• ০৭ জুলাই ২০১৯ ২২:৫২:৩০
  • ০৭ জুলাই ২০১৯ ২২:৫২:৩০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘ক্রসফায়ারে দেয়া’

ফাইল ছবি


ইয়াসির আরাফাত বর্ণ :


ওয়ারীতে সাত বছর শিশুকন্যাকে ধর্ষণের পর হত্যাকারী অপরাধীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। যথারীতি নাগরিকদের একটি অংশের কাছ থেকে দাবি উঠেছে ক্রসফায়ারের। কয়েকদিন আগেই বরগুনার রিফাত হত্যাকান্ডে জড়িতদেরকেও ‘ক্রসফায়ারে দেয়া’র দাবি উঠেছিল, দুদিন পরই হয়েছিল বাস্তবায়ন।

তবে এবার ওয়ারীর ঘটনায় ক্রসফায়ারের দাবি তোলা নাগরিকদের সংখ্যা আরো বেশি। জানিনা এটাও বাস্তবায়ন হবে কীনা তবে ভবিষ্যতে এ রকম ঘটনাগুলো আরো ঘটলে ক্রসফায়ারের দাবি তো নাগরিকদের সংখ্যা আরো বাড়বে বলেই আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।

এখানে ‘ক্রসফায়ারে দেয়া’ একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ টার্ম। পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের সামনে ক্রসফায়ারের যে ন্যারেটিভ (গল্প) হাজির করে তাতে ক্রসফায়ার কোনো পরিকল্পিত ঘটনা হওয়া সম্ভব না, স্রেফ একটি দুর্ঘটনা। মানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আটক ব্যক্তিকে নিয়ে অস্ত্র বা এ জাতীয় কিছু উদ্ধার করতে গেল, পথিমধ্যে আটক ব্যক্তির সহযোগীরা আক্রমণ করে বসলো, তখন পালিয়ে যেতে গিয়ে কিংবা গোলাগুলির মাঝে পরে নিহত হলেন আটক ব্যক্তি। গল্পে বেশি বৈচিত্র আনতে গেলে অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দু-একজন আহত হতে পারেন। কিন্তু এখানে ‘ক্রসফায়ারে দেয়া’র দাবি উঠছে, ‘দেয়া’ শব্দটার মাধ্যমে ক্রসফায়ার নামক একটি বিচারহীন ও দুর্ঘটনাজনীত মৃত্যুও যে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত করা যায় তার ইঙ্গিতই দেয়া হচ্ছে।

এখন এই নাগরিকেরা কেন ‘ক্রসফায়ারে দেয়া’র দাবি তুলছেন ! এই নাগরিকেরাই নিরাপদ সড়কের জন্য সরকারকে শাপান্ত করে, বাসা ভাড়া বিদ্যুৎ পানি গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে রাস্তায় না নামলেও দামবৃদ্ধিকে অন্তত যৌক্তিক মনে করে না, এরাই রূপপুর প্রকল্পের সমুদ্রচুরি, ভোটডাকাতি, দুর্নীতি,গুম-খুনের সমালোচনা করে প্রকাশ্যে কিংবা অন্দরে। অর্থাৎ কোনটা ন্যায্য আর কোনটা অন্যায্য তা বোঝার মত কান্ডজ্ঞান নাগরিকদের আছে।

এতকিছু যখন তারা বোঝে তাহলে সার্বভৌম রাষ্ট্রে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে তার বিচারিক প্রক্রিয়া ও আইন আদালতের দায়রবদ্ধতা সম্পর্কে অবশ্যই তারা ওয়াকীবহাল। তাদের জানার কথা রিফাতের খুনীদের শাস্তি দেয়ার প্রক্রিয়া হবে আইন আদালতের হাত ধরে, তাদের জানার কথা ওয়ারীর ধর্ষণকারীর শাস্তি দেয়ার প্রক্রিয়া হবে আইন আদালতের হাত ধরে, এমনকি কক্সবাজারের কাউন্সিলর ইকরাম- ইয়াবা ব্যবসায়ী হবার কারণে তার যে শাস্তিই হোক না কেন (এমনকি তা যদি মৃত্যুদন্ডও হয়) তা হওয়ার কথা আইন আদালতের ভেতর দিয়েই।

এটুকু জানার পরও যখন তারা পরিকল্পিত ক্রসফায়ারের দাবি তুলছেন তার মানে তারা দেশের বিদ্যমান আইন ও আদালতকে বিশ্বাস করেন না কিংবা ভরসা করেন না। তারা হয়তো জানেন কিংবা তাদের কারো কারো জীবনে হয়তো এমন ঘটনাও ঘটেছে যে, আইনের দলান্ধতা দীর্ঘসূত্রিতা এবং অপরাধীদের ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকার কারণে আইন ও আদালত বার বার অপরাধীদেরকে উপযুক্ত শাস্তি না দিয়ে পার পাইয়ে দিয়েছে। ফলে যখন কোনো এক নির্মম ঘটনা চোখের সামনে আসছে এবং অপরাধীতে চিহ্নিত করা যাচ্ছে তখনই তারা আদালত কাঠামোকে আর বিশ্বাস না করে ওই কাঠামোর সর্বোচ্চ শাস্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিজচোখে দেখার তাগিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে ‘ক্রসফায়ার দেয়া’র দাবি তুলে বসছে।

এতে লাভ হচ্ছে শোষণ এবং ক্ষমতার। অপরাধীদের বিরুদ্ধে জনসাধারণের হুট করে জেগে ওঠা আবেগকে তারা ক্রসফায়ারের মাধ্যমে প্রশমন করিয়ে দিচ্ছে। অপরাধীর নিকৃষ্টতম মৃত্যু হবার কারণে জনমনে ‘উচিত শিক্ষা হয়েছে’ টাইপ অনুভূতি চলে আসছে এবং জনতা ভুলে যাচ্ছে এই অপরাধ সংগঠিত হবার পেছনে রাষ্ট্র ও ক্ষমতার দায়ের জায়গাটুকু, অপরাধের দায়স্বরূপ রাষ্ট্র ও ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা কিংবা চ্যালেঞ্জ করার চিন্তা একটুও মাথায় আসছে না তাদের। পাশাপাশি অপরাধীরা যেহেতু বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই মারা যাচ্ছেন ফলে তাদের অপরাধকর্মের পেছনের ইন্ধনদাতারাও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইন্ধনদাতারা টিকে থাকায় অপরাধী তৈরী হওয়া কমছে না বরং আগের অপরাধীর ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে আরো চতুর এবং কৌশলী সহিংসতাকারীদের জন্ম হচ্ছে।

লেখক: শিক্ষার্থী, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0196 seconds.