প্রতিবন্ধী, দিনমজুর, জেলে, বাক প্রতিবন্ধী বাবা, মা কেউই রেহাই পাচ্ছে না এই উন্মাদ আক্রমন থেকে। শুধু কী গণধোলাই? একের পর এক বিভিন্ন ঘটনা আমাদেরকে নিয়ে ফেলছে ট্রমার টানেলের ভেতর।

গণধোলাইয়ে নিহত হতভাগা মা রেনুর রক্তাক্ত মুখ যখন আমাদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তার ছোট্ট শিশুটির মা মা বলে চিৎকার করছে, ঠিক তখনই আরেক মায়ের আর্তনাদে শুনি সে আর তার শিশুটির মুখে মা ডাক আর শুনতে পারছে না। ২১ জুলাই জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এই মা তার দুই বছরের শিশু আয়েশার ধর্ষক ও হত্যাকারীর বিচার দাবি করে একাই প্রতিবাদ জানাতে এসেছেন। শিশুটির ছবি আঁকড়ে ধরে পাগলের মতো কেঁদেছেন। গত ৫ জানুয়ারি ঢাকার গেন্ডারিয়া এলাকায় শিশু আয়শা ধর্ষণের শিকার হয়। সেই হত্যাকারী ও ধর্ষক নাহিদের বিচার নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানাতে এসেছিলো এই মা। এই দৃশ্য মনে করিয়ে দিলো গত কয়েকদিন আগে আরেক মায়ের আহাজারী আরেক শিশুর মুখ। গত ৭ জুলাই ওয়ারিতে ছোট্ট শিশু সায়মাও একই রকম পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে খুন হয়। ঘটনা একটি দুটি নয়। হাজার হাজার ঘটনা আছে। গত ৬ মাসে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৬৩০টি শিশু ধর্ষণ ও ২১টি শিশু ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএফ) এক পরিসংখ্যানে প্রকাশ করা হয়েছে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরে সারাদেশে ২৩২২ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

আমাদের বাবারা-মায়েরা এই সব ছবি ঘটনা দেখে-শুনে-পড়ে তার শিশু সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কিত হন। এক জঘন্য শঙ্কা তাদের তাড়িয়ে বেড়ায়। আর এই আশঙ্কা ক্রমেই বেড়ে চলছে, বাড়তে বাড়তে এক ভীতির জগত ঘিরে ফেলছে আমাদের।

রাস্তায় চলতি পথে তরুণীরা বিভিন্ন সময় ধর্ষণ-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ফিরতে একটু রাত হলেই আতঙ্কে অনেকের মুখ নীল হয়ে যায়! যাত্রীকম ফাঁকা বাস মানেই নারীদের ভেতর তৈরি করে এক হিমশীতল জঘন্য আশঙ্কা। পথে পথে ভয়। গলির মোড়ে ভয়, চেনা রাস্তায় ভয়, অচেনা রাস্তায় ভয়, পাশের সিটের পুরুষকে ভয়, বাসের হেল্পার-ড্রাইভারকে ভয়। একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা সেই ভয়কে স্থায়ী করে তুলছে। যাত্রা পথে চলন্ত বাসেও ধর্ষণের শিকার হয়ে প্রাণ দিতে হচ্ছে নারীদের। এতোসব ভয় আমাদের মগজ কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে প্রতিদিন।

বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মারা যাওয়া তরলিমা রেনু। ছবি : সংগৃহীত

শুধু নারী নয় তরুণরাও কম আতঙ্কে থাকে না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভিযানের নামে পথে, ভাড়া মেসে ব্যাচেলর তরুণদের হয়রানি করার ঘটনা কম আসেনি গণমাধ্যমে। কখনো পুলিশি চেকপোস্টে কখনো বা ব্যাচেলর বাসায় বিভিন্ন সময়েই তরুণরা আতঙ্কে থেকেছে। অপরাধ না করলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। অপরাধী না হলে নির্ভয়ে থাকবেন। এই যে রাষ্ট্রের সরল বাক্যগুলো মানুষকে আশ্বস্ত করতে পারেনি, পারছে না। কেন পারছে না সেই প্রশ্নের ভেতরই রাষ্ট্রকে উত্তরটা খুঁজতে হবে। একেকটি বিশেষ অভিযান কত সাধারন মানুষের ভেতরও আতঙ্ক তৈরি করছে সে কথা কি অজানা আছে এখনো?

সড়কে ভয়। প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ যাচ্ছে মানুষের। আনন্দ যাত্রা হলেও সড়ক দুর্ঘটনার ভয় মানুষকে তাড়িয়ে বেড়ায়। সঙ্গত কারণেই কারো কারো ক্ষেত্রে এই ভয় এখন মারাত্মক আকার ধারন করেছে। ফেসবুকে লেখা-লেখি নিয়েও দেখেছি কি পরিমান আতঙ্ক ছড়িয়ে পরে একেক সময়। কে যে কোন কথার কারণে কখন রাষ্ট্র বিরোধী অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে উঠছে তা নিজেও বুঝে উঠতে পারছে না ঠিকমত। যে কোন সভ্য গণতান্ত্রিক দেশেই সরকারের বিভিন্ন কাজের মতের সাথে দ্বিমত প্রকাশ করা, সমালোচনা জানানোর অধিকার থাকে নাগরিকদের। কিন্তু কোনটা আসলেই রাষ্ট্রবিরোধী লেখা, আর কোনটা সরকারের কাজের সমালোচনা, কোনটা ‘গুজব’ সব যেন একাকার হয়ে গেছে এখানে। এসবের সংজ্ঞা আসলে কি হবে কে জানে...। তাই এ সময়ে সমালোচকদের অনেকেই একটা চাপা আতঙ্ক নিয়ে থাকেন সব সময়।

চারিদিকে ভয়ের গল্প। ক্রসফায়ার, গুম, হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, গণধোলাই এসব কিছু ঘিরে রেখেছে আমাদের। আমরা যেন এসবের ভিতরে আটকে গেছি। এটাই আমাদের নাগরিক জীবনের গল্প। রোজকার সকালে চায়ের কাপ হাতে যে খবরের কাগজটি মেলে ধরি, কিংবা মোবাইল ফোনে অনলাইন পত্রিকায় স্ক্রল করি সেখানেই এইসব ঘটনা আমাদের সকালকে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। আমরা এমনই এক অদ্ভুত সমাজে আছি এখন। যে সমাজ মগজের ভেতর গেঁথে দিয়েছে খুন, ধর্ষণ, হত্যা, ক্রসফায়ার, গুম, গণধোলাই, মেরো ফেলো...ইত্যাদি শব্দ।

ছিনতাইকারী ধরা পরলে চিৎকার করতে শুনি গণধোলাই দাও, আজকাল কোন অপরাধী ধরা হলেই বলা হয় ক্রসফায়ার দাও, গুম করে ফেলো ইত্যাদি কথা এখন এই সমাজে প্রচলিত শাস্তির দাবি হয়ে উঠেছে। একটা সমাজে কখন নাগরিকরা এই ধরনের কথা বলে সেটা বিশ্লেষন করলেই সমাজের চরিত্রটা প্রকাশ হয়ে যায়। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, এই যে রেনুকে একদল পাষণ্ড গণধোলাই দিয়ে মেরে ফেললো সে ঘটনায় সবাই দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তারপর দোষিদের বিচার দাবি করতে গিয়েও অনেকে দাবি তুলেছে, ওই হত্যাকারীদের গণধোলাই দাও! এই হচ্ছে আমাদের বিচার চাওয়ার দাবি! রোজকার জীবন, আমাদের বেঁচে থাকার একেকটা দিন!

এই সব ভয় নিয়েই কাটছে আমাদের দিনকাল। ভয় থেকে ছুটি নেই। আমরা একটা ভয় থেকে আরেকটা ভয়ের ভেতর প্রবেশ করছি, একটা ঘটনা থেকে আরেকটা ঘটনায়, একটি হত্যা থেকে আরেকটি হত্যায়, একটি যন্ত্রণা থেকে আরেকটি যন্ত্রণায়, একটি দুঃস্বপ্ন ভাঙতে না ভাঙতে আরেকটি দুঃস্বপ্ন এসে হাজির হয়। ঘুমের ভেতর তাড়া করে বেড়ায় মৃত্যু, স্বপ্নের ভেতর একটা অজগর সাপ হাসে! কি ভয়ঙ্কর সে দৃশ্য। এখান থেকে বের হতে পারছি না কিছুতেই। আমরা যেন আটকে গেছি ট্রমার টানেলের ভেতর। আমাদের এই ট্রামার টানেল থেকে বের করে আনবে কে?

লেখক: সাংবাদিক ও স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0194 seconds.