• ২২ জুলাই ২০১৯ ১৪:০৯:০৮
  • ২২ জুলাই ২০১৯ ১৪:২২:৪২
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গণপিটুনির মনস্তত্ব, গণপিটুনির ব্যাকরণ

প্রতীকী ছবি


ফিরোজ আহমেদ :


এই রকম একটা ভিডিও দেখা খুব কঠিন। কিন্তু দেখলাম, যদি উন্মত্ত মানুষের কোন কথাবার্তা কোন ভাবনা শোনা যায়। 'মাইরা ফালা' অনেকবার শোনা গেলো, আর অন্তত একবার শোনা গেলো 'পুলিশ ছাইড়া দিবো'।

গণপিটুনির যতগুলো দৃশ্য এ পর্যন্ত দেখেছি, তাতে সর্বদাই এই বাক্যটাকে বারংবার শুনেছি, সেই হিসেবে বলা যায় পথচলতি মানুষও তুচ্ছ অপরাধে কিংবা বিকট সন্দেহে এমন হিংস্র সত্তায় পরিণত হন, তার প্রধান কারণ বাংলাদেশে পুলিশ এবং আদালতের প্রতি তীব্রতম জনঅনাস্থা।

যেভাবেই হোক, ভারতবর্ষ জুড়েই, এবং বাংলাদেশেরও জনমানসে এই কুসংস্কারটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে: যে কোন নতুন স্থাপনাকে কার্যকর করতে নিরাপদ করতে শিশুদের বলি প্রয়োজন হয়। এমনকি আরও অন্ধবিশ্বাস প্রচলিত আছে যে, ধনীরা তাদের লুকিয়ে রাখা সম্পদ পাহারা দেয়ার জন্য শিশুকে তার সাথে মাটিচাপা দিতেন, মৃতশিশুটি এই সম্পদ পাহারা দিতো যক্ষ বা যখ হয়ে, সেই থেকে যখের ধন প্রবাদটির উদ্ভব। রবীন্দ্রনাথেরও একটা মর্মান্তিক গল্প আছে এই নিয়ে, নিরুদ্দিষ্ট বংশধরদের জন্য গুপ্তধন পাহারা দিতে দাদা ভুল করে আপন নাতিকেই যখ বানিয়েছেন। দীঘিতে জল ওঠাবার জন্য এমন কাহিনী মনে হয় প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আছে। এই ধরনের আরও বহু সংস্কার গ্রামীণ সমাজে আছে, শহরেও কম নেই। একটা যেমন হলো বজ্রপাতে নিহত মানুষের কঙ্কালের অলৌকিক ক্ষমতা। অন্য একটি হলো সীমান্তখুঁটির চুম্বকের ক্ষমতা। এগুলো নিয়ে বহু হত্যাকাণ্ড, জালিয়াতি ও প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে একসময়।

ছেলেধরা সন্দেহে হত্যা বাংলাদেশে এর আগেও অজস্র হয়েছে। ভিখারিরা তার প্রধান শিকার, এছাড়া ভবঘুরে মানুষজন এভাবে নির্মম মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছেন।

চীনা নির্মাতাদের নিয়েও দেশে এই রকম গুজব আগেও ছড়িয়েছিল যে তারা পশুবলি দিয়ে কাজ শুরু করে সৌভাগ্যের আশায়। পদ্মাসেতুর মত জটিল কাঠামো, যা বহু বিলম্বও হয়েছে প্রাকৃতিক নানান বাধায়, সম্ভবত জনমানসে এই কুসংস্কারকে আবার জাগিয়ে তুলেছে। এইসব বড় স্থাপনা যখন গণিত আর প্রকৌশল বিদ্যার অনগ্রসরতার যুগে অনেকবেশি নির্ভরশীল ছিল ভাগ্যের ওপর, তাই প্রাকৃতিক শক্তিগুলোকে তুষ্ট করবার জন্য রক্তপান করানো-- প্রকৃতিকে হিংস্র রক্তপায়ী হিসেবে দেখার একটা শক্তিশালী উপধারা একদা সকল দেশেই ছিল, প্রাণ উৎসর্গ করাটা তারই প্রতিষেধক। এই নিয়ন্ত্রণ যত বেশি মানুষের আপন হাতে চলে এসেছে, তত বেশি এই তুষ্ট করবার দরকারটা কমে এসেছে।

অপরাধী সন্দেহে গণপিটুনিতে হত্যাও সারা দুনিয়াতেই ছিল। এটা কমে আসাটা আইনের দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হবার সমানুপাতিক। গোর্কির একটা গল্প আছে, একশো বছর আগের নিউ ইয়র্কের চিত্র, যেখানে ট্রামের নিচে পড়ে যাওয়া এক মাতালের খুন হওয়াতে কিছু একটা করার উপায় খুঁজে পেলো ছন্নছাড়া হতাশ বেকার ক্ষুদ্ধ বিরক্ত একঘেয়েমীতে পূর্ণ মানুষগুলো, 'লিঞ্চ' 'লিঞ্চ' বলে তারা এগিয়ে গেলো ট্রামচালকের দিকে। এরপর একটা মাত্র বাঁশির তীব্র হুঁশিয়ারি, একটা সটান বাড়িয়ে দেয়া লাঠির হুঁশিয়ারি বাড়ানো লাঠি- গণপিটুনির উত্তেজনার গন্ধে এতক্ষণ মশগুল জনতার হতাশ কাঁধগুলো আবার ঝুলে পড়লো, আবার তারা ডানে বামে খুঁজতে শুরু করলো নতুন আর কোন উত্তেজনা, আর কোন ঘটনা।

গণপিটুনিকে আমাদের দেশে এখনও অনুমোদনযোগ্য হিসেবেই দেখা হয়। ছিনতাইকারীর বেলায় পুলিশকে বেশ কয়েকবার অপেক্ষা করতে দেখেছি কখন মানুষজন মোটামুটি তৃপ্ত বোধ করছে, অনেক সময় দরকষাকষিও চলে। পুলিশের হাতে দিয়ে দেয়ার আগেই যথেষ্ট শাস্তি অপরাধী সন্দেহ করা ব্যক্তিটিকে দেয়া হয়েছে কি না, সেটাই সেখানে বিবেচ্য। আবার অনবিলম্বে হতভাগ্য মানুষটাকে উদ্ধার করার চেষ্টাও দেখেছি তাদের কখনো কখনো। বুঝতেই পারছেন, অজস্র গণপিটুনি দেখতে হয়েছে চলতেফিরতে। পত্রিকান্তরে জেনেছি, একাধিক ঘটনা আছে যেখানে আইন রক্ষাকর্তারাই কাউকে তুলে দিয়েছেন 'জনতার' হাতে, মেরে ফেলবার জন্য। এর প্রধান কারণ হলো গণপিটুনি বন্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতাকে এখানে বড় করে দেখা হয় না, ভারতেও শুনেছি তাই। গণপিটুনিতে জড়িতদের শাস্তির নিদর্শনও এখানে প্রায় নেই। ফলে গণপিটুনির সংস্কৃতি উৎসাহিত হয়। আর সরকারের প্রকৃতি যদি হয় গুণ্ডাতান্ত্রিক, তৃণমূল স্তর পর্যন্ত আপন গুণ্ডাবাহিনীকে রক্ষায় সর্বোচ্চটাই তাকে করতে হয়, কেন সে একজন নামগোত্রহীন নিহত মানুষের জন্য তার তৃণমূলের সদস্যদের ত্যক্ত করতে যাবে! এই বিষয়টাও গণপিটুনির সাথে জড়িতদের মাঝে একটা অভয়বোধের সৃষ্টি করে।

গণপিটুনিতে কখনো কখনো তেমন কিছু করার থাকে না। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই থাকে। ৯৯৯ এ ফোন করে এখন বেশ ভালো সাড়া মেলে। তাছাড়া খুব আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রহারকারীদের থামানোর চেষ্টা করলে অনেক সময়েই হুঁশ ফেরে। সর্বশেষ নারীর দুর্ভাগ্য, অতি সামান্য চেষ্টা, বলা যায় প্রায় কোন চেষ্টাই দেখা যায়নি তাকে রক্ষায় উপস্থিত কারও মাঝে।

তবে আমার অনুমান চলমান পরিস্থিতিতে মানুষের হতাশা, আইনের প্রতি সমস্তরকমের অশ্রদ্ধা, ন্যায্য তদন্ত ও বিচার বিষয়ে ন্যূনতম আস্থার অভাব এমন একটা পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। কাউকে সামান্য অস্বাভাবিক মনে হলে, কাউকে সন্দেহজনক মনে হলে, অপরিচিত মানুষকে দেখলে প্রায় বাতিকগ্রস্ত হিতাহিতশূন্য হয়ে পড়ছে মানুষ। আর এইক্ষেত্রে একটা ব্যাপক মুশকিল এই যে, সমাজের এই সব স্থানে অনেক চোরাস্রোত, অনেক গোপন গুজব, অনেক চক্র কাজ করে, যার দেখা হয়তো আপনি আপনার পরিচিত জগতে পাবেন না।

পদ্মাসেতুর নকশার জটিলতা একদিকে সেই গূঢ় প্রাকৃতিক শক্তি বিষয়ে মানুষের অন্ধবিশ্বাসের জগতকে জাগিয়ে দিয়েছে, নির্মাণজটিলতা তাকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে প্রাণউৎসর্গ বিষয়ে সেই আদিম কল্পনা জেগে উঠেছে, সংশয় আর সন্দেহ তৈরি করেছে। মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত সমাজ হয়তো এই আতঙ্কের ছোঁয়া থেকে অনেকখানি মুক্ত। কিন্তু যাদের ছেলেমেয়েরা মাঠে খেলে বেড়ায়, রাস্তায় হাঁটে, তাদের জন্য এই আশঙ্কা ভয়ঙ্কর। এরসাথে যুক্ত হয়েছে নিরাপত্তা বিষয়ে চরম অশ্রদ্ধা। তার চেনা সকল ভয়াবহ অপরাধীরা-- বিশ্বজিৎ হত্যায় হোক, মিতু হত্যায় হোক, টাঙ্গাইলের সাবেক সংসদ হোক, মুক্ত। ব্যাঙ্ক ডাকাতরা মুক্ত। এবং সবচেয়ে ভীতিকর হবে, মানুষ যদি কিছুদিনের জন্য অন্ধভাবে বি্বাস করে যে, সেতু করবার জন্য এই ছেলেধরায় সরকারের অনুমোদন আছে, তবে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে।

মর্মান্তিক এই মৃত্যুগুলো মেনে নেয়া যায় না। আপনার আশেপাশে এমন দৃশ্য দেখলে অবশ্যই থামাবার চেষ্টা করবেন। বিশেষকরে শিক্ষার্থীদের পক্ষে এটা সবচেয়ে বেশি সম্ভব। ৯৯৯ এ ফোন করবেন, সেক্ষেত্রে পুলিশের তৎপরতা বহুগুন সক্রিয় থাকবে, কারণ তাদেরকে উচ্চস্তর থেকে নির্দেশ দেয়া হবে। উদ্যোগ নিলে, চেষ্টা করলে হয়তো এমন অনেক প্রাণঘাতী ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব হবে।

লেখক: রাজনৈতিক পরিষদের সদস্য, গণসংহতি আন্দোলন ও সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

গণপিটুনি ফিরোজ আহমেদ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0299 seconds.