• ২১ জুলাই ২০১৯ ১৭:২৪:০৮
  • ২১ জুলাই ২০১৯ ১৭:২৪:০৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

মব জাস্টিসের আধিক্য, আতংকিত মানুষ, আশংকায় দেশ

প্রতীকী ছবি

বারবার লিখে এসেছি, বলে এসেছি, মবকে প্রশ্রয় দেবেন না, মব জাস্টিসকে উৎসাহিত করবেন না। কে শোনে কার কথা। কেউ কান দেয়নি। না দেয়াতে কি হয়েছে, আজ গুজবের কারণে মানুষ পিটিয়ে মারা হচ্ছে। স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করাতে যাওয়া একজন মাকে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মেরে ফেলা হয়েছে। সেই ভিডিওটাও আবার আপলোড করা হয়েছে সামাজিকমাধ্যমে। যারা দেখেছেন তারা বলতে পারবেন, কি নিষ্ঠুর ছিল সেই মৃত্যু দৃশ্য।

সিদ্ধিরগঞ্জে সিরাজ নামে একজনকে একইভাবে গণপিটুনিতে মারা হয়েছে। পরে জানা গেছে সে ছেলেধরা ছিল না। কিন্তু মৃত্যুর পরে এই জানার আদৌ কোন মূল্য রয়েছে। সাভারেও এক নারীকে হত্যা করা হয়েছে গণপিটুনিতে। ময়নসিংহে এক অসুস্থ মহিলা পানি চেয়েছিলেন, বিপরতীতে তার ভাগ্যে জুটেছে গণপিটুনি। কি ভয়াবহ নিষ্ঠুরতা।

অনেকে প্রশ্ন করেছেন, সারাদেশে হচ্ছে টা কি? কি হচ্ছে তাতো পরিষ্কার। সামাজিক শৃংখলা ভেঙে পড়েছে। মানুষ বিচারে আস্থা রাখতে পারছে না, নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরা খুঁজে নিতে চেষ্টা করছে। সেই সেবা প্রকাশনীর ওয়েস্টার্নে পড়া ‘বুনো পশ্চিমে’র মতন। চারিদিকে চলছে ‘মব জাস্টিস’, চলছে ‘লিঞ্চিং’। ‘ধরো এবং মারো’ ‘মব জাস্টিসে’র এটাই হলো মূল কথা। কিন্তু এই যে ‘ধরো মারো’র নামে বিচার বহির্ভূত হত্যা, এর শুরু কোথা থেকে। কারা ‘হারকিউলিস’, কারা রাস্তা থেকে কালো কাচের মাইক্রোবাসে মানুষ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। কেউ ফেরত আসছে, কেউ আসছে না। এই যে না আসাটা এটাও ‘মব জাস্টিস’, এটাও ‘লিঞ্চিং’।

রেনু নামে যে মাকে ছেলে ধরা সন্দেহে পিটিয়ে মারা হলো। তারও তো দুটো বাচ্চা। এই দুটো বাচ্চাকে এখন দেখবে কে? কি হবে মা ছাড়া ওই দুটো বাচ্চার, তাকি ভেবে দেখেছেন সেই মবওয়ালারা। পৌরুষ দেখাতে হয় সমাজের যারা দোর্দন্ড প্রতাপে আইনকে বুড়ো আঙুল দেখাচ্ছে তাদের ওখানে গিয়ে দেখান। সমাজের উঁচুতলার কিছু মানুষ আজ আইনকে পোষা বিড়াল ভাবছেন। বরগুনার দিকে তাকান, তাহলেই বুঝতে পারবেন, অবস্থাটা কি। কেন মিন্নির বাবার আত্মহত্যার কথা বলতে হয়। কেন মিন্নির মুখ চেপে ধরে রাখা হয়, সেই প্রশ্নের উত্তর জানতে নিজের বিবেক খাটান। ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় নিজের পৌরুষ খাটাতে চেষ্টা করুন। 
দেখলাম কদিন ধরে সরকারি তরফ থেকে চেষ্টা হচ্ছে, যাতে মানুষ গুজবে বিভ্রান্ত না হয়। কিন্তু মাঠে নামার টাইমিংটা তাদের ঠিক হয়নি, যথার্থও হয়নি। আর রয়েছে বিশ্বাসযোগ্যতারও প্রশ্ন। মানুষ এখন বিভ্রান্তিতে।

শিশুর কাটা মাথা ব্যাগে ভরে নেয়ার সময় এক যুবক গণপিটুনিতে মারা গেলো। গুজবের ভিত্তিটা এ ঘটনায় হয়ে উঠলো আরো মজবুত। কিন্তু শিশুর মাথা কাটার কারণ ও তার ব্যাখ্যা সঠিক ভাবে দিতে ব্যর্থ হলো সংশ্লিষ্টরা। মানুষকে আশ্বস্ত করতে ব্যর্থ হলো যে, এটা পদ্মা সেতু বিষয়ক গুজবের সাথে সংশ্লিষ্ট নয়। জানি উত্তরে বলা হবে, চেষ্টা হয়েছে, হচ্ছে। অথচ চিত্র বলছে, সেই চেষ্টা যথেষ্ট ছিলো না, যথেষ্ট নয়। আর তা বিশ্বাসযোগ্যতাও পায়নি।

বিশ্বাসযোগ্যতা না পাওয়া এবং মব জাস্টিসের কারণটা বলার চেষ্টা করি। এর আগে বহু ঘটনা ঘটেছে, মানুষ ন্যায় বিচার পায়নি। বন্দুকযুদ্ধ, হারকিউলিস কাহিনি এসবের জোড়াতালি বক্তব্য, সব ঘটনায় একই ধরণের কথা, মানুষের বিশ্বাসকে দ্বিধান্বিত করেছে। রাতের অন্ধকারে বা দিনের আলোতে মাইক্রোবাসে তুলে নেয়ার পর অস্বীকারের ধারাবাহিকতা বিশ্বাসের সেই দ্বিধাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বিচার এবং বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরণের বিভ্রান্তি, সাথে অনাস্থা।

এসবের সাথে যোগ হয়েছে, রাস্তাঘাটে, ডোবা-নালায়-নদীতে, রেললাইনের ধারে পাওয়া মানুষের মৃতদেহ। পঁচা-গলা বিকৃত অজ্ঞাত পরিচয় সেইসব মৃতদেহের পরিচয় আর কখনোই জ্ঞাত হয় না। ঠাঁই হয় আঞ্জমানে মফিদুলে। অথচ স্বজনরা খুঁজতে থাকে সেই অজ্ঞাতদের দিনের পর দিন। একসময় তারা বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে। তাদের সাথে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠে তাদের সমব্যথিরা, সমাজ।

তনু, তানিয়া, রূপা, আফসানা, বিশ্বজিত, সাগর-রুনি, ফাগুন হত্যাকান্ডগুলোর মত অনেক হত্যাকান্ডেরই যখন কোন সঠিক সুরাহা না হয়। তখন দেশের মানুষ বিচার প্রক্রিয়ার প্রতি আস্থা হারায়, ন্যায় বিচার নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়। সঙ্গত কারণেই বিক্ষুব্ধতা ভর করে দেশের মানুষের মন ও মগজে। এমন একটা অবস্থায় ‘মব জাস্টিস’ জনপ্রিয়তা না পাবার তো কোন কারণ নেই। আর মব জাস্টিসের পরিণতি ‘লিঞ্চিং’ অর্থাৎ ‘ধরো এবং মারো’, এটাওতো অজানা থাকার কথা নয়।

অনেক আগে থেকেই আমরা কিছু মানুষ, যার সংখ্যা খুব বেশি নয়, এমন আশংকার কথা বলে আসছিলাম। বুঝতে পারছিলাম এই ট্রেন্ড দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাবে। আজো ধারণা করতে পারছি দেশ কোথায় যাচ্ছে। কিন্তু আমরা শুধু ধারণাই করতে পারি। ধারণা ছাড়া আমাদের মতন ঢাল-তলোয়ারহীন নিধিরাম সর্দারদের আর কিছু করার ক্ষমতা নেই। করার ক্ষমতা যা কিছু তা প্রকৃত সর্দারদেরই।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

 

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0207 seconds.