• ২২ জুলাই ২০১৯ ১৮:০২:৩৬
  • ২২ জুলাই ২০১৯ ১৯:৩৬:১৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

কেটে ফেলা গাছ ভুলে যাবে সব শোক...?

ছবি: ইয়াসির আরাফাত বর্ণ


ইয়াসির আরাফাত বর্ণ :


জাহাঙ্গীনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়ন প্রকল্প নামে বেশ বড় অংকের একটি বাজেট এসেছে কয়েকদিন আগে। বাজেটের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা, এই বাজেটের আওতায় তেইশটি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা আছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের। যার ভেতর দশতলা বিশিষ্ট পাঁচটি আবাসিক হলও আছে।

ইতোমধ্যে হল নির্মাণ কাজের উদ্বোধনও করা হয়েছে। কিন্তু বিপত্তি এখানেই। পাঁচটি হল বানানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যে স্থানগুলো নির্ধারণ করা হয়েছে সেগুলোর প্রায় সবকটিই বিভিন্ন রকমের ফলজ, বনজ এবং ঔষধি গাছে ভরপুর।

পাঁচটি হলের মধ্যে তিনটি ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হবে ক্যাম্পাসের বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব এলাকায়। উত্তরের ওই জায়গাটি মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হলের খেলার মাঠ হিসাবেই নির্ধারণ করে রাখা হয়েছিল। সেখানে ভবন নির্মাণ হলে কাটা পাড়বে প্রায় ২৮ রকমের ফলজ গাছ। দক্ষিণ দিকটিতে রয়েছে বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির ৬৩ গোলাপজাম গাছসহ প্রায় ৫৩৯ টি বিভিন্ন প্রজাতির ফলজ ও ঔষুধি গাছ এবং পূর্বদিকে রয়েছে প্রায় ৩৫৮ টি বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষজাতীয় গাছ। ভবন নির্মাণ করতে গেলে কাটা পড়বে এর সবগুলোই।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকায় নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে দুটি ছাত্রীনিবাস। ওই এলাকাতেই রয়েছে একটি দীর্ঘবর্ষী বটগাছ, ১৭৮ টি কাঁঠালগাছসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ২০৭ টি ফলজ ও বনজ বৃক্ষ। ভবন নির্মাণ করতে গেলে কাটা পড়বে সেগুলোও। অর্থাৎ পাঁচটি হল বানাতে গেলে ক্যাম্পাসে কাটা পড়বে মোট ১১৩২ টি গাছ।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও উন্নয়নাকাঙ্খীদের দাবি ক্যাম্পাসের পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করতে গেলে এই গাছগুলো কাটা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। আবার এটাও সত্য যে ক্যাম্পাসের এই জায়গাগুলোতে মাত্র পঁচিশ বছর আগেও এত পরিমাণ গাছ ছিল না। তাই এই জায়গাগুলোতে গাছ কাটা হলেও অন্যান্য জায়গায় গাছ লাগিয়ে এই ক্ষতি পূরণ করার আশ্বাস আছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক পরিবেশের সুস্থ্যতা রক্ষা নিয়ে প্রশাসরে কার্যকালাপের ধরণ এই আশ্বাসের সুরক্ষা দেয় না । বিশ্ববিদ্যালয়ে বিগত সময়গুলোতে বিভিন্ন জায়গায় এলোপাথারি ভাবে ভবন নির্মাণের নামে গাছ কাটা হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই গাছ কেটে ফেলার পর ওইসকল স্থানে ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিলও করা হয়েছে, কেটে ফেলার পর অন্যান্য স্থানে অরণ্যায়নের যে আশ্বাস তারা বিভিন্ন সময়ে দিয়ে এসেছেন সেগুলোও সৎভাবে বাস্তবায়ন করেননি। ফলত দেখা যাচ্ছে এইসব কেটে ফেলা গাছ থেকে বিক্রি করা টাকাই প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের প্রধানতম আগ্রহের জায়গা হয়ে উঠছে।

এটুকু অনস্বীকার্য যে, পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করতে গেলে প্রাকৃতিক পরিবেশ সংকুচিত হয়ে আসবেই এবং সময় ও সভ্যতার সাপেক্ষে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন কিন্তু এই উন্নয়ন যদি একরৈখিক হয় তবে তার মত ভয়ংকর আর কিছুই হতে পারে না। মেগাসিটি ঢাকা তার সবচেয়ে প্রকৃষ্ট উদাহরণ। একবিংশ শতাব্দিতে বিশ্বজুড়েই যখন নিরাপদ উন্নয়নের ধারণা সামনে চলে এসেছে, পরিকাঠামোর সাথে সাথে কতটুকু জল প্রবাহ থাকবে, কতটুকু গাছপালা থাকবে, কতটুকু ইকোফ্রেন্ডলি আবহাওয়া থাকলে পরিকাঠামোকে কেন্দ্র করে থাকা মানুষগুলো স্বস্তিতে বাঁচতে পারবে তার বৈজ্ঞানিক রূপরেখা যখন আমাদের সামনে হাজির তখনও আমাদের সমাজে আমরা ইট কাঠ পাথরের চাকচিক্য ও মাটির ওপরে ঢালাই দিয়ে করা শিল্প বিপ্লব পরবর্তী সময়ের “উন্নয়নে’’র ধারণাকেই সবচেয়ে কার্যকর মনে করছি । অথচ সেই ধারণার মেয়াদও শেষ হয়েছে প্রায় একশ বছর আগে। 

এই মান্ধাতার সময়ের উন্নয়নের ধারণা আমাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে প্লাস্টিক/পলিমার, মাটি-পানি-বায়ু দূষণের মুখে, বিভিন্ন ধাতব ও রাসায়নিক বিক্রিয়ায় প্রতিবেশ হয়ে উঠছে মানুষসহ অন্যান্য প্রাণীদের বসবাসের জন্য অস্বাস্থ্যকর ও বিপদজনক। পরিবেশ ও প্রতিবেশকে রক্ষা করেও যে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করা সম্ভব সে জিনিসটুকুও সম্ভাবত আমাদের সমাজের প্রশাসকেরা জানেন না, তারা সুন্দরবন ধ্বংস করে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বানানো পরিকল্পনায় আছেন, জনবসতির একশ কিলোমিটার আওতার মধ্যেই বানাচ্ছেন কুখ্যাত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, লাউয়াছড়াসহ অন্যান্য রিজার্ভ ফরেস্টের বনজ গাছ পাচারের সংবাদ জানার পরও সাংগঠনিকভাবে দুর্নীতির মাধ্যমে চুপ করে থাকছেন, প্রাকৃতিক মৎস ও প্রাণীজ বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্রের নিকটবর্তী দূরত্বেই কলকারখানা বানানোর অনুমতি দিচ্ছেন এমনকি বদ্বীপের কাঠামো টিকিয়ে রাখে যে সমুদ্রতীরবর্তী বাস্তসংস্থান সেখানেও বানাচ্ছেন ইকোনমিক জোন। জিডিপির প্রতি এই লোলুভ নেশা খুব সাধারণ বাস্তুসংস্থানগত বোঝাপড়াও দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদের।

এই যখন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের অবস্থা তখন অন্তত বিশ্ববিদ্যালগুলো থেকে প্রত্যাশা থাকে পরিবেশ ও প্রতিবেশের মূল্যায়ন করবার, কেননা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রধানকাজই মানবকল্যাণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গবেষণা করা, চর্চা করা এবং মডেল দেখানো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের মত প্রতিষ্ঠানগুলোও পারছে না বনভূমির জীবন রক্ষা করে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন করবার মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে, তারাও বন-জঙ্গল উজাড় করে রাষ্ট্রের জিডিপি লোভী কামনার মতই উন্নয়নের মচ্ছবে নেমে পড়েছে। রাষ্ট্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য কার্যকরণ ও আদর্শগত এই ফাঁরাকটুকু না থাকলে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্ব বিদ্যালয় তার আবেদন ও উপযোগিতা হারায়। মুক্তজ্ঞান উৎপাদন ও চর্চা রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমূলক খোলসে আটকা পড়ে যায়। মানবকল্যান ও সুস্থ্য পরিবেশের যে মডেল রাষ্ট্রের সামনে উপস্থাপন করার কথা বিশ্ব বিদ্যালয়গুলোর সেটিও উন্নয়নের ভেলকিবাজির খপ্পড়ে পড়ে রাষ্ট্রের মুনাফালোভী চরিত্রের আদলে নিজেকে নির্মাণ করে।

বলছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নচিত্র নিয়ে, হল বানানোর এই প্রক্রিয়ার শুরুতেই আজ সকালে ক্যাম্পাসের টারজান পয়েন্ট সংলগ্ন এলাকায় কেটে ফেলা হয়েছে বেশ কয়েকটি দীর্ঘবর্ষী বৃক্ষ। এমনকি শিক্ষার্থীরা যাতে সরাসরি দেখতে না পারেন সেই অভীক্ষায় পুরো বনভূমি এলাকা টিন দিয়ে ঘিরে দেয়া হয়েছে। একসময়ের গাছকর্তন বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়া শিক্ষকেরাই হয়ে উঠেছেন বর্তমান সময়ের গাছকর্তন কমিটির পুরোধা। কয়েকদিন আগেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়েও উন্নয়নের এই ভাওতাবজির কথা বলেই কেটে ফেলা হয়েছিল কয়েকশত বনজ বৃক্ষ। অথচ এর কোনোকিছুর জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসন বিন্দুমাত্র জবাবদিহীতা দেবার প্রয়োজন বোধ করেন নি কখনোই। ‘উন্নয়ন’ এখনকার সময়ে এতই প্রভাব বিস্তার অনাচার করবার পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে উন্নয়নের নামে গাছই কাটা হোক, মানুষই মারা হোক, আর বনভূমিকে মরুভূমিই বানিয়ে ফেলা হোক না কেন তার জন্য কোনো শোক হয় নাই। উন্নয়নই যেন সব শোকের ব্যথানাশক বটিকা হিসেবে কাজ করে যায়। আর উন্নয়নের জোয়ারে কেটে ফেলা গাছগুলোর সব শোক বুঝি ভুলে যায় মানুষ? মানুষ ভুলে গেলেও প্রকৃতি কি ভুলতে পারে এইসব শোক?

শেষ করবো নেদারল্যান্ডস এর একটি উদাহরণ দিয়ে, সেখানে মহাসড়কের দুই ধারে সংরক্ষিত এবং প্রাকৃতিক বনাঞ্চল থাকবার কারণে পুরো মহাসড়কজুড়ে প্রায় ছয়শতটির মত ওভারব্রিজ বানিয়ে দেয়া হয়েছে যেগুলোর একেকটির আকৃতি একটি ফুটবল মাঠের সমান। ওভারব্রিজগুলো গাছপালা ও জঙ্গলে ভরপুর, সেগুলো শুধুমাত্র বানানো হয়েছে যাতে করে বনের একপাশ থেকে বন্যপ্রাণীরা রাস্তা পার হয়ে অন্যপাশে চলে যেতে পারে। বনের কারণে সেখানে থেমে থাকেনি মহাসড়ক বানানো, মহাসড়কের কারণে সেখানে হুমকিতে পড়েনি বনের প্রতিবেশ। নিরাপদ ও টেকসই উন্নয়নের এটি খুবই ছোট্ট একটি দৃষ্টান্ত এবং এমন দৃষ্টান্ত স্থাপন করার মত মেধা অবশ্যই আমাদের রাষ্ট্র ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আছে।

লেখক:  শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0351 seconds.