• ১৬ জুন ২০১৯ ২২:৫৮:১৩
  • ১৬ জুন ২০১৯ ২২:৫৮:১৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

শ্রীলঙ্কায় নির্বিচারে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে মুসলমানদের

স্বামীর পাশে আব্দুল রাহিম মাজাহিনা। ছবি : সংগৃহীত

ফারহানা করিম :  

খ্রিষ্টানদের ধর্মীয় উৎসব ইস্টার সানডেতে শ্রীলঙ্কার তিনটি গির্জা এবং বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিকমানের হোটেলে বোমা হামলায় বিপুল সংখ্যক মানুষ হতাহত হয়েছিলেন। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সন্ত্রাসী সংগঠন আইএস ওই হামলার দায় স্বীকার করে জানিয়েছিল, স্থানীয় মুসলিম উগ্রপন্থীদের সহায়তায় বর্বর ওই হামলা করা হয়েছে।

মূলত নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে বোমা হামলার প্রতিশোধ নিতেই এই হামলা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে আইএস। তবে ইস্টার সানডের হামলার পর শ্রীলঙ্কায় বসবাসরত মুসলমানরা তীব্র আতংকের মধ্যে জীবন যাপন করছেন। নির্বিচারে গ্রেপ্তারের শিকার হচ্ছেন তারা।

আল জাজিরার একটি প্রতিবেদনে শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের এধরনের দুর্বিসহ জীবনের বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে।

১৭ মে সেন্ট্রাল শ্রীলঙ্কার পুলিশ আব্দুল রাহিম মাজাহিনা নামে ৪৭ বছর বয়সি এক নারীকে গ্রেপ্তার করে।  পরবর্তীকালে তিনি জানতে পারেন, পোশাকের কারণেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মাজাহিনা যে পোশাক পরেছিলেন তাতে জাহাজের চাকার মত দেখতে ছবির নকশা আঁকা ছিল। কিন্তু পুলিশ জানায়, তার এই নকশার সঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় প্রতীক ধর্মচক্রের সঙ্গে মিল রয়েছে। 

হাঁপানি এবং উচ্চরক্তচাপের রোগী মাজাহিনা এর আগেও বহুবার এই পোশাক পরেছিলেন কিন্তু তখন কেউ এটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখেনি বলেই এখন তার মনে হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যদি সত্যিই এটি ধর্মচক্র হতো তাহলে এর আগে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ এই ব্যাপারে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করতো।’

শ্রীলঙ্কার বৌদ্ধ ধর্মবিষয়ক বিভাগ পরবর্তীকালে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানায়, মাজাহিনার পোশাকে যে ছবি রয়েছে তা ধর্মচক্রের সঙ্গে মিলে কি না সে ব্যাপারটি তারা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।

এদিকে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ১৩০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হাসালাকা অঞ্চলের পুলিশ ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আইনের আওতায় মাজাহিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। তার আইনজীবী ফাতিমা নুশরা জারুক জানান, ধর্মীয় বিদ্বেষ ছাড়াও এমন একটি আইনেও তাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে যেখানে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

পুলিশের মুখপাত্র রুয়ান গুণাসেকারা আল জাজিরাকে জানান, ইস্টার সানডের বোমা হামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে এখন পর্যন্ত যে ২ হাজার ২৮৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে মাজাহিনাও রয়েছেন। এদের মধ্যে ১ হাজার ৮২০ জন মুসলমান। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন কেবলমাত্র পোশাকের কারণেই মাজাহিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। 

প্রসঙ্গত, ২১ এপ্রিল ইস্টার সানডের হামলায় আড়াইশো জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক আহত হয়েছিলেন।  শ্রীলঙ্কাজুড়ে গির্জা এবং বিলাসবহুল হোটেলকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছিল।

অবশ্য গ্রেপ্তার হওয়া ২ হাজার ২৮৯ জনের মধ্যে পরবর্তীকালে ১ হাজার ৬৫৫ জনকে জামিনে মুক্তি দেয়া হয়। ৬৩৪ জন এখনো পুলিশ হেফাজতে রয়েছে বলে জানা গেছে। গুণাসেকারা জানান, আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হয় তদন্ত চলছে কিংবা তাদের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। যে ৪২৩ জনকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ৩৫৮ জনই মুসলমান। 

কোন রকমে চোখের পানি আটকে রেখে মাজাহিনা বলেন, ‘থানায় ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আমার মাথার স্কার্ফ খুলে ফেলতে এবং অন্য পোশাক পরতে বাধ্য করেন। এসময় অন্যান্য পুলিশ অফিসাররা আমার ছবি তুলছিল।’

তিনি জানান, ১৭ দিন তিনি বন্দী ছিলেন। এসময় নিরাপত্তারক্ষী তাকে বার বার সন্ত্রাসী বলে উল্ল্বেখ করেছে।   
৩ জুন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাকে জামিনে মুক্তি দেয়। কিন্তু নভেম্বর মাসে তাকে আবারো আদালতে যেতে হবে বলে উল্লেখ করেন মধ্যবয়সি এই নারী। যদি তিনি দোষী সাব্যস্ত হন তাহলে তাকে সর্বোচ্চ সাজা হিসেবে অন্তত দুই বছর জেল খাটতে হবে।

দ্বীপদেশ শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। মুসলমানদের সংখ্যা শতকরা ১০ ভাগেরও কম। এছাড়া অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে হিন্দু এবং খ্রিষ্টান রয়েছে।

জেলে থাকার সময় মাজাহিনার রক্তচাপ বেড়ে যায়। ঘরে ফিরে আসার পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার স্বামী মুনাফ একজন দিন-মজুর। স্ত্রীর সেবা করার জন্য তিনি কিছু দিনের জন্য কাজ থেকে অব্যাহতি নিয়েছেন।  যার ফলে পরিবারটি ব্যাপক আর্থিক সমস্যায় পড়ে যায়।

এদিকে শ্রীলঙ্কার মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন দীপিকা উদুগামা জানান, পুলিশ মুসলমানদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার করছে এধরনের বেশ কয়েকটি অভিযোগ ইতোমধ্যেই তিনি পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই ব্যাপারে আমরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এ ধরনের গ্রেপ্তারের ঘটনা উল্লেখ করে আমরা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিদর্শকের কাছে লিখবো।’

ইস্টার সানডের হামলার আগে শ্রীলঙ্কায় নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং আটকের শিকার হতো সংখ্যালঘু তামিল জনগোষ্ঠী। তামিলরা হিন্দু এবং খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বী। সংখ্যাগরিষ্ঠ সিংহলি জনগোষ্ঠীর অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করে স্বাধীন তামিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তামিলরা লিবারেশন টাইগারস অব তামিল ইলম (এলটিটিই) প্রতিষ্ঠা করে। বিচ্ছিন্নতাবাদী এই সংগঠনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত ছিল শ্রীলঙ্কার সরকার। পরিশেষে মাহিন্দা রাজাপক্ষের সরকার তামিলদের পরাজিত করে শ্রীলঙ্কায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।

মুসলমানদের নির্বিচারে গ্রেপ্তারের ব্যাপারে পুলিশের মধ্যে কোন উদ্বেগ আছে কি না জিজ্ঞেস করা হলে মুখপাত্র গুণাসেকারা বলেন, ‘এই ব্যাপারে আমি কিভাবে বলতে পারবো? কারো যদি কোন আপত্তি থাকে, তাহলে পুলিশ সদর দপ্তরে কিংবা মানবাধিকার কমিশনে অভিযোগ জানাতে পারেন।’ তিনি জানান, পুলিশের সদর দপ্তরে এখনো পর্যন্ত এধরনের কোন অভিযোগ আসেনি।

এদিকে শ্রীলঙ্কার মুসলিম সম্প্রদায় প্রতিনিয়ত যে ব্যাপক চাপের মধ্যে রয়েছেন সে ব্যাপারে এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

শ্রীলঙ্কার মুসলিম রাজনীতিক রাউফ হাকিম বলেন, ‘এটা সত্য যে ২১ এপ্রিলের বোমা হামলার মূল হোতা আমাদের সম্প্রদায়ের। কিন্তু ওই ঘটনার পর তাদের চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীকে সব ধরণের সহায়তায় আমরা করে এসেছি। তারপরেও আমরাই সবচেয়ে বেশী ভোগান্তির শিকার হচ্ছি।’

৫৮ বছর বয়সি জেজিমা(ছদ্মনাম) আল জাজিরাকে জানান, তার স্বামী নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পরেও বাদুল্লা জেলার পুলিশ তার অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। অবশেষে মানবাধিকার কমিশনের সহায়তায় তিনি তার স্বামীর খোঁজ পান। কলম্বোর অপরাধ তদন্ত বিভাগ তাকে আটক করেছে বলে জানতে পারেন তিনি।

এছাড়া ২০ বছর বয়সি আসলাম রিজভির কথা বলা যেতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত একটি এসডি মেমোরি কার্ড রাখার অপরাধে তাকে আটক করা হয়েছে। তার প্রতিবেশি ১৯ বছর বয়সি আব্দুল আরিসের ফোনে ইস্টার সানডের বোমা হামলার কিছু ফুটেজ থাকার কারণে তাকেও আটক করা হয়। তিনি এই ফুটেজ হোয়াটস অ্যাপ থেকে পেয়েছেন বলে জানান।

ইস্টার সানডে হামলার মূল হোতা জাহরান হাশিমের জন্মস্থান কাত্তানকুডির মুসলমানদের অবস্থা আরো খারাপ। এই অঞ্চলের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক নাম না বলার শর্তে বলেন, ‘প্রত্যেকেই ভয়ে ভয়ে আছে। অনেক নিরীহ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমাদের মধ্যে কাউকে যদি কোন লোকের সন্দেহ হয় তাহলেই তারা পুলিশে খবর দেয়।’

শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের একটি সংগঠন অল সিলন জামিয়াতুল উলামার নেতা মুফতি রিজভি নির্বিচারে নিরীহ মুসলমানদের গ্রেপ্তার করা থেকে বিরত থাকার জন্য সরকারের কাছে অনুরোধ জানান। শ্রীলঙ্কার স্বার্থেই এটা করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। নতুবা চরমপন্থা আরো বেড়ে যাবে বলে আশংকা করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট বিষয়

শ্রীলঙ্কা মুসলমান

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0262 seconds.