• ২০ জুলাই ২০১৯ ১৭:১৪:৩৪
  • ২০ জুলাই ২০১৯ ২২:৪৩:০১
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

বানের স্রোতে ভাসি গেইলং, এক গ্লাস পানি দেও খাই

ছবি : সংগৃহীত


জাহানুর রহমান খোকন :


গত কয়েকদিনের অবিরাম বৃষ্টির পানি, তৎসঙ্গে উজানের পানির ঢলে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদসহ ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধর, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপরসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এসব নদী তীরবর্তী শত শত গ্রামের কয়েক লক্ষ মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। কুড়িগ্রামের বানভাসি মানুষ বন্যায় অমানবিক কষ্ট পাচ্ছে, বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। ইতোমধ্যে ১০ দিনে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে পানিতে ডুবে। বন্যার পানিতে ডুবে আছে সাড়ে ৭ লক্ষাধিক পরিবার ও তাদের ঘরবাড়ি।

চরাঞ্চলের অধিকাংশ ঘরবাড়ি পানির নিচে,তারা কেউ আশ্রয় নিয়েছে বাঁধের রাস্তায়,কেউ আশ্রয় নিয়েছে নৌকায়। গরু ছাগলের সাথে নৌকায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। খাদ্য সংকট, বিশুদ্ধ পানীয়জলের সংকটে ভূগছে চরাঞ্চলের এই মানুষ গুলো। অথচ সরকারের কোন বিকার নেই। ছিটেফোঁটা ত্রাণ যা যাচ্ছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অতি নগণ্য।

অপরদিকে নদনদীর পানি বেড়েই চলেছে। আমরা উদ্বিগ্নের সাথে লক্ষ্য করছি যে, কুড়িগ্রামে লক্ষ লক্ষ বানভাসি মানুষের জন্য সরকারি পর্যায়ের ত্রান-সাহায্য খুবই অপ্রতুল। এমতাবস্থায় বানভাসি মানুষের জন্য নিরাপদ আশ্রায়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, পয়নিস্কাশনের ব্যবস্থা, গবাদিপশু রাখার জায়গার ব্যবস্থা, গবাদিপশুর খাদ্য সরবরাহ করাসহ যাবতীয় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতি জরুরি।

১. বাড়তে পারে শিশু মৃত্যু :

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে ৮৫টি মেডিক্যাল টীম বিভিন্ন চরাঞ্চলে কাজ করছে। কিন্তু সাড়ে ৭ লক্ষাধিক পানিবন্দি মানুষের জন্য তা কতটা অপ্রতুলতা সেটা পাঠক মাত্রই বুঝবার কথা। এদিকে বাঁধ ও চরাঞ্চলে অবস্থানরত শিশুদের বিভিন্ন ধরনের অসুখ দেখা দিয়েছে। টিউবওয়েল সব পানির নিচে, বিশুদ্ধ খাবার পানি সংকট। চিলমারীতে বন্যার কারনে কলেরা হয়ে মারা গেছে সমস্তভান নামের এক জয়ীতা নারী। কলেরা রোগের চিকৎসা নিচ্ছে তার পুত্রবধু ও নাতনি। সামান্য জ্বরে এন্টিবায়োটিক ইঞ্জেকশন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গ্রামের হাতুরে ডাক্টারের বিরুদ্ধে।

পানি মাপার দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ধরলা ৯১ সেন্টিমিটার, নুনখাওয়া পয়েন্টে ৮৯ সেন্টিমিটার এবং চিলমারী পয়েন্টে ১১৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এমতাবস্থায় শিশুদের ডায়রিয়া সহ নানান সমস্যা দেখা দিতে পারে। সেদিকে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তদারকি জরুরি হয়ে পড়েছে।

২. থিওরি অব র‌্যাটস :

শ্রাবণ মাস বর্ষাকাল। বর্ষা আসবে এটি অতি স্বাভাবিক একটি বিষয়। কিন্তু বন্যা? আমরা জানি বাংলাদেশে সাধারনত আগস্ট-সেপ্টেম্বরে একটি নিয়মিত বন্যা হয় তার আগে শ্রাবণে একটু ঘাস ছুইছুই হাটু পানির বন্যা হয়। সেদিক বিবেচনায় এই বন্যাটি হলো আগাম বন্যা। আর ভৌগলিকভাবে বাংলাদেশ তথা কুড়িগ্রাম ভারতের আসাম রাজ্যের পাশে অবস্থিত। তাই অতি বর্ষণ ও পানির ঢল কুড়িগ্রামের এই আগাম বন্যার প্রধানতম কারণ হতে পারে। সেই পানির বিস্তার কতটুকু হবে সেটিই এখন বিবেচনার বিষয়। আমি পূর্বেই বলেছি শ্রাবণের বন্যা হবে ঘাস ছুইছুই হাটু পানির সমান। সেটা না হয়ে কেন চাল ছুই ছুই গলা পানি? কেন চরাঞ্চল অতিক্রম করে শহরে পানি এটি এখন গবেষণার বিষয়।

এর প্রথম কারণ হলো নদ-নদীর নাব্যতা হ্রাস। কুড়িগ্রাম জেলার মোট আয়তনের ২২ ভাগ নদ-নদী ও দ্বীপ চরাঞ্চল। আর ভৌগোলিকভাবে উজানের পাহাড়ি ঢল ও নদ-নদীর প্রবেশদ্বার হওয়ায় সেখানে বন্যার প্রকোপ বেশী পড়েছে। নদ-নদী খনন না করায় সেই পাহাড়ি ঢল ও অতি বর্ষণের অতিরিক্ত পানির চাপ আমাদের নদীগুলোর ধারণ ক্ষমতার বাইরে তাই নদীর দু'কূল ছাপিয়ে বন্যা দেখা দিচ্ছে। আর শহরে বন্যার কারণ হিসাবে আমরা বিগত ২০১৭ সালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্যবটি আবারো স্মরণ করতে পারি, সেটি হলো বাধে ইঁদুর  গর্ত করে ফলে বাধ ভেঙ্গে যায়, শহর প্লাবিত হয়।

পানি উন্নয়ন বোর্ড তাদের বিখ্যাত থিওরি অব র‌্যাটস দিয়েই খালাস অন্য দিকে স্থানীয় চেয়ারম্যান বাঁধের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বলেই দায়সারা। কিন্তু সকলে অবগত যে বাঁধের রাস্তার আসে পাশের জমি মালিকগণ দিন দিন বাঁধ কেটে সরু থেকে সরু করে ফেলায় শহর রক্ষা বাঁধ নাজুক হয়ে পড়েছে। যার ফলে শহরে বন্যা দেখা দিয়েছে। গতকাল রৌমারী বন্দবের এলাকায় এলজিইডি'র সড়ক ভেঙ্গে গোটা উপজেলার বাঁধের ভিতরের ৫০ হাজার পরিবার নতুন করে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চিলমারী উপজেলার কাচকল এলাকায় বাঁধ ভেঙে গোটা উপজেলা পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। একই অবস্থা রৌমারী ও রাজিবপুর উপজেলায়। তিন উপজেলায় সকল ধরণের কার্যক্রম স্তবির হয়ে গেছে।

কোমড় পানিতে তলিয়ে আছে উপজেলা প্রশাসন, থানা, হাসপাতালসহ গোটা এলাকা। এখন পর্যন্ত বন্যায় ৫৬টি ইউনিয়নের ৫৭৮টি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এতে সাড়ে ৭ লাখ মানুষ পানিবন্দি। সদর উপজেলার কাঠালবাড়ি বাংটুর ঘাটের পাশের বাঁধে গত কয়েকদিন আগে এলাকাবাসীর তৎপরতায় পাইলিং করে বস্তা দেওয়া হলো। কিন্তু মরবার পূর্বে এই চিকিৎসা দিয়ে আমরা কি করবো?

৩. জনগণের সরকার বনাম ভোটের নেতা :

দেশের এরকম অবস্থায় সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে মন্ত্রী ও এমপিদের এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশনা আসা দরকার ছিল। প্রয়োজনে সেনা মোতায়েন করে এই সংকট নিরসন করা। কিন্তু আমরা কি দেখলাম? এলাকার সাংসদ, মন্ত্রী তো দূরের কথা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, মেম্বার পর্যন্ত কোনো এলাকায় বন্যার্তদের খোঁজ খবর নিতে যায় নাই। এখন প্রশ্ন হলো কেনো যায় নাই?

কারণ, এই সংকটময় সময়ে তাদের কাছে খালি হাতে যাওয়ার সাহস চেয়ারম্যান মেম্বারের কিংবা আমাদের সংসদ সদস্যদের নাই। এরা ভোটের চেয়ারম্যান, জনগণের চেয়ারম্যান নয় তাই জনগণকে ভয় পায়। আর সংকল্পবদ্ধ থাকে মরে কিছু ভোটার মরুক এতে কম টাকায় ভোট কেনা শেষ হবে কিন্তু খালি হাতে ভোটারের সামনে যাবো না।

আমাদের সংসদ সদস্য সম্পর্কে পাগলি ছকিনা আক্ষেপ করে বলেছিল-ভোট আসপে (আসবে) ওমরা এমপি হউবে (ওরা এমপি হবে), এক্যান(একটা) গাড়ি দুক্যান (দুইটা) হইবে, হামার এক্যান শাড়ি ছিড়ে আধখ্যান হইবে ( আমাদের একটা শাড়ি ছিঁড়ে অর্ধেক হবে)।

এমতাবস্থায় চেয়ারম্যান বা সাংসদের উপর ভরসা আর নয়, সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপের আশায় দিন গুণছেন কুড়িগ্রামের বানভাসি মানুষ।

জনগনের সরকার জননেত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা যেন তাদের বাঁচবার শেষ পাথেয়।

৪. বন্যার্তদের উপর কিস্তির ঘা :

কুড়িগ্রাম কৃষি নির্ভর জেলা,এখানে নেই কোন শিল্পকারখানা। তাই বিভিন্নি এনজিও'র কাছে ঋণ নিয়ে তারা আউস ধানের আবাদ করেছিল। এ বছর ধানের দাম কম থাকায় ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষি সেই ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারে নাই।

কৃষি অফিস ও জেলা কন্ট্রোল রুমের তথ্যমতে জেলায় সাড়ে ৭ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি, ক্ষতিগ্রস্ত দেড় লক্ষাধিক ঘরবাড়ি ও ১৫ হাজার ১৬০ হেক্টর ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এই সকল বর্গাচাষি কৃষকদের আশা ছিল পরের ফসল আমন ধান করে এই ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু আগাম বন্যা আসায় এনজিও গুলো বুঝতে পেরেছে আমনেও তারা ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবে। তাই সুযোগ বুঝে বাসায় এসে কিস্তির টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে।

যদিও সরকারী দফতর থেকে নির্দেশনা রয়েছে বন্যার সময় কিস্তির টাকার চাপ না দেওয়ার। কিন্তু সেটা তারা মানছে না। উল্টো বড় কর্তার দোহাই দিয়ে কিস্তির চাপ সৃষ্টি করে আসছে। যা বানভাসি মানুষের উপর মরার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে।

৫. নিজ দেশে পরবাসি একা কেন ভালবাসি :

এই দুর্দিনে নেই ত্রাণ, নেই আর্থিক সাহায্য। নেই সরকারের তৎপরতা তাইতো ত্রাণের পরিবর্তে আবারো বাজেটের কথা মনে পরে যায়। মনে পরে যায় রোহিঙ্গাদের কথা, শরনার্থী হয়েও তারা যে সুযোগ সুবিধা পেয়েছে তা রংপুর তথা কুড়িগ্রামের জনগণ পায় নাই। কেন পায় নাই? সেটা ভাববার বিষয়। সাড়া দেশের মোট বাজেটের ৮ ভাগের এক ভাগ যেখানে রংপুরের পাওয়ার কথা সেখানে রংপুর পাচ্ছে মাত্র ১০০ ভাগের এক ভাগ।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব প্ল্যানার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে বাংলাদেশের সব থেকে বেশী বরাদ্দ ঢাকা চট্টগ্রাম বিভাগের পরেই জেলা শহর গোপালগঞ্জে। সব থেকে কম পেয়েছে রংপুর বিভাগ। উন্নয়ন কর্মসূচির এই বরাদ্দ হওয়ার কথা ছিল দারিদ্রতা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে, কিন্তু হয়েছে তার উল্টো। কেন এই আঞ্চলিক বৈষম্য?

বাজেট গবেষক ড. আদিল মোহাম্মদ সাম্প্রতিক সময়ের বাজেট বিশ্লেষণ করে বলেছেন, বাংলাদেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় আসে তখন সেই সরকারের মন্ত্রীদের এলাকায় বেশী বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেদিক বিবেচনায় এ বছর রংপুরে সব থেকে বেশী বাজেট হওয়ার কথা সেটিও হয় নি।

নাকি রংপুরবাসির সাথে এই আঞ্চলিক বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের আদলে সৃষ্টি সেটা প্রমাণের উপযুক্ত সময় বানভাসি মানুষের কান্না এসে গেছে। সরকারকে প্রমাণ দিতে হবে আমরা নিজ দেশে পরবাসি নই। আমরা কুড়িগ্রাম তথা রংপুরের মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক।

লেখক ও শিক্ষক

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0200 seconds.