• ১৩ জুন ২০১৯ ১৯:১৫:১৪
  • ১৩ জুন ২০১৯ ২১:১৭:৩৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন

চেরনোবিলের আয়নায় রূপপুরের ভূত

ছবি : সংগৃহীত


মওদুদ রহমান :


মুক্তি পাবার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাঝেই টপরেটেড ক্যাটাগরিতে স্থান না পেলেও চেরনোবিল মিনি সিরিজটা হয়তো বাংলাদেশে এমনিতেই জনপ্রিয় হতো। কারণ এই সিরিজের নামটার সাথে এই অঞ্চলের মানুষ নানান সময়ে নানানভাবে পরিচিত হয়েছে। এই পরিচিতির শুরু পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণের খবর পত্রিকার হেডলাইনে আসার মাধ্যমে।

১৯৮৬ সালের এই ঘটনার পরবর্তী বছরগুলোর ঈদে অনেক পরিবারই বঞ্চিত হয়েছে দুধ সেমাই খাবার আনন্দ থেকে। কারণ খবর রটেছিল যে, পোল্যান্ড থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়া গুঁড়া দুধ কম দামে আমদানী করে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে এক শ্রেণীর ধুরন্ধর ব্যবসায়ী (নিউইয়র্ক টাইমস, ৫ জুন, ১৯৮৭)। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের অন্যতম কারণ হিসেবেও চেরনোবিল নামটার উল্লেখ হয়েছে অনেকের বিশ্লেষণে।

আর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ শুরু হবার পর থেকে চেরনোবিল নামটা পরিচিতি পাচ্ছে অনেকটা ঘরের পাশের শহরের মতই। রাশিয়া থেকে প্লেন ভর্তি হয়ে প্রজেক্টের কর্তাব্যক্তিরা আসছেন, সভা-সেমিনার করছেন, শতভাগ নিরাপদ প্রযুক্তির গান শোনাচ্ছেন আর প্রজেক্টের অংশ হিসেবে ফিরতি প্লেনে বাংলাদেশ থেকে ঘুরতে নিয়ে যাচ্ছেন আমলা, সাহিত্যিক আর সাংবাদিকদের যেনো তারা ফিরে এসে কোম্পানীর স্তুতিভরা কলাম কিংবা কবিতা লিখতে পারেন।

চেরনোবিলের প্রতিক্রিয়াঃ

চেরনোবিল সিরিজ দেখে যারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন তাঁদেরকে মোটা দাগে দুইভাগে ভাগ করা যায়। একদল বিস্ফোরণের ভয়াবহতায় স্তম্ভিত হচ্ছেন, রূপপুরের চিন্তায় আতঙ্কিত হচ্ছেন, চেরনোবিলের তুলনায় সামান্যমাত্রার দুর্ঘটনাও যদি বাংলাদেশে ঘটে তাহলে কি হবে তা ভেবে কপালে ভাঁজ ফেলছেন। আরেকদল উন্নত প্রযুক্তির কথা বলছেন, আতংকগ্রস্থদের গুহাবাসী বলে টিটকারী মারছেন, বদলে যাওয়া যুগের হাওয়ায় অভ্যস্ত হতে বলছেন। একদল যেখানে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জবাব জানতে চাইছে, আরেকদল তখন আশ্বাস আর বিশ্বাসের মোয়া বিতরণ শুরু করেছে।

সাধারণ মানুষের আগ্রহ, জিজ্ঞাসা, সচেতনতার বিপরীতে ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া নীতি-নির্ধারক, এক শ্রেণীর সুবিধাভোগী বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী আর সাংবাদিকদের উন্নাসিকতা অবশ্য নতুন কিছু নয়। নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রির এই জারিকৃত প্রশ্নবিহীন ব্যবস্থার ফলেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনার ৭ বছর পরে ঘটে চেরনোবিল বিস্ফোরণ আর তারও ২৪ বছর পরে এসে জাপানে ঘটে ফুকুশিমা পারমাণবিক দুর্ঘটনা। দুর্ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রি সবসময়ই ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’ টেকনোলজির বড়াই করে। আর দুর্ঘটনায় পর হাজির হয় ‘আরও আধুনিক’ প্রযুক্তির বিজ্ঞাপন নিয়ে। যেমন এখন বলা হচ্ছে, রূপপুর প্রকল্পে নাকি অতি উন্নত ‘থার্ড জেনারেশন প্লাস’ প্রযুক্তি বসানো হবে। কিন্তু কে না জানে যে, উন্নত প্রযুক্তির লেবেল ব্যবসা প্রচার আর প্রসারের বাহানা মাত্র। প্রযুক্তির উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া এবং নিয়ত গবেষণার মাধ্যমে এটিতে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ হবে এটাই স্বাভাবিক। কাজেই থার্ড জেনারেশনের ট্যাগ লাগানো প্রযুক্তি রোসাটমের ঝুড়িতে থাকা সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি হতে পারে কিন্তু এটাই কী সর্বশেষ? চেরনোবিল দুর্ঘটনার সময় কী সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ছিল না? ফুকুশিমা দুর্ঘটনাকালে জাপানের হাতে কী ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’ টেকনোলজি ছিল না?

চেরনোবিল সিরিজটা সকলকে আবারো সেই পুরনো প্রশ্নগুলিই নতুন করে জিজ্ঞাসা করার সুযোগ এনে দিয়েছে। বিজ্ঞাপনের জোর আর পেশীশক্তির প্রভাব বলয়ের বাইরে থাকা সাধারণ মানুষেরা নিজেদের ভবিষ্যতের স্বার্থেই এই প্রশ্নগুলি তুলছেন কিন্তু এই বিতর্কে অংশ না নিয়ে, প্রশ্নের যৌক্তিক জবাব না দিয়ে আবারো নতুন কোন বিজ্ঞাপন বাজারে আসবে কিনা, নতুন কোন কলাম কিংবা কবিতা লেখা হবে কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শতভাগ নিরাপদ অথচ দুর্ঘটনা ঘটলে দায়মুক্তি আইনঃ

তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হতে চেরনোবিলের মত বিস্ফোরণের কোন প্রয়োজন নেই। এই তেজস্ক্রিয়তা ছড়াতে থাকে প্রতিনিয়ত। বেশীরভাগ সময়েই তা হয় লো-ডোজের বিকিরণ যা কিনা অনেকে তুলনা দেয় ১২ টা কলায় থাকা তেজস্ক্রিয়তার সাথে আবার কখনো হালকা করার চেষ্টা করে এক্সরের সাথে তুলনা করে। কিন্তু একটা পারমাণবিক কেন্দ্রে প্রতি মুহুর্তেই থাকে এই নিন্মমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা উচ্চ মাত্রায় পৌঁছে যাবার ঝুঁকি। যখন এর মাত্রা বেড়ে পরিবেশে ছড়াতে থাকে তখন কী রাষ্ট্র আমাদের জানতে দেয়? তখন কী ঘোষণা দিয়ে সবাইকে সতর্ক করা হয়? এর সরাসরি জবাব হচ্ছে, ‘না’। রাশিয়া, ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, এমনকি জাপানেও এমন রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তার উদাহরণের লিস্ট উল্লেখ করেই লিখে ফেলা যাবে আরেকটা লেখা। এখানে শুধু জানিয়ে রাখি যে, ভারতে ১৯৯৫ সাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পারমাণবিক স্থাপনায় কর্মরত ১,৭৩৩ জন বিজ্ঞানী এবং কর্মচারী ক্যান্সার, হৃদরোগ এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ অকেজো হয়ে মারা গেছেন যাদের বেশীরভাগের বয়স ছিল ২৯ থেকে ৫০ বছর।

<http://uswww.rediff.com/news/report/suicides-at-indias-atomic-centres-in-15-years/20101004.htm>

ভারতে দাবিকৃত “নিরাপদ” পরমাণু প্রযুক্তি নিয়ে কর্মরতদের এত বড় অংশ কী কারণে অকালে মৃত্যুবরণ করলো, কী কারণে ১৯৭ জন আত্নহত্যা করলো তা নিয়ে পরবর্তীতে কোন তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়নি। আর বাংলাদেশে তো দায়মুক্তির ব্ল্যাংকচেক আইন করে আগেই দিয়ে রাখা হয়েছে।

<http://bdlaws.minlaw.gov.bd/bangla_sections_detail.php?id=1165&sections_id=44292&gt>

এখন প্রশ্ন হচ্ছে,  দাবিকৃত শতভাগ নিরাপদ প্রযুক্তি আমদানি করার পরও ভবিষ্যতে যে কোন ধরণের পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়মুক্তি দিয়ে আইন তৈরী করে রাখা হয়েছে কেন?

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কতটা সস্তা?

চেরনোবিল সিরিজে দেখানো এতসব বিপদ আর পাহাড়সম ঝুঁকির পরও কেবল সস্তা  বিদ্যুৎ উৎপাদনের দোহাই দিয়েই এখনও পর্যন্ত টিকে আছে এই ইন্ডাস্ট্রি। পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের শুরুর দিকে প্রচারণা ছড়িয়েছিল যে একদিন এই বিদ্যুৎ কল্পানাতীত সস্তা উপায়ে বিতরণ করা হবে। কিন্তু সেই সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাল আর আসেনি। বরং দিনে দিনে খরচের বোঝা কেবলই বেড়েছে। এখন এর উৎপাদন খরচ এতটাই আকাশ্চুম্বী হয়েছে যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কোম্পানী ওয়েস্টিংহাউজ ২০১৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণা করেছে। (দ্য গার্ডিয়ান, ২৯ মার্চ, ২০১৭)। প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রি স্ট্যাটাস রিপোর্ট (WNISR) অনুসারে ফ্রান্সের রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণকারী কোম্পানী ‘আরিভা’ গত ছয় বছরে ১২.৩ বিলিয়ন ডলারের (প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা) লোকসান গুনেছে। কোম্পানির ব্যবসা বাঁচাতে সরকার ৫.৩ বিলিয়ন ডলারের সাহায্য প্রদান করে এবং শেষে কোম্পানিটি ভেঙ্গে যায়।

খরচের পাগলা ঘোড়ার সওয়ারি এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবসা আসলে শুরু থেকেই টিকে আছে রাষ্ট্রায়ত্ত ভর্তুকি সুবিধা ভোগ করার মাধ্যমে। বছরের পর বছর ধরে এই খরচের বোঝা টানার পর অবশেষে কয়েকটি দেশ এখান থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ উল্লেখ করা যায়, ভিয়েতনাম সরকারের সিদ্ধান্তের কথা। রাশিয়া ও জাপানের সাথে পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি হয়ে যাবার পরও ফুকুশিমা দুর্ঘটনার পর ভিয়েতনাম সরকার তা বাতিল করে দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই কোন অজানা ভয় থেকে নেয়া হয়নি। বরং সাত বছরের ব্যবধানে প্রাক্কলিত খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় নিজেদের অর্থনীতি বাঁচাতে ভিয়েতনাম সরকার এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে।

<https://www.reuters.com/article/us-vietnam-politics-nuclearpower/vietnam-abandons-plan-for-first-nuclear-power-plants-idUSKBN13H0VO>

পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে খরচের এই লাগামহীনতা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায় যে, ১৯৬৬ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৭৫ টি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ শুরু হয়। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রকৃত নির্মাণ খচর প্রাক্কলিত খরচের চেয়ে গড়ে ৩০০ শতাংশ বেড়ে যায়। (রামানা এম. ভি., ২০০৯)। একইভাবে ফ্রান্সের ফ্লামেনভিলেতে ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ খরচ ইতোমধ্যেই তিনগুণ বেড়ে গেছে অথচ নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। (রয়টার্স, ৪ ডিসেম্বর, ২০১২)। কাজেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বেলায় যে অন্যরকম কিছু ঘটবে তা মনে করার কোনই কারণ নেই। বরং এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকাজ শুরুর আগেই মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে প্রাক্কলিত বাজেট ৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১২.৬৫ বিলিয়ন ডলারে এসে ঠেকেছে। (WNISR 2017)।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, বাংলাদেশের সাথে রাশিয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি ‘ফিক্সড কস্ট’ মডেলে হয়নি, হয়েছে ‘কস্ট প্লাস’ মডেলে। অর্থাৎ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান যে কোন কারণ দেখিয়ে যে কোন সময় খরচ বৃদ্ধির আবেদন করতে পারবে। এ প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বাজেটের ৯০ শতাংশ রাশিয়া থেকে ঋণ হিসেবে নেয়া হচ্ছে যা সুদে-আসলে শোধ দিতে হবে। এই পরিমাণ অর্থঋণের বোঝা পুরো অর্থনীতিতেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। কাজেই এই প্রারম্ভিক ব্যয়, জ্বালানি খরচ, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষাগত খরচ এবং ডিকমিশনিং খরচ সব কিছু হিসাবে এনে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে উৎপাদিত প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম কত হবে তা কেন প্রকাশ করা হয় নি তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়।

পারমাণবিক বর্জ্যের কী হবে?

এই প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলেই জবাব আসে, ওটা নিয়ে চিন্তা নেই। রাশিয়া আছে না! অথচ রাশিয়ান ফেডারেশনের আইন বলছে যে, অন্য দেশ থেকে বর্জ্য এনে রাশিয়ার মাটিতে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা যাবে না।

<https://www.oecd-nea.org/rwm/profiles/Russian_Federation_report_web.pdf>

এ জায়গায় এসে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুধ-কলা খানেওয়ালারা বিশ্বাস করাতে চায় যে, রাশিয়া  বাংলাদেশের জন্য নিজেদের আইন পরিবর্তন করে ফেলবে। এমন চেষ্টা এর আগেও যে হয় নাই, এমনটা কিন্তু না। কিন্তু কোনবারেই রাশিয়ান সরকার নিজ দেশের আইন পরিবর্তন করে নাই। ২০০১ সালে তাইওয়ানের পারমাণবিক বর্জ্য নিরাপদকরণের জন্য মার্কিন মধ্যস্ততায় রাশিয়ায় পাঠানোর আয়োজনের প্রতিবাদে রাজপথে নেমে এসেছিল রাশিয়ার জন সাধারণ। রাশিয়া বড়জোর যেটা করতে পারে, সেটা হচ্ছে রি-প্রেসেসিং যার মাধ্যমে স্পেন্ট ফুয়েল থেকে বাড়তি ২৫-৩০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের জ্বালানী পাওয়া সম্ভব। কিন্তু যারা রাশিয়াতে স্থায়ীভাবে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য সংরক্ষণের আশায় বিশ্বাস করাতে চায় তাদেরকে জিজ্ঞাসা করুন যে, এতে কী পরিমাণ ঝুঁকি থাকে? কত অর্থ খরচ হয়? আর কয় হাজার বছরের জন্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হয়?
পদকলোভী নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রির দুধ-কলাভোগী বিজ্ঞানী আর প্রকৌশলীরা প্রচার করে বেড়ায় যে, বছর শেষে একটা পারমাণবিক বর্জ্যের পরিমাণ নাকি ছোট একটা ব্রিফকেস সাইজের সমান হয়। অথচ মাত্র ২০ বছরে তাইওয়ানে ৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে তৈরী হয়েছিল ৭ হাজার ৫০০ টন তেজস্ক্রিয় বর্জ্য। <https://www.theguardian.com/world/2001/feb/19/russia.paulbrown > পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জটিলতা, জমতে থাকা বর্জ্য কয়েক হাজার বছর ধরে নিরাপদকরণের খরচ, যে কোন সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি এসব কিছু মাথায় রেখে তাইওয়ান সরকার তাই ২০২৫ সালের মধ্যে সকল পারমাণবিক কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। < http://world-nuclear-news.org/Articles/Taiwan-government-maintains-nuclear-phase-out >

চেরনোবিল সিরিজের নিয়ে এখন বিশ্বজুড়েই শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ একে দেখছেন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে মার্কিনী চক্রান্তের অংশ হিসেবে। আবার কেউ একে বলছেন অতিরঞ্জিত, কেউ বলছেন, না, এটাই বাস্তব। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন যে, এইচবিও’র চেরনোবিল মিনিসিরিজ দিনশেষে একটা গল্পই। নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রির কাজ-কারবার বাস্তবে এই সিরিজে দেখানো ঘটনার মত ভয়াবহ না। বরং এরচেয়েও বেশী। এই সিরিজে যতটুকু সত্য দেখা যায়, তারচেয়েও বেশী সত্য এখনও বন্দী আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া আর ফ্রান্সের নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রির গোপন নথিপত্রে।

জটিল প্রযুক্তির লেবেল লাগানো নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রির সাথে সব সময়ই রাষ্ট্রের থাকে মিথোজীবিতার সম্পর্ক। দুর্নীতিবাজ রাজনীতিবিদ, ঘুষখোর আমলা, পা-চাটা বুদ্ধিজীবি আর পদকলোভী বিজ্ঞানীদের একে অপরকে আশ্রয় করে দিনের পর দিন নিরাপদে টিকে থাকার আবাস হচ্ছে এই নিউক্লিয়ার ইন্ডাস্ট্রি। তাই চেরনোবিল সিরিজকে প্রোপাগান্ডা হিসেবে খারিজ করে দিলে আখেরে লাভ এই ইন্ডাস্ট্রিরই হবে, ক্ষতিটা হবে সত্যের। ক্ষতিটা হবে সাধারণ মানুষের যাদেরকে অশিক্ষিত আর মূর্খ জ্ঞান করে, জটিলতার প্যাকেটে সবকিছু বন্দী রেখে করে ফেলা হচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

তাই চেরনোবিলের আয়নায় যারা রূপপুরের ভূত দেখে আতঙ্কিত হচ্ছেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন করছেন তাঁদের আতঙ্ক আমলে নেয়া প্রয়োজন, তাঁদের প্রশ্নের জবাব খোঁজা প্রয়োজন। কারণ প্রশ্নের বিপরীতে স্বৈরাচারী ডান্ডা দেখানোর মূল্যটা অনেক বেশী যার কিছুটা হলেও আমরা দেখতে পাই চেরনোবিল মিনিসিরিজটাতে।

লেখক : প্রকৌশলী ও গবেষক

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0285 seconds.