• ২১ জুলাই ২০১৯ ২০:৪৫:০৫
  • ২১ জুলাই ২০১৯ ২০:৫৩:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

এইখানে মৃত্যু ছাড়া আর কোন দাবি বেঁচে নেই!

প্রতীকী ছবি

তাসলিমা আক্তার রেনু। একজন মা। এই মায়ের একটা সংগ্রাম ছিলো। একা একটি সন্তান লালন-পালন করার সংগ্রাম। স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর শিশু সন্তানটি নিয়ে একাই থাকতেন। সন্তানটি বেড়ে উঠছে... সাথে বেড়ে উঠছে তাঁর স্বপ্ন।

খোঁজ নিতে গিয়েছিলেন তার শিশু সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করবেন সে বিষয়ে। কত স্বপ্ন নিয়ে একজন মা তার শিশুটিকে স্কুলে দিতে যায়? কত বড় স্বপ্ন তার চোখের ভেতর? একটা আকাশ সমান নাকি আরো বড়? এই শিশুটি বড় হবে। রূপকথার মতো এগিয়ে যাবে বাধাহীন সুন্দর জীবনে...।

সেসব ভাবতে ভাবতেই হয়তো অন্য মায়েদের মতো রেনু গিয়েছিলেন স্কুলে খোঁজ খবর নিতে, তার সন্তানকে ভর্তি করাবেন বলে। অথচ লোকে ভাবলো শিশু পাচারকারী, তারপর পিটিয়ে মেরে ফেললো! আমি ভাবছি এই মা যখন মার খেতে খেতে মরে যাচ্ছিলো তার স্বপ্নটা কি চোখের সামনে ভেসে উঠছিলো? নাকি ভাবছিলো, মা ছাড়া ওই ছোট শিশুটি কিভাবে একা থাকবে...! নিশ্চই গণপিটুনির বেদনার চেয়ে মাতৃহারা হয়ে বেড়ে ওঠা শিশুটির মুখ আর বেশি বেদনার মনে হয়েছিলো। তেমনটাই হওয়ার কথা যদি মায়ের মতো ভাবতে চাই।

যখন একজন মায়ের মৃত্যু হচ্ছিলো তখন একজন নির্বাক বাবাকেও মেরে ফেলা হলো একইভাবে। ঠিক একই দিনে একই ভাবে একই সন্দেহে মেরে ফেলা হয়েছে যুবক সিরাজকে। যিনি এক অসহায় বাবা। ঘটনাটি ঘটে নারায়নগঞ্জে। সিরাজ বাক প্রতিবন্ধী। তাকেও ছেলে ধরা সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা হলো। সিরাজের স্ত্রী শামসুন্নাহারের তাকে তালাক দিয়ে অন্যত্র বিয়ে করেন। সেই সংসারে সাথে নিয়ে যান শিশু কন্যা মিনজুকে। ৬ বছর বয়সি মেয়ে মিনজুর জন্য সিরাজের পিতৃমন কাঁদে। তাই দেখতে গিয়েছিলেন মিনজুকে। মেয়ের জন্য চুড়ি-ফিতা কিনে নিয়ে গিয়েছিলেন টাকা ধার করে। কিন্তু গণআক্রোশের শিকার হন সিরাজ। বাক প্রতিবন্ধী সিরাজের ভাষা কেউ বোঝেনি। না মুখের ভাষা, না চোখের ভাষা। যে চোখে তার সন্তানের জন্য কান্না জমে ছিলো। যে চোখে সন্তানকে দেখার হাহাকার ছিলো। সেই চোখের ভাষা কেউ পড়তে পারেনি। এখানে সবাই মূর্খ হয়ে গিয়েছিলো। পিটিয়ে মেরে ফেললো ওই বাবাকে। মৃত্যুর আগে নিশ্চই তৃষ্ণা পেয়েছিলো সিরাজের। আহা সন্তানের হাতে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানির আকুতি কি জেগেছিলো মনে....! একজন বাবার মতো করে ভাবতে গেলে হয়তো এমন কিছুই মনে আসতে পারে।

দিন গড়িয়ে রাত। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে নিহত হয় আরেক বৃদ্ধ। কি নাম তার? কোথায় বাড়ি? কে জানে। মানুষের শুধু মনে হয়েছে লোকটা ছেলেধরা। ব্যস পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। সাভারেও একই ঘটনা। সন্দেহ করে এক নারীকে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে জনতা। একই দিনের ঘটনা সব।

রবিবার সকালে নওগায় ৬ জেলেকে ‘ছেলে ধরা’ সন্দেহে ধাওয়া করে গণপিটুনি দিয়েছে মানুষ। তাদের ব্যাগে থাকা মাছকে মানুষ ভেবে ছেলে ধরা সন্দেহে ধাওয়া করে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ এসে উদ্ধার করে। পুলিশও জানিয়েছে, এরা নিরীহ জেলে। সন্দেহের বশত তাদের পিটিয়েছে মানুষ!

একটা মা মারা গেলো, একজন বাবাও মারা গেলো। জল্লাদের উল্লাস মারা গেলো না। সে বেঁচে রইলো। আমাদের মনে জল্লাদ হাসতেই থাকে...হাসতেই থাকে। এই তল্লাটে একমাত্র মৃত্যুছাড়া আর কোন দাবীই বেঁচে নেই এখন। একা লাগে, অসহায় লাগে, আতংঙ্ক বোধহয়, মনে হয় এই বুঝি ছুটে আসছে একদল মানুষ, তারা ছুটে এসে মেরে ফেলবে বোধহয়! ভয়গ্রস্থ হয়ে পরি আতঙ্কিত হয়ে পরি। নিজেকেই নিজের সন্দেহভাজন হিসেবে মনে হয়। চলতি পথে মনে হয়, কেউ কি কোন কারণে আমাকেও সন্দেহ করছে? এই বুঝি একদল মানুষ ছুটে আসছে পিটিয়ে মারতে। এরপর আমি সেই গণরোষে খাবিখাচ্ছি। কেউ আমার কথা শুনছে না, যেমন শোনেনি সেই মায়ের কথা। যেমন বুঝেনি সেই বাবাকে। তেমনি আমাকেও বুঝি কেউ বুঝছে না-শুনছে না। এরপর আর ভাবতে পারিনা। আমার আতঙ্ক আরো বাড়ে ভয় আরো বাড়ে।

আকাশে আমাদের স্যাটেলাইট ওঠে, আর জমিনে সেতুর জন্য মাথা লাগবে এমন গুজবে মানুষ মরে! আমাদের দেশ ডিজিটাল হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসায় ভ্রমণে যাচ্ছে আমাদের কর্মকর্তারা অথচ সেই মুহূর্তে গলাকাটা গুজবে মানুষ মরছে। আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে মানুষ। একটা সমাজে এমন কি হয় যে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে মেরে ফেলছে, বিচারের কাছে যেতে চাইছে না, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে তুলে দিতে চায় না। কেন? বিচার আইন আদালতে কেন নির্ভর হতে পারছে না? একটা সমাজের মানুষ কেন এমন অন্ধ আচরণ করছে? কেন অস্থির হয়ে উঠেছে সমাজ? এর পেছনে কারণ কি? মূল উৎস্যটা কোথায়? এতো অবিশ্বাসই বা কেন সমাজে জায়গা করে নিতে পারছে? এইসব প্রশ্নের সমাধান আগে করতে হবে।

খেয়াল করলে দেখা যাবে, এখন পর্যন্ত যতগুলো গণধোলাইয়ের ঘটনা ঘটেছে তার বেশির ভাগেই মার খাচ্ছে নিরীহ মানুষ। মরছে, রক্তাক্ত হচ্ছে, কেউবা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে হাসপাতালে। যারা মার খাচ্ছে তাদের সিংহভাগই গরীব-নিম্নবিত্ত দিন মজুর, মানসিক রোগি...। শুধুমাত্র সন্দেহ করে নৃশংস হয়ে উঠছে মানুষ। অচেনা হলেই সন্দেহ লাগছে। কিন্তু কেনে এমন হচ্ছে? অচেনা জনপদে হেটেই তো চেনা হয়েছে, কত মানুষ এক শহর থেকে আরেক শহরে ছুটেছে, ভবঘুরে হয়ে ঘুরেছে। কত বাউন্ডুলে পথিক এলোমেলো পায়ে এ গলি ওগলি হেঁটে বেরিয়েছে এক সময়। অথচ এখন কেন এই অচেনারা আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠছে?

এমন একটা ভয়ের সমাজ তৈরি হয়েছে যে এখানে একটা ভয় আরেকটা ভয়কে শক্তিশালী করে তুলছে। একটা ভয়ের অস্থিরতা আরেকটা ভয়কে জাগিয়ে তুলছে, অস্থির করে তুলছে। এইসব ভয় সমাজকে ঘিরে রেখেছে। ভয়-অবিশ্বাস-অনাস্থা মানুষের বিবেক-বোধ অকেজো হয়ে পরছে। আর সেখান থেকেই আতঙ্কিত মানুষের এমন সব কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে যা সে বুঝতেও পারছে না। মূলত মানুষ সমাজে নিরাপত্তা খুঁজচ্ছে, যা সে পাচ্ছে না কোথাও।

সমাজে এই আতঙ্ক কবে দূর করবে রাষ্ট্র? কবে আমাদের নিরাপত্তা দিবে, আস্থা ফিরিয়ে দিবে? আমরা জানিনা। আমাদের স্বপ্নের নাম হয়ে উঠছে দুঃস্বপ্ন, আমাদের বেঁচে থাকার নাম হয়ে উঠছে আতঙ্ক, আমাদের অনুভূতির ভেতর ঢুকে পরেছে গভীর দুঃখবোধ, তীব্র যন্ত্রণা। আমাদের অপরাধী করে রেখেছে সেই মায়ের মুখ, সেই বাবার তৃষ্ণা এবং তাদের না বলা কথা...।

লেখক: সাংবাদিক ও স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ছেলেধরা গণপিটুনি হত্যা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0201 seconds.