• ১৮ জুলাই ২০১৯ ১৯:০৯:১০
  • ১৮ জুলাই ২০১৯ ১৯:০৯:১০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

‘কি খাই, কই থাকি কেউ খোঁজ নিতে আইলো না’

ছবি : সংগৃহীত

পবনদাস বাউলের একটি জনপ্রিয় গানে গেয়েছেন, ‌‌‘বান উঠলো ভাই ঘরে ঘরে/ দেওয়াল চাপা মানুষ মরে/ বালক ছেলে কোলে করে/ বালক ছেলে কোলে করে স্কুলে পলাই/ বসুন্ধরার বুকে বরষারি ধারা/ ধারা ভরা হাহাকার....।’

বাউল তার গানে গানে তুলে ধরেছেন বানভাসি মানুষের হাহাকার দুর্দশার কথা আর এখন বাংলাদেশের বন্যাকবলিত অঞ্চলের মানুষ তাদের যাপিত জীবন দিয়ে দেখাচ্ছেন সেই হাহাকারের চিত্র।

বরষার ধারা যখন নদ-নদী উপচে ভাসিয়ে নেয় জনপদ তখনতো হাহাকার জাগবেই। সেই হাহাকার শিশুর বুক থেকে আসে, মায়ের বুক থেকে আসে...। বানের জলে ভেসে যাওয়া গবাদি পশুর চোখ বেয়ে নেমে আসা জলও মিশে যাচ্ছে স্রোতে। কোথায় পাবে ঠাই এই বানভাসি মানুষেরা? ঘরের মাচায়/চালে/ উঁচু বাঁধে আশ্রয় নেয়া এই বন্যাকবিলত এলাকার মানুষেরা একেকজন যেন দূর দ্বীপবাসি। চারিদিকে শুধু থই থই করছে পানি, আর কেউ নেই!

হঠাৎ বন্যার পানির ঢলে সব ভাসিয়ে নিলেও ভাসিয়ে নিতে পারেনি ক্ষুধা। তাইতো বন্যার পানির নিচে সব তলিয়ে যাওয়ার পর কুড়িগ্রামের সাবেরা বেওয়া বলে ‘কি খাই, কই থাকি কেউ খোঁজ নিতে আইলো না’!

এখন এই হাহাকার শুরু হয়েছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। বেশিরভাগ নদ-নদীর পানি বইছে বিপদসীমার ওপর দিয়ে। দেশের ২১ জেলা বন্যায় তলিয়েছে। গত কয়েকদিনে বন্যা পরিস্থিতির অবনতিতে চরম দূরাবস্থায় পরেছে মানুষ। প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। মানুষ পানিবন্দি হয়ে কোনো মতে দিন কাটাচ্ছে ৷ কোথাও কোথাও পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারন করেছে। ফসলের মাঠ তলিয়েছে, বাড়ির উঠোন তলিয়েছে। এরপরও থামেনি, পানি বেড়ে ঘরও তলিয়ে গেছে। রান্নার জন্য চুলাটাও নেই। ঘরে খাবার নেই, থাকার মতো আশ্রয় নেই, শৌচাগার নেই, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই। কিন্তু এসবই ছিলো একসময়, এখন সবই পানির নিচে। রোগ-শোক-ক্ষুধা এবং ভবিষ্যতের দুঃশ্চিন্তা এক অমানবিক পরিস্থিরি সৃষ্টি করেছে এসব অঞ্চলে। শিশুসন্তান আর গবাদিপশু নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে বানভাসি মানুষেরা।

দেশের উত্তরাঞ্চলে এখন এমনই চিত্র। কারো ভেসে গেছে ফসলের মাঠ, কারো বা গবাদি পশু, কারো ভেসে গেছে গোছানো সংসার। ব্রহ্মপুত্র নদীর পানিতে প্লাবিত হয়ে বৃদ্ধা নুর বানু আশ্রয় নিয়েছেন ঘরের চালে। ৮ দিন ধরে সেখানেই অবস্থান করছেন। রোদ বৃষ্টি পানিতে ভিজেছেন শুকিয়েছেন এখানেই! এখন শরীরে দেখা দিয়েছে নানা সংক্রামক রোগ, খোস-পাচরা। অন্যদিকে পেটে ক্ষুধা। অথচ নুর বানুর যাওয়ার জন্য কোনো জায়গা নেই, খাওয়ার জন্য কোনো খাবার নেই। বন্যাকবলিত গ্রামে গ্রামে এখন এমন নুর বানুদের দেখা মিলবে। 

গত বুধবার বাংলা’র এক প্রতিবেদনে উঠে আসে কুড়িগ্রামের বন্যা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র। ৫০ বছর বয়স্ক মেহেরজান বলছিলেন, তিনি তার জীবদ্দশায় এতো পানি দেখেনি। ৮৮ সালের বন্যাকেও হার মানিয়েছে। 

কুড়িগ্রামের ৫৬ ইউনিয়নের দেড় লক্ষাধিক পরিবারের এখন মানবেতর ভাবে জীবন যাপন করছে। ঘর সংসার ফেলে একটু আশ্রয়ের জন্য ছুটছে মানুষ এদিক-সেদিক। কেউ আশ্রয় নিচ্ছে উচু স্কুলগুলোতে। কেউ বা বাঁধের রাস্তায়।

যমুনা নদীর পানি বেড়ে গত ৩০ বছরে রের্কড ভেঙেছে। দেশের মোট ২১ জেলায় পানিবন্দি আছে ১৫ লাখ মানুষ। বন্যায় রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত পানিতে ডুবে কুড়িগ্রামে ৫ শিশু ও সিরাজগঞ্জে এক শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে ৷ ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় দুর্যোগ সাড়াদান সমন্বয় কেন্দ্রের উপ সচিব কাজী তাসমীন আরা আজমিরী ডয়চে ভেলেকে দেয়া এক স্বাক্ষাতকারে জানিয়েছেন, জেলায় এখন পর্যন্ত ২১ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন চাল পাঠানো হয়েছে। আর্থিক অনুদান দেয়া হয়েছে তিন কোটি ১৭ লাখ টাকা। শুকনো খাবারের ব্যাগ দেয়া হয়েছে ৮৪ হাজার।

তবে প্রকৃত চিত্র ভিন্ন রকম। অনেকের কাছেই পৌঁছায়নি ত্রাণ! এ কথা স্বীকারও করে নিলেন স্থানীয় পর্যায়ের দায়িত্বশীলরা। চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আজগার আলী সরকার জানালেন, তিনি ১০ হাজার পানি বন্দি পরিবারের বিপরীতে বরাদ্দ পেয়েছেন ৪৮০ পরিবারের! কিন্তু ক্ষুধার ভাষাতো দপ্তর বোঝে না, মন্ত্রণালয় চেনে না। ক্ষুধার্থ পাকস্থলিতো আর বুঝতে চায়না এখনো ত্রাণ পৌঁছায়নি আরো অপেক্ষা করতে হবে...। তাই ক্ষুধার সাথে সাথে বাড়ছে মানুষের ক্ষোভও। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ সাবেরা বেওয়া, কছিমনরা অভিযোগ করেন, তাদের কেউ কোন খোঁজ নিচ্ছে না।

উলিপুরের হাতিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হোসেন জানান, তার ইউনিয়নে ৭/৮ হাজার পানি বন্দি পরিবারের জন্য যে পরিমান চাল পেয়েছেন তা মাত্র ৫০০ পরিবারকে দেয়া যাবে। 

মরার উপর আবার খড়ার ঘা হয়ে দেখা দিয়েছে এনজিও গুলোরক্ষুদ্র ঋনের কিস্তি! মাঠ কর্মীরা কিস্তি আদায়ে আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে গিয়েও হানা দিচ্ছেন! এই হচ্ছে সার্বিক পরিস্থিতির একটি নমুনা চিত্র। ত্রাণ এখনো যা যাচ্ছে তার প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। এখনো বন্যার এই ভয়াবহতা স্পর্শ করতে পারেনি বোধহয় আমাদের নাগরিক মনকে। সাধারনত গণমাধ্যমের বাইরেও সামাজিক মাধ্যমগুলোতে দেশের বিভিন্ন পরিস্থিত/দুর্যোগের চিত্র তুলে ধরে আলোচনা করেন সাধারন নাগরিকরা। সমস্যা হলে সমাধান চায়, সাহায্য দরকার হলে এই সামাজিক প্লাটফর্ম  ব্যবহার করেও অনেকেই ‘ত্রাণবন্ধু’ হিসেবে হাজির হয় দুর্গত এলাকায়। দল বেধে তরুণরা পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ভাঙা ঘর আবার জুড়ে দেয়ার স্বপ্ন দেখায়। কিন্তু কেন যেন এবারো এসব কিছুই এখনো চোখে পরছে না। এখনো তেমন কোন আলোচনাও হতে দেখিনি।

সাধারনত গণমাধ্যমের পাশাপাশি সাধারন নাগরিকরা ফেসবুককে তাদের মত প্রকাশের জন্য ফেসবুককে যে প্লাটফর্ম হিসেবে বেছে নেন সেখানেও তেমন কোনো আলাপ চোখে পড়েনি আমার। উদ্বেগ উৎকণ্ঠার চিত্র চোখে পরেনি নাগরিক সমাজের ভেতরেও। বরং যদি ফেসবুক দুনিয়ার কথাই ধরি তাহলে গত কয়েকদিন ছিলো ‘ফেসএ্যাপ’ নিয়ে ব্যস্ততা। তরুণরা বন্ধুরা সব বুড়ো সেজে বসে আছে! এই নিছক মজার আড়ালে চাপা পরে যাচ্ছে কী সেই বন্যা দুর্গত মানুষের ছবি? ওই ক্ষুধার্থ শিশুটির কান্না, মায়ের আহাজারি, ঘর ভাঙা দম্পত্তির স্বপ্নহীন চোখের ছবি, কৃষকের বুক জুড়ে তৈরি হওয়া ফসলা হারানো হাহাকার...।

এই বন্যা কত ধরনের সংকট তৈরি করে দিয়ে যাচ্ছে বন্যাকবলিত এলাকার মানুষের জীবনে তা নিরাপদ স্থানে বসে অনেকে ধারনাও করতে পারছি না আমরা। বর্তমানে খাদ্য-আবাসস্থল-শৌচাগার-বিশুদ্ধপানি-ওষুধ এরমত মৌলিক সংকটগুলো যেমন তীব্রভাবে রয়েছে, তেমনি পানি নেমে গেলেও ক্ষয়তক্ষতি সামাল দেয়া এই সব অঞ্চলের নিন্ম আয়ের মানুষের জন্যে আরেকটি সংকট তৈরি করবে। কারো ভেঙেছে ঘর, কারো বা গেছে মাঠের ফসল, কারো পুকুরের মাছ, কারো গবাদি পশু, কারো বা ভেসে গেছে ক্ষুদ্র ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি। দেখা গেছে এই সব দিয়েই চলতো সংসার-জীবন-জীবিকা। এই ক্ষতি তারা কিভাবে কাটিয়ে উঠবে?

দুর্গত এলাকার মানুষের দিকে এখনই নজর দেয়া দরকার। তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে হবে আমাদেরকেই। অনতিবিলম্বে ত্রাণ পৌঁছে দেয়ার পাশাপাশি দরকার চিকিৎসা সহায়তাও। প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরা। মানুষকে এমন সর্বহারা করে দেয়া বন্যায়, চুপচাপ বসে থাকাটা অন্যায়ই হবে...।

লেখক: সংবাদ কর্মী ও স্বাধীনধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা

সংশ্লিষ্ট বিষয়

বন্যা

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0215 seconds.