• ০৮ জুলাই ২০১৯ ২২:৩৪:৩৩
  • ০৮ জুলাই ২০১৯ ২২:৩৪:৩৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

ভালোবাসার র‌্যাগ-৪১ এবং রাজা-রাণী নির্বাচন প্রসঙ্গে কিছু কথা

ছবি : সংগৃহীত

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবছর যে ব্যাচটি বের হয়ে যায়, সেই ব্যাচের শিক্ষার্থীরা ঘটা করে শিক্ষা সমাপনী উৎসব (র‌্যাগ) করে। পুরো উৎসবে থাকে রাজা-রাণী থেকে শুরু করে মন্ত্রিপরিষদ। এই রাজা-রাণী আবার নির্বাচন করা হয় গোপন ব্যালট পদ্ধতির ভোটের মাধ্যমে। এবছর বিশ্ববিদ্যালয়টির ৪১ তম ব্যাচের বিদায় ঘন্টা বেজেছে। গত ৫ জুন হয়ে গেছে রাজা-রাণী নির্বাচনও। এই নির্বাচনের নানা অভিজ্ঞতা, অনুযোগ, অভিযোগ, ভালোবাসা ও আবেগের জায়গা নিয়ে লিখেছেন ৪১ তম ব্যাচের শিক্ষার্থী- লুসি ম্যারি এন (ছদ্মনাম)।

‘রাম যদি হেরে যেত, রামায়ন লেখা হত
রাবণ দেবতা হত সেখানে’

কিন্তু আমাদের এখানে কোনো দেবতা বা অসুরের গল্প নেই। আমাদের গল্প ছিল র‌্যাগ-৪১ নিয়ে, রাজা-রাণী নিয়ে, উদ্দেশ্য ছিল সবাইকে ছেড়ে যাবার আগে আর একবার বুকে টেনে নেওয়া। অথচ.........….

ইতোমধ্যেই নির্বাচন হয়ে গেছে, আমরা আমাদের রাজা-রাণী পেয়ে গেছি। সেই সাথে কিছুটা শিক্ষাও পেয়ে গেছি আমরা, যারা ভালোবেসে দূর থেকে ক্যাম্পাসে ছুটে গিয়েছিলাম ভোট দিব, র‌্যাগ করব বলে। কিন্তু এখন পর্যন্ত র‌্যাগ-৪১ এর গ্রুপে যা দেখছি, আমরা বন্ধুরা একে অপরকে যেভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করছি একজন সাবেক শিক্ষার্থী, একজন র‌্যাগার হিসেবে তা সত্যিই আমাকে কষ্ট দিচ্ছে।

জীবনের রূঢ় বাস্তবতায় জীবিকার তাগিদে আমার মত অনেকেই ক্যাম্পাসের বাইরে। কেউ চাকরি করছে, কেউবা পড়াশোনা করছে। তাই এখনো যারা ক্যাম্পাসে আছে তারা সফলভাবে র‌্যাগ আয়োজন করবে এমন প্রত্যাশা আমাদের সবার ভেতরে। কিন্তু অপ্রত্যাশিত ঘটনা চূড়ান্ত রূপ নিতে শুরু করে একটি অনলাইনে ‘‘র‌্যাগের অর্থ আত্মসাৎ ও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে’’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে।

৭০০ একর থেকে অনেক দূরে বসে এমন সংবাদ দেখে কাছের বন্ধুকে ফোন করে জিজ্ঞেস করি, এসব কেমন কথা? সত্যি নাকি? নিউজে তো অভিযুক্ত ছাড়া আর কারো নাম নাই? কথা হয় বন্ধু, ছোট-বড় আরো কয়েকজনের সাথে। তারপর সব ভুলে নিজের কাজে মন দেই। রাতে ঘরে ফিরে ফেসবুকে ঢুকি। দেখি চলছে আরেক পর্ব। আমাদের মহানুভব রাজা-রানী (বিজিত) নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করে গ্রুপে পোস্ট দেয়। তবু ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে তারা রক্ষা পায় না। আমরা ভুলে যাই কে বন্ধু, জানি না কে আড়ালের ক্রিড়ানক। তবু কেবল দোষারোপের রাজনীতিতে আমরা দ্বিধা-বিভক্ত হই, সুযোগ করে দেই। আর এ সুযোগে নায়কের মুখোশে মুখ ঢাকে খলনায়ক।

রাতে ভাত খেয়ে ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফেসবুক দেখি আর বন্ধুদের কাছে জানতে চাই...কী হচ্ছে? আমার এক বন্ধু জানায়, এক প্রার্থী বাকিতে নিমেনেশন কিনেছিল। তার টাকার হিসেব পাওয়া যাচ্ছে না। কিন্তু বাকিতে নিমেনেশন দেওয়ার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনার পেল কীভাবে?

এসব কথা বলতে বলতে ৩৯ এর এক আপুর ফেসবুক অ্যাকাউন্টে চোখ পড়ে। দেখি তিনি তার র‌্যাগের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছেন, ‘...র‌্যাগের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা দেওয়ার কথা।’

অথচ একজন সাধারণ ভোটার হিসেবে আমি জানি না ব্যাংকে কবে টাকা জমা হয়েছে, কত টাকা জমা হয়েছে অথবা আদৌ কোনো টাকা জমা হয়েছে কিনা। এসব জানারও কোনো প্রয়োজনবোধ করিনি, বন্ধুরা সব আছে বলে।

কিন্তু ধীরে ধীরে জানতে পারি অনেক কিছু। অনেক প্রশ্ন তৈরি হয়। অথচ কোথাও কোনো উত্তর নেই। কেবল আছে কাদা ছোড়াছুড়ি। নিশ্চয় এই কাদা ছোড়াছুড়ির এক ফাঁকে টাকা-পয়সার একটা স্বচ্ছ হিসাব তৈরি করা হয়ে গেছে...এখন প্রশ্ন উঠলেই এই সহীহ ফর্দ আমাদের সামনে তুলে ধরা হবে আর বলা হবে এইসব দুষ্কৃতকারীদের বয়কট করা হোক!

বিকেলেই ক্যাম্পাস ছাড়তে হবে বলে আমি সকাল সকাল ভোট দিয়েছি। রঙিন ব্যালট পেপার পেয়েছিলাম আমি। কিন্তু আরেক বন্ধু জানায়, দুপুরের পর পর ব্যালট নাকি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তাই সে বিকেলে ফটোকপি করা ব্যালটে পেপারে ভোট দিয়েছে। আশ্চর্যতম সংবাদ!

নির্বাচনে ভোট হবে সব এক রকম ব্যালটে...যতজন ভোটার ততটি ব্যালট পেপার নিশ্চিত করা নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব। তারা জানত না কতজন ভোটার? যদি জেনে থাকে...তাহলে ব্যালট কম পড়ার দায় কার? ফটোকপি করা ব্যালটে ভোট হতে পারে? ফটোকপি করা ব্যালট তো বাইরে থেকেও কেউ নিয়ে আসতে পারে।

তাহলে বন্ধুত্বের কথা বলে, ব্যাচের ইউনিটির দোহায় দিয়ে এত কথার কি দরকার? কী দরকার রাজা-রাণী প্রার্থীদের কাছে ২০ হাজার টাকায় নমিনেশন বেচার...তারা কি ফটোকপি করা ব্যালটে ভোট করার জন্য এত টাকায় নমিনেশন কিনেছিল?

প্রশ্ন আরো জাগে...জানতে পারি ভোট গ্রহণ শেষে জাকসুর কক্ষটি তালা দিয়ে নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা প্রায় ঘন্টাখানেক নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছিলেন...হয়ত তারা ভাত খেতে গিয়েছিলেন, নয়তা সিগারেট খেতে কিংবা কোনো কাজে। কিন্তু ভোট শেষে কমিশনাররা এভাবে ভোট কেন্দ্র ছেড়ে যেতে পারেন? যে কোনো একজন সাধারণ ভোটারও যদি প্রশ্ন করে, তারা কি কোনো শলাপরামর্শ করতে এক ঘন্টার জন্য উধাও হয়ে গিয়েছিলেন?...তাহলে কি তার অন্যায় হয়ে যাবে? ব্যাচের সব বন্ধুদের কাছে জাতীয় বেঈমান হয়ে উঠবে সেই প্রশ্নকর্তা?

ফুটবল টিমের সমান নির্বাচন কমিশন থাকা সত্ত্বেও কেন মাত্র তিনজন ব্যালট পেপার বন্টন করল...সে প্রশ্নের উত্তরও আমার জানা নেই। জানি না এ প্রশ্নের জন্য কী শাস্তি নির্ধারিত আছে।

কাছের বন্ধু ছিল পোলিং এজেন্ট। তার মতে, ভোট গণনা হয় রুদ্ধদ্বার কক্ষে। কিন্তু এমন পরিস্থিতি কেন তৈরি করা হলো যেখানে দ্বার উন্মোচন করে বাইরে যেতে হলো নির্বাচন কমিশনারকে...এক ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হলো ভোট গণনা। এ প্রশ্ন করলেও কি প্রশ্নকর্তাকে বয়কট করবে আমার বন্ধুরা? জানি না...শুধু জানি ব্যাচে কিছু মানুষ সব সময়ই আছে যারা আলোকে আলো আর অন্ধকারকে অন্ধকার বলেই চেনে।

নির্বাচনের পর দিন শনিবার যখন নানা বিষয়ে প্রশ্ন উঠল তখন জানা গেল, ফল ঘোষণার সাথে সাথেই ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। র‌্যাগের আয়োজক কমিটির কয়েকজন বন্ধুকে ফোন দিলাম। তোরা জানিস কখন ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে? তারা বলল, ‘এটা তো আমরা জানি না।’ ফল ঘোষণার পরপরই ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলার এমন নজির কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। কেউ যদি এর কারণ জানতে চায়...আমরা সবাই মিলে কি তাকে খুঁজে বের করে যথাযথভাবে তার শাস্তি নিশ্চিত করব?

যাই হোক...আমার রাজা আরমান খান যুব। তার পাওয়া ভোটের মধ্যে একটি ভোটের মালিক ছিলাম আমি। শেষ পর্যন্ত যুবই রাজা হবে তা নিয়ে কোনো সন্দেহ আমার ছিল না। আমি বিশ্বাস করি, এই নির্বাচনে যুব তার প্রাপ্য পেয়েছে, তেমনি বিশ্বাস করি ব্যক্তি বিশেষের অসততা, অনৈতিকতার কারণে আজ এত প্রশ্ন, এত বিভাজন আমাদের ভেতরে। শ্যামাকে অভিনন্দন। ভালোবাসা সিয়াম আর নোভার জন্য। সব কিছুর পরও সুন্দর র‌্যাগ চাই আমি।

অনেক কিছু বললাম। তবে সঠিক সময়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না হওয়া, ব্যালট পেপার পুড়িয়ে ফেলা, ফটোকপি করা ব্যালটে ভোট গ্রহণ, বাকিতে নমিনেশন দেয়া এসব গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু এসব অভিযোগ পাশ কাটিয়ে যখন সবার দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর চেষ্টা চলে তখন আমাদের আরও বেশি এক হতে হবে। বুঝতে হবে কোন মাঠে রাবণ হয়ে ওঠে রাম, খল নায়ক হয়ে ওঠে নায়ক।

আমার ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার সনির্বন্ধ অনুরোধ রইল। অন্য কোনো উদ্দেশ্য নয় বরং পুরো র‌্যাগের অনুষ্ঠানকে আরও সুন্দর, অংশ গ্রহণমূলক ও গণতান্ত্রিক করার লক্ষ্যেই আমার এত কথা। আমি বিশ্বাস করি, ৪১ ব্যাচ মেধাবীদের ব্যাচ যারা যে কোনো পরিস্থিতিতে সত্য ও সুন্দরের পক্ষে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে সেসব যদি সত্যি হয়ে থাকে তা আমাদের জন্য লজ্জার। একজন সাধারণ শিক্ষার্থী, ভোটার আর র্যামগার হিসেবে আমি সব সময়ই বলব, নির্বাচন কমিশনের আরও সততা, দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়ার অবকাশ ছিল। অথচ সে প্রশ্ন না তুলে আমরা বলছি অন্য কথা। কিন্তু সত্য কেউ না কেউ বলবেই.........তাই আসুন নিজেকে সেফ জোনে রেখে সেই অপেক্ষায় থাকি আর নচিকেতার গান শুনি......

‘‘তোমরা জানতে চাইবে এতে আমার কিসে লাভ
হয়ত আমি বলল, এটা আমার স্বভাব
আমি উজান স্রোতে কাটব সাতার, ছেড়ে সোনার তরি
তোমরাই বল অকাজ, আমি অন্ধের দেশে চশমা বিক্রি করি।’’

৪১তম ব্যাচের সাধারণ শিক্ষার্থীদের পক্ষে,
লুসি ম্যারি এন (ছদ্মনাম)
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,
সাভার, ঢাকা।

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0197 seconds.